পরিবর্তনই চিরন্তন

পরিবর্তনকে কেউ রুখতে পারে না। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।আজ যে শিশু, কাল সে বালক, আজ যে যুবক, কাল সে বৃদ্ধ।আজ যেখানে বন, কাল সেখানে বসতি, আজ যেখানে বসতি কাল সেখানে ধ্বংসস্তুপ। আজ যেখানে সামন্তবাদ, কাল সেখানে রাজতন্ত্র, আজ যেখানে রাজতন্ত্র, কাল সেখানে সাম্রাজ্যবাদ, আজ যেখানে সাম্রাজ্যবাদ, কাল সেখানে গনতন্ত্র, আজ যেখানে গণতন্ত্র, কাল সেখানে সমাজতন্ত্র। পরিবর্তনের এই ধারা চলছেই।

ধর্মের ইতিহাসও মানুষের কিংবা পৃথিবীর ইতিহাসের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে সময়ে সময়ে। জংগল থেকে বের হবার সময় মানুষ যে ধর্ম নিয়ে এসেছিল সেই ধর্মের কথা শুনলে বর্তমান সময়ের মানুষেরা হাসা হাসি করে। ঐ সময়কার ধর্ম বিশ্বাস এখন একেবারে অচল।মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা শুরুর সময় থেকে পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্মের তৈরী হয়েছে, সময়ে সময়ে অসংখ্য ধর্ম বিলুপ্ত হয়েছে। আগের অন্ধবিশ্বাস একেবারে বাতিল হয়ে সম্পুর্ন নতুন আরেক ধরনের বিশ্বাস সমাজে ঠাই পেয়েছে। বর্তমান সভ্য পৃথিবীতেও প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মত ধর্মবিশ্বাস এখনও বেচে আছে। প্রতিদিন নতুন ধর্ম বিশ্বাস তৈরী হচ্ছে, পুরাতন ধর্ম বাতিল হয়ে পড়ছে।পরিবর্তন চলছেই।

কিন্তু, ধার্মিকেরা মনে করে তারা যে ধর্মটিকে বিশ্বাস করেন তাই চিরন্তন। তাদের বিশ্বাসকৃত এই ধর্মটি পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত টিকে থাকবে। এবং তাদের বিশ্বাসকৃত ধর্মের কোন একটা বানী, সুক্ত, শ্লোক, সুরা কিংবা আয়াতকে কোনভাবেই আংশিক কিংবা পুরপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে মানেন। একজন ধর্ম বিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে স্রষ্টার বানী অমোঘ বিধানের মত(যদিও তারা কতটুকু মান্য করে সেটা চিন্তার বিষয়)। তারা কোনভাবেই তাদের বিশ্বাসকৃত ধর্মগ্রন্থের এতটুকুন ভূল মানতে রাজি হন না। অথচ, তাদের এই বিশ্বাসকৃত ধর্মই সময়ে সময়ে, ভেতরে ভেতরে পরিবর্তিত হয়েছে, ডালপালা গজিয়ে নতুন নতুন শাখার তৈরী করেছে। বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান আর মহাযানে বিভক্ত হয়ে গেছে, খ্রীস্টানরা প্রোটেস্টাইন ক্যাথলিকে, হিন্দুরা অসংখ্য মতে অসংখ্য পথে, মুসলমানরা শিয়া, সুন্নি, হানাফি, সাফায়ি, হাম্বলি আরও কত যে ভাগে বিভক্ত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এই মত পথগুলো, শাখা প্রাশাখগুলোর মধ্যে যেগুলো সমাজের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে, লোক বাড়াতে পাড়ে, সেগুলো একসময় নিজেদেরকে ঐ ধর্মের একমাত্র অনুসারী বলে দাবী করে, করবে। এটাই স্বাভাবিক।
অথচ, সময়ের প্রয়োজনে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মকে পরিবর্তন করতে চাইলে, সংস্কার করতে চাইলে, যোগোপযোগী করতে চাইলে, সে সময়ের অনুসারীগণ প্রাতিবাদ করে উঠেন। তারা দাবী করেন(সাথে বিশ্বাসও করেন) ধর্মের কোন বিধান বা নিয়ম বদল করা যায় না। ধর্মের পরিবর্তন যে পৃথিবীর অন্যান্য স্বাভাবিক বিষয় কিংবা মতবাদের মত প্রতিনিয়ত ঘটেই চলছে তা তারা মানতে নারাজ। হিন্দুগণ সত্য যুগে দৈব বানী শুনা যেতো বলে বিশ্বাস করেন। যেহেতু, দৈব বানী বলে কিছু নেই তা বিজ্ঞানের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই তারা একটা যুগবিভাগ করে বর্তমানকে কলি যুগ নাম দিয়ে আর দৈব বানী না আসার একটা বাহানা তৈরী করে নিয়েছে। কলি যুগে দৈব বানী না আসার কারণ যতটা না ধার্মিক, তার চেয়ে বেশি বাস্তবিক। এরকম করে, অন্যান্য ধর্মগুলিও নানান বিষয়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নানান পরিবর্তন করেছে, করছে।

বর্তমান মুসলমানরা দাবী করেন, ইসলাম ধর্ম সন্ত্রাস কিংবা বিধর্মী হত্যা, জোর করে ক্ষমতা দখল ইত্যাদি কাজকে সমর্থন করে না। এর কারণ বর্তমান সময় এসব কর্মকান্ডকে সমর্থন করে না। কিন্তু, ইসলামের ইতিহাস দেখলে সহজেই বুঝা যায়, এটি এর প্রতিষ্টাকাল থেকে শুরু করে পৃথিবীর যে প্রান্তেই প্রচারিত হয়েছে, সেখানেই আগে যুদ্ধ করে ক্ষমতা দখল করে তারপর লোকেদের ধর্মান্তরিত করেছে। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রবেশের আগে সতেরবার মন্দির লোটপাটের মধ্য দিয়ে মুসলমান সেনানীগণ তাদের আক্রমনের ধার শানিয়েছেন। সহজ কথায়, অন্যান্য ধর্মের ইতিহাস যেখানে প্রচারের ইসলামের ইতিহাস সেখানে বিজয়ের। জোর করে ক্ষমতা দখলের ব্যপারটা নিয়ে বর্তমান মুসলমানগণের এই দাবীও কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণেই।

এই পরিবর্তনকে কেউ রুখতে পারছে না, পারবেও না, এটাই স্বাভাবিক। তথাপিও ধার্মিকগণ ধর্মসংস্কারকে সমর্থন করেন না কেন? কেন পুরাতনকে আঁকড়ে রাখার জন্য এত লম্ফঝম্ফ? কেনই বা এত সহিংসতা?

৪ thoughts on “পরিবর্তনই চিরন্তন

  1. সংস্কার হলে কি সেটা সর্ব
    সংস্কার হলে কি সেটা সর্ব জ্ঞানী ঈশ্বরের বানী বলে কেউ মানবে ? মানবে না , কারন ঈশ্বরের বানী সংস্কার হলে সেই ঈশ্বরকে সর্ব জ্ঞানী বলার কোন অজুহাত থাকবে না । তাই পুরাতনই সঠিক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *