পর্যটনের বিষফোঁড়া!

পাহাড়কে কিছু মানুষ লাস ভেগাস বানাইছে। আপনার মাথায় একবারও আসছে নীলগিরি জিনিসটা কী এবং কেন? নীলগিরিতে ছিল ম্রো জনগোষ্ঠীর বসতি কাপ্রু পাড়া। তাদের চোখের জল এখনো নীলগিরির মাটিতে লেগে আছে। ভুমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে কেন পাহাড়ের মাঝখানে এরকম ফাইভস্টার মানের আয়োজন করা লাগবে? তাও সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রনাধীন পর্যটন কমপ্লেক্স। কাপ্রু পাড়া নামটা ক্ষেত! ফাইভস্টার ব্যাবস্থাপনার সাথে যায় না! বরং নতুন দেওয়া ‘নীলগিরি’ নামটা অনেক বেশি সেক্সি এবং কমার্শিয়াল। তারও আগের প্রশ্ন হইতে পারে পর্যটন ব্যাবসা কী আর্মির কাজ?


পাহাড়কে কিছু মানুষ লাস ভেগাস বানাইছে। আপনার মাথায় একবারও আসছে নীলগিরি জিনিসটা কী এবং কেন? নীলগিরিতে ছিল ম্রো জনগোষ্ঠীর বসতি কাপ্রু পাড়া। তাদের চোখের জল এখনো নীলগিরির মাটিতে লেগে আছে। ভুমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে কেন পাহাড়ের মাঝখানে এরকম ফাইভস্টার মানের আয়োজন করা লাগবে? তাও সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রনাধীন পর্যটন কমপ্লেক্স। কাপ্রু পাড়া নামটা ক্ষেত! ফাইভস্টার ব্যাবস্থাপনার সাথে যায় না! বরং নতুন দেওয়া ‘নীলগিরি’ নামটা অনেক বেশি সেক্সি এবং কমার্শিয়াল। তারও আগের প্রশ্ন হইতে পারে পর্যটন ব্যাবসা কী আর্মির কাজ?

আরেকটা লাস ভেগাস বানাইছে সাজেক। কেন সেখানে আর্মির হোটেল মোটেল বানায়ে টুরিস্ট জোন করতে হইছে? সাজেক এলাকাটা কয়েক বছর আগেও পাংখোয়াদের বসতি ছিল। যাদের পাহাড় সম্পর্কে জানাশোনা আছে, তারা জানেন পাংখোয়ারা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে গহীনে থাকে। জনসমাগমে তারা খুবই অস্বস্তি বোধ করে। এখন সাজেক থেকে তারা বাড়িঘর উঠিয়ে আরো ভিতরে চলে গেছে।

এদিকে আমাদের টুরিস্টদের আচরণও মাশাল্লাহ। আমি প্রায়ই পাহাড়ের গহীনে যাই দেখে আমার শিক্ষিত স্মার্ট বন্ধু বললো পরেরবার তাকেও নিয়ে যাইতে। পরেরবার তাকেও নিয়ে গেলাম। সে প্রথমবার পাহাড়ে। সেদিন রাতে একটা বম পাড়ায় থাকবো। একটু পর দেখি সে তাদেরকে নানান বিব্রতকর প্রশ্ন করা শুরু করছে! যেমন – ‘আপনারা কিভাবে কথা বলেন? কি খান? সাপ খান? ব্যাঙ খান?’ এসব প্রশ্ন তাদেরকে হয়তো প্রায়ই শুনতে হয়। এগুলা অপমানজনক। আপনার বাসায় একজন পাহাড়ি এসে যদি জিজ্ঞেস করে আপনি কিভাবে কথা বলেন, একটু কথা বলে দেখানতো? আপনি কী গরু খান ছাগল খান? কাঁঠাল পাতা খান? এসব প্রশ্ন করলে আপনি প্রথম দিনই থাপ্পড় দিয়ে তার দাঁত ফেলে দিতেন। কথাবার্তা ছাড়াই আপনার উঠানে কেউ রাতে উচ্চস্বরে বারবিকিউ পার্টির নামে গান বাজানো শুরু করলে কি করতেন? নিরানব্বই ভাগেরও বেশি আদিবাসী সহজ সরল শান্তিপ্রিয়। আপনি নিশ্চই কখনোই শুনেন নাই পাহাড়িরা সমতলে এসে বাঙালিদেরকে মারছে। তাইলে পাহাড়ে কেন হয়? সেটা বুঝতে আপনার নিশ্চই অসুবিধা হওয়ার কথা না। সেটেলারদের কাছে পাহাড়ি মেয়েরা ভোগ্যপণ্য। আপনি শুনে অবাক হবেন পাহাড়িরা নিজের মাতৃভাষায় কথা বললেও, ধর্ষনকে তারা ধর্ষনই বলে। কারণ ধর্ষণ বলে বেশিরভাগ পাহাড়ি ভাষায় কোন শব্দই নাই!

সাজেকের কথায় ফিরে আসি। কথিত টুরিস্টরা সাজেক যাওয়ার সময় বাচ্চাদের জন্য চকলেট নিয়ে যায়। খুবই ভালো কথা। এই চকলেট কিনতে তাদেরকে উৎসাহিত করে বাঙালি জিপ ড্রাইভাররা। কিন্তু চকলেট গুলো কিভাবে বিলায় জানেন? খোলা জিপে করে যেতে যেতে চলন্ত জিপ থেকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবাসী শিশুদের দিকে মুঠ করে করে চকলেট ছুঁড়ে মারে! এদের কাছে এক দেড়শ টাকার বিনিময়ে এটা বিরাট বিনোদন। যে আমি কিছু ফ্রি’তে বিলাইতেছি! অবুঝ বাচ্চারাও এখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে চকলেটের জন্য। এখন আপনি বলতে পারেন, আপনি কী পাহাড়ে যাবেন না? অবশ্যই যাবেন! কিন্তু কমন সেন্সটা সাথে নিয়ে যাইতে হবে। কোথায় কেমন আচরণ করবেন এই সেন্সটা যেন অন্তত থাকে। ‘আনন্দ ভ্রমণ’ এর জন্য দেশে অনেক জায়গা আছে, সেখানে যান সমস্যা নাই। কিন্তু পাহাড় বা প্রকৃতি কোন আনন্দ ভ্রমণের জায়গা না। প্রকৃতি প্রার্থনার জায়গা, হৃদয় চোখ আত্নার প্রশান্তির জায়গা। কথিত পর্যটনের নামে পাহাড়ে ‘আনন্দ’ খোঁজকারীদের উৎপাত বন্ধ হোক।

পাহাড়িরা পাহাড়িদের মতো। সে আপনার মতো হবেনা। আপনি সবাইকে আপনার মতো বানাইতে যাইয়েন না। যাকে তার মতো থাকতে দেন। বব মার্লের ধর্মে অঙ্গহানি নিষেধ ছিল। চুল কাটা নিষেধ ছিল। এখন আপনি সভ্য বানানোর জন্য মার্লেকে ধরে তার চুল দাঁড়ি কেটে দেওয়াতো অসভ্যতা! যারে তার মতো থাকতে দেওয়াটাই সভ্যতা। আপনি কিভাবে জানেন আপনিই সভ্যতার মানদন্ড!? আপনি তাকে হাঁটতে সহায়তা করতে পারেন। কিন্তু আপনার রাস্তায় হাঁটতে বলতে পারেন না।

২ thoughts on “পর্যটনের বিষফোঁড়া!

  1. সহমত। কিছুদিন আগেই বান্দরবন
    সহমত। কিছুদিন আগেই বান্দরবন ঘুরে এলাম। জানতে চেয়েছিলাম, বুঝতে চেয়েছিলাম কেমন আছে পাহাড়ি মানুষগুলো।
    আপনার লিখায় অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়েছে, ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *