জেনারেল জ্যাকবঃএক দুঃসময়ের প্রকৃত বন্ধুর চিরবিদায়




একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের নিজে হাতে দলিলের খসড়া লিখেছিলেন যিনি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই অকৃত্রিম বন্ধু ভারতীয় জেনারেল জেএফআর জ্যাকব আর নেই।মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয়ের সাক্ষী ছিলেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই শীর্ষ কর্মকর্তা। আজ বুধবার সকালে দিল্লির একটি সামরিক হাসপাতালে মারা যান তিনি।তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ১৯৭১ সালে তিনি ইস্টার্ন আর্মি কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে পূর্ব পাকিস্তানের রণাঙ্গনে সরাসরি যোগ দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। ঢাকা দখলের মূল পরিকল্পনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ছিলেন ভারতীয় সেনানায়করাও। আর জ্যাকব ছিলেন সেদিনের অন্যতম রূপকার।

‘সারেন্ডার ইন ঢাকা, বার্থ অফ এ নেশন’ এবং ‘অ্যান ওডেসি ইন ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বইয়ে জ্যাকব লিখে গেছেন সেইসব আগুনঝরা দিনের কথা, যে পথ ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এএকে নিয়াজী ঢাকার তখনকার রেসকোর্স ময়দানে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের।বইদুটিতে জ্যাকব মুক্তিবাহিনী আর বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূয়সী প্রশংসা করেন।যা অপর কোন ভারতীয় বা পাক জেনারেল ইতিপূর্বে করেননি। নিয়াজীর সারেন্ডার করার সেই দলিলটি তারই লেখা। পাকিস্তানিরা চাইছিল জাতি সংঘের হস্তক্ষেপ। কিন্তু জ্যাকব সেটা হতে দেননি। তিনি ঢাকায় নিয়াজির হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন তার সাথে আত্মসমর্পন নিয়ে নেগোশিয়েট করতে।

১৯২৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জ্যাকব কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭৮ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি ভারতের গোয়া ও পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৩৬ বছরের সেনাবাহিনী জীবনে তিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জ্যাকব ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হলোকস্ট( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের উপর চালানো গণহত্যা)র নির্মমতা থেকে অনুপ্রাণীত হন এবং ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী তে যোগদান করেন। তাঁর পিতা তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে আপত্তি জানান কিন্তু তাও তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ২০১২ সালে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমি গর্বিত আমি ইহুদি, তার থেকেও বেশি ও অনেক বেশি গর্বিত যে আমি ভারতীয়।

১৯৭১ সালে লেফটেনেন্ট জেনারেল থেকে তিনি মেজর জেনারেলে পদোন্নোতি লাভ করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফের দায়িত্বে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি প্রশংসাসূচক অনেক সম্মান লাভ করেছেন।

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী যখন অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণভয়ে ভারতে আশ্রয়ের খোঁজে আসতে থাকে। চীফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যাকব তখন উক্ত সমস্যা নিরসনের উপায় খুঁজতে থাকেন। কিন্তু অন্যদিকে পাকিস্তানীদের অত্যাচার আরো বাড়তে থাকে। এসব দেখে জ্যাকব তৎক্ষণাৎ তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এই সমস্যা নিরসনের একমাত্র উপায় হচ্ছে পাকিস্তানীদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর প্রধান শ্যাম মানেকশ’ পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে প্রথমেই চট্টগ্রাম এবং খুলনা শহর দখল করতে নির্দেশ দেন। জাতিসংঘ এবং চীনের প্রবল চাপের মুখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু জ্যাকব সব ধরনের চাপের উর্দ্ধে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সচেষ্ট ছিলেন।প্রথমেই তিনি ঢাকাকে দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। এর জন্য তিনি সুচারুভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে অগ্রসর হন।তাঁর পরিকল্পনা অবশেষে সফল হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানীদের ঢাকা থেকে হটাতে সফল হয়। দখলের পর তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সকল যোগাযোগ মাধ্যম ধ্বংস করেন। তিনি তিন সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা দখলের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু তা হয়ে যায় এক রাতের ভিতরেই। তারপর ধীরে ধীরে আরো অনেক স্থান দখল করতে সক্ষম হয় ভারতীয় সেনাবাহিনী।

জ্যাকব বুঝতে পারেন যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো ফলাফল লাভ সম্ভব হবে না। তাই তিনি জেনারেল নিয়াজিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বলেন। তিনি নিয়াজির কাছে আত্মসমর্পণের খসরা পাঠিয়ে দেন। উক্ত দিন সকালে জ্যাকব শ্যাম মানকেশর ফোন পান এববং তিনি তাঁকে বলেন ঢাকায় গিয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে। তারপর তিনি আত্মসমর্পণ দলিল হাতে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান এবং আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান সংগঠিত করতে তিনি জেনারেল নাগরাকে দুটি চেয়ার, একটি টেবিল জোগাড় করতে এবং ঢাকা শহর বিমানবন্দর, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ও একটি যৌথ গার্ড অব অনারের আয়োজন করতে বললেন। তারপর পাকিস্তান বাহিনী ৩০মিনিট সময়ে আত্মসমর্পণ সম্পন্ন করে। ৯৩ হাজার সৈন্য সাথে নিয়ে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেন। এখানে আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকায় তখন প্রায় ৩০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য উপস্থিত ছিল, অপরদিকে ভারতীয় সৈন্য ছিল মাত্র ৩ হাজার। অর্থাৎ অনুপাতে ১০:১। এক্ষেত্রে জ্যাকব অনেক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। জেনারেল নিয়াজি এ সম্পর্কে মোটেই অবগত ছিলেন না।

স্বাধীনতাযুদ্ধে তার অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানিত করে।এদেশের মুক্তিসংগ্রামের এই অকৃত্রিম বন্ধুর পুণ্য স্মৃতির প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও অভিবাদন।

তথ্যসূত্রঃ
১।উইকিপিডিয়া
২।সারেন্ডার এট ঢাকাঃবার্থ অফ এ ন্যাশনঃ জ্যাকব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *