মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব দুই

নোট : ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাও সেতুং-এর ১০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে ইউরোপে এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘মাও ও গণযুদ্ধ’। কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস্ (সিপিপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব তুরস্ক (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) অর্থাৎ (টিকেপি-এমএল) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (পিপলস্ ওয়ার) অর্থাৎ সিপিআই (এমএল-পিপলস্‌ ওয়ার) এই সংগঠনত্রয় ছিল সেমিনারটির আহ্বায়ক। ওই সেমিনারে যোগ দিয়েছিল প্রায় ২৭টি পার্টি ও সংগঠন। সিপিআই (এমএল-পিপলস ওয়ার) বর্তমানে যা সিপিআই (মাওবাদী) নামে পরিচিত, তারা সর্বহারা শ্রেণীর নেতা, মহান শিক্ষক মাও সেতুং-এর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২৬ ডিসেম্বর, ২০০০ ওই সেমিনারের নির্বাচিত অংশ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করে। রচনাটি দীর্ঘ হওয়ায় এটিকে খণ্ড করতে হয়েছে, এটি দ্বিতীয় পর্ব।

 

তৃতীয় পর্ব । ভারতবর্ষের নির্দিষ্ট পরিস্থিতে গণযুদ্ধ
নকশালবাড়ির সংগ্রাম এবং কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে সি.পি. আই(এম-এল)- এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ভারতীয় জনগণ বিপ্লবী কর্মসূচিতে শামিল হন। কয়েক দশক ধরে সি.পি.আই এবং সি.পি.আই (এম)-এর সংশোধনবাদী লাইনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সি.পি.আই(এম-এল) ভারতের রাষ্ট্রীয় চরিত্রকে আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক এবং চীনের পথই বিপ্লবের পথ বলে ঘোষণা করে।

ভারতীয় বিপ্লবের বৈশিষ্ঠ্যের সঙ্গে চীন বিপ্লবের যেমন বহু মিল রয়েছে আবার পার্থক্যও রয়েছে বেশ কিছু। এই অধ্যায়ে আমরা ভারতীয় বিপ্লবের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব, অতঃপর দেখব ভারতীয় সংসদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোকে। ভারতে গণযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পর্যালোচনার আগে ভারতীয় বিপ্লবী শিবিরের অবস্থা নিয়ে আলোচান করব। সবশেষে বর্তমানে সংকটাচ্ছন্ন ভারত রাষ্ট্রে বিপ্লবের অগ্রগতির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখব।

১। ভারতীয় বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য
চীনের মতোই ভারতও আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক (অসম আর্থ-সামাজিক রজনৈতিক বিকাশসহ) রাষ্ট্র। চীনের মতোই এদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ কৃষিজীবী। কৃষিবিপ্লবই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ। অসম বিকাশের কারণে সারা দেশে একই সময়ে বিপ্লব (সশস্ত্র বিপ্লবী অভ্যুত্থান) ঘটানো সম্ভাব নয়। তাই এলাকা ভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। গেরিলা যুদ্ধের পক্ষে অনুকূল এমন বেশ কিছু অঞ্চল এদেশে রয়েছে। তাই এদেশে বিপ্লব সফল করার জন্য দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধ করা, গেরিলা অঞ্চল ও ঘাঁটি এলাকা প্রতিষ্ঠা করা এবং সবশেষে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার রাজনৈতিক পথেই চলতে হবে।

চীন বিপ্লবের সঙ্গে ভারতীয় বিপ্লবের মূল প্রশ্নে বেশ কিছু মিল থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। এর অন্যতম হল ভারতে রয়েছে একটা কেন্দ্রীভূত এবং সুসংগঠিত আধুনিক এক সৈন্যবাহিনী। যে কারণে ভারতীয় বিপ্লবী যুদ্ধে দ্রুত জয়রাভ সম্ভব নয়। এটা সত্য যে, ভারতে ঘাঁটি এলাকা বিস্তার করা চীনের মতন দ্রুতগতিতে সম্ভব নয় এবং সাধারণভাবে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখাও অসম্ভব। এদেশে গেরিলা অঞ্চলকে ঘাঁটি এলাকায় পরিণত করতে চীনের থেকেও বেশি সময় লাগবে এবং শত্রু সৈন্য যাতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয় সেইজন্য বেশ কিছু গেরিলা জোন তৈরি করা প্রয়োজন। ভারতে ঘাঁটি এলাকার চরিত্র হবে আরও চলমান। এই বাস্তব পরিস্থিতিকে উপলব্ধি করতে না পারলে, অধিক শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর কাছে বিপ্লবী শক্তির পরাস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। চীন ও ভারতের বিপ্লবী যুদ্ধের ক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছে যে, শুরু থেকে একমাত্র চীনা কমিউনিস্ট পার্টিরই গণফৌজ ছিল, পাশাপাশি উভয়ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সশস্ত্র বিপ্লবকে সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

চীনের মতো ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম থেকে গণফৌজ নেই। একে গোড়া থেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। নভেম্বর ৯৫ সালের ‘রণনীতি ও রণকৌশল’ নামে পার্টির দলিলে ভারতীয় বিপ্লবের পথ সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘প্রবল প্রতিবিপ্লবী আক্রমণের মুখে কমিউনিস্ট পার্টিকে গণফৌজ তৈরি করতে হবে। সামগ্রিকভাবে বিপ্লবী আন্দোলনের দুর্বলতার ফলে অতি দ্রুত গণফৌজ গড়া সম্ভব নয়। গণফৌজ গড়ে তুলতে হবে ধীরে ধীরে। ছোটো ছোটো গেরিলা ইউনিটের বিক্ষিপ্ত কার্যকলাপ দিয়ে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠবে কেন্দ্রীভূত গণফৌজ’।

এই দলিলে বিপ্লবী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার পথ সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে যে- ‘ভারতীয় বিপ্লবে এই পদ্ধতির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এই ভারবেই সামন্ত-বিরোধী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে কৃষক জনতাকে নিয়ে যে সব গেরিলা ইউনিট গড়ে উঠবে তাদের দীর্ঘকালে ধরে ধীরে ধীরে শক্তিবৃদ্ধি করে গণফৌজে পরিণত করতে হবে। গেরিলা অঞ্চল থেকে ঘাঁটি এলাকায় রূপান্তরিত হতে দীর্ঘ সময় লাগবে- এরজন্য পার্টি ও জনগণকে আমাদের প্রস্তত করতে হবে। এটা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করার পর শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা উচিত এবং প্রথম থেকে গোপন ও শক্তিশালী একটা পার্ঠি সংগঠন থাকা উচিত’। এই পথে ভারতের গণযুদ্ধকে অগ্রসর হতে হবে। ভারতীয় বিপ্লবের ক্ষেত্রে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা ঔপনিবেশিক ভারত গঠনে সংসদ ও অন্যান্য আইনসভাগুলোর ভূমিকা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যেতে পারে।

২। সংসদ বর্জন
কমিনটার্নের দ্বিতীয় কংগ্রেস দেখায় যে- পুঁজিবাদের উন্নতির যুগে (একচেটিয়া পুঁজিবাদের আবির্ভাবের আগে) সংসদ প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের যুগে ‘সংসদ মিথ্যাচার, প্রতারণা ও হিংসার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে এবং এটা একটা অর্থহীন বাকসর্বস্ব আলোচনা সভা’। সাম্রাজ্যবাদী দেশে পরিস্থিতি পরিপক্ক না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র বিপ্লব সম্ভব নয়। সেখানে অভ্যূত্থান ঘটানোর আগে নিপীড়িত জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার, শিক্ষা, বিক্ষোভ ইত্যাদি চালানো দরকার। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিপ্লবী পরিস্থিতি গড়ে উঠছে ততদিন সেখানে সংসদীয় পদ্ধতিতে লড়াই একটা কৌশল মাত্র। কিন্তু যে সকল দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘঠিত হয়নি, যেখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনা অসমভরে বিকশিত এবং যেসব দেশে বিপ্লবী পরিস্থিতি উজ্জ্বল, সেখানে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধ চালানো সম্ভব। সেখানে সংসদীয় পদ্ধতিতে সংগ্রাম চালানো অর্থহীন।

ভারতীয় জনগণকে মেকি গণতন্ত্র দিয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য এ দেশে আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা ঔ পনিবেশিক অবস্থার ওপরে সংসদীয় ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করার জন্য সংসদকে বিপদ-নিরোধক (Safety valve) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এইভাবেই ঔপনিবেশিক যুগের স্বৈরাতান্ত্রিক কাঠামোটাকে শুধু টিকিয়ে রাখাই হয়নি বরং তা আরও শক্তিশালী করে তোলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সংসদের কোনো ক্ষমতাই নেই, কারণ প্রশাসনই সব কাজ চালায়, এমনকী প্রয়োজনে অর্ডিনান্সও তৈরি করে নিতে পারে। এছাড়াও অর্থবল, বাহুবল এবং বর্ণ সম্প্রদায়, আঞ্চলিকতার রাজনীতি আজ চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার সংসদীয় ধাপ্পাবাজির নগ্ন রূপ প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। তাই আজ পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করার অর্থ শাসকশ্রেণীর তালে তাল দিয়ে চলা। আরেকদিকে মাঠে-ময়দানে যে সব বিরোধী কর্মকান্ড দেখা যাচ্ছে সেগুলো আবার সংসদ ও বিধানসভার ঘেরাটোপে ফিরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে এটাই প্রমাণিত হয়।

যে সব বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে সংসদকেও ব্যবহার করার কথা ভেবেছিলেন তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদকে তারা তো ব্যবহার করতে পারেইনি বরং সংসদই তাদের ব্যবহার করেছে। সংসদে কিছু আসন পাবার লোভে তারা তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের মেজাজকে ত্যাগ করেছেন, তাদের গোপন সংগঠনের অধিকাংশকে প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন, সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দল এবং এমনকী আঞ্চলিক কাযেমি স্বার্থন্বেষীদের সঙ্গে সমঝোতা করছেন। মূল কথা- সংসদমুখীনতাই আজ তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যখন নির্বাচিত সাংসদরা দুনীর্তিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, অপরদিকে তখন ধারাবাহিকভাবে যারা নির্বাচন বয়কটের প্রচারে সরব ছিলেন, তারা সশস্ত্র সংগ্রামকে বিকাশিত করতে জোরদার কর্মসূচি গ্রহণ করে সংগ্রামের বিস্তার ঘটাতে থাকেন এবং রাষ্ট্র-বিরোধী সংগ্রামকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে থাকেন। এখন আমরা আমাদের পার্টি-অভিজ্ঞতার সারসংকলন করার আগে দেশের তথাকথিত বামপন্থীদের চরিত্রটা একবার দেখে নিই।

৩। ভারতে ‘বামশক্তি’
আজকে যারা গণযুদ্ধের কথা শুধু মুখে নয় হাতে-কলমে প্রয়োগ করছেন, কেবল তারাই পারেন বৈপ্লবিক অগ্রগতির লক্ষ্যে আশান্বিত হতে। এখানে নানা রঙের ‘বাম’রা রয়েছে- যারা মানুষকে বিপথে চালিত করছেন এবং তারাই হলেন প্রতিক্রিয়ার শেষ আশ্রয়স্থল। এদেশে সি.পি.আই এবং সি.পি.আই (এম)- এর মতন পুরোনো সংশোধনবাদীদের থেকে ইউরোপের সোশাল ডেমোক্র্যাটদের পার্থক্য যৎসামান্য, তার ওপর আছে লিবারেশন গোষ্ঠীর মতো কিছু তথাকথিত সি.পি.আই (এম-এল) পার্টি, সি.পি.আই(এম)- এর সঙ্গে যাদের প্রায় কোনো পার্থক্যই নেই। তাদের নোংরা কাজকে বিপ্লবী মুখোশের আড়ালে রাখার জন্যই তারা সি.পি.আই(এম-এল) নামটা ব্যবহার করছেন। এছাড়াও রয়েছে আরও কিছু গোষ্ঠী, যারা বিপ্লবী কথাবার্তা বলে, কিন্তু কার্যত তা প্রয়োগ করে না। তারা কিছু আংশিক দাবিদাওয়া, শাসকশ্রেণীর আইনি চৌহদ্দির মধ্যে কিছু তৎপরতা, কিছু সংসদীয় ক্রিয়াকলাপ, পত্র-পত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদি কাজের মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখে। শ্রেণী সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধি করা কিম্বা নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে রণনীতিগত দায়দায়িত্ব পালন করা থেকে তারা সর্বদা বিরত থাকে। আসলে এরাও গণযুদ্ধের পথ থেকে দূরে সরে গিয়ে সংশোধনবাদের গুহ্বরে অধঃপতিত। প্রকৃতপক্ষে আমাদের নব গঠিত ঐক্যবদ্ধ সি.পি.আই (এম-এল) (পিপলস্ ওয়ার) ছাড়া অল্প কয়েকটা গোষ্ঠী গণযুদ্ধের পথ অনুসরণ করে চলেছে, যেমন এম.সি.সি।

দেশে যদি গণযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং চিন্তাধারায় উজ্জীবিতএকটা সৎ-সর্বহারা পার্টির নেতৃত্ব প্রয়োজন। সেই পার্টিকে হতে হবে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নীতিতে গঠিত, গণ কর্মসূচিমুখী এবং সমালোচনা আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়ায় গতিশীল। সেই পার্টির ভিত্তি হবে পেশাদার বিপ্লবীরা।

এছাড়া তথাকথিত কিছু বিপ্লবী গোষ্ঠী ও দল আছে যারা উদার পেটি বুর্জোয়া সংগঠন ছাড়া আর কিছুই না। এদের মধ্যে কেউ কেউ কিছু আইনি অস্তিত্ব বজায় রেখে চলে। ভারতের মতো দেশে যেখানে হাজার হাজার কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও বিভিন্ন সংগ্রামী জাতিসত্তা ছাড়াও বহু মানবাধিকার রক্ষা কর্মী, ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী ও সমাজসেবীদের হত্যা করা হচ্ছে, এমনকী আইনি ট্রেড ইউনিয়নকেও বেআইনি বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। সেখানে উদার রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নপুংসক হতে বাধ্য। অন্ধ-বিহার-দন্ডকারণ্যের মতো সশস্ত্র সংগ্রাম যত বাড়তে থাকবে, শ্রেণী সংগ্রাম যত তীব্র হতে থাকবে, তত এই প্রান্তিক সংগঠনগুলো হয় উধাও হয়ে যাবে নয়ত সংশোধনবাদীদের সঙ্গে যোগ দেবে। অবশ্য নিচুতলার কর্মীদের একটা বড়ো অংশ বিপ্লবী শিবিরে যোগ দেবে।

৪। ভারতে গণযুদ্ধে অগ্রগতি
সি.পি.আই(এম-এল)(পিপলস ওয়ার)- এর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে অন্ধ্র বিহার-দন্ডকারণ্যে গণযুদ্ধের অগ্রগতি ঘটে চলেছে। এম.সি.সিও বিহারে গণযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পার্টির নেতৃত্বে ভারতে চলমান গণযুদ্ধের সারশংক্ষেপে নীচে দেওয়া হল। যদিও বর্তমানে আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ পার্টি, কিন্তু বিগত দুই দশক ধরে আন্ধে এবং দন্ডকারণ্যে সি.পি.আই(এম-এল) (পিপলস ওয়ার)- এর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে এবং বিহারে সি.পি.আই(এম-এল)(পার্টি ইউনিট)- এর কেন্দ্রীয় সংগঠণিক কমিটির নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালিত হত। তাই আমরা দুই পার্টির পৃথক অভিজ্ঞতা পৃথকভাবেই দেখাব।

ক. অন্ধ্র-দন্ডকারণ্য
১৯৭২ এ বিপ্লবী আন্দোলন ধাক্কা খাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য কমিটি (টিকে থাকা অংশ) অন্ধ্রপ্রদেশে পার্টিকে পুনগর্ঠিত করে। পরবর্তী পাঁচ বছরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিপ্লবী শক্তিকে সুসংবদ্ধ করে, দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী ও বাম হঠকারী লাইনের আক্রমণ থেকে রাজনৈতিক লাইনকে কার্যকরীভাবে রক্ষা করে এবং বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এই ছাত্র আন্দোলন থেকে অনেক পার্টি কর্মী পাওয়া যায়। করিমনগর ও আদিলাবাদের কৃষক আন্দোলনের বীজ বপন করা সম্ভব হয়। এছাড়া নাচে, গানে, গল্পে, কবিতায় সজ্জিত এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন এই পুনরুজ্জীবনে অনুঘটকের কাজ করে।

১৯৭৭ এর শেষ দিকে করিমনগর ও আদিলাবাদে সামন্ত বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার বিপুল সাড়া জাগায়। ক্ষেতমজুরদের ধর্মঘট, ভূস্বামীদের সামাজিক বয়কট, গণ-আদালত ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ৭৮ এর সেপ্টেম্বরে সুবিশাল মিছিল সংগঠিত হয়। ভূস্বামীরা শহরে পালিয়ে যেতে থাকে বিশাল পুলিশ বাহিনী গ্রামাঞ্চল ছেয়ে ফেলে। তারা বিপ্লবী কর্মী ও গ্রামবাসীদের মারধোর করে, জেলে পোরা, অত্যাচার এবং লুঠতারাজ শুরু করে। এর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৭৯-এ অন্ধ্রের আন্দোলন এক বিশেষ পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়। আন্দোলনের এই বিকাশের ফলে শূধু ভূস্বামী নয়, আধা সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রস্তুতির অর্থ শুধু নতুন ধরনের সংগ্রাম নয়, শুধু নতুন পদ্ধতির সংগঠন নয়, এর সাথে আছে পার্টির সামরিক প্রস্তুতিও।

এইরকম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তে নেওয়ার ওপরই নির্ভর করছিল আন্দোলন এগোবে না থেমে থাকবে। এইরকম মুহুর্তেই অতীতে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভ্রান্তি দেখা গেছে। অতীতে বহুবার সামন্ত-বিরোধী সংগ্রাম যখন তীব্র আকার ধারণ করেছে, তখনই ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে হয় আন্দোলন ধ্বংস হয়ে গেছে নয়ত নেতৃত্ব আন্দোলনকে পরবর্তী উচ্চস্তরে উন্নীত করার বদলে দ্রুত পশ্চাদপসরণ করেছে। ১৯৪৬-৫৪’র তেলেঙ্গানা সংগ্রামে পার্টি নেতৃত্ব বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। বিহারের ভোজপুরেও নিবারেশন গোষ্ঠীর নেতৃত্ব একইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এছাড়াও বেশ কিছু এম-এল গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় আক্রমণের মুখে পিছিয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে পার্টির অন্ধ্র মাখা ‘গেরিলা অঞ্চরের পরিপ্রেক্ষিত’ নামক যুগান্তকারী দলিলে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি তৈরি হয় এবং সি.পি.আই (এম-এল)(পিপলস ওয়ার)-এর জন্ম হয়। স্থানীয় সংগঠকরা উত্তর তেলেঙ্গানায় তৈরি দেশী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছোটো ছোটো স্কোয়াডে (১ জন কেন্দ্রীয় সংগঠক ও ২ জন সদস্য) সংগঠিত হয়। প্রথম সশস্ত্র স্কোয়াড তৈরি হয় দন্ডকারণ্যের জঙ্গলে সংগ্রাম বিস্তারের লক্ষ্যে যা উত্তর তেলেঙ্গানার গেরিলা আন্দোলনের পশ্চাৎভুমি হিসেবেও গড়ে উঠবে। ঘাঁটি অঞ্চল তৈরি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে এটা করা হয়।

৮০-৮৪ এই পর্বে গেরিলা জোন তৈরির প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সময়ে উত্তর তেলেঙ্গানায় গণ অভ্যুত্থান হয় এবং দন্ডকারণ্যে জঙ্গি গণ আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। শত সহস্র কয়লা খনি শ্রমিকদের মধ্যে ‘সিকাসা- নামে শক্তিশালী ইউনিয়ন জন্ম নেয় এবং অন্ধ্রপ্রদেশের সর্বত্র ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সরকার এই আন্দোলনের ওপর সব রকমের অত্যাচার নামিয়ে আনে। আগে শুধুমাত্র আন্দোলনকারীদের ওপরই অত্যাচার হচ্ছিল। শত্রু এবার পার্টি এবং বিপ্লবী আন্দোলনের ওপর সর্বগ্রাসী আক্রমণ নামিয়ে আনে।১৯৮৫-৮৯ এই সময়ে প্রথম পর্বের দমনপীড়ন শুরু হয়। গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমনকী পার্টির প্রতি সহানুভূতিশীল এমন ব্যক্তিদেরও ধরপাকড় করা হয়, মিথ্যা সংঘর্ষের নামে খুন করা হয়। প্রকাশনা দপ্তরগুলোতে পুলিশি হানা চলে এবং হাজার হাজার কর্মী, সমর্থক গ্রেপ্তার হন। স্থানীয় ধনী সম্প্রদায় ও লুম্পেনদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামে গণ সংগঠনের কর্মীদের ফিরিয়ে আনার জন্য নানারকম পুনবার্সন প্রকল্প নেওয়া হয়। এই ব্যাপক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পার্টিতে নতুন রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

এই অবস্থায় পার্টি আত্মরক্ষার্থক সংগ্রামের আহ্বান রাখে। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো আরও মজবুত করে গড়ে তোলা হয়। লড়াইয়ের জন্য স্কোয়াডগুলো আরও দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত হয়। এবার গোপন গণ সংগঠন তৈরি করা হয়। উত্তর তেলেঙ্গানা ও দন্ডকারণ্যে রাষ্ট্রীয় আক্রমণের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ‘৮৫-‘৮৬ তে যে আন্দোলন আত্মরক্ষাত্মক ভূমিকা নিতে বাধ্য হচ্ছিল, ‘৮৭-তে সেই আন্দোলন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। এইভাবে ‘৮৭ থেকে ‘৮৯ পর্যন্ত পার্টি নিজেকে আরও সুসংবদ্ধ করে তোলে গণ অভ্যুত্থানের পুনরাবৃত্তি, নব নব ধারায় সংগ্রাম গড়ে ওঠে, যেমন জমি দখল, মাদক বিরোধী আন্দোলন, দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য লুঠ, খনি-শ্রমিক ধর্মঘট ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সংগ্রাম এক নতুন মাত্রা লাভ করে। ২৮ শহীদ দিবস পালন ও শহীদ বেদী প্রতিষ্ঠা, দণ্ডকারন্যে মে দিবস উদযাপন এবং ১৫ আগষ্ট ও ২৬ জানয়ারি তথাকথিত স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্র দিবসকে কালা দিবস হিসেবে পালন করার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়ে ওঠে। ১৯৯০ এ অন্ধ্রপ্রদেশে শাসকশ্রেণীর অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে সাময়িকভাবে বিরাম আসে। দমনপীড়ন কিছুটা কম হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মে মাসে ওয়ারঙ্গেলে দশ লক্ষেরও বেশি কৃষকের বিশাল মিছিল বের হয়।

কিন্তু ১৯৯০ এর শেষ দিকে এই আন্দোলনের ওপর সরকার এক ভয়াবহ আক্রমণ নামিয়ে আনে যা পূর্ববর্তী সমস্ত নজিরকে স্নান করে দেয়। আগে যা ছিল অঘোষিত যুদ্ধ তা পরিনত হয় সর্বাত্মক বিদ্রোহ দমনের আক্রমণে। ব্যাপক সন্ত্রাস, সংঘর্ষে মৃত্যু, আত্মসমর্পনে বাধ্য করা ছিল এই দমনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এক বছরের মধ্যে দুই শতাধিক মানুষকে ভুয়ো সংঘর্ষের নামে হত্যা করা হয়। কযেক হাজার মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় এবং বন্দী করা হয়। নষ্ট করা হল লক্ষ লক্ষ টাকার শস্য ও সম্পত্তি, ধ্বংস করা হয় বহু বাড়ি ঘর।

এই নয়া আক্রমণের মোকাবিলার জন্য পার্টিকে নতুন কর্মকৌশল উদ্ভাবন করতে হয়। পার্টি পূর্বেই ঘোষণা করেছিল যে উত্তর তেলেঙ্গানা ও দন্ডকারণ্য গেরিলা জোন প্রাথমিক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। বর্তমান আক্রমণের মোকাবিলায় গেরিলা জোনগুলোকে আরও সুসংবদ্ধ করতে পার্টি আহ্বান জানায়। এই গেরিলা জোনগুলিকে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে গেরিলা স্কোয়াডগুলোকে প্লেটুনের স্তরে নিয়ে আসা হয়, একটা কেন্দ্রীয় স্কোয়াডের অধীনে দু-নিটে স্কোয়াড রাখা হয়, প্রতিটা স্কোয়াডে গড়ে তোলা হয় স্বাধীন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিভিন্ন স্তরে কেন্দ্রীয় সামরিক নেতৃত্ব গঠিত হয়, গ্রাম স্তরের পার্টি সংগঠনকে সুসংবদ্ধ করা হয়, গ্রামস্তরে জনগণের ক্ষমতার আধার ‘গ্রাম রাজ্য কমিটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তার অধীনে গড়ে তোলা হয় গ্রামোন্নয়ন কমিটি, ন্যায়-প্রতিষ্ঠা কমিটি এবং গ্রামরক্ষী বাহিনী। ১৯৯২ থেকে আজ পর্যন্ত শত নিপীড়নের মধ্যেও এই সংগ্রাম তীব্র হয়ে উঠেছে। আরও বেশি বেশি করে মানুষ এই সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ভারতে গণতান্ত্রিক বিপ্লব না হওয়ার ফলে দেশের মানুষের লাগাতার সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা কম। যদিও ব্রিটিশ যুগে বেশ কিছু সশস্ত্র বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল, অতি দ্রুত সেগুলোকে দমন করা হয়েছিল। ১৯৪৬-৫১ এই পাঁচ বছর তেলেঙ্গানা সংগ্রাম এবং ১৯৬৯-৭১ এই তিন বছর চলেছিল শ্রীকাকুলামের সংগ্রাম। ভারতীয় বিপ্লবে অত্যন্ত জরুরি এবং প্রয়োজনীয় বিষয় হল জনগণকে ব্যাপক আকারে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে শামিল করা।

আজ তেলেঙ্গানাও দণ্ডকারণ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষক কমিটির কর্তৃত্ব ক্রমবর্ধমান। গ্রামরক্ষী বাহিনী ও মিলিশিয়া গড়ে উঠছে। গণ উদ্যোগে চলেছে উন্নয়নের কাজ, গ্রামস্তরে এবং স্কোয়াডের মধ্যে পার্টি সংগঠন আরও সুসংদ্ধ হয়েছে এবং সামরিক দিক থেকে পার্টি আরও শক্তি ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ভূস্বামী ও অন্যান্য শ্রেণীশত্রুবাদে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে গত পাঁচ বছরে গেরিলা স্কোয়াডগুলো তিনশোরও বেশি অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। সি.পি.আই(এম-এল)-এর অষ্টম (প্রতিষ্ঠা) কংগ্রেসের পঁচিশ বছর পর নভেম্বর ১৯৯৫-এ পার্টি কংগ্রেসের মর্যাদাসম্পন্ন পার্টির সারা ভারত বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

খ.বিহার
সত্তরের দশকে প্রথম দিকের বিপর্যয়ের পর সি.পি.আই (এম-এল) (পার্টি ইউনিটি) পার্টিকে পুনর্গঠিত করে ১৯৭৮-১৯৭৯ থেকে বিহারে তৎপরতা শুরু করে। প্রথম থেকেই গণযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি প্রচার করা হয়। সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে সশস্ত্র স্কোয়াডগুলো এক বড় ভূমিকা রাখে। রণনীতিগত দিক থেকে অনুকূল পালামৌ এর কায়েল-কাইমুর অঞ্চল নির্বাচিত করা হয়। প্রাথমিক কাজ শুরু করার জন্য, কিন্তু গোড়ার দিক এই অঞ্চলে সেরকম সাফল্য পাওয়া যায়নি। মগধ অঞ্চলের জেহানাবাদে দ্রুত বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন অগ্রসর হতে থাকে এবং ১৯৮১ সাল থেকে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। অতিদ্রুত তা উত্তরে পাটনা এবং দক্ষিণে গয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। প্রথমে ভূমিহীন এবং গরিব কৃষকদের মধ্যে গোপন রাজনৈতিক প্রচার চালাতে থাকি, যাতে তাদের বিশ্বাস অর্জন করা যায় এবং গণ আন্দোলনে সক্রিয় হতে উৎসাহী করা যায়। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ভিত তৈরি করে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়।

বিহারের গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কর্তৃত্ব বিপুল। এরা গরিব ও ভূমিহীন কৃষকদের (যাদের অধিকাংশই দলিত ও নিম্নবর্গের মানুষ) প্রতি বর্ণভিত্তিক, সামন্ততান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী নিষ্ঠুর শোষণ চালায়। অপরাধী ও লুম্পেনদের অত্যাচার বিহারের গ্রামাঞ্চলে কর্তৃত্ববাদী, নিষ্ঠুর শোষণ চালায়। অপরাধী ও লুম্পেনদের অত্যাচারে বিহারের গ্রামাঞ্চলে সাধারণ ঘটনা। ভূস্বামীরা তাদের শোষণ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন রকম হিংসা ও ক্ষমতা ব্যবহার করে। এমনকী কখনও কখনও প্রাইভেট আর্মি ব্যবহার করে। ভূস্বাদীদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে শ্রেণীসংগ্রামে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমরা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা প্রথম থেকেই অনুভব করি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয় যাতে ব্যাপক মানুষকে শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল করা যায়। অস্ত্র সংগ্রহ করা ছিল অত্রন্ত জরুরি কাজ, আর তাই ভূস্বামীদের কাছ থেকে প্রচুর আইনি ও বেআইনি অস্ত্র লুঠ করা হয়। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকেও অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

প্রথমে সামন্ত্রতান্ত্রিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বিস্তার লাভ করে। পতিত জমি ও দখলীকৃত জমি উদ্ধার, মজুরি বৃদ্ধি, ভাগচাষে বর্ধিত ভাগের দাবি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আন্দোলন করা হয়; ভূমিদাস প্রথা, বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ এবং সর্বোপরি ভুস্বামীদের প্রাইভেট আর্মির বিরোধিতা করা হয়।

গণআন্দোলন শুরু হতেই সামন্তপ্রভু ও তাদের প্রাইভেট আর্মির অত্যাচারও শুরু হয়। বহু ভূমিহীন ও গরিব কৃষককে গৃহহীন করা হয় এবং পুলিশের সহযোগিতায় বহু কর্মীকে হত্যা করা হয়। ১৯৮২র আগষ্টে সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল প্রতিরোধ আন্দোলন নতুন করে শুরু হলে তিনজন কমরেড ভূস্বামীর বাহিনীর হাতে শহিদ হন। ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিরোধসহ ব্যাপক জঙ্গি গণআন্দোলন সংগঠিত করা হয়। জনগণকে রক্ষা করা ও ভূম্বামীদের সশস্ত্র বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য লালরক্ষী বাহিনী গঠিত হয়। প্রতিরোধ আন্দোলন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে প্রতিক্রিয়াশীল শত্রুকে খতম করার নির্দিষ্ট লাইনও গ্রহণ করা হয়। এর ফলে ৮৪ তে জেহানাবাদে ভূমিসেনার এক স্থানীয় নেতা আমাদের সংগঠনের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

এই সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন যত বাড়তে থাকে ভুস্বামীর বাহিনী তা দমন করতে অক্ষম হওয়ায় ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বাড়তে থাকে। ’৮৩-তে কৃষক সম্মেলনে পুলিশ আক্রমণ চালায়। সামরিক দিক থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তুলনায় আমাদের শক্তি ছিল যথেষ্টই কম, তাই আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে রক্ষ্যা করার এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেওয়া হয়। অন্যদিকে আমাদের গণভিত্তি বিস্তৃত করার জন্য মধ্য কৃষকদেরও তাদের আর্থ-সামাজিক দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে শামিল করা হয় এবং পাটনা, গয়া, নালন্দাও নওয়াদা পর্যন্ত কাজের এলাকা বিস্তৃত হয়।

১৯৮৬তে আরওয়ালে এক জনসভা চলাকালীন চারিদিক থেকে ঘিলে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৩ জন নারী-পুরুষকে হত্যার এক নৃশংস দৃষ্টান্ত স্থাপন কলে। এর বিরুদ্ধে বিহারে এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিহারে বিধানসভা ঘোরও করা হয়। ফলে সমস্ত গণ সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সরকার জেহানাবাদকে ‘পুলিশি-জেলায় পরিণত করে। এর ফলে আইনি এবং বেআইনি গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন অঞ্চলে আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। ৮৪-র ১৭ জুন, কৃষক আন্দোলনের প্রিয় নেতা তথা ‘মজদুর কিষাণ সংগ্রাম সমিতি’ (এম. কে. এস. এস)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড কৃষ্ণা সিং শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। ফলস্বরূপ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং পালামৌতে কৃষক আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। পালামৌ বিহারের এক বিশাল পশ্চাৎপদ জেলা। এই জেলা বিহারের সমভূমি থেকে শুরু করে ছোটনাগুপুরের মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। একদিকে পালামৌ-এর সুবিধাজন ভৌগলিক অবস্থান, আপেক্ষিক রাজনৈতিক শূন্যতা, মানুষের অপরিসীমা দারিদ্র্য, জমিদার ও আমলারা যারা নৃশংস দমন ও অত্যাচার নামিয়ে আনছে তাদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব, অপরদিকে ব্যাপক দরিদ্র কৃষক যাদের অধিকাংশ আদিবাসী ও দলিত- এর পলে এই অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনকে উন্নত করে গেরিলা অঞ্চলে পরিণত করা ও দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধ গড়ে তোলা খুবই সুবিধাজনক ছিল। রণনীতিগতভাবে অনুকূল অবস্থানের জন্য পালাশৌ এর কৃষক আন্দোলকে আরও উন্নত গেরিলা অঞ্চলে গড়ে তুলতে পার্টি প্রথম থেকেই এখানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।

কমরেড কৃষ্ণ সিংয়ের হত্যাকারীর শাস্তির দাবিতে হাজার হাজার গ্রামবাসী পুলিশি সন্তাসকে তোয়াক্কা না করে ডালটনগঞ্জ অভিযানে শামিল হন। পরবর্তী ছমাসে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে, সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে, জমির অধিকরের দাবিতে, বনসম্পদ অধিকারের দাবিতে, ভূমি দাসত্ব বিলোপের দাবিতে গণ আন্দোলনের বিস্তার যেভাবে পালামৌ-এর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তা ছিল পার্টির দুটো সঠিক সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি। সিদ্ধান্ত দুটো হল- কমরেড কৃষ্ণা সিংয়ের হত্যার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা।

অতিদ্রুত গোটা পালামৌতেরাষ্ট্র তথা ভূস্বামীর বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। এই জঙ্গি আন্দোলনের ৮৬র মে মাসে বন্দী কমরেডদের মুক্তির জন্য ছাতারপুর পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করা হয় এবং ৮৮র এপ্রিলে মহুয়া সংগ্রহের দাবিতে আন্দোলরত মহিলাদের পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের বন্দুকে কেড়ে নেওয়া হয় ইত্যাদি। ভূস্বামীর বাহিনীর অত্যাচারে এবং গণ সংগঠন নিষিদ্ধকরণের ফলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে গণ সংগঠনের কিছু সুবিধাবাদী নেতা দল ত্যাগ করে। ফলে আন্দোলনে কিছু ক্ষতি হয় এবং সাময়িকভাবে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তাই সংগঠন সুসংবদ্দ করার, রাজনৈতিক প্রচার বৃদ্ধি করার এবং শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের দিকে পার্টি নজর দেয়। সংগঠনকে সুসংবদ্ধ করার পরে আন্দোলনকে অন্যান্য নিপীড়িত অংশের মধ্যে বিস্তৃত করা হয় এবং সানলাইন সেনা নামক ভূস্বামীদের প্রাইভেট আর্মিকে ধ্বংস করা হয়।

রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে উন্নত করার জন্য সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দেওয়া হয়। মগধ আঞ্চলিক স্তরে সামরিক কার্যকলাপ সুসংগঠিত করার জন্য একটা কমান্ডার কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে আঞ্চলিক স্তরে, পার্টির আঞ্চলিক শাখার নেতৃত্বে এই কমিটিকে সৈন্য সঞ্চালন টীম অথবা মিলিটারী অপারেশনাল টীম হিসেবে আরও উন্নত করে তোলা হয়। এই টীমকে গড়ে তোলা হয় পার্টির সামরিক কার্যকলাপ দেখাশোনা করার জন্য। যারা স্কোয়াড নিয়োগ, সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সামরিক অভিযানের প্রয়োজন অনুযায়ী বাহিনীকে কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে দেখাশোনা করবে।

শ্রেণীসংগ্রাম তীব্র হওয়ায় এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সশস্ত্র সংঘর্ষ প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সব সংঘর্ষে কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়। সশস্ত্র সংগ্রামে অনেক কমরেডই শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। গেরিলা অঞ্চল তৈরির নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পাঁচটা জেলা নিয়ে গঠিত কোয়েল-কাইমুর অঞ্চলকে প্রথমে বাছা হয় এবং এর সংলগ্ন একটা এলাকাকে পশ্চাদঞ্চল হিসেবে ঠিক করা হয়।

মগধকে বাদ দিয়ে উত্তর বিহারে তৃতীয় একটা অঞ্চল নির্বাচিত করা হয়। পরিল্পনা অনুযায়ী সেখানে রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, গণ সংগঠন পুনর্সংগঠিত করা হয়। সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীগুলোকে সাময়িক বাহিনী, স্থায়ি বাহিনী, নিয়মিত গেরিলা বাহিনী ও গ্রামস্তরে গ্রামরক্ষী বাহিনী রূপে পুনগঠিত করা এভং অস্ত্র শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়। গণ আন্দোলন বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামস্তরে গণ সংগঠনগুলোর কমিটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত আত্মসমর্পণকারী জমিদার, প্রাইভেট আর্মি ও ডাকাত ইত্যাদিদের শাস্তি দেওয়া হয় ও সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসা করা হয়।

সামরিক সংগঠন এবং গণ সংগঠনগুলোকে ধীরে ধীরে গেরিলা অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে চালিত করা হয়। গেরিলা অঞ্চলে গণযুদ্ধের বিকাশ ঘটিয়ে উচ্চতর স্তরে উন্নীত করতে হবে যা গ্রামস্তর থেকে আঞ্চলিক স্তর পর্যন্ত ধীরে ধীরে গণ বিপ্লবী কমিটির (জনগণের সরকার) মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে।

৫। গেরিলা অঞ্চল
মাও-এর গণযুদ্ধের তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সশস্ত্র সংগ্রামকে অঞ্চল ভিত্তিক ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে চালিত করা। অর্থাৎ ক্ষমতার আধার হিসেবে বিপ্লবী কৃষক কমিটি স্থাপন করে এবং তা ধাপে ধাপে গেরিলা অঞ্চলে ও ঘাঁটি এলাকায় পরিণত করা। ৯৫ এর নভেম্বরে প্রকাশিত আমাদের ‘রণনীতি ও রণকৌশল’দলিলে বলা হয়েছে, ‘সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলাই হবে প্রধান কাজ। এর ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন গেরিলা অঞ্চল তৈরির সূচনা করবে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন সরকার ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও তা প্রশাসনিক ভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে না, অপরদিকে তেমনি গেরিলা যুদ্ধ যতই উন্নত ও তীব্র হোক না কেন বিপ্লবী বাহিনীও স্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অবস্থায় পৌঁছোতে পারবে না। যেসব অঞ্চলে এই রকম পরিস্থিতি বিদ্যমান তাকেই গেরিলা অঞ্চল বলা হবে। এর অর্থ প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ও বিপ্লীব শক্তি উভয়েই এই অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দখলের জন্য লড়াই করে কিন্তু স্থায়ী প্রশাসন কায়েম করতে পারে না।’

আমাদের বর্তমান আন্দোলনের ধারায় আমরা কিছু অঞ্চলকে চিহ্নিত করেছি যেগুলো প্রাথমিক ভাবে গেরিলা অঞ্চলের স্তরে উন্নত হয়েছে। আবার কিছু এলাকা গেরিলা অঞ্চলে পরিণত হওয়ার প্রস্তুতির স্তরে রযেছে। প্রথম ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও গ্রামরক্ষী বাহিনী গড়ে উঠেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, বন সম্পদের অধিকার স্থানীয় আদিবাসীদের দেওয়া হচ্ছে, ভূ’স্বামীদের জমি দখল করে গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে, জমিদার ও মহাজনদের আসল ও সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সরকারকে কর দেওয়া ও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ‘প্রস্ততি অঞ্চল’ ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতির দিকে এগোতে থাকবে। এইভাবেই দুটো প্রাথমিক স্তরের গেরিলা অঞ্চল এবং পাঁচটা প্রস্ততি অঞ্চল তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক স্তরের গেরিলা অঞ্চলগুলো হল-
১। অন্ধ্রের পাঁচটা জেলা নিয়ে উত্তর তেলেঙ্গানা,
২। মহারাষ্ট্রের দুটো জেলা ও মধ্যপ্রদেশের তিনটে জেলা নিয়ে দণ্ডকারণ্য। এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় দু’কোটি। যার বৃহদাংশ এই গেরিলা অঞ্চলে বাস করেন।

প্রস্তুতি অঞ্চল :
ক. উত্তর অন্ধ্রের চারটে জেলা এবং উড়িষ্যার দুটো জেলা নিয়ে পূর্বাঞ্চল,
খ. অন্ধ্রের চারটে জেলা নিয়ে দক্ষিণ তেলেঙ্গানা,
গ. অন্ধ্রের আরও তিনটে জেলা নিয়ে নাল্লামালা বনাঞ্চল,
ঘ. বিহারের চারটে জেলা নিয়ে মগধ অঞ্চল,
ঙ. বিহারের আরও চারটে জেলা নিয়ে কোয়েল-কাইমুর অঞ্চল।
ভারতের দুটো রাজ্যে ও মধ্যবর্তী বানঞ্চলে পার্টির শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে এবং আরও ছটা রাজ্যের পার্টি সংগঠন আছে। দেশের আর্থ-রাজনৈতিক তীব্র সংকটের এই পরিস্থিতিতে পার্টি দ্রুত এগিয়ে যাবে।

৬। ভারতের আর্থ-রাজনৈতিক সংকট
বিশ্ব জনস্যখ্যার সতেরো শতাংশ মানুষ (একশো কোটি) নিয়ে এই ভারত শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ার নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নাগপাশে আবদ্ধ। এই সাম্রাজ্যবাদী নাগপাশ যদি ভাঙা যায় তবে তা শুধু এশিয়ার বিশ্ববিপ্লবে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। পূর্বে ভারত ছিল শুধুমাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুকুটের মণিস্বরূপ, বর্তমানে তা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। দুই শঁতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসক ও তৎপরবর্তী অর্দ্ধ শতাব্দীর নয়া ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের ফলে প্রচুর প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভারত পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।এখানকার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান একমাত্র অফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয়।

বিশাল দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন দক্ষিণ কোরিয়ার মত ছোটো দেশের মোট ৬ জাতীয় উৎপাদনের দুই তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি। ১৯৯৫-এ ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন ছিল ৩২৪০০ কোটি ডলার, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার ছিল ৪৫,৬০০ কোটি ডলার। এদেশের দারিদ্রসীমা এতই চরম যে রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন পরিষদের মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী পৃথিবীর একশো চুয়াত্তরটা দেশের মধ্যে ভারতের স্থান একশো ঊনচল্লিশ। কতখানি খারাপ অবস্থা সেটা বুঝতে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারেঃ আর্জেন্টিনার স্থান ছত্রিশ, মেক্সিকোর পঞ্চাশ, ব্রাজিলের আটষট্টি, শ্রীলঙ্কার একানব্বই, ইন্দোনেশিয়ার নিরানব্বই এমনকী কেনিয়ার মতো দেশেরও একশো চৌত্রিশতম স্থান।

ভারতের শাসকশ্রেণী চিরকালই সাম্রাজ্যবাদীদের সেবাদাস। প্রথমে এরা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেবক। ৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এরা বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অঙ্গুলি হেলনে নাচতে থাকে। কিন্তু দেশের মানুষের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তীব্র মানসিকতার জন্য শাসককুল ভারতের তথা বিশ্বের জনসাধারণের কাছে জনপ্রিয় বক্তৃতা দিয়ে ধোঁকা দেয় এবং দ্বিচারিতার আশ্রয় নেয়। এম.কে. গান্ধীর তথাকথিত ব্রিটিশ বিরোধী অহিংস সংগ্রাম আসলে উপনিবেশ বিরোধী জঙ্গি আন্দোলনকে বিপথে চালিত করার ব্রিটিশ কৌশল মাত্র। নেহেরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর মেকি সমাজতন্ত্রের বুলি তাদের মুতসুদ্দি চরিত্রকে আড়াল করার সুচতুর কৌশল মাত্র। বর্তমানে পারমাণবিক বিস্পোলণ ও সি.টি.বি.টি. নিয়ে পশ্চিম দুনিয়া বিরোধী বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথাবার্তা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদীর ধ্বজাধারী বি.জে.পি-র বহুজাতিকদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও ইস্রায়েলের মতো রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাক্সক্ষাকে গোপন করার চেষ্টা মাত্র।

১৯৯১ সাল থেকে সব একের পর এক সব সরকারই আই.এম.এফ-এরে নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ উম্মুক্ত করে দিয়েছে। এই সেবাদাস পুঁজিপতিরা নিজেদেরকে বহুজাতিক সংস্থার কাছে বিক্রি করে অঘোষিতভাবে তাদের ম্যানেজার ও সেলসম্যানে পরিণত হয়েছে কিম্বা তাদের বিদেশী সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার সুযোগ করে দিয়েছে। অনেকের মধ্যে এইরকম একটা ভ্রান্তি আছে যে, ভারতীয় পুঁজিপতিরা আকারে বড়ো বলে তারা বুঝি জাতীয় বুর্জোয়া চরিত্র সম্পন্ন। কিন্তু বাস্তবটা ঠিক এর উলটো। টাটা, বিড়লা, আম্বানীর মতো বৃহত্তম পুঁজিপতিরা বিদেশী পুঁজির অতি বিশ্বস্ত সেবক। এই আট বছরের বিশ্বায়নে বিদেশী ঋণ ১৯৯০-এ ৮,২০০ কোটি ডলার থেকে আজকে ১০,০০০ কোটি ডলারে পরিণত হয়েছে, এফ.আই.আই বোম্বে স্টক এক্সচঞ্জের ২০% ব্যবসার অংশীদার হয়ে অঘোষিতভাবে আমাদের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, টাকার মূল্য ভীষণভাবে কমে গেছে। ১৯৯১ সালে ডলার পিছু ১৮.৪ টাকা থেকে আজকে ৪২.৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে (১৩০ শতাংশ অবমূল্যায়ণ) এবং আরও অবমূল্যায়ণ ঘটেই চলেছে, ১৯৯১ সালে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ ছিল ৩৫১ কোটি টাকা এবং তা ‘৯৬-এ দাঁড়িয়েছে ৮,৪৪১ কোটি টাকায়, বাণিজ্য ঘাটতি ১৯৯১-৯২-এ ১১,০০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৯৯৬-৯৭-এ দাঁড়িয়েছে ৪৯,০০০ কোটি টাকায়।

এর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রধানত ভারতীয় শিল্পগুলোকে দখল করেছে, আমদানি শুল্ক কমার জন্য আমদানির হার বিপুল ভাবে বেড়ে গেছে। বাণিজ্য ঘাটতি প্রতি বছর বাড়তেহ বাড়তে বিরাট অংকে পৌঁছেছে (এ বছর ২০ বিলিয়ন ডলার), সরকারি সংস্থাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে বহুজাতিকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, খনি-বিদ্যুৎ-প্রাকৃতিক তেল-কৃষির মতন মূল (core) ক্ষেত্রগুলোতে এমনকী অর্থলগ্নি, গৃহনির্মান প্রকল্প, দালালি ও বিমার ক্ষেত্রেও বিদেশী পুঁজির অবাধ বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, টাকাকে আংশিক বিনিময়যোগ্য করা হয়েছে এবং পূর্ণ বিনিময়যোগ্য করার পথে অগ্রসর হচ্ছে, বিদেশী পুঁজি ও তাদের মুতসুদ্ধি বুর্জোয়া দালালদের বিপুল কর ছাড়, ভর্তুকির মতো ইত্যাদির সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অথচ সমাজ কল্যাণ খাতে খরচ কমানো হচ্ছে, কৃষিকে অবহেলা করা হচ্ছে, বিপরীতে রপ্তানিযোগ্য কৃষি-শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও বিগত দু’বছরে অর্থনীতি প্রায় অচল অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু এ বছর ভারত বাণিজ্যজনিত দেনা মেটানোর সংকটে আবদ্ধ। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সুদের কারবারেও ১৭% সুদের প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে ৪০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে, যার জন্য সুদ ছাড়াও বিভিন্ন রকমের কর ছাড় ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশী পুঁজির আগ্রাসনে সবচেয়ে ভয়ংকর ফল হল বছরে প্রায় একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ আমাদের মোট জাতীয় আয়ের ১১% সাম্রাজ্যবাদীদের হস্তগত হয়।

এই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশে এক রাজনৈতিক অস্তিরতা দেখা দিয়েছে, এমনকী শাকশ্রেণী কোনো রকম স্থায়ী সরকার গড়তে পারছে না। কেন্দ্রে গত তিন বছরে তিনবার সরকার পাল্টেছে এবং বর্তমান বি.জে.পি সরকার প্রথম দিন থেকেই সমস্যায় জর্জরিত, তাদের জোটের দলগুলো বিরোধীদের চেয়েও বড়ো সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বি.জে.পি. নেতৃবৃন্দ নিজেরাই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত (উদাহরণ- দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট)। কংগ্রেস একরকম তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বিরাজ করছে। সোনিয়া গান্ধীর মতো স্বৈরাচারীও তাদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে ব্যর্থ। তথাকথিত তৃতীয় ফ্রন্টের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সংশোধনবাদী দলগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য ঘন ঘন শিবির পাল্টাতে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন’, সংবিধান সংশোধন’ ইত্যাদির কথা তোলা হচ্ছে। নির্বাচন তামাশায় পরিণত হয়েছে। বাহুবল এবং অর্থবলই শুধু ভোট নিয়ন্ত্রণ করছে না, নির্বাচিত তামাশায় পরিণত হয়েছে। বাহুবল এবং অর্থবলই শুধু ঘন দলবদল করছে। জনগণ বিরক্ত হয়ে ক্রমশ নির্বাচন থেকে সরে আসছেন। এতদসত্ত্বেও এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। উদারীকরণের সাথে সাথে সব পক্ষ ই মুনাফার সর্বাধিক ভাগ দখলের জন্য কামড়াকামড়ি করছে।

আর্থিক সংস্কারের ফলে দেশের মানুষ ভয়ংকর দারিদ্র ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বিপুল শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন সংকোচন, সমাজ কল্যাণ খাতে ব্যয় সংকোচন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কৃষিক্ষেত্রে স্থবিরতা, খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন। বাম, মধ্য বা দক্ষিণ যে কোনো সংসদীয় দলই অর্থনৈতিক সংস্কারের একই নীতি অনুসরণ করছে কিন্তু জনসাধারণ এই দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। ৯৮-এর জুন থেকে আগষ্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিশ লক্ষ কর্মচারী বিভিন্ন রকম ধর্মঘটে শামিল হন। বহুক্ষেত্রে এই ধর্মঘট জঙ্গিরূপ ধারণ করেছে। যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতায় শেষ হয়েছে। এর সাথে বিভিন্ন নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলো আরও বেশি বেশি করে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছেন।

মার্কসবাদ-লেলিনবাদ-মাও চিন্তাধারা ও গণযুদ্ধের পুষ্ট কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাই এই অসন্তোষে মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভারতে সি.পি.আই (এম-এল)(পি.ডব্লিউ) গণযুদ্ধের পথ অনুসরণকারী দল। অন্যান্য তথ্যকথিত মাওবাদী দল ও গোষ্ঠীর অধিকাংশ কোনোভাবেই গণযুদ্দের সাথে যুক্ত নয়। ভারত সরকারের ও তার রাষ্ট্রযন্ত্রের সব গণতান্ত্রিক অছিলা আসলে একটা স্বরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের মুখোশ।

নকশালপন্থীদের দমন, জাতিসত্তার আন্দোলকারীদের নিধন, শিখ ও মুসলিম বিরোধী নীতি প্রণয়ন, এমনকী আইনি শ্রমিক আন্দোলন দমন, জনপ্রিয় শ্রমিক নেতাদের হত্যা, দলিতদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ বাড়িয়ে তোলা, পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর ঝটিকাবাহিনী সৃষ্টি-বিশেষত ভারতের মতো দেশে যেখানে যেখানে সংগ্রাম চলছে, সেখানে গণযুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ অকার্যকারিতার ইঙ্গিত বহন করে। এর সঙ্গে আছে দেশের বৃহৎ অঞ্চলে ভূ’স্বামীদের সামন্ততান্ত্রিক কর্তৃত্ব। যে সব অঞ্চলে প্রত্যক্ষ সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন নেই সেখানেও মহিলাদের ওপরে পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব, নিম্নবর্ণের ওপর উচ্চবর্ণের নিপীড়ন এবং গণতন্ত্রের প্রতি আক্রমণ তথাকথিত গণতন্ত্রকে তামাশায় পরিণত করেছে। এই সংকটের মুখে একমাত্র মাও-এর নিদেশিত পথে অর্থাৎ গণযুদ্ধের পথে প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাই ফ্যাসিস্টদের বিরোধিতা করে বিপ্লবের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

চলবে… তিন পর্বে সমাপ্য!
প্রথম পর্ব : মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব এক

১ thought on “মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব দুই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *