জঙ্গিনেতা অধ্যাপক রেজাউর রাজ্জাক এখনো বহাল তবিয়তে!

১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে জঙ্গিদের কর্মকান্ড শুরু ও প্রসারে জামায়াত ছাড়াও আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধফেরত মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র ও মসজিদের ইমামদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এরপর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের আগমনের পর জানা যায় তাদের পেছনে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকেরাও।


১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে জঙ্গিদের কর্মকান্ড শুরু ও প্রসারে জামায়াত ছাড়াও আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধফেরত মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র ও মসজিদের ইমামদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এরপর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের আগমনের পর জানা যায় তাদের পেছনে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকেরাও।

সম্প্রতি দেশে আইএস ও আল-কায়েদার শাখার কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়া সন্দেহভাজন জঙ্গিদের পরিচয় দেখে জানা যায় ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানীতে চাকরি করা কর্মকর্তারাও রয়েছে। আর অতি সম্প্রতি জানা গেলো, ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের এক নারী কর্মকর্তা এদেশে জঙ্গিদের সাথে আইএসআই-এর যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করতো।

প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনী, বিচার বিভাগে জামায়াতের লোকজন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এখনো। ফলে কার্যক্রম বিস্তার করতে খুব একটা বেগ পেতে হচ্ছে না জামায়াতের আশির্বাদপুষ্ট উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ জঙ্গি দলগুলোকে।

তারই একটি নমুনা এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যা সম্ভবতঃ কোন সংবাদ মাধ্যমে ছাপেনি। এই লেখার বিষয়বস্তু তৈরি করেছে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এনএসআই)। সেই বিশেষ প্রতিবেদন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে দিয়েছিল দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করে।

২০১৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর পাঠানো সেই প্রতিবেদনে বলা হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস-এর সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউর রাজ্জাক (Mohammad Rezaur Razzak) “শিক্ষকতার আড়ালে জঙ্গি সংগঠন তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন, সমন্বয় সাধনের যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তা প্রতিরোধ করা না গেলে দেশে জঙ্গিবাদীদের ব্যাপক বিস্তারের আশংকা করা হচ্ছে।”

“রেজাউর রাজ্জাককে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে এসে তার জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডের তথ্য সংগ্রহপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া অত্যাবশ্যক।”

কিন্তু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায় সে এখনো একই পদে বহাল তবিয়তে আছে। এমনকি তাকে হেড অব অপারেশনসের দায়িত্ব দেয়া আছে। লিংক-এখানে

রাজ্জাকের বাবা ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক লস্কর। তার স্ত্রীর নাম খাদিজা নাজনীন। প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজ্জাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট এতোটাই আস্থাভাজন যে সাবেক উপ-উপাচার্য আইনুন নিশাত তার প্রতিটি কাজে তাকে যুক্ত রাখতেন। সেই সুবাদে সে এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট স্বনামধন্য বিক্তিবর্গ তার পূর্বের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিবহাল নয় মর্মে জানা যায়।

তার অজানা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস

রাজ্জাক যুক্তরাষ্ট্রের The University of Texas হতে বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স (১৯৮০-৮৪) এবং Southern Methodist University – Cox School of Business থেকে ব্যবসা প্রশাসনে এমবিএ (১৯৮৪-৮৫) ডিগ্রী লাভ করে। সেখানে অবস্থানকালীন জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এফবিআই-এর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে জঙ্গিবাদ বিস্তারের উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে গবেষোণা প্রতিষ্ঠান/এনজিও Research Centre for Unity Development (RCUD) প্রতিষ্ঠা করে সে। তাছাড়া সে জঙ্গি সংগঠন জামায়েতুল মুসলেমিন এর প্রতিষ্ঠাতাকালীন সদস্য।

উল্লেখ্য, RUCD-এর অপর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রশীদ চৌধুরী, যে কিনা ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ইয়েমেনে গ্রেপ্তারকৃত আল-কায়েদার সদস্য তেহজীব করিমের শ্বশুর। এর মূল কাজ ছিল এনজিও’র ছদ্মবেশে জেএমবি’র নতুন সদস্য সংগ্রহ, তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ হতে অর্থ সংগ্রহ করে তা জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহার করা।

রাজ্জাক ২০০৫ সালে American International University of Bangladesh (AIUB) এর ব্যবসা প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে শিক্ষকতার আড়ালে জঙ্গি সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহ, সমন্বয় সাধনের কাজ চালিয়ে যায়। অতঃপর ২০০৭ সালে জামায়েতুল মুসলেমিন প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

জামায়েতুল মুসলেমিন করার সময় থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দীন রহমানীর সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে জানতে পারে এনএসআই।

RUCD-এর আরো যুক্ত ছিল রেজওয়ান শরীফ (রেদোয়ানুল আজাদ রানা), মইন উদ্দীন শরীফ, তেহজীব করিম, রাজীব করিম, ফারজাদ হক তুরাজ, জুনুন শিকদার ও ইজাজ আহমেদ। এদের মধ্যে রানা, মইন, তেজজীব ও তুরাজ ২০০৯ সালে al-Qaeda in the Arabian Peninsula (AQAP)-তে যোগদানের উদ্দেশ্যে ইয়েমেন গমন করে AQAP-এর প্রধান আনোয়ার আল আওলাকীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। তুরাজ বাদে বাকী সবাইকে জঙ্গি কার্যক্রমের জন্য ২০১০ সালে ইয়েমেন পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ছয়-সাত মাস ইয়েমেনের জেলে থাকার পর ২০১১ সালে পর্যায়ক্রমে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এদের মধ্যে রহমানী, রানা ও জুনুন ব্লগার রাজীব হত্যার জড়িত ছিল। আর রাজীব করিম আল-কায়েদার হয়ে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজের বোমা হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৩২ বছর সাজাপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যের কারাগারে আটক আছে বলে জানা যায়।

রাজ্জাক ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত AIUB-তে কর্মরত ছিল। সেখানে সে সুদক্ষ, কৌশলী, নিয়মানুবর্তীতা ও ভালো আচরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করে। সেসময় ছাত্রদেরকে জঙ্গি মতাদর্শে অনুপ্রানিত করতে সক্ষম হয় যাদের মধ্যে আমেরিকায় গ্রেপ্তার রেজওয়ান নাফিস চৌধুরীর সহযোগী ফাহিম ফয়সাল আহমেদ অন্যতম।

পরবর্তীতে তার বিভিন্ন সন্দেহজনক কার্যক্রম ও উগ্র ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের কারনে কর্তৃপক্ষের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। এ কারনে সে মালয়েশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং-এর উপর পিএইচডি অর্জনের কথা বলে ২০১০ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।

পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় না গিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ’র সান্ধ্যকালীন কোর্স শিক্ষক হিসেবে যোগদানের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ হয়ে ২০১২ সালে BRAC University-এর School of Business শাখায় সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেয়। এখানে সে একজন সুশৃংখল, দক্ষ ও জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত হয়ে ইসলাম প্রচারের আড়ালে সে ছাত্রদেরকে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করছে এবং কিছু ছাত্রের সাথে নিয়মিত গোপনে বৈঠক করে বলে গোয়েন্দা সংস্থাটি তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়।

এত কিছু জানার পরও সরকার কেন এখনো রাজ্জাককে জামাই আদরে রেখেছে তা বুঝতে কারো সমস্যা হবার কথা না।

৫ thoughts on “জঙ্গিনেতা অধ্যাপক রেজাউর রাজ্জাক এখনো বহাল তবিয়তে!

  1. এত কিছু জানার পরও সরকার কেন

    এত কিছু জানার পরও সরকার কেন এখনো রাজ্জাককে জামাই আদরে রেখেছে তা বুঝতে কারো সমস্যা হবার কথা না।

    তারমানে জঙ্গিবাদের প্রধান পৃষ্টপোষক সরকার নিজেই।

  2. জঙ্গিবাদ নির্মূলে মহাজোট
    জঙ্গিবাদ নির্মূলে মহাজোট সরকারের কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে? জঙ্গিবাদ বেড়ে উঠছে রাষ্ট্রিয় পৃষ্টপোষকতায়।

  3. পাকিস্তানের সরকারগুলো ক্ষমতায়
    পাকিস্তানের সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকার জন্য জঙ্গিবাদে মদত দিতে দিতে আজ রাষ্ট্রটি সমগ্র বিশ্বে অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে খেতাব পেয়েছে। বাংলাদেশ সেই পথে হাটছে। আওয়ামিলীগকে বুঝা উচিত, রাজনৈতিকভাব জঙ্গিবাদের প্রধান টার্গেট হবে আওয়ামীলিগ।

  4. ঢাকা ভার্সিটির হিজবুতের
    ঢাকা ভার্সিটির হিজবুতের প্রতিষ্ঠাতা ও বুদ্ধিজীবী ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের IBA অধ্যাপক। পরবর্তীতে যাকে অপসারণ করা হয়। এরা হল মূল গড ফাদার। এদের মাধ্যমে অনেক বেধাবী ছাত্র এসব লাইনে জড়িয়ে পড়ে। এসব গড ফাদারদের কথা মিডিয়াতে আসে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *