শ্রীমন্তদের কেউ মনে রাখেনা


দেশভাগের কিছুকাল পরের কথা।


দেশভাগের কিছুকাল পরের কথা।
শ্রীমন্ত ছিলো নামজাদা চোর।পটিয়া,সাতকানিয়া,বাশখালী,চন্দনাইশ এলাকায় এই সিদেল চোরের উতপাতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এক সময়।গেরস্তের চোখে ঘুম ছিলোনা,চৌকিদার,দফাদাররা বসিয়েছিল সতর্ক পাহারা।মানুষের হাস,মুরগী,থালা বাসন,পড়নের শাড়ী,লুঙ্গী কোন কিছুই তার চুরির তালিকা থেকে বাদ পড়তোনা।অবস্থা এমন হয়ে দাড়ালো যে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাত থানার কোথাও কোন চুরি হলেই লোকে ধরে নিত যে এটা শ্রীমন্ত চোরার কাজ।অতিষ্ঠ হয়ে থানায় অভিযোগের পরে অভিযোগ জমা দিতে লাগলো তারা।প্রথমদিকে ছিঁচকে চোর বিবেচনায় তেমন একটা পাত্তা না দিলেও অবশেষে পুলিশের ও টনক নড়লো।বড় দারোগা মাখনবাবু নিজেই ঘোড়ায় চেপে দুজন কনস্টেবল সহ রওনা হলেন হাইদগাও গ্রামের দিকে।পুলিশ আসার খবর কিশোর শ্রীমন্তের কানে আগেভাগেই পৌঁছে যায়।চুপিচুপি লুকিয়ে থাকে বাড়ির কিছুটা সামনে যে বটগাছটা ছিল,তারই মগডালে।সে আমলে দারোগা মানে সাক্ষাৎ যমদূত বলেই বিবেচনা করতো গ্রামগঞ্জের লোকেরা। তাই পুলিশ আসার সংবাদে ভরা হাটবারে রাস্তাঘট একেবারে ফাকা হয়ে গীয়েছিল।মাখনবাবু ঘোড়া বাধলেন সেই বটগাছটির নীচে যেটির মগডালে শ্রীমান শ্রীমন্ত লুকিয়ে ছিল।ঘোড়া রেখে সঙ্গী দুই কনস্টেবলসহ এগিয়ে গেলেন শ্রীমন্তের বাড়ির দিকে।বাড়িতে শ্রীমন্তের বিধবা মা, দাদা,বৌদি আর ছোটবোন ছিল।পুলিশ দেখে শ্রীমন্তের মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন আর দাদা প্রশান্ত ভয়ে ধূতিই ভিজিয়ে ফেলল।মাখনবাবু রাশভারী মানুষ।তারউপর ব্রিটিশের ট্রেনিং পাওয়া দারোগা।কিছুক্ষণ পুলিশী মেজাজে ধমকাধমকি করলেন বাড়ির লোকজনকে।আরেকবার শ্রীমন্তের নামে কিছু শুনলে ভিটেতে ঘুগু চড়িয়ে দেবেন বলে শাসিয়ে দিলেন।এরপর ফিরেচললেন থানার দিকে।কিন্তু বটগাছের নীচে এসে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো তার।দেখলেন তার ঘোড়াটি নেই।আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করলেন অনেক।কিন্তু পেলেননা কোথাও।চিন্তিত মনে একটা গরুর গাড়ী ভাড়া করে ফিরে চললেন থানায়।সরকারী ঘোড়া,খুঁজে না পেলে চাকরি বাচানোই কঠিন হয়ে পড়বে।থানায় ফিরে আরেকদফা ভিড়মি খেলেন তিনি।দেখলেন ঘোড়াটি বাধা আছে থানার সামনেই।আর তাকে ভাতের মণ্ড খাওয়াচ্ছে থানার এক সেপাই।তাকে দেখেই লম্বা সালাম ঠুকলো সেপাইটি।

—বনবাহার(ঘোড়ার নাম)কে পেলে কোথায়?
—- কেন স্যার , আপনিইতো পাঠালেন একটা ছেলেকে দিয়ে।ছেলেটা বললো আপনার নাকি শ্বশুড়বাড়ীতে দাওয়াত আছে।তাই ওকে আগেভাগে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
—- নাম বলেছে ছেলেটা ?
—- জ্বি স্যার বলেছে।শ্রীমন্ত।

চোখ দুটো বিস্ময়ে কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইলো তার।স্থান,কাল,পাত্র ভুলে হো হো করে হেসে উঠলেন দারোগা মাখনবাবু।ছেলেটির বুদ্ধির তারিফ না করে পারলেননা তিনি।

অনেক বছর কেটে গেছে।সেদিনের কিশোর শ্রীমন্ত এখন প্রৌড়।সময়টা ৭১ এর মে মাসের মাঝামাঝি।একদিন চন্দনাইশ থেকে শ্রীমন্তকে পাকড়াও করলেন মুক্তিবাহিনীর একটি গ্রুপ।নিয়ে গেলেন ক্যাপটেন করিমের কাছে।চোর শুনে বেজায় রেগে গেলেন করিম।হুকুম দিলেন গুলি করে মারার।স্বাধীন দেশে তারা চোর ডাকাত আর রাখবেন না।
করিম সাহেবের পায়ে গিয়ে পড়লো শ্রীমন্ত।বললো,

— সাব, এই বুড়া মানুষটাকে একবার সূযোগ দেন।আমি আইজ থেইকা আপ্নাগো লগে থাকুম।দেহেননা কি করবার পারি।

করিম সাহেবের মনে দয়া হলো।দিলেন তিনি একটা সূযোগ।শ্রীমন্তও তার কথা রেখেছিল।যুদ্ধের বাদবাকি দিনগুলোতে খানসেনা আর রাজাকারদের ক্যাম্প থেকে ১৭ টা রাইফেল চুরি করে নিয়ে আসে সে।গেরিলাদের জন্য রাজাকারদের বাড়ি থেকে হাস,মুরগী,গরুর দুধ,গাছের ফল,এমনকি পুকুরের মাছ পর্যন্ত চুরি করে আনতো।রান্নাও করতো নিজে।সকলের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছিল সে।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বিএলএফ এর নেতাদের ক্ষমতাওলিপ্সার বলি হয়ে শহীদ হন ক্যাপ্টেন করিম।তার পরদিনই গ্রুপ ত্যাগ করে নিজ বাড়িতে ফিরে যায় শ্রীমন্ত। যাওয়ার সময়ে কমাণ্ডার সোলায়পমানকে বলে যায় “যার জন্য ভালা অইছিলাম,হে যখন নাই ,আমি আর থাইকা কি করুম”

স্বাধীনতার কয়েকবছর পরে যক্ষায় ভুগে মারা যায় শ্রীমন্ত। আর ৯০ এর এরশাদচক্রের সাজানো দাঙ্গায় প্রাণভয়ে এক কাপড়ে দেশত্যাগী হয় শ্রীমন্তের ছেলে অনন্ত ও পরিবারের অন্যরা।ইতিহাসে শ্রীমন্তদের নাম হয়তো লেখা রবেনা।কিন্তু এদেশের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে থাকবে তাদের আত্মত্যাগের কাহিনী।

২ thoughts on “শ্রীমন্তদের কেউ মনে রাখেনা

    1. এটি পুরোপুরি গল্প নয় দুলাল
      এটি পুরোপুরি গল্প নয় দুলাল ভাই। শ্রীমন্ত নামের এক মাঝবয়েসী লোক সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সহায়তা করেছিলেন।তার গ্রামের বাড়ি ছিল পটিয়ার হাইদগাও।আর পেশা ছিল চুরি।এই তথ্যের উপর ভিত্তি করেই গল্পটি লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *