কোথায় যাচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা?

মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে ভুল ।। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শংঙ্কা
সুকুমার রায়ের ‘আনন্দে’ হ–য–ব–র–ল


মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে ভুল ।। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শংঙ্কা
সুকুমার রায়ের ‘আনন্দে’ হ–য–ব–র–ল

বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও দেশব্যাপী প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চার কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২টি নতুন বই। বরাবরের ন্যায় শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌছলেও নির্ভুল বই দিতে পারেনি সরকার। এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রতিবছরের ন্যায় এবারো শিশুদের পাঠ্যবইতে রয়ে গেছে বড় ধরনের ভুল। শিক্ষার প্রধান মাধ্যম পাঠ্য বইয়ে ভুল থাকার কারনে শিশুরা পাচ্ছে ভুল শিক্ষা। আর শিশুদের এই ভুল শিক্ষার কারণে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শংঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই।
পাঠ্যবইয়ে তথ্য বিভ্রাট দেখলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘বিভ্রম’ তৈরি হয়। আর ছোট হোক বড় হোক কোন প্রকার ভুলই গ্রহণযোগ্য নয়। পাঠ্যবইয়ে ভুলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রকাশ করা হয়েছে এবছরের সপ্তম শ্রেণির বাংলা বইটি। ‘সপ্তবর্ণা’ নামের বাংলা বইটির ৬৯নং পৃষ্ঠায় স্থান পেয়েছে সুকুমার রায়ের ‘আনন্দ’ নামের ছড়াটি। কিন্তু এই ছড়া সুকুমার রায় যেভাবে লিখেছেন ঠিক সেভাবে উপস্থাপন না করে ভয়াবহরকম এলোমেলো উপস্থাপন করা হয়েছে। সুকুমার রায়ের ‘সুকুমার সাহিত্য সমগ্র’র প্রথম খন্ডের ১১৫ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশ হয়েছিলো ‘আনন্দ’ ছড়াটি।

সুকুমার রায়ের ছড়াটির ছবি

বাংলাদেশ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা (এনসিটিবি) কর্তৃক এলোমেলোভাবে প্রকাশিত কবিতাটির ছবি।

বইটির সংকলন, রচনা ও সম্পাদনায় ছিলেন অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক, অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী, অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ, অধ্যাপক ড. রফিকউল্লাহ খান, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক, অধ্যাপক শ্যামলী আকবর, অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর, ড. সরকার আবদুল মানড়বান, ড. শোয়াইব জিবরান, শামীম জাহান আহসান।

সরকারী বা এনসিটিবি প্রকাশিত পাঠ্যবইয়ের নিম্নমান বা ভুল নিয়ে অনেকেই দেশের শিাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। এ বিষয়ে রাজধানির কাফরুলে অবস্থিত সরকারি ভাষাণটেক কলেজের সহকারি অধ্যাপক আবদুল­াহ আল মোহন এক ফেসবুক বার্তায় বলেন, এ বিষয়ে আমি ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবাদ স্বরুপ লিখে আসছি। গ্রন্থ-আকারে সেগুলো প্রকাশও হয়েছে। ইউজিসি পুরস্কারও দিয়েছে আমাদের একটি যৌথ-গবেষণাকর্মকে। এসব কাজের জন্য একবার আমাকে পাঠ্যবই সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটিতে রাখা হয়েছিল, ২০০০ সালের দিকে। সেই তখন থেকেই বুঝেছি পাঠ্যবইয়ের মানের উন্নয়ন বা ভুলের নিরসন ঘটবে না। কারণ এই বই যাঁরা নির্মাণ করেন, সম্পাদনা করেন, পরিমার্জনা করেন বা মাঠ-পরীক্ষা করেন, এবং যে-প্রক্রিয়ায় তাঁরা কাজগুলো করেন, খোলাখুলিভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা জানেন এগুলো সব ছোটলোকের বাচ্চাদের জন্য হচ্ছে, তাঁদের বাচ্চাদের জন্য নয়। কাগজে-কলমে বাধ্য করা হলেও, বা সত্যিই যদি এগুলো তাদের ছেলেমেয়েদের ঘাড়ে চাপানো হয় তবু তাঁরা জানেন, এসব তাঁরা পাশে ফেলে রাখতে সক্ষম। তাঁদের সন্তানদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ধরণের শিক্ষা, ভিন্ন ধরণের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই। বিশ বছর আগের চিত্র আর বর্তমান চিত্রের মধ্যে গুণগত পার্থক্য নেই। আগে অধিকাংশ বই একরঙা ছিল, এখন চার রঙা হয়েছে — এটুকুই।
তিনি আরো বলেন, পাঠ্যপুস্তক উৎসব তো সফল হয়ে গেছে! এখন কি আর সপ্তম শ্রেণীর সকল বাংলা বই প্রত্যাহার করে নতুন বই প্রণয়ন করা যাবে? কর্তৃপক্ষের কানে গেলে কিছু একটা হয়তো করবে। অথবা অন্য সকল কিছুর মতো কানে তুলো দিয়ে থাকবে! ছোটলোকের বাচ্চাদের নিয়ে অতো ভাবলে দেশের উন্নয়ন হবে কেমন করে? তাছাড়া ওদের পাশের সব ব্যবস্থা তো সরকার করেই দিয়েছে! শতকরা ৯৯%’র জন্য ৯৯%পাশ, মানে ১%-এর শাসন নিরাপদ রাখতে ৯৯%-এর সর্বনাশ!

শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী সৌরদীপ দাশগুপ্ত মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের ভুল কে কেন্দ্র করে ‘কোন পথে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা?’ শিরোনামে অনলাইনে তিনি একটি নোট প্রকাশ করেন। তিনি নোটটিতে বলেন, ছোটভাইয়ের ‘সপ্তবর্ণা’ (বাংলা বই) হাতে নিয়ে শুরুতেই কবিতাগুলো পড়তে বসলাম। সূচিপত্রে সুকুমার রায়ের আনন্দ ছড়াটি চোখে পড়লো। পড়তে গিয়ে শুরুতেই হোঁচট খেলাম। পুরো লেখাই উল্টাপাল্টা! লাইনগুলোর বিন্যাস সব এলোমেলো, যার জন্য কবিতার কথাগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেছে! হতচকিত হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বাবা’র কাছে বইটা নিয়ে গেলাম। রীতিমতো আশ্চর্য লাগলো যে সরকারি বই-এ যদি এরকম ভুল থাকে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শিখবে কোথা থেকে? আর লাইনগুলোই বা কেনো এমন এলোমেলোভাবে সাজানো? ২০১৬ সালে প্রকাশের পাশাপাশি ক’দিন আগে পুরোনো কাগজের দোকান থেকে একটা ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘সপ্তবর্ণা’ বই মা নিয়ে এসেছিলো। ওটা খুলেও দেখি হুবহু এক-ই সমস্যা! তার মানে কম করে হলেও এই দু’টো বছর শিশুদের সম্পূর্ণ ভুলভাবে একটা কবিতা শিখানো হয়ে এসেছে। সবথেকে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই বইগুলো মুদ্রণের পরবর্তীতে এতো ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিদের হাতে ঘুরে ঘুরে নিরীক্ষিত হওয়ার পরও কীভাবে এমন ভুল চোখ এড়িয়ে যায়? মূল কবিতা/ছড়া একজনের মুখস্ত না-ও থাকতে পারে, কিন্তু অন্ত্যমিলের ব্যপারখানা দেশের এতো শিক্ষকের চোখ কেমনে এড়িয়ে যায়? আমাদের দেশে তো শিশুদের আগ্রহ নিয়ে পড়ার জায়গায় পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ানো হয়, তা-ও আমি মনে করি কিছু শিশু তো নিশ্চই এর মধ্যেও আগ্রহভরে নতুন বই থেকে কিছু পড়তে চায়। তার মধ্যেও যদি এমন ভুল থাকে, তাহলে তারা শিখবেই বা কোথা থেকে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *