স্ত্রীর প্রতিরুপ

“তোমারে কতবার না বলছি যে,বাসায় বাটা মাছ আনবা না,তারপরও তুমি একই ভুল করছো”;আম্মা বাটা মাছ পছন্দ করে না,বাটা মাছের মাথা নাকি দেখতে ডোঁরা সাপের মাথার মত,তাই বাটা মাছ আনার কারনে আম্মা আব্বাকে ধমকাচ্ছে। আব্বা অপরাধীর মত আস্তে আস্তে বলতেছে,” কী করবো বলো,বাজারে আর কোন মাছই নাই,তাই এটা নিয়া আসছি,তুমি মাছ না খাইলে একটা ডিম ভেজে নাও”। আমি আমার বাবাকে এমন অবনত মস্তকে খুব কমই দেখেছি,বিশেষ করে আমার মায়ের সামনে বাবার নরম হয়ে কথা বলা এটাতো কল্পনাই করা যায় না। কারন,আমার বাবা খুবই রাগী মানুষ। মায়ের সামনে বাবার এরকম পরাজিত মুখ দেখে আমার কেন যেন ভালোই লাগছিলো,অথচ বাবা খুব বিশাল কোন অন্যায় করেনি,বাজারে মাছ ছিল না বলে বাটা মাছ এনেছে। কিন্তু বাবার প্রতি আমার খুব ছোট ছোট কিছু ক্ষোভ ছিল অনেক আগে থেকেই,ক্ষোভগুলো এখোনো আছে কিনা বুঝতে পারছি না কিন্তু



১।

“তোমারে কতবার না বলছি যে,বাসায় বাটা মাছ আনবা না,তারপরও তুমি একই ভুল করছো”;আম্মা বাটা মাছ পছন্দ করে না,বাটা মাছের মাথা নাকি দেখতে ডোঁরা সাপের মাথার মত,তাই বাটা মাছ আনার কারনে আম্মা আব্বাকে ধমকাচ্ছে। আব্বা অপরাধীর মত আস্তে আস্তে বলতেছে,” কী করবো বলো,বাজারে আর কোন মাছই নাই,তাই এটা নিয়া আসছি,তুমি মাছ না খাইলে একটা ডিম ভেজে নাও”। আমি আমার বাবাকে এমন অবনত মস্তকে খুব কমই দেখেছি,বিশেষ করে আমার মায়ের সামনে বাবার নরম হয়ে কথা বলা এটাতো কল্পনাই করা যায় না। কারন,আমার বাবা খুবই রাগী মানুষ। মায়ের সামনে বাবার এরকম পরাজিত মুখ দেখে আমার কেন যেন ভালোই লাগছিলো,অথচ বাবা খুব বিশাল কোন অন্যায় করেনি,বাজারে মাছ ছিল না বলে বাটা মাছ এনেছে। কিন্তু বাবার প্রতি আমার খুব ছোট ছোট কিছু ক্ষোভ ছিল অনেক আগে থেকেই,ক্ষোভগুলো এখোনো আছে কিনা বুঝতে পারছি না কিন্তু মায়ের সামনে বাবার পরাজিত হওয়া দেখলে আমার ভালো লাগে। তার মানে যে আমি আমার বাবাকে ভালোবাসি না তা কিন্তু না। বাবার প্রতি আমার ছোট ছোট কিছু ক্ষোভের কারন হলো সংসারের সবজায়গায় সবসময় তার প্রভুত্ব কায়েম করা। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মা বাবার সামনে ভেজা বেড়ালের মত থাকে। একবার কোন এক কারনে বাবা মা’কে থাপ্পড় মারে, আমি স্কুল থেকে হঠাৎ এসে পরায় ঘটনা দেখে ফেলি। কিন্তু মা-বাবা কাউকে বুঝতে দেইনা যে আমি তাদের ঝগড়া দেখেছি। মা’ ও আমাকে দেখে স্বাভাবিক আচরন করে এবং আমাকে নিয়ে সেখান থেকেই সাথে সাথে মামার বাড়ি চলে যায়। মা আমাকে বোঝাতে চায় যে মামার বাড়ি বেড়াতে যাবে,অথচ কিছুদিন পরই আমার ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা। এ সময় মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার কোন মানেই হয় না। মা আমাকে নিয়ে দুইদিন মামার বাড়ি থাকার পর আবার চলে আসে। বাসায় এসে দেখে সবকিছু অগোছালো। মা সবকিছু ঠিকঠাক করতে থাকে আর বাবাকে বকতে থাকে,”সংসারটা যেন একা আমার,আমি দুইদিন না থাকলেই সব কিছু অগোছালো হয়ে যায়”। মায়ের ভাব দেখে মনে হয় সবকিছুই স্বাভাবিক,দুইদিন আগে কিছুই হয়নি। মায়ের বকাবকিতে বাবা কিছুই বলে না,চুপচাপ পত্রিকা পড়তে থাকে। বাবার চেহারায় কিছুটা অনুতপ্ত ভাব দেখা যায়,সেটা দেখেই আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় মা জিতে গেছে।  ঠিক তখন থেকেই মনে হয়,আমি আমার বাবাকে মা’র কাছে হারতে দেখলে আনন্দ পাই। অথচ এসব ছোট-খাট ঝগড়া একান্তই তাদের। কিন্তু সংসারে বাবার প্রভুত্ব ফলানোটা কেন যেন আমার মনে দাগ কাটে।
  ২।
আমি আমার স্ত্রী সহ শহরেই থাকছি। চাকরির কারনে শহরেই থাকতে হয়। আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। অন্যসব বাবাদের মত আমিও ব্যাপারটা নিয়ে খুব উত্তেজিত। আমার মা ব্যাপারটা জানার পর বলে,” বউ প্রথম মা হতে যাচ্ছে,ও তো অনেক কিছুই বোঝে না,আমি কালকেই আসতেছি তোর বাসায়।” পরের দিনই মা গ্রামের বাড়ি থেকে সরাসরি আমার বাসায় এসে উঠে। প্রথম সন্তান ছেলে না মেয়ে এটা জানার জন্য আমার মনটা আকুপাকু করতে থাকলো। আমি একবার ওকে বললাম,চলো আল্ট্রাসনোগ্রাফী  করে দেখি আমাদের ছেলে হবে না মেয়ে হবে। ও রাজি হলো না। ও বললো প্রথম সন্তান হবে সারপ্রাইজ। আগে থেকে জানার কোন মজাই নাই। আমি আর ওকে জোড়াজুড়ি করি না। সারপ্রাইজই থাক,সেটাই ভালো। তবে আমি খুব খুশি হব যদি প্রথমেই একটি মেয়ের বাবা হই। আমার সুপ্ত ইচ্ছা আমি আমার স্ত্রীকে জানাইনি,কারন এতে যদি তার মন খারাপ হয় এই ভেবে যে, যদি প্রথম সন্তান ছেলে হয় তাহলে আমি খুশি হব না। আমার স্ত্রীর শরীর ক্রমেই স্বাভাবিকতা হারাতে থাকে। মাঝে মাঝে আমি আমার স্ত্রীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবতে থাকি, কী অদ্ভুদ ব্যাপার! একটা শরীর তার মধ্য আরেকটা শরীর নিয়ে ঘুরছে। আমার স্ত্রী এখন শুধু আমার স্ত্রীই না,সে একটি সন্তানের মা। মা,ব্যাপারটা মাথায় আসতেই আমার স্ত্রীর প্রতি আমার ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে যায়। আমার মনটাকে হঠাৎ একটা অপরাধবোধ ছুঁয়ে যায়। আমি আসলেই অপরাধী কিনা বুঝতে পারি না।আমি আমার বাবার মত হতে চাই না। অথচ আমার কাছে মনে হয় আমি আমার বাবার ব্যাতিক্রমও না। আমি কী আমার অজান্তেই আমার স্বামীত্বের প্রভাব সংসারে খাটাচ্ছি?আমার স্ত্রীর উপর খাটাচ্ছি? আমি বুঝতে পারি না,আমি কনফিউজড হয়ে যাই।আমি আমার স্ত্রীর ফেসবুক পাসওয়ার্ড জানি অথচ ও আমারটা জানেনা। তাই বলে যে আমি ওকে সন্দেহ করছি ব্যাপারটা সেরকমও না। মাঝ রাতে পিপাসায় ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি নিজে না উঠে আমার স্ত্রীর ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলি পানি দিতে।  আমার খয়েরি রং পছন্দ না,তাই ওকে আমি খয়েরি রংয়ের শাড়ি বা সালোয়ার পরতে মানা করি ও সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়,আমাকে বোঝাতে চায় তার নিজেরও খয়েরি রং পছন্দ না, অথচ শপিংএ গেলে ও নিজের অজান্তেই খয়েরি রংয়ের পোষাকের সামনে গিয়ে দাড়ায় আবার যখন আমার কথা মনে পরে তখন বলে,” এটা ভালো লাগছে না,চলো আরেকটা দেখি”। এরকম আরও অনেক ছোট-খাট বিষয়। ওকে দেখে মনে হয় ও ব্যাপারগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়, হয়ত আমাকে খুশি করার জন্যই মেনে নেয়। কিন্তু আমি ওর খুশির জন্য কী কী মেনে নিয়েছি? কিছুই না। এসব কী তার উপর আমার স্বামীত্বের প্রভাব ফলানো নয়? কিন্তু আমিতো ওকে অনেক ভালোবাসি, হয়ত এসবই আমার দায়িত্ব। আমি আমার সাথে তর্কে লিপ্ত হই ব্যাপারটা নিয়ে।
  ৩।
আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠেছে। ওর সবকিছুই স্বাভাবিক তাই সিজার করার দরকার নেই। তাছাড়া ও নিজেও চেয়েছে স্বাভাবিকভাবে প্রসব করতে। আমি ওর চিৎকার শুনছি। ওর চিৎকার আমার সহ্য হচ্ছে না, আমার কাছে মনে হচ্ছে সিজার করাটাই বেটার ছিল,তাহলে আর ওকে এই কষ্টটা পেতে হত না। আমি ক্লিনিকের বারান্দায় পায়চারি করছি, আমার মা’ও এদিক সেদিক হাটছে আর কতক্ষন পরে পরে এসেই আমাকে বলছে,”সমস্যা নাই,আল্লার নাম নে”। আমি হঠাৎ মায়ের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালাম,ইনি আমার মা। আমি আমার জন্মের সময়টাকে নিজের মত করে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম,আমার জন্মের সময় আমার মা’ও এরকম করে চিৎকার করেছে, নিজের নাড়ী ভেদ করে একটি জীবন পৃথিবীতে পাঠানোর কষ্ট শুধু একজন নারীই উপলব্ধী করতে পারে। আমার কাছে মনে হয় সবকিছু ছাপিয়ে একজন নারীর সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মা। কারন,মা হতে হলে একজন নারীকে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয় পৃথিবীর অন্য কোন কাজে এত ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয় না।
৪।
মাত্র দশ-পনের বছরের ব্যবধানে আমার বাবাকে ছাপিয়ে সংসারের প্রধান ব্যাক্তি হয়ে উঠেছে আমার মা। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগে। এখন বাবা যে কোন কাজের জন্য মায়ের সাথে পরামর্শ করে। মা কোন বিষয়ে একটু রাগ করলে বাবা চুপচাপ মেনে নেয়। এর কারন কী আমি বুঝতে পারি না,কারন ঘরের বাইরে বাবা এখনও ঠিক আগের মতই আছে। তবে বাবা কেন মায়ের কাছে অবনত হয়ে থাকে সবসময়। এটার কারন হিসেবে আমার যা মনে হয় তা হল,”আমরা সন্তানেরা সবাই বড় হয়ে গেছি এবং বাবার ধারনা সন্তানেরা তার মাকে বেশি ভালবাসে বাবার চেয়ে,তাই বাবা যদি মা’কে মূল্যায়ন না করে তবে তার প্রতি সন্তানদের ভালবাসা কমে যাবে।” কিন্তু এরকম হওয়ার কথা না,আমরা ভাইবোন সবাই বাবাকে অনেক ভালোবাসি এবং এখনও সংসারের প্রধান কর্তা হিসেবেই মানি। কোন কাজ করেতে চাইলে আগে বাবার সাথেই পরামর্শ করি,তখন বাবা বলে,” আগে তোর মা’কে জানা,তারপর দেখ তোর মা কি বলে”।
  ৫।
আমার জীবনের অন্যতম একটি সারপ্রাইজ হল আমার প্রথম সন্তান মেয়ে। আজ ওর আকিকা অনুষ্ঠান। অনেকেই এসেছে আকিকা অনুষ্ঠানে। আমার বাবা কোন কাজ ছাড়াই সবচেয়ে ব্যস্ত। আমার বাবার সব উত্তেজনা আমার সন্তানকে ঘিরে। কারন আমার বাবা এই প্রথম দাদা হয়েছে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমার শ্বশুর বাড়ির অনেকেই আমাদের বাড়িতে এসেছে। যাদের অনেকেই এই প্রথম এসেছে এবং অনেকেই আমার মা-বাবার সাথে পরিচিত না। বাবা সেই পরিচয় পর্ব সম্পাদন করছে এবং কিছুক্ষন পরপরই তাগাদা দিচ্ছে, এই এদিকে পান দিয়ে যা,শরবত দিয়ে যা। এর মধ্য আমার এক মামা শ্বশুর বাবাকে বললো,”কই বেয়াই,বেয়াইনকেতো দেখতেছি না”। আমার মা আশেপাশেই ছিল,বাবা মা’কে ডাক দিয়ে এনে তার পাশে বসায়,পরিচয় করিয়ে দেয়,”এই হল আমার সন্তানদের মা”। আমি আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই। আমি বুঝতে পারি, যখন বাবা সংসারে তার স্বামীত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইতো তখন হয়তো সে আমার মা’কে শুধু তার স্ত্রী হিসেবেই দেখত। কিন্তু যখন থেকেই বাবা  স্ত্রীর প্রতিরুপটি দেখে,তার স্ত্রীকে শুধু একজন স্ত্রীই নয়,সন্তানের মা হিসেবেও মূল্যায়ন করতে শেখে তখন থেকেই তিনি সংসারে স্বামীত্ব প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত থাকে। আমার বাবা আমার মা’কে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়নি,একজন মা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। 
  ৬।
আজ আমার তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী। আমি খুব মনভোলা। গত দুই বিবাহ বার্ষিকীতে আমার স্ত্রীই আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছে। এরমধ্য গত বছরের সারপ্রাইজটা ছিল মজার। আমি অফিস থেকে এসে খুব ক্লান্ত,খেয়ে দেয়ে শুয়ে পরেছি। হঠাৎ করেই গভীর রাতে ও আমাকে ডেকে তুললো। রুমে লাইট অন করতেই দেখি পুরো রুম নানা রকম বেলুন আর কাঁচা ফুলে সাজানো। আমি ঘুমানোর পরই হয়তো ও এসব করে রেখেছে। ও বললো,”হ্যাপি ম্যারিজ অ্যানিভার্সারি”। আমার মনে হলো আমি একটা ঘোরের মধ্য আছি। ও বললো তোমার জন্য একটা গ্রেট সারপ্রাইজ আছে,তুমি গেস করতো কী সারপ্রাইজ?  আমি বললাম,বুঝতে পারছি না। ও আমাদের চারমাস বয়সী ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে আমার কোলে তুলে দিয়ে বললো, এই হলো তোমার বিবাহ বার্ষিকীর উপহার। আমার কাছে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যাক্তী আমি। ভুলে যাওয়ার ভয়ে আমি এবার বিবাহ বার্ষিকির দিন মোবাইলে রিমাইন্ডার করে রেখেছি। তবে তার আর  প্রয়োজন হয়নি,আমার সবসময়ই মনে ছিল। অফিস  শেষ করে আমি একটি শপিং মলে যাই আমার স্ত্রীর জন্য কিছু উপহার কিনতে। কিন্তু বুঝতে পারছি না কি উপহার দেয়া যায়। হঠাৎ একটি শাড়ির দোকানে খয়েরি রংয়ের শাড়িতে আমার দৃষ্টি আটকে যায়। রাতে বাড়ি ফিরে আমি উপহারটি আমার স্ত্রীর হাতে দেই। ও শাড়িটি দেখে মুচকি হেসে বলে,”তোমার না খয়েরি রং অপছন্দ”। আমিও হেসে দিয়ে বলি,”তোমাকে বিয়ের আগে অপছন্দ ছিল,কিন্তু এখন খুবই পছন্দ”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *