সমুদ্র অর্থনীতি ও আগামীর বাংলাদেশ

(লেখাটির প্রকৃত লেখক ‘চৌধুরী এম. আরমান হোসাইন’। লেখকের অনুমতিক্রমে লেখাটি ব্লগে প্রকাশের প্রয়াস।)


(লেখাটির প্রকৃত লেখক ‘চৌধুরী এম. আরমান হোসাইন’। লেখকের অনুমতিক্রমে লেখাটি ব্লগে প্রকাশের প্রয়াস।)

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বলতে গেলে আমাদের জন্য এক বিশাল সম্পদ। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মায়ানমারও ভারতের অসীমাংসিত সীমানা এতদিন ছিল বড় এক বাধা; যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতের রায়ে উক্ত দুই দেশের সাথে সমুদ্রসীমা নিরঙ্কুশভাবে চিহ্নিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহী সোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ তথা খনিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম প্রতিষ্ঠার অধিকার পায়।
বাংলাদেশের স্থলভাগের সমপরিমাণ এই বিশাল সমুদ্রসীমা আমাদের জন্য যে বিশাল সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমির হাতছানি দিচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমুদ্রে যেমন আছে প্রাণিজ সম্পদ তেমনি আছে বিশাল খনিজ সম্পদ। সমুদ্রের ভূ-অভ্যন্তরে রয়েছে অনেক খনিজ সম্পদ। সমুদ্রের জল থেকে তৈরি হয় লবণ। আবার সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজে উৎপাদন করা যায় জলবিদ্যুৎ। এতে খরচ যেমন কম লাগে; ঠিক তেমনি পরিবেশগত দূষণ ও রোধ করে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পিছনে সমুদ্র সম্পদ যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তা সেসব দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস ও ধারা বিশ্লেষণ করলে খুব সহজে প্রতীয়মান হয়। যে দেশ তার সমুদ্রকে যতো বেশি সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে ও করছে সে দেশ তার অর্থনীতিকে ততো বেশি এগিয়ে নিতে পেরেছে। ইউরোপ আমেরিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির পিছনে সমুদ্র সম্পদ এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পিছনে পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি তাদের সমুদ্র বন্দরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশে বিদ্যমান অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মতো সমুদ্রও এক বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের জন্য এক বিশাল ও অফুরন্ত সম্পদ হিসাবে একে জাহির করলে একটুও বাড়াবাড়ি হয় না। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি সমুদ্র নির্ভর। দেশে ৬০ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য সমুদ্র পথে হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে সমুদ্র পথে। বঙ্গোপসাগরে বিদ্যমান নানা প্রজাতির মৎস্য ও অন্যান্য জৈব সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। সমুদ্রগামী জাহাজে জনশক্তি হিসাবে কাজ করে অনেক বাংলাদেশি। এতে করে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা।
তাই বলা চলে সমুদ্র আমাদের জন্য এক অজানা চরম সম্ভাবনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। সঠিক নেতৃত্ব পেলে সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে একটা উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। সমুদ্র বিজ্ঞানের উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ক বিভাগ চালু করে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া আমাদের সমুদ্র সম্পদকে দেখাশুনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শক্তিশালী নৌ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। তাহলে-ই বাংলাদেশ একদিন সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বুকে উন্নত দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

– চৌধুরী আরমান হোসাইন, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *