ভাগ্য

গ্রাম থেকে পুব দিক বরাবর, যেখানে একটা লম্বা তালগাছ কিছুটা হেলে থাকে একটু খাটো তালগাছের দিকে, ঠিক সেদিক বরাবর সোয়া মেইল হেটে গেলে আর একটা গ্রাম পরবে। বর্ষাকালে নৌকা চললেও শুকনার সময় হাঁটা পথ শামুকের কারণে মাঝে মাঝে বিপজ্জনক। কিছু কিছু জায়গা ডোবা মতন আছে কচুরিপানা জমা করে হাঁটার উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঐ যে গ্রামটা, সেখানে দিনের বেলা কোন পুরুষের দেখা পাওয়া যায় কদাচিৎ। ছোট ছোট আধা ল্যাংটা, কখনো পুরো ল্যাংটা, বাচ্চাকাচ্চা সকাল থেকে আমআটির ভেঁপুর সুরে কান্না আরম্ভ করে। ওদের বসনে, কান্নায় শুধুই দারিদ্রতা প্রকাশ পায়। মন নরম হয়ে গেলে যদি কাছে গিয়ে আদর করে নাম শুধাতে যান, কিছুক্ষন পর আবিষ্কার করবেন আপনার পকেটের কলম, মোবাইল বা টাকা হাওয়া হয়ে গেছে।

ঐ গ্রামের কুমারী, সধবা বা বিধবা মেয়েদের অবস্থাও একই রকম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তাঁরা তারস্বরে চিৎকার করে। মাঝে মাঝে অপোজিসনে কাউকে দেখা যায়, মাঝে মাঝে কাউকে দেখা যায় না। সব চাইতে বয়স্ক বিধবা যে বুড়িটি ভাঙা ঘরের দাওয়ায় হাটুর উপর কাপড় তুলে ছানিপরা চোখে কাল্পনিকে সুখের অতীত আওড়ায় তাঁর কাছ থেকে শুনেছিলাম ঐ গ্রামের পুরুষরা হয় স্বল্পায়ু। নাবালগ অবস্থা থেকে চুরি বাদ দিয়ে অন্য কোনো পেশার কথা তাঁরা জানে না। সাবালক হবার পরে তাঁরা অন্য কোনো পেশার প্রতি উৎসাহী হলেও সুযোগ পায় না। পরম্পরা রক্ষা করাকে তাঁরা অনেকটা ধর্মের মত মানে- চুরি করলে বাঁচা যাবে না করলে মরতে হবে। চুরি করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারানো, কিংবা পাবলিকের পিটুনিতে অক্কা পাওয়া, কিংবা গুরুতর জখম হয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুকতে ধুকতে পারা যাওয়া, কিংবা জেলহাজতে ঢোকা বের হবার কারণে জীবনীশক্তি নিঃশেষ হওয়া ইত্যাদি অনেকটা অনিবার্য যা তাঁদেরকে রসহীন, বর্ণহীন, খাবার-কাপড়হীন পৃথিবী থেকে সহজে বিদায় নিতে সাহাজ্য করে।

আজকে চোরের গ্রামের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন। বুড়ির কাছ থেকে জানলাম আজ রাতে গ্রামের কোন চোর চুরি করতে বের হয়নি। সব চাইতে তুখোড় এবং সব চাইতে বেশী জেলখাটা চোর যে, তাঁর একচিলতে উঠোনে আজ রাতে চোরদের সভা বসেছে। সভায় তাঁরা নিজেদের এহেন ভাগ্যের জন্য ভাগ্য ছাড়া আর কাউকে দোষী হিসেবে খুঁজে পেলো না। ভাগ্য পরিবর্তনের কোন পথ এতো আলোচনার পরেও না পেয়ে তাকে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখলো না। শেষ পর্যন্ত সবই উপরওয়ালার ইচ্ছা বলে সভা শেষ হল। ভাগ্য লিপিকার তখন ওদের পরের দিনের ভাগ্য লেখা শেষ করে পুব দিকে আলো ফোটাচ্ছিল।

১ thought on “ভাগ্য

  1. ভাগ্য নির্ভর করে কর্মের উপরে,
    ভাগ্য নির্ভর করে কর্মের উপরে, কর্ম নির্ভর করে শিক্ষার উপরে। দুর্ভাগ্য নির্ভর ৩য় ব্যাক্তির উপরে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *