বাপজানের বায়োস্কোপঃ একটি অসামান্য চলচ্চিত্রের কথকতা

বাপজানের বায়োস্কোপ ছবিটি মূলতঃ আবর্তিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীকে আবর্তিত করে।যদিও সময়কাল মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরে।পদ্মার পাড়ের বিস্তীর্ণ ভাইগনার চরের কিছু মানুষকে নিইয়ে এ ছবির গল্প।গল্পের পরিচায়ক হিসেবে সামনে আসে হেসান মোল্লা,কিশোর ইনসান,মাতব্বর জীবন সরকার, তার রক্ষিতা , লাঠিয়াল সোহরাব,মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ,শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সেকান্দার বক্স চরিত্রগুলো।

বাপজানের বায়োস্কোপ ছবিটি মূলতঃ আবর্তিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীকে আবর্তিত করে।যদিও সময়কাল মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরে।পদ্মার পাড়ের বিস্তীর্ণ ভাইগনার চরের কিছু মানুষকে নিইয়ে এ ছবির গল্প।গল্পের পরিচায়ক হিসেবে সামনে আসে হেসান মোল্লা,কিশোর ইনসান,মাতব্বর জীবন সরকার, তার রক্ষিতা , লাঠিয়াল সোহরাব,মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ,শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সেকান্দার বক্স চরিত্রগুলো।

চলচিত্রের পটভূমি যমুনা পাড়ের চর “চর ভাগিনা”। চরের মালিক জীবন সরকার আর প্রান্তিক চাষী হাসেন মোল্লা কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে কাহিনী। হাসেন মোল্লার পিতা চরে চরে বায়োস্কোপ খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পিতার মৃত্যুর পর সেই বায়োস্কোপের বাক্সটি ঘরেই পড়ে থাকে। ছাপোষা কৃষক হাসেন মোল্লাকে তবুও ক্ষণে ক্ষণে নাড়া দিয়ে যায় বাবার শেষ স্মৃতি, পোড়ায় মন। একসময় হাসেন মোল্লা ঠিক করে ফেলে সপ্তাহে একদিন করে হলেও সে বায়োস্কোপের খেলা দেখাবে। বায়োস্কোপ বাক্সটি ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে প্রস্তুত করে দূর চরে খেলা দেখাতে যাবার জন্যে। পুরনো ছবিগুলো নষ্ট সময়ের ব্যবধানে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হাসেন মোল্লা এক নতুন কাহীনি ছবিতে আঁকিয়ে নেয়, নতুন রীল বানায়।

আর এই কাজে তাকে সহায়তা করে ৭ম শ্রেণীর মাদ্রাসা ছাত্র ইনসান।হেসানের খুব ভক্ত সে। চলতি নিয়মের রবীন্দ্রনাথ,কাজী নজরুল,ঢাকা শহর,সিনেমার নায়ক নায়িকা এসবের বদলে সে সামনে নিয়ে আসে এক অন্য কাহিনী।না, নতুন কিছু নয়। গল্প হিসেবে সে বেছে নেয় ৭১ এর এক সত্য কাহিনীকে। এই গ্রামের এক তরুণ ছিলো ইউসুফ।মুক্তির সংগ্রাম শুরু হলে ঝাপিয়ে পড়ে লড়াইয়ে।অপর চরিত্র সেকান্দার বক্স,যে ছিলো সাক্ষাৎ ইবলিশ। পাশের গ্রামে পাক আর্মি ক্যাম্প বসলে সে তাদের ডেকে আনে নিজ গ্রামে।শুরু হয় হত্যা,ধর্ষণ,আর জ্বালাও পোড়াও এর তাণ্ডব।সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন মুক্তিযোদ্ধারা ইউসুফের নেতৃত্বে।বন্দী করে সেকান্দারকে।কিন্তু সেকান্দারের কাকুতি মিনতিতে মন গলে যায় ইউসুফের।তাকে ক্ষমা করে দেন তিনি।বিনিময়ে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে দাওয়াত দেয় সেকান্দার তার বাসায়।সরলমনে ইউসুফ সেকান্দারের দাওয়াত রক্ষা করতে যায়।কিন্তু বেইমান সেকান্দার তাকে ধরিয়ে দেয় মিলিটারীর হাতে।যারা তাকে গুলি করে হত্যা করে।এই ইউসুফ ছিলেন হেসানের ছোট চাচা।বাবার মুখে শোনা চাচার এই কাহিনী নিয়ে গল্প বানায় হেসান আর কিশোর ইনসান আঁকে ছবি।চর থেকে চরান্তরে ছুটে চলে হেসান এই কাহিনী নিয়ে।

এই সময় চরে ফেরে সেকান্দার বক্সের ভাগ্নে জীবন সরকার,যার নামে এই ভাইগ্নার চর।সাথে নববধু।প্রকৃতপক্ষে সে তার বৌ নয়।কান্দাপাড়ার পতিতা পল্লীর এক বেশ্যা মাত্র।সহজ কথায় সরকারের রক্ষিতা।একদিন তার বায়োস্কোপ দেখার বায়না মেটাতে গিয়ে জীবন সরকার জানতে পারে বায়োস্কোপের আসল কাহিনী।রাগে জ্বলে ওঠে সে। সালিশ ডেকে বন্ধ করতে বলে বায়োস্কোপ।কিন্তু টলাতে পারেনা হেসানকে।মাথা উঁচু করে বলে “বাপজানের বায়োস্কাপ চলবে”। ক্ষেপে গিয়ে নির্দেশ দেয় যতোদিন বায়োস্কোপ চলবে ততদিন সারা চরে এক ছটাক লবণও বিক্রি করা যাবেনা। লবণের অভাবে হাহাকার পড়ে যায় সারা চরে।প্রতিবেশীরা বারবার অনুরোধ করে হেসানকে বায়োস্কোপ বন্ধ করতে।কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে হেসান। এরই মাঝে ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা।নিজের শরীর দিয়ে সরকারের লাঠিয়াল সোহরাবকে বশ করে সরকারের বৌ।বিনিময়ে সরকারের গুদাম থেকে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে বলে লবণ।

অনেকদিন কেটে গেলেও গ্রামবাসীরা লবণের জন্য হাহাকার করতে না দেখায় সন্দেহ জাগে সরকারের মনে।লোকমারফত সে জানতে পারে গ্রামে প্রত্যেকের বাড়ীতেই লবণ দিয়ে রান্না হচ্ছে।কোন হাহাকার নেই কোথাও।গ্রামবাসীদের ডেকে এনে মারধর করতে শুরু করে জীবন সরকার।কিন্তু বাধা দেয় তার বৌ।নিজের কাঁধে নেয় সকল দোষ।ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয় সরকার।
ইনসানের মা মিনারাকে ডেকে বেহেস্ত দোজখের ভয় দেখিয়ে বায়োস্কোপ থেকে দূরে রাখতে বলে সরকার।কিন্তু তাতে পেছপা হয়না ইনসান।তখন লাঠিয়াল সোহরাবকে দিয়ে ইনসানকে খুন করায় সরকার।চালিয়ে দেয় আত্মহত্যা বলে।সরকারের নির্দেশে ইনসানকে খুন করে ব্যাপক মনোকস্টে ভোগে সোহরাব।মনোজগতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে তার।প্রতি মূহুর্তে ইনসানের ছায়া পীড়া দিতে থাকে তাকে।ইনসানের মৃত্যু নাড়া দেয় চরবাসীদেরও।ফুঁসে উঠে যার যা আছে তাই নিয়ে সংঘটিত হয় তারা।তাদের দমন করার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে তেড়ে আসে জীবন সরকার।কিন্তু সম্মিলিত জনতার প্রতিরোধে পিছিয়ে যায়। যাওয়ার সময় সোহরাবকে বলে হেসানকে খুন করতে।কিন্তু এবার বেকে বসে সোহরাব।এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে কান্দাপাড়ার পিতৃপরিচয়হীন পতিতার সন্তান বলে কটাক্ষ করে জীবন সরকার।মূহুর্তে আগুন ধরে যায় সোহরাবের রক্তে।কুকুর নিধন করতে হাতের লাঠি নিয়ে তাড়া করে জীবন সরকারকে।আর ওইদিকে বাপজানের বায়োস্কোপ গেয়ে চলে সত্যের জয়গান।

হাসেন তার বাপজানের শেষ সম্বল বায়স্কোপের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া, তার পরিবার ও চরভাগিনার সত্য ঘটনা তুলে ধরে চরভাগিনার সমস্ত মানুষের কাছে। এমন একটি কাহিনী নিয়ে খ্যাতিমান নাট্যকার মাসুম রেজার কাহিনী ও সংলাপে তরুণ নাট্য নির্মাতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজুল রিজু নির্মাণ করেছেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘বাপজানের বায়স্কোপ‘।কাহিনী মাসুম রেজা চিত্রনাট্য রিয়াজুল রিজু সংলাপ মাসুম রেজা সঙ্গীত পরিচালক এস আই টুটুল সুরকার আমিরুল ইসলাম, অয়ন চৌধুরী গীতিকার আমিরুল ইসলাম, অয়ন চৌধুরী।ছবির মূল চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন শহীদুজ্জামান সেলিম,শতাব্দী ওয়াদুদ,সানজীদা তন্ময়, মাসুদ মহিউদ্দীন প্রমুখ।চমৎকার গল্প,কুশলী পরিচালনা।চিত্রায়ণ, সাবলীল অভিনয় সবলিছু মিলে চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠেছে এক কথায় অনবদ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *