কোর্স নং CSE-800

আজ আমি আমার জীবনের গল্প বলতে চাই। দাঁড়ান , দাঁড়ান, জীবনের গল্প বলতে চাওয়াতে আপনি হয়তো আমাকে বিখ্যাত কেউ ভাবছেন, ভাবছেন আমার জীবন মনে হয় কোন বিরল বিশেষত্বে ভরপুর । ভাই প্লিজ, লজ্জা দিবেন না। আমি মোটেও বিখ্যাত কোন ব্যক্তি নই, খুবই সাধারন একজন মানুষ। আট দশটা সাধারন মানুষের মতই গতানুগতিক আমার জীবন, ব্যতিক্রম কিছুই নেই। আট দশটা সাধারন মানুষের মত আমিও ৯টা -৫টা অফিস করি , রাতে বাসায় ফিরি, টিভিতে খেলা দেখি, রাজনীতি নিয়ে আলাপ করি। আট দশটা সাধারন মানুষের মত আমার জীবনেও জড়িয়ে আছে একজন, খুব প্রিয় একজন । আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিতে জড়িয়ে ছিল সে , এখনো আছে , ভবিষ্যতেও থাকবে। আমার অস্তিত্বের অংশ হিসেবে মিশে আছে সে। তাকে ছাড়া একটি দিনের কথা আমি এখনো ভাবতে পারি না। তাকে আমি প্রথম দেখি ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম দিনে ওরিয়েন্টশন প্রোগ্রামে। এক তীব্র শীতের সকালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দীর্ঘ স্বপ্ন পূরণের প্রগাঢ় আনন্দ নিয়ে গিয়েছিলাম ক্যাম্পাসে। কিছুটা ভয় আর রোমাঞ্চ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম অডিটরিয়ামের সামনে। নুতুন দিনের উজ্জ্বল স্বপ্ন চোখে এঁকে আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম রোমাঞ্চিত। বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় আর অল্প কিছু আড্ডার মধ্য দিয়ে দারুন সময় পার করছিলাম। হঠাৎ মেয়েদের জটলায় দীর্ঘ চুলের একটা মেয়ের দিকে আমার দৃষ্টি পড়ে যায়। কেমন যেন ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে চারপাশের সবকিছু দেখছিল সে। এরকম দীর্ঘ চুলের রূপসী কোন মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখিনি। একেবারে প্রথম দেখাতেই মেয়েটির প্রেমে পড়েছিলাম আমি, যাকে বলে লাভ এট ফার্স্ট সাইট। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছিলাম এই মেয়েটি যেন আমার ডিপার্টমেন্টে পড়ে। ঈশ্বরের কৃপায় হোক কিংবা কাকতালীয় যাই বলি না কেন পরদিন ক্লাসে গিয়ে আবিষ্কার করলাম সেই মেয়েটি আর আমি একই ডিপার্টমেন্টে একই সেকশনে পড়ছি। জানতে পারলাম মেয়েটির নাম প্রিয়তি। সেই দিনটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন গুলোর একটি। ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিন আর প্রথম প্রেমের আনন্দ মিলে মিশে একাকার হয়েছিল আমার মধ্যে। তীব্র সুখকর একটা অনূভতি নিয়ে ঐদিন বাসায় ফিরি।

আমি মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির আর দশটা ভীতু লাজুক ছেলের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিলাম না । ভালবাসার কথা বলতে গেলে কোন এক অজ্ঞাত জড়তা আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরত। মেয়েটি কি রাজী হবে, ওর কি কোন সম্পর্ক আছে, ক্লাসের সবাই কি হাসাহাসি করবে এই জাতীয় ভাবনা মাথায় আসতো সবসময়। কতবার যে বলি বলি করেও ভালবাসার কথা বলতে পারিনি। এভাবে দেখতে দেখতে কখন যে প্রথম সেমিষ্টার পার হয়ে গেল টেরই পাইনি। দ্বিতীয় সেমিষ্টারের শুরুতে একদিন প্রিয়তিকে দেখি ক্যাফেটেরিয়ার সামনে হাসিমুখে একটা ছেলের সঙ্গে গল্প করতে। তীব্র ঈর্ষা কী জিনিস সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করি আমি, সেই সঙ্গে জন্ম নেয় প্রবল অসুরীয় ক্রোধ। আমার ইচ্ছা হয় ঐ ছেলেটিকে মেরে একেবারে তক্তা বানিয়ে দিতে। এত মেয়ে থাকতে কেন সে প্রিয়তির সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করে। শুনেছি সেই ছেলেটি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ছেলে তাই বাস্তবতার খাতিরেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি। ঐ দিনই সিদ্ধান্ত নেই যা হবার হবে কিন্ত যে করেই হোক প্রিয়তিকে আমার ভালবাসার কথা বলতেই হবে।

একদিন ডাটা ষ্ট্র্যাকচার ল্যাব শেষে ল্যাবের মধ্যেই অপেক্ষা করছিলাম আমি কারন তখনও প্রিয়তির প্রোগ্রাম করা শেষ হয়নি। উল্লেখ্য প্রিয়তি খুব ভাল প্রোগ্রামার আর প্রোগ্রামিং এর কোন কিছুই আমার মাথায় ঢোকে না। যথারীতি ঐ দিনও প্রোগ্রাম না পেরে স্যারের ঝাড়ি খেয়েছি কিন্ত তা নিয়ে খুব বেশি ভাবার সময় আমার নেই। আজ আমার লক্ষ্য ভিন্ন। আজ যে করেই হোক প্রিয়তিকে আমার দীর্ঘ দিনের অব্যক্ত ভালবাসার কথা বলতেই হবে।
এক পর্যায়ে প্রিয়তির দিকে এগিয়ে যাই আমি। বলি–প্রিয়তি তুমি কি প্রোগ্রামটা পেরেছ?
-হ্যা।
-তোমার কোডটা কি একটু দিবে?
-নিতে পার।
আমি হাসিমুখে পেন ড্রাইভটা এগিয়ে দেই। প্রিয়তির দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে বললাম- প্রিয়তি শোন তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।
-হ্যা, বল।
-তোমাকে আমার প্রচণ্ড ভাল লাগে, আমি তোমাকে ভালবাসি।

প্রিয়তি হতভম্ভ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সম্ভবত কি বলবে ভেবে পায় না। হতভম্ভ প্রিয়তির সামনে নিজেকে জীর্ণ শীর্ণ বলে মনে হতে থাকে আমার। যুগে যুগে কত প্রেমিকই না প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলেছে। আমি কি আরেকটু ব্যতিক্রম হতে পারতাম না? কিভাবে ভালবাসার কথা বলব তা নিয়ে অনেকবারই ভেবেছি। বেশ কয়েক বার প্রাকটিসও করেছি কিন্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে যথা রীতি সব ভুলে গিয়েছি। অতিরিক্ত টেনশনে মাঝে মধ্যে মাথা কাজ করে না আমার।প্রিয়তি নিজের হতভম্ভতা দ্রুত কাটিয়ে উঠে বলে-ধন্যবাদ। এটা সম্ভব নয়।
-কেন সম্ভব নয় জানতে পারি ?
-সব কেনর উত্তর হয় না।

আমাকে আর কোন প্রশ্ন করার সুযোগ দেয় না প্রিয়তি, হন হন করে চলে যায় সে। হতভম্ভ আমার প্রিয়তির চলে যাওয়া দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। আমি প্রিয়তির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু শুন্যতার হৃদয়ে আছড়ে পড়ার তীব্র শব্দ শুনি। আমি বিমর্ষ হই কিন্ত ভেঙ্গে পড়ি না। আর এত সহজে হতাশ হবার পাত্রও আমি নই। কোন এক কবি বলেছিলেন “রমণীর মন সহস্র বছরের সখা সাধনার ধন”। আমিও “সহস্র বছরের সাধনার” জন্য প্রস্তত হই। এদিকে এই ঘটনা জানাজানি হওয়ায় বন্ধু মহলে আমার প্রেষ্টিজ মোটামুটি পাংচার হবার দশা। কেউ কেউ যে আমাকে নিয়ে আড়ালে আবডালে হাসাহাসি করে তা আমি ঠিকই বুঝতে পারি। বন্ধু মহলে প্রেষ্টিজ বাঁচানো কিংবা নিজের মনের তাগিদ যাই বলি না কেন প্রেমের এই লড়াইয়ে জেতার জন্য আমি মরিয়া। তাছাড়া প্রত্যাখানই কি প্রেমের সবকিছু? বারাক ওবামাকেও তো মিশেল ওবামা প্রথমে না বলছিল। ফ্রেডরিক রুজভেল্টের স্ত্রীও তাই। তারা কি এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়েছিল? তবে আমিই বা ছাড়বো কেন?

একদিন মনে হল আচ্ছা ফেসবুক থেকে প্রিয়তিকে একটা মেসেজ পাঠালেইতো পারি। এই কাজটি কেন আরো আগে করিনি তা নিয়ে জন্ম নিয়েছিল আক্ষেপ। ঐ দিনই ফেসবুকে মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রিয়তিকে উদ্দেশ্য করে লিখলাম-“প্রিয়তি, তুমি কি জান প্রতিটি দিন, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাত্রি, প্রতিটি শুভ্র সকালে আমি তোমাকে প্রচন্ড মিস করি। তোমার সঙ্গে কাটানো খুব অল্প কিছু মুহূর্ত আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় কিছু ক্ষণ। খুব ছোট কিন্ত আশ্চর্য সুন্দর এই জীবনে চলার পথে আমি কি তোমার সঙ্গী হতে পারি?”

ফিরতি মেসেজের প্রতীক্ষায় আমি সারাটি দিন সারাটি রাত আমি ফেসবুকের সামনে পড়ে থাকি কিন্ত না কোন রেসপন্স নেই। ভোরের দিকে একটু চোখ বুঝে আসলে আমি ঘুমাতে যাই। পরদিন ঘুম থেকে উঠে বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করি যে প্রিয়তি ফেসবুকে আমাকে ব্লক করেছে। তীব্র হতাশায় আমার যেন কান্না পেতে লাগলো। মেয়েরা এত নিষ্ঠুর হয় কেন? প্রকৃত ভালবাসা চিনতে মেয়েদের এত দেরী হয় কেন? আমার এই অব্যক্ত প্রশ্নগুলো কষ্টের এক রাশ জমাট বাতাসে কিছু হাহাকারকে সঙ্গী করে ফিরে কিন্ত কোন উত্তর আসে না। আসার তো কথাও না। যাই হোক আস্তে আস্তে আমিও স্বাভাবিক হতে লাগলাম। বাস্তব নামের নির্মম সত্যটুকু উপলব্ধি করতে খুব বেশি সময় লাগলো না আমার। বুঝতে পারলাম যে কোন কারনেই হোক প্রিয়তি আমাকে পছন্দ করে না। ভাল প্রোগ্রাম পারিনা এটাই সেই কারন কিনা কে জানে?

২)
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মানুষ নাকি কবি হয়। আমিও ইদানীং কবিতা লিখি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ি। কখনো নিজের মনেই আবৃত্তি করি। একদিন কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে চিরকুমার সংঘ গঠন করে ফেলি। চিরকুমার সংঘের প্রতিটি সভায় বেশ জ্বালাময়ী ভাষায় প্রেম ভালবাসার কুফল বর্ণনা করি। আজ কালকার তথাকথিত প্রেম ভালবাসা যুবসমাজের কত বড় ক্ষতি করছে তা বেশ ব্যাখ্যা সহ উপস্থাপন করি। প্রতি বছর ভালবাসা দিবসের আগের রাতে হলে চিরকুমার সংঘের পক্ষ থেকে মিছিল বের হয়। আমি সেই মিছিলের নেতৃত্ব দেই। সেই মিছিলের স্লোগান হয় এরকম “কেউ পাবে, কেউ পাবে না,তা হবে না তাহবে না। ভালবাসা দিবস মানি না ,মানবো না”। কাজটা হাস্যকর মনে হলেও সে সময় আমাদের বেশ মজাই লাগতো। এভাবেই দেখতে দেখতে ভার্সিটি লাইফের শেষ বছরে পা দিলাম। এদিকে কবিতা আর চিরকুমার সংঘের পাল্লায় পড়ে আমার রেজাল্টের মোটামুটি বারোটা বাজার দশা। টেনে টুনে কোন রকম পাশ করি, পাঠ্যবই পড়তে তেমন আগ্রহ পাই না। একদিন ক্লাসে গিয়ে শুনি সবাই বলাবলি করছে আজ নাকি থিসিসের নোটিশ দিবে। থিসিসের কথা শুনতেই আমার গলা শুকিয়ে আসে। বড়ভাইদের কাছে এতকাল থিসিস সম্পর্কিত আতঙ্কের কথা অনেক শুনেছি। এবার যেন সেটাই ভোগ করার পালা। খানিকটা দুশ্চিন্তা নিয়ে নোটিশ বোর্ডের সামনে যাই । বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করি যে প্রিয়তি আর আমার থিসিস একই স্যারের আন্ডারে। বন্ধুদের মধ্যে যাদের থিসিস সুপারভাইজার স্যার তুলনামুলক বন্ধু সুলভ তাদের চোখে মুখে যেন ঈদের আনন্দ খেলা করে আর যাদের ভাগ্য অতাটা সুপ্রসন্ন নয় তাদের বিমর্ষ মুখ দেখে বাধ্য হয়ে আমারই স্বান্তনা দিতে হয়। এদিকে আমার দুশ্চিন্তা কোন স্যারকে নিয়ে নয় বরং আমার থিসিস সহপাঠিনীকে নিয়ে।যাই হোক একদিন আমি আর প্রিয়তি থিসিসের ব্যাপারে কথা বলতে স্যারের কাছে গেলাম। আমার সঙ্গে কথা বলতে প্রিয়তির অস্বস্তি লক্ষ্য করে শেষ পর্যন্ত আমিই ওর দিকে যাই। বলি-প্রিয়তি ,কি ব্যাপারে থিসিস করলে ভাল হয় তোমার কোন ধারনা আছে?
-না, দেখি স্যার কি বলেন।
-স্যারের সঙ্গে কি দেখা করেছ?
-না।
-চল আজ ক্লাস শেষে স্যারের সঙ্গে দেখা করে আসি।
-ঠিক আছে।

সেদিন প্রথম একসঙ্গে আমরা স্যারের সঙ্গে দেখা করতে যাই। স্যারটি বেশ তরুন, সুদর্শন। অতি সম্প্রতি বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। স্যার প্রথমেই আমাদের রেজাল্ট জানতে চাইলেন। প্রিয়তির ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট শুনে তাকে বেশ মুগ্ধই মনে হল। আমার রেজাল্ট শুনে ভ্রূ কুচকে বললেন তোমার রেজল্টের অবস্থা তো খুব খারাপ, থিসিস করতে পারবে তো?
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। স্যার বললেন -এক কাজ কর। তোমরা দুজন একই বিষয় নিয়ে কাজ কর। সেক্ষেত্রে প্রিয়তি তোমাকে হেল্প কর তে পারবে। কি বিষয়ে কাজ করবে তা আগে ঠিক কর তারপর আগামীকাল আবার দেখা কর। ঠিক আছে।
আমরা দুজন একসঙ্গে বলি -ঠিক আছে স্যার।
স্যারের রুম থেকে বের হয়ে আমি প্রিয়তিকে জিজ্ঞেস করি-কি ব্যাপারে থিসিস করলে ভাল হয় তোমার কোন আইডিয়া আছে?
-না , দেখি সবাই কি করছে।
– কে কোন বিষয়ে কাজ করছে জান কিছু?
-একেকজন একেক বিষয় নিয়ে কাজ করছে তবে আমার ধারনা বায়োমেট্রিক্স নিয়ে কাজ করলে ভাল হবে।
-ঠিক আছে।
অবশ্য এই কথা বলা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার কারন কোন বিষয়েই আমার খুব একটা ধারণা নেই।
পরদিন আমরা স্যারকে জানালাম যে আমরা বায়োমেট্রিক্স নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। স্যার বললেন -ঠিক আছে। তবে তোমরা কাজ করবে দুটো ভিন্ন এপ্লিকেশন নিয়ে। প্রিয়তি কাজ করুক আইরিশ রিকগনিশন নিয়ে আর তুমি কাজ কর ফিঙ্গার রিকগনিশন নিয়ে, কেমন। আমরা স্যারের কথায় সম্মতি দেই।

এরপর থেকে সপ্তাহে দুই দিন আমরা এক সঙ্গে স্যারের সাথে দেখা করতে যাই। স্যার না থাকলে ডিপার্টমেন্টের বাইরের লিচু গাছটির নিচে একসঙ্গে বসে থাকি। বায়োমেট্রিক্স আর ম্যাটল্যাবের কঠিন বিষয় গুলো প্রিয়তি আমাকে বোঝায়। আমি অনিচ্ছা স্বত্বেও সেগুলো বোঝার চেষ্টা করি, কিছু বুঝি ,কিছু বুঝি না তবুও প্রিয়তির মুখের দিকে তাকিয়ে আগ্রহ নিয়ে শুনি। এর বাইরেও আমরা অনেক গল্প করি। আমি জানতে পারি যে প্রিয়তিরা দুই বোন এক ভাই, সে তার একমাত্র ছোট ভাইটিকে প্রচণ্ড ভালবাসে। আমি জানতে পারি প্রিয়তির প্রিয় রং আকাশী , জন্ম দিন ৫ ই আগস্ট। প্রিয়তির সাবলীল কথাবার্তা শুনে মনেই হয় না যে কোন এক কালে আমি ওকে প্রেম নিবেদন করে ছিলাম। আমরা যেন কতদিনের বন্ধু, আমাদের পরিচয় যেন কত কালের।
একদিন আমি আর প্রিয়তি লিচুতলায় স্যারের জন্য অপেক্ষা করছি। দুই ঘণ্টা হয়ে গেল স্যারের কোন খবর নেই। বসে থাকতে থাকতে দুজনই প্রচণ্ড বিরক্ত। প্রিয়তিকে একটু বেশিই বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে। আমি বললাম- কিরে শরীর খারাপ নাকি?
-হু।
-কেন কি হইছে?
-মনে হয় জ্বর আসতাছে।
-কই দেখি ।
আমি প্রিয়তির কপালে হাত দিয়ে দেখি জ্বরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে।
-জ্বরে তো তোর গা পুড়ে যাচ্ছে আর বলছিস কিছু হয়নি। তোর আর বসে থেকে কাজ নেই যা হলে চলে যা।
-স্যার আবার কি বলে না বলে …
-তুই চলে যা, আমি তো আছিই।
-আচ্ছা ঠিক আছে আমি গেলাম। ফেসবুকে তোকে নক করবো, স্যার কি বলেন না বলেন আমাকে জানাস।
প্রিয়তি চলে যেতে থাকে। আমি পিছন থেকে প্রিয়তিকে ডাকি।
প্রিয়তি পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলে- কিছু বলবি?
-আমি ফেসবুকে ব্লকড। দয়া করে তুই কি আমাকে আনব্লকড করবি?
আমার বলার ভঙ্গি শুনে হেসে ফেলে প্রিয়তি। হাসতে হাসতেই বলে -আচ্ছা ঠিক আছে।
আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাসি দেখি। সেই পরিচিত ভুবন ভোলানো হাসি। এই মেয়েটা এত সুন্দর করে হাসে কিভাবে?

৩)
প্রিয়তি কয়েকদিন ডিপার্টমেন্টে আসে না। খোজ নিয়ে জানলাম যে ওর অ্যাপেন্ডেসাইটিসের অপারেশন করতে হবে। বেশ সিরিয়াস অবস্থা। হাসপাতালে নিতে হবে খুব শিঘ্রই। একদিন ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বললাম -কোন চিন্তা করিস না, দেখিস তুই একদম ঠিক হয়ে যাবি।
-হু। কিন্ত থিসিসের কি হবে?
-জাহান্নামে যাক থিসিস। তুই তোর শরীর নিয়ে ভাব।
– তুই স্যারকে একটু আমার ব্যাপারে বলিস।
-আচ্ছা ঠিক আছে বলব। এসব নিয়ে বেশি টেনশন করিস না তো।

বললাম বটে কিন্ত টেনশন না করে উপায় নেই। ফাইনাল পেপার সাবমিট আর প্রেজেন্টেশনের আর মাত্র ১৫ নিন বাকি। প্রিয়তিকে ছাড়া একসঙ্গে এত কিছু করব কিভাবে ভাবতেই শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে যায় । স্যারের সঙ্গে দেখা করে সব কিছু খুলে বলি। স্যার বলেন -দেখ কত দুর কি করতে পার । পরের ১৫ দিন আমি শুধু থিসিস নিয়েই পড়ে থাকি। লাইব্রেরী থেকে কিছু বই আনিয়ে পড়তে থাকি। আস্তে আস্তে আমার বুক সেলফের কবিতার বইয়ের জায়গা দখল করে প্রোগ্রামিং এর বই। আমি রাত জেগে পড়াশোনা করি । ফাইনাল পেপার ও প্রেজেন্টেশন তৈরি করি নিজের জন্য এবং প্রিয়তির জন্যও যেন সে ফিরে এসে প্রেজেন্টেশন দিতে পারে।

অবশেষে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হয়। ফাইনাল প্রেজেন্টেশন খুব ভাল ভাবে সম্পন্ন করি। প্রিয়তিও সুস্থ হয়ে ফিরে এসে প্রেজেন্টেশন দেয়। আমার থিসিস পেপারের জন্য স্যারদের কাছে প্রশংসা লাভ করি। আমার মত একটা উচ্চ শ্রেণীর গর্ধবের পক্ষে কি করে এরকম একটা পেপার লেখা সম্ভব হল তা অনেক স্যারের মাথায় ঢোকে না। তাদেরকে কিছুটা বিমর্ষ বলে মনে হয়।

প্রেজেন্টেশন শেষে প্রিয়তির সঙ্গে দেখা। মিষ্টি করে হেসে সে জিজ্ঞেস করে- কিরে কি খবর কেমন আছিস?
-এই তো… তারপর বল তোর শরীর এখন কেমন ?
-ভাল। দীপক তুঁই আমার অনেক বড় একটা উপকার করেছিস। তুই না থাকলে যে কি হত ? তোর এই উপকার আমি …
-জীবনেও শোধ করতে পারবি না এই তো। এই সব ডায়লগ বহুত শুনছি পারলে নুতুন কিছু বল।
-নুতুন কিছু! আচ্ছা ঠিক আছে। চাকরি পেলে প্রথম বেতনের টাকায় তুই যা চাবি তাই তোকে কিনে দিব।
-কি বলিস এই সব?
-শিউর।
-বাদ দে তো এই সব।
-বাদ দিব কেন? বল তুই কি চাস?
-কিছুই চাই না। বাদ দে তো।
-আচ্ছা তুই তো পাঞ্জাবি খুব পছন্দ করিস তাই না ?
– কি করে জানলি?
-আগে না কি সব সংগঠন করে বেড়াতি, তখন দেখতাম তোকে পাঞ্জাবী পরে ঘুরতে।
-চির কুমার সংঘের কথা বলছিস?
-হ্যা। আর ভাল কথা আমি কিন্ত আর চির কুমারী থাকছি না, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
-মানে?
-মানে হল হাসপাতালে বসে শুয়ে বসে দিন পার করছি। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার সামনে থিসিসের স্যার দাঁড়িয়ে। গোলাপের একটা তোড়া আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন কেমন আছ প্রিয়তি ? দীপকের কাছ থেকে সব কিছু শুনে চলে আসলাম। আমি বললাম- দাঁড়িয়ে আছেন কেন স্যার বসেন। লক্ষ্য করলাম গোলাপের তোড়ার সঙ্গে নীল রঙের একটা কার্ড ঝোলানো। স্যার বললেন- প্রিয়তি আমি চলে যাবার পর তুমি কার্ডটি খুলে দেখবে কেমন? আমি বললাম -ঠিক আছে স্যার। স্যার চলে যাবার পর কার্ডটি খুলে দেখি সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে সুন্দর করে লেখা “প্রিয়তি , খূব একটা গুছিয়ে কথা বলার অভ্যেস আমার নেই। শুধু একটা কথাই বলতে চাই, আমি তোমাকে ভালবাসি। আমরা কি সারা জীবনের জন্য পরস্পরের সঙ্গী হতে পারি ?” তারপর সব কিছু পারিবারিক ভাবেই ঠিক হল।
আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। হদয়ে প্রচন্ড স্রোতের রক্ত ক্ষরন অনুভব করি। তারপরও মুখটা যতটা সম্ভব হাসি হাসি করে বলি -কংগ্রাচুলেশনস ।
-থ্যাংস।
-আচ্ছা ঠিক আছে। আজ তাহলে আসি রে ।
-আচ্ছা। আর শোন বিয়েতে কিন্ত অবশ্যই আসবি আর ফোনে তো যোগাযোগ হবেই।
-ওকে।

সেটিই ছিল প্রিয়তির সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এরপর আর কখনো প্রিয়তির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমি ইচ্ছে করেই দেখা করিনি । এমনকি ওর বিয়েতেও যাইনি। শুনেছি প্রিয়তিরা এখন জার্মানিতে থাকে। তবুও কি করে যেন প্রিয়তি আমার বর্তমান ঠিকানা যোগাড় করে একটা প্যাকেট পার্সেল করে পাঠিয়ে দেয়। সেই প্যাকেট খুলে দেখি একটা নীল রঙের পাঞ্জাবী । সেই পাঞ্জাবিটা এখনো আমার আলমারিতে সযত্নে রাখা আছে। আমি সেটা কখনো পরিনি কারন আমি চাই না স্মৃতিময় এই পাঞ্জাবীটা পুরনো হয়ে যাক। প্রিয়তির স্মৃতি হিসেবে এটিকে আকড়ে ধরে রাখতে চাই সারা জীবনের জন্য। তবে থিসিসের পর থেকে প্রোগ্রামিং নিয়ে আমার ভয়টা কেটে যায়। পাশ করার পর একটা আইটি কোম্পানিতে যোগ দেই। কিছু দিন পর এক বন্ধুকে নিয়ে নিজেই একটা আইটি কোম্পানি দাঁড় করিয়ে ফেলি। গত বছর আমার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি বেসিসের এ্যাওয়ার্ড পায়। ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে এই যাপিত জীবনের দিন গুলো যে কিভাবে পার হয়ে যাচ্ছে কে জানে। তবে কর্ম ব্যস্ত একেকটি দিন শেষে যখন বাসায় ফিরি, নিস্তরঙ্গ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে যখন একেকটি নিঃসঙ্গ রাত পার করি তখন প্রিয়তির কথা খুব করে মনে পড়ে। কেমন আছে এখন প্রিয়তি? আমার কথা কি তার এখনো মনে আছে? লক্ষ্য করি যে প্রিয়তির কথা ভাবতে গিয়ে কষ্টের এক গুচ্ছ অনুভূতি তীব্র ভাবে আমার হৃদয়কে গ্রাস করে। জন্ম নেয় একটা অন্তহীন আক্ষেপও ,কখনো নিজের প্রতি কখনো প্রিয়তির প্রতি। আমি কষ্ট ও আক্ষেপের এই অনুভূতি গুলোকে ত্যাগ করতে পারি না , ত্যাগ করতে চাইও না কারন এই অনুভূতি গুলোর সঙ্গে জড়িত আমার অপূর্ণ ভালবাসা। আমি কষ্ট ও আক্ষেপের এই তিক্ত অনুভূতিগুলোকে সঙ্গী করে একেকটি দিন বেঁচে থাকি…

পুনশ্চ, ইউনিভার্সিটি লাইফে ঐ একটি কোর্সেই আমি সর্বোচ্চ গ্রেড পাই। কোর্স নং CSE-800-Project & Thesis।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *