“সাজো রেসকোর্স, এবার নতুন কথা শোনো”, একটি নতুন সকালের গল্প

১০ জানুয়ারি ‘৭২
একটি নতুন সকাল কিংবা একটি গল্প

অথচ ৪৪ বছর পর আমরা এদিনটি পালন করছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভার ফলে সৃষ্ট জ্যামে ভোগান্তিতে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত পোস্টার রাস্তায় পড়ে থেকে পদপৃষ্ট হয়ে আর এখানে ওখানে শাদা খাবারের মোড়ক দিয়ে নগরী নোংরা করার প্রতিযোগিতা। সে যাই হোক, আমরা ইতিহাস স্মরণ করি ইতিহাস অবমাননা করে, ইতিহাসকে হাত ধরে ডেকে এনে, চা নাশতা খাইয়ে অপমান করে। আমাদের মত ইতিহাস অবমানকারী জাতি আর কেউ আছে বলে মনে হয় না। বসনিয়ান যুদ্ধেও এত হয়নি।


১০ জানুয়ারি ‘৭২
একটি নতুন সকাল কিংবা একটি গল্প

অথচ ৪৪ বছর পর আমরা এদিনটি পালন করছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভার ফলে সৃষ্ট জ্যামে ভোগান্তিতে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত পোস্টার রাস্তায় পড়ে থেকে পদপৃষ্ট হয়ে আর এখানে ওখানে শাদা খাবারের মোড়ক দিয়ে নগরী নোংরা করার প্রতিযোগিতা। সে যাই হোক, আমরা ইতিহাস স্মরণ করি ইতিহাস অবমাননা করে, ইতিহাসকে হাত ধরে ডেকে এনে, চা নাশতা খাইয়ে অপমান করে। আমাদের মত ইতিহাস অবমানকারী জাতি আর কেউ আছে বলে মনে হয় না। বসনিয়ান যুদ্ধেও এত হয়নি।

আমি ইতিহাস পড়তে পছন্দ করি। তবে “আমরা” না। আমাদের দেশে আমরা ‘দলপন্থি’ ইতিহাস পড়ি। যারা বিএনপি সাপোর্ট করে, তারা কখনো মুনতাসীর মামুন কিংবা আনিসুজ্জামানের ইতিহাসের গল্প মানবেনা। আওমী’রা মানবেনা তাদের বিপরীতের একটি শব্দও। জামাতের কথা না ই বললাম। তারা নিজেরাই ইতিহাস এবং ইতিহাসের প্রুভমেন্ট।

বিবাদে না গিয়ে আমরা ১০/ ১১ জানুয়ারি ‘৭২ এর তৎকালীন কিছু পত্রিকার শিরোনাম দেখি। অনুভব করি দিনটিকে:

১. ১০ জানুয়ারি ‘৭২ এ দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল:
‘ওই মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে।’
ইত্তেফাক রিপোর্ট’ হিসেবে সেখানে ছাপা হয়: ‘আজ বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভদিন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অন্তরের অন্তহীন আস্থা ও ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বর্ণসিঁড়িতে হাঁটিয়া হাঁটিয়া স্বাধীন বাংলা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদীর্ঘ নয় মাস পরে আবার জননী বাংলার কোলে ফিরিয়া আসিতেছেন। পাক সামরিক জল্লাদের কারাগার তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারে নাই।’
শিরোনামটি নেয়া হয়েছিল রবী ঠাকুরের গান থেকে।

২. ১০ জানুয়ারি আজাদ পত্রিকার শিরোনাম ছিল:
‘জাতির উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে আজ পূর্বাহ্ন সাড়ে এগারোটায় মুজিবের ঢাকা আগমন’। দুই কলামের অপর প্রতিবেদন: ‘রাজধানীতে আনন্দ-উল্লাস, ঢাকায় বিপুল সংবর্ধনা দানের আয়োজন’। এক কলামের খবর: ‘হিথ-মুজিব ঘরোয়া বৈঠক’। দুই কলামের খবর: ‘বঙ্গবন্ধু আজ দিল্লি আসছেন’।

৩. দৈনিক পূর্বদেশ সেদিন লাল কালিতে শিরোনাম করেছিল:
‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’।
বঙ্গবন্ধুর বড় একটি রঙিন ছবির পাশে ছিল সম্পাদকীয়: ‘মাগো, তোর মুজিব এলো ফিরে’ শিরোনামে। ছয় কলাম শিরোনামে প্রতিবেদন: ‘জাতির পিতা আজ তাঁর নিজের লোকের কাছে ফিরছেন’। দুই কলামে আরেকটি সংবাদ শিরোনাম:

‘সাজো রেসকোর্স, এবার নতুন কথা শোনো’।

৪. ১১ জানুয়ারি ইত্তেফাকে একটি শিরোনাম: ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া। সহজ ও কাব্যময় ভাষায় পাঠকের আবেগ ছুঁয়েছিল প্রতিবেদনটি।

‘ইত্তেফাক রিপোর্ট’ হিসেবে লেখে: ‘নির্মেঘ নীলাকাশে সাদা কবুতর যে হঠাৎ দেখা দিল। সকলের হৃদয়ের গভীরে সমস্বরে একটি ধ্বনি উঠিল, ওই মহামানব আসিতেছে। বিমানবন্দরে সাড়া পড়িয়া গেল। বিমানের সিঁড়ির দশ গজ দূরে ছোট মঞ্চ। সেখান হইতে হাত বিশেক দূরে দেশ-বিদেশের সংবাদ সংস্থার অসংখ্য মুভি ক্যামেরা।’

৫. ১১ জানুয়ারি পূর্বদেশ পত্রিকায় লেখা হয়, “এখন বাতাস উঠুক, তুফান উঠুক, ফিরবো নাকো আর, যাত্রা হলো শুরু, ওগো কর্ণধার”, রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙতি দিয়ে সাজানো প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সেদিনের উত্তাল জনসমুদ্রের কথা। পাশেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে : মুজিব’। তিন কলামজুড়ে ছিল, ‘বাংলার প্রাণ ফিরেছে বাংলায়’। দুই কলামের খবর, ‘ভুট্টো সাহেব সুখে থাকুন, আর আপনাদের সঙ্গে নয়’। এক কলাম,

‘হোম সুইট হোম’।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তান সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ০৮ জানুয়ারি সকাল ৭ টার একটু পরই বিমানটি লন্ডনে অবতরণ করে। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেন ‘গুড মর্নিং মি. প্রেসিডেন্ট।’

বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালী হোটেল ঘিরে ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে। দুপুরের দিকে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য আমি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি, আমি জানতাম ওরা আমাকে হত্যা করবে আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব না, কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে।’

বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ্যাডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজীরবিহীন সম্মান দেখান। ইতিহাস সাক্ষী ঐদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তাঁর কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না এলেন।

ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত ১১ জানুয়ারি ‘৭২ এর একটি প্রতিবেদনের সংক্ষেপ দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। এ লেখাটি পড়লে আমার মনে হয় যে কারো চোখে পানি চলে আসবে।

ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২

“গতকাল (১০ জানুয়ারি) ঢাকা রমনা রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালীর সামনে শেখ মুজিবুর রহমান কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং চিরদিন স্বাধীন থাকবে।’

… তিনি বিমানবন্দর থেকে সোজা রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় পৌছান।

অত্যন্ত ক্লান্ত শেখ মুজিব তাঁর ৪০ মিনিটের বক্তৃতার মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর কোন জাতিকেই স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি।

তিনি বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতরকার সমস্ত সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সমস্ত দেশই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে এবং বাংলাদেশ অবশ্যই জাতিসংঘের সদস্য পদ পাবে।

শেখ মুজিব বলেন, বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হবে_ সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাকিস্তানের মুসলিম রাষ্ট্র সমস্ত আদর্শ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করলো।

চোখে রুমাল চেপে ধরে শেখ মুজিব পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা আমার লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছ, আমার মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছ এবং এক কোটি লোককে গৃহত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলে, তবুও তোমাদের প্রতি আমার কোন আক্রোশ নেই, তোমরা স্বাধীন থাক, আমিও স্বাধীন থাকি।

তিনি বলেন, বাঙালীরা যারা দালালী, বেঈমানী করেছে এমনকি যারা তার প্রহসনমূলক বিচারে সরকারী পক্ষ নিয়েছিল তাদের সবার বিচার হবে। তবে আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নেবেন না।

… ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে শেখ মুজিব গভীরভাবে ধন্যবাদ জানান।

মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে আবেগ আপ্লুত শেখ মুজিব জানান, আমি আমার মনকে স্থির করে ফেলেছিলাম, আর কখনই আমার সোনার বাংলায় ফিরে যাওয়া হবে না। তারা আমার কবরও খুঁড়েছিল। আজ আমি এখানে, এটা কেবলমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই সম্ভব হয়েছে।

তাঁর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন তাঁকে সংবর্ধনা জানান, ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনার, সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য কূটনীতিক প্রতিনিধিরা সংবর্ধনা জানান।

জনতার ভিড়ে বেগম মুজিব ও তাঁর দুই ছেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। কিন্তু শেখ মুজিব সোজাসুজি একটি খোলা পুলিশ লরিতে রমনা রেসকোর্সে যান।

বিশাল জনসভা শেষে ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে একটি গৃহে ঘটে বর্ণনাতীত এক আবেগপ্রবণ পুনর্মিলন। বন্ধুদের শুভেচ্ছা সূচক ফুলের পাপড়িতে শোভিত শেখ মুজিব তাঁর দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। ঘটনা এর চেয়েও এগিয়ে যায় যখন শেখ মুজিব তাঁর ৯০ বছরের পিতার পা স্পর্শ করে ৮০ বছরের মাকে বুকে জড়িয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।”

(ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২)

তথ্যসূত্র:
১. অনলাইন নিউজ
২. ব্লগ
৩. উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *