মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব এক

প্রথমেই পাঠকদের সঙ্গে বাতচিতটা সেরে নেয়া দরকার। কারণ সাম্রাজ্যবাদীরা দুনিয়াব্যাপী ধারাবাহিক অন্যায়যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো শক্তির আজ বড্ডো অভাব। কিন্তু বিপরীতে যদি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায়যুদ্ধের প্রশ্ন আসে, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীদের তেল মাখা বন্দুকের বুলেট আমাদের খুঁজে নিতে দ্বিধা করে না। তাই জনগণের ন্যায়যুদ্ধের আলাপটা গোপনেই সারতে হয়।

তা সত্ত্বেও আমরা কেন অনলাইনে প্রকাশ্যে এ আলচনা তুলছি, এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ধন্দ বা ভীতি তৈরী হতে পারে। সেকারণেই বলে নিচ্ছি, এ আলোচনাটা নেহাৎই মাওবাদী দর্শন ও যুদ্ধবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত সমাজ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা বিষয়ক তাত্ত্বিক আলোচনা। পাঠক এর অংশীদার হলে কেন গণযুদ্ধ সমর্থন করবেন বা কেন করবেন না, এ বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

এটা খুবই জরুরী, কেন না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমর্থন বা বিরোধিতাগুলো হয় ধারণানির্ভর। সেই ধারণার জগৎ থেকে বেরিয়ে সচেতনতার জগতে পদার্পণ করাটা নিঃসন্দেহে দার্শনিক ও বস্তুগত এক বিরাট উল্লম্ফন। আসুন, গণযুদ্ধের তত্ত্ব সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এই লেখা সেই পথ দেখাতে সাহায্য করবে।

১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাও সেতুং-এর ১০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে ইউরোপে এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘মাও ও গণযুদ্ধ’। কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস্ (সিপিপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব তুরস্ক (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) অর্থাৎ (টিকেপি-এমএল) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (পিপলস্ ওয়ার) অর্থাৎ সিপিআই (এমএল-পিপলস্‌ ওয়ার) এই সংগঠনত্রয় ছিল সেমিনারটির আহ্বায়ক। ওই সেমিনারে যোগ দিয়েছিল প্রায় ২৭টি পার্টি ও সংগঠন।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশের উচ্চতর স্তর হিসেবে মাওবাদ বা মাও চিন্তাধারার ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনা ও তাকে উর্দ্ধে তুলে ধরাটাই ছিল এই সেমিনারের প্রধান উদ্দেশ্য। তাছাড়া বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের জন্য মার্কসবাদের অস্ত্রভান্ডারে গণযুদ্ধের নীতি এক মৌলিক এবং প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই, সেমিনারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদের তীব্র সংকটের সময়ে আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর আশু কর্তব্য হিসেবে মাও-এর ‘গণযুদ্ধ’ এর ধারণাকে ঊর্দ্ধে তুলে ধরা।

সিপিআই (এমএল-পিপলস ওয়ার) বর্তমানে যা সিপিআই (মাওবাদী) নামে পরিচিত, তারা সর্বহারা শ্রেণীর নেতা, মহান শিক্ষক মাও সেতুং-এর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২৬ ডিসেম্বর, ২০০০ ওই সেমিনারের নির্বাচিত অংশ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করে। অনুবাদে তারা পিপলস ওয়ার-এর অনুবাদ ‘জনযুদ্ধ’ করলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে এক্ষেত্রে ‘গণযুদ্ধ’ শব্দটি বেশি চালু বিধায় এখানে গণযুদ্ধ শব্দটিই ব্যবহার করা হলো। রচনাটি দীর্ঘ হওয়ায় এটিকে খণ্ড করতে হয়েছে, আরও দুই পর্ব পাবেন।

‘মাও ও গণযুদ্ধ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের রিপোর্ট
১৯৯৮- এর ডিসেম্বরে ইউরোপে ‘মাও ও গণযুদ্ধ’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস্ (সি.পি.পি.), কমিউনিস্ট পার্টি অফ তুর্কী/মার্কসবাদী-লেনিনবাদী (টি.কে.পি/এম.এল.) ও কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদ-লেনিনবাদী) (পিপলস ওয়ার) এই সেমিনারের আহ্বায়ক ছিল। যেসব পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদী-মাওবাদ বা মাও চিন্তাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে, গণযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং যেসব পার্টি গণযুদ্ধকে সমর্থন করছে তাদের সকলকে এই সেমিনারের অন্তভূক্ত করা হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে ২৭টা অংশগ্রহণ কারী পার্টি ও সংগঠন ছিল, যার মধ্যে ৫টা পার্টি টেকনিক্যাল কারণে যোগ দিতে পারেনি। ২৭টা সংগঠনের মধ্যে ৬টা পার্টি গণযুদ্ধ চালাচ্ছে আর বাকি ২১টা পার্টি গণযুদ্ধে প্রতি সর্মথন জানিয়েছে। প্রথম ছটা পার্টির মধ্যে সেমিনারের আহ্বায়ক তিন পার্টি ছাড়াও বাকিরা হল মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (এম.সি.সি), কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) এবং পি.বি.এস.পি (পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি)। এদের মধ্যে শেষের দুটো পার্টি সেমিনারে আসেনি। আহ্বায়করা কমিউনিস্টপার্টি অব পেরু(পি.সি.পি)-র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।

এই সেমিানরের দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলঃ প্রথমত, এই সেমিনার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশের উচ্চতর স্তর হিসেবে মাওবাদ বা মাও-চিন্তাধারার ঐতিহাসিক তাৎপর্য অপরিসীম। দ্বিতীয়ত, এই সেমিনার পুঁজিবাদের তীব্র সংকটের সময়ে আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর আশু কর্তব্য হিসেবে মাও-এর গণযুদ্ধের ধারনাকে তুলে ধরতে চয়েছিল।

প্রথম বিষয়ে আহ্বায়করা জোরের সাথে বলেন যে মার্কসীয় তত্ত্ব ও প্রয়োগে মাও- এর ঐতিহাসিক অবদানকে বাদ দিয়ে বিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সমাজতন্ত্রের সংহতিকরণ কোনোটাই সম্ভব নায়। চীন ও অন্যান্য দেশে সমাজতন্ত্রের পতনের ফলে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে অবাধ বিচ্যুতি ও সংশয় তৈরি হয়েছে এরকম একটা অবস্থায় মাও-এর ঐতিহাসিক অবদানকে জোর দেওয়া একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সর্বহারা বিপ্লবের পথে একনিষ্ঠ বিপ্লবীদের জড়ো করে প্রকৃত মাওপন্থীদের সংহতিকরণ এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

দ্বিতীয় বিষয়ে, গণযুদ্ধের ওপর মাও-এর ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ হল একমাত্র গণযুদ্ধের পথেই বর্তমান সংকটে বিপ্লবীরা সবচেয়ে বেশি সুযোগ নিতে পারেন এবং সাম্রাজ্যবাদের ওপর কার্যকরী আঘাত হানতে পারেন। এছাড়া, বিপ্লবীদের মধ্যে বিদ্যমান দুটো বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গণযুদ্ধের উপর মাও-এর ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণা করাটা একান্ত প্রয়োজন- এক. পশ্চাৎপদ দেশের কিছু ‘মাওপন্থী যারা অনির্দিষ্টকালের জন্য সশস্ত্র বিপ্লবকে স্থগিত রেখেছেন, এমনকী তাদের কর্মসূচিতেও স্থান দেননি; দুই. যারা মাওপন্থী নন কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম করছেন তারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে দর কষাকষির লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামকে ব্যবহার করার ফলস্বরূপ বিপ্লবকে ধ্বংস করেছেন। (যেমন এরিটিয়া, অ্যাঙ্গোলা, এল সালভাদোর, নিকারাগুয়া প্রভৃতি। )

প্রাণবন্ত আলোচনা ও মাও গণযুদ্ধ বিষয়ে একটা সাধারণ ঘোষণা’-র মধ্যে দিয়ে এই সেমিনার একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এর সাথে আরও একটা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয় যাতে এই সেমিনারের অবদান ও তাৎপর্য বিষয়ে একটা মোটামুটি বিবরণ দেওয়া আছে। এছাড়া ইরাকে আমেরকিার বোমাবর্ষণ, কুর্দিদের ওপর দমন, বলকানের অবস্থার বিরোধিতা করে এবং পেরুর বিপ্লব, কমরেড গঞ্জালো মুক্তি এবং বেলজিয়ামে ক্লাবেক ইস্পাত কারখানার বিচারধীন ১৩ জন শ্রমিকের সমর্থনে সভায় একটা প্রস্তাব গৃহীত হয়। অংশগ্রহণকারীদের এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন থাকলে স্বাক্ষর করার কিংবা দ্বিমত থাকলে স্বাক্ষার না কারার অধিকার ছিল।

সামগ্রিকভাবে তিনদিনের এই সেমিনারে ২১টা সংগঠনের ৪২জন প্রতিনিধির মধ্যে বোঝাপড়ার গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেমিনারে যেসব ‘দলিল’ পড়া হয়েছে তা বই আকারে বের করা হবে। এখানে আন্তর্জাতিক সেমিনারে সি.পি.আই. (এম-এল) (পিপলস্ ওয়ার) যে ‘দলিল’ উপস্থাপন করেছে সেটা ‘মাও এবং গণযুদ্ধ’ নামে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।

মাও ও গণযুদ্ধ
[আন্তর্জাতিক সেমিনারের সি.পি.আই. (এম-এল) (পিপলস্ ওয়ার) কেন্দ্রীয় কমিটি (অস্থায়ী) কর্তৃক পরিবেশিত ‘দলিল’]

মহান মার্কসবাদী শিক্ষক মাও সেতুং-এর ১০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে, সর্বহারা রণকৌশলের প্রতি তাঁর মৌলিক অবদান ‘গণযুদ্ধের নীতি- কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হল তাঁর প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানানোর উপায়। সর্বোপরি বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আশু প্রয়োজনীয়তা এই মতবাদকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতার জন্য মার্কসবাদের অস্ত্রভান্ডারে ‘গণযুদ্ধের নীতি একটা মৌলিক এবং প্রয়োজনীয় উপাদান।

‘সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল ও যুদ্ধের দ্বারা সমস্যার সমাধান’- এর তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হলেও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার প্রকাশভঙ্গি বিভিন্ন। কমরেড মাও দেখিয়েছেন উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশ দেশসমূহে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধই বিপ্লবের পথ এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্র আছে এরকম পুঁজিাবদী রাষ্ট্রে যেখানে জনগণ ফ্যাসিবাদ বা যুদ্ধের মাঝে নেই সেখানে জনগণের সামনে অভ্যুত্থান ও সংগ্রামের জন্য র্দীঘকালীন আইনি সংগ্রামের প্রস্তুতি একমাত্র রাস্তা। কমরেড মাও গণযুদ্ধের ধারণা সম্পর্কে নীতির যে রূপরেখা দিয়েছেন তার প্রয়োগ বিশ্বজনীন- সে অভ্যুত্থানের পথই হোক বা দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের পথই হোক।

আজ, এক গভীর সংকট পৃথিবীতে ছায়া ফেলেছে যা মহানন্দার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসের এইরকম এক সংকটজনকে মুহুর্তে ‘মাও এবং গণযুদ্ধ- এর ওপর আন্তর্জাতিক সেমিনার ভীষণ অর্থবহ হয়ে উঠেছে। বিপ্লব এগোবে না পিছোবে, বিপ্লব এই সংকটের থেকে উদ্ভুত সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবে কিনা, সর্বহারা পার্টি পরিবর্তনের জন্য অগ্রণী বাহিনীর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না এসব নির্ধারণরে প্রধান চাবিকাঠিই হল গণযুদ্ধ।

এই দলিলে আমরা প্রথমে মাও-চিন্তাধারার আন্তর্জাতিক তাৎপর্যকে তুলে ধরব, তারপর গণযুদ্ধের তত্ত্বের নির্যাস, অতঃপর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে গণযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা এবং সবশেষে ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণযুদ্ধের প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করব।

প্রথম পর্ব-ক। মাও-চিন্তাধারার আন্তর্জাতিক তাৎপর্য
কমরেড মাও কর্তৃক বিকশিত ও উন্নত মার্কসবাদ- লেনিনবাদের বিজ্ঞানকে কাজে না লাগিয়ে বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক গঠন চালানো অমম্ভব। ব্যাপারটা যেন-পরবর্তী সময়ে আইনস্টাইন ও অন্যান্যদের দ্বারা বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনকে ধর্তবোর মধ্যে না রেখে নিউটনের আবিষ্কার নিয়ে গবেষণারত কোনো বৈজ্ঞানিকের মতো। মাও, মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সবদিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন দর্শনে, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রে, সমাজতন্ত্র ও সর্বহারার রণকৌশলে। মাও-এর রচনা ও অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে সুণিপুণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে কেবলমাত্র বিপ্লবকে সার্থক করে তোলার লক্ষ্যেই নয়, সর্বহারা একনায়কত্বকে কিভাবে আরও সুসংহত করা যায় এবং সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্য আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই কাজেও।

মার্কসবাদী দর্শনের জগতে মাও-এ যুগান্তকারী রচনা দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে এবং ‘অনুশীলন প্রসঙ্গে’ দ্বন্দ্বতত্ত্বের ধারণাকে আরও উন্নীত করেছে। সর্বোপরি মাও তার সমস্ত লেখায় সর্বহারা বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার গুরুত্বের ওপর অর্থাৎ মার্কসীয় দর্শনকে জনগণের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। সমস্ত কর্মকান্ডের মধ্যে ‘জনগণের সেবা কারো’ এবং ‘গণ লাইন’ সম্পর্কে তারা চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মানুষ ও নতুন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করা এবং সেইদিকে তাদের দষ্টিভঙ্গিকে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে এটা একটা জীবন্ত রূপ ও প্রক্রিয়া। ‘গণ লাইন’ সম্পর্কে তার ধারণা কেবলমাত্র একটা উজ্জ্বল সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার তত্ত্বই নয়, এটা ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে জনগণের স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করার এক উদাও আহবান এবং এর মাধ্যমে স্বার্থপরতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, লোভ, সম্পত্তির অধিকার প্রভৃতি বুর্জোয়া মূল্যবোধের বিরুদ্ধে একটা বাস্তুব সংগ্রাম। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতির বিপ্লবের সময় এটা আরও উন্নত হয়েছিল। এই গণলাইন ছিল সমস্ত ও বুর্জোয়া মূল্যবোধের বিরুদ্ধে ব্যাপক শ্রেণী সংগ্রাম, যে সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল পার্টির মধ্যেকার বুর্জোয়া কেন্দ্রগুলোর বিরোধিতা করা এবং পার্টি ও সমগ্র সমাজকে রূপান্তরিত করা। এটা ছিল সমাজকে সাম্যবাদের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজতান্ত্রিক নতুন মানুষ সৃষ্টি করার এক গণ জাগরণ। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতি বিপ্লবের শ্লোগান ‘নিজের বিরুদ্ধে লড়ো এবং সংশোধনবাদের সমালোচনা করো’আসলে ছিল জনগণ এবং পার্টির গভীরে সর্বহারা বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার একটা প্রয়াস। সমাজ পরিবর্তনের জন্য দর্শনের ব্যবহার- এই মার্কসীয় ধারণাকে চীনা জনগণের ক্ষেত্রে মূর্ত বাস্তবতায় পরিণত করেন মাও সেতুং।

রাজনৈতিক-অর্থনীতির ক্ষেত্রে, সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের নিয়ন্ত্রক অর্থনৈতিক সূত্রগুলোকে মাও ভীষণভাবে পরিশীলিত করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের প্রথম অভিজ্ঞতার ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে মাও তাকে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উন্নয়নের কাজে লাগান। ‘বিপ্লবকে আয়ত্ত করো এবং উৎপাদন বাড়াও’ ; ‘রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দাও’; ‘দু’পায়ে হাঁটা; অর্থাৎ কৃষিকে ভিত্তি করা ও শিল্পকে প্রাধান্য দেওয়া; উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে যথার্থ সমতা বিধান করা; সম্মুখদিকে মহাউল্লম্ফন অর্থাৎ শিল্পকে গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া; তাচাই এবং তাচিং কৃষিকার্য এবং শিল্পবিকাশের এই দুই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া; সমাজতান্ত্রিক সমাজে কারখানাগুলোর পরিচালন পদ্ধতি তৈরি করা; ধাপে ধাপে কমিউন ও সমবায় খামার গড়ে তোলা; কৃষির এবং কারখানার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, বুর্জোয়াদের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা; ‘মূল্যের সূত্র’গুলোকে করায়ত্ত করা; আঞ্চলিক উদ্যোগকে উন্নীত করে আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা; জাতীয় পরিকল্পনা এবং বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে সমতা বিধান করা; ‘খালি-পা ডাক্তারদের প্রকল্প চালু করা; জনগণের মধ্যে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া; এগুলো ছাড়াও সর্বোপরি গুরুত্বপূর্ণ হল – সকল অর্থনৈতিক কাজকর্মে একটা গণ লাইনকে নির্দিষ্ট করাই ছিল সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যে রাজনৈতিক অর্থনৈতিতে মাও-এর মহান অবদান।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে মাও কেবলমাত্র লেনিনের দ্বিস্তর বিপ্লবের তত্ত্বকেই পরিশীলিত করেছিলেন তা নয় – সমাজতন্ত্রে উত্তরণের নীতিগুলোকে তিনি আরও উন্নত করেন। প্রথমত – তিনি নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এবং জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের শ্রেণীভিত্তির পরিষ্কার রূপরেখা দেন। লেনিনের দ্বিস্তর বিপ্লবের গভীর বিশ্লেষণে মাও-এর ‘নয়াগণতন্ত্র’ কেবল সামন্ততন্ত্রকেই লক্ষ্যবস্তু করেনি, সাম্রাজ্যবাদও ছিল তার লক্ষ্যবস্তু। এই তত্ত্ব প্রমাণ করেছিল যে, বর্তমান যুগে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কাজ কেবলমাত্র সর্বহারা একনায়কত্বেই সম্পূর্ণ হতে পারে, এবং তা হবে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা অংশ। সর্বহারা একনায়কত্বে যাবার জন্য প্রথম ধাপ হিসেবে জনগণের চারটি শ্রেণীর যৌথ গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব যে অন্তবর্তীকালীন রূপান্তরের পর্যায়, এই ধারণাকে তিনিই প্রথম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপরে গণতান্ত্রিক পর্যায়ে থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যে আদর্শগত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তা-ও মাও প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বশেষে সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে বিপ্লবকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে তার ধারণা, অথাৎ প্রাথমিক স্তর থেকে সমাজতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে উত্তরণের ধারণাকে মাও সমৃদ্ধ করেন।

সর্বহারা রণকৌশলের ক্ষেত্রে বিপ্লবী অস্ত্রাগারে মাও-এর অবদান উল্লেখযোগ্য। যার ব্যবহার ছাড়া বর্তমান যুগে শত্রুর সাথে যুদ্ধের কার্যকরিতা ভোঁতা হয়ে পড়বে। জনগণকে সমাবেশিত করার জন্য গণ লাইনের ধারণাকে তিনি শুধুমাত্র গড়ে তোলেননি, বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান যথেষ্ঠ। তিনি সর্বহারা পার্টি সম্পর্কে লেনিনীয় ধারণাকে বিকশিত করেছেন। এমন এক নতুন ধরনের পার্টি গড়েছেন যা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি বরং এই পার্টি সমালোচনা, আত্মসমালোচনা ও শুদ্ধিকরণ অভিযানকে সুষ্টুভাবে পরিচালনা করে দুই লাইনের সংগ্রামের ভিত্তিতে এগিয়ে চলে। মাও-ই সর্বপ্রথম যুক্তফ্রন্টের পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব ও সূত্রকে উপস্থাপন করেন। যুক্তফ্রন্ট, যা শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে এবং সর্বহারা নেতৃত্বে সামাজিক শ্রেণীগুলোর মিলিত একটা ফ্রন্ট। ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির দুই কৌশল’গ্রন্থে যুক্তফ্রন্টের যে ধারণা লেনিন অবতারণা করেছিলেন মাও তার যুক্তফ্রন্টের ধারণায় সেটাকে এক নতুন পর্যায়ে উত্তরণ ঘটিয়েছেন। সব থেকে বড়ো কথা হল, মাও ক্ষমতা দখলের প্রশ্নের সাথে সর্বহারা নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, পেটি বুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া এই চার শ্রেণীর যৌথ একনায়কত্বকে যুক্ত করেছেন। সবশেষে এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মাও-ই প্রথম আন্তর্জাতিক সর্বহারাদের সামরিক তত্ত্বের সন্ধান দেন। তাঁর গণযুদ্ধের তত্ত্বের ধারণায় মাও বিপ্লবের তত্ত্ব ও অনুশীলনকে এক নতুন ও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন- যা এক দুর্বল শক্তি দ্বারা এক শক্তিশালী শক্তিকে পরাস্ত করার বিজ্ঞান।

খ। গণযুদ্ধের মর্মবস্তু
গণযুদ্ধের মর্মবস্তু কী? গণযুদ্ধের রণনীতির হৃদয় ও আত্মা যে কোনো দেশের সংখ্যাগুরু জনগণের ওপরই নির্ভর করে (ভারতের ক্ষেত্রে যে জনসংখ্যা ৯০% এর বেশি) রাষ্ট্রের ভাড়াটে সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত সংখ্যালঘু শ্রেণীশত্রুদের পরাস্ত করা। গণযুদ্ধের এই ধারণা আন্তর্জাতিকভাবেই প্রযোজ্য।

গণযুদ্ধের তত্ত্বের ধারণায়, এই মৌলিক সত্যকে আয়ত্ত করা দরকার যে একদিকে আছে শাসকশ্রেণী দ্বারা নিপীড়িত দেশের এক বৃহৎ জনসমষ্টি অপরদিকে রয়েছে ভাড়াটে সৈন্য দ্বারা সুরক্ষিত মুষ্টিমেয় শোষকশ্রেণী যারা টিকিয়ে রাখছে এই নির্মম শোষণ ব্যবস্থাকে। রণনৈতিক দিক থেকে বলা যায় যে রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তিকে পরাস্ত করা যায় কেবলমাত্র বঞ্চিত মানুষের এই বিশাল আধারের ওপর নির্ভর করেই যা গণফৌজের এক অফুরন্ত উৎস এবং যা এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো গেরিলা যোদ্ধাদের এবং পার্টিকে রক্ষা করবে- অবশ্য যদি তারা বিপ্লবী তত্ত্বে শিক্ষিত হন এবং আগে থেকে তাদের সংগঠিত করা যায়।

সর্বহারা পার্টিকে গণযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে মনে রাখতে হবে যে, রণনীতিগতভাবে শত্রুরা দুর্বল, কাগুজে বাঘ এবং জনগণের সশস্ত্র শক্তির দ্বারাই তাদের পরাস্ত করা যায়; কিন্তু রণকৌশলগতভাবে শত্রু শক্তিশালী, এবং জনগণের বাহিনী কখনই তাদের সঙ্গে সম্মুখ সংঘর্ষে যাবে না। মাও যেমন বলেছিলেন, ‘রণনীতির নিরিখে শত্রুকে কাগুজে বাঘ হিসেবে দেখো কিন্তু রণকৌশলগতভাবে তাকে প্রকৃত বাঘ হিসেবে বিচার করো। এটাই সেই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট যেখানে গণযুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুর রণনৈতিক শক্তির মোকাবিলা করা যায় এবং যেখানে গেরিলা যুদ্ধ মুখ্য সঞ্চালক।

গেরিলা যুদ্ধ একমাত্র পদ্ধতি যার দ্বারা রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তিকে অপেক্ষাকৃত দুর্বলশক্তি কার্যকরীভাবে মোকাবিলা করতে পারে। অধিকতর শক্তিশালী শত্রুকে নিজেদের এলাকায় প্রবেশ করতে দিতে হবে এবং চর্তুদিক থেকে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের ঘিরে ফেলেই বৃহৎ শত্রুকে ধ্বংস করা যাবে। জনগণের শক্তির ও পর নির্ভর করে এবং শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য জনগণকে সশস্ত্র করে শত্রুর প্রতিকূল এলাকায় অবিরাম যুদ্ধে শত্রুকে লিপ্ত করে দিতে হবে। এইভাবে শত্রুকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তারপর প্রতিটা যুদ্ধে গণশক্তিকে বৃহৎ আকারে সংহত করে একে একে তাদের ধ্বংস করতে হবে। মাও-এর গেরিলা যুদ্ধের নীতি- যখন শত্রু আক্রমণ করে আমরা পশ্চাদপসরণ করি; যখন শত্রু ঘাঁটি গাড়ে আমরা তাকে ব্যাতিব্যস্ত করি এবং যখন শত্রু পশ্চাদপসরণ করে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি- প্রয়োগ করে বৃহৎ শক্তিশালী বাহিনীকেও কার্যকরীভাবে মোকাবিলা করা যেতে পারে।

মাও, গেরিলা যদ্ধের সূত্রগুলোকে এবং চলমান ও স্থানিক যুদ্ধের সঙ্গে তার সর্ম্পককে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন যে যদিও গণযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ি, তবুও প্রচার এবং যুদ্ধের সময় কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। গোরিলা আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘আকস্মিকতা। গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশবলী নিয়ে তিনি এক নতুন পদ্ধতি গড়ে তোলেন, যেটা হল কেন্দ্রীয় রণনৈতিক নির্দেশ এবং প্রচার ও যুদ্ধে বিকেন্দ্রীয় নির্দেশের সমন্বয়। মাও তার গণযুদ্ধের তত্ত্বের ধারণায় যুদ্ধ পরিচালনার প্রতিটা খুঁটিনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবৃত করেন- যেমন আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার প্রশ্ন; খতমের ও কৌশলে শত্রুর শক্তিক্ষয় করানোর কাজ; স্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত করা বা বিকেন্দ্রীভূত করার প্রশ্নে নমনীয়তা; জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সমাবেশিত করার প্রশ্ন; অফিসারে ও তার সাধারণ সৈন্যের মধ্যেকার সম্পর্ক; সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যেকার সম্পর্কের প্রশ্ন ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসবের মধ্যে প্রধান সাংগঠনিক রূপ হিসেবে গণফৌজের প্রতিষ্ঠাই হল প্রাথমিক পূর্বশর্ত।

গণযুদ্ধের তত্ত্বের এই নীতিগুলো আন্তর্জাতিকভাবেই প্রযোজ্য- তা সে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের পথ হোক অথবা অভ্যূত্থানের পথই হোক। প্রথম ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু থেকে গড়ে তুলতে হবে এবং অসম বিকাশের কারণে গেরিলা অঞ্চল এবং ঘাঁটি এলাকা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সবশেষে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে হবে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের জন্য জনগণকে ক্রমশ সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করে তুলতে হবে।

যে কোনো বিপ্লবের কেন্দ্রীয় কর্তব্য হল বিদ্যমান রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে চুরমার করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা। সমস্ত ক্রিয়াকর্মকেই সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপূরক করে গড়ে তুলতে হবে বা তার প্রস্ততির লক্ষ্যেই পরিচালনা করতে হবে। লেনিন যেমন ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ এ বলেছেন, জনগণকে সুসংবদ্ধভাবে এই বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলা এবং বিশেষ করে সহিংস বিপ্লবের প্রশ্নে শিক্ষিত করা হল, মার্কস ও এঙ্গেলসের সমগ্র শিক্ষার মূলকথা। অনেক পার্টির প্রবণতা থাকে র্দর্ঘস্থায়ি লক্ষ্য থেকে আশু লক্ষ্যকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার। সেক্ষেত্রে রণনীতি থেকে রণকৌশলের বিচ্যুতি ঘটে যায়। আংশিক দাবির জন্য সংগ্রাম, বিপ্লবী প্রচার প্রভৃতি বিপ্লবের রণনৈতিক কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। কার্যত যা শেষে এক বিমূর্ত এবং অসম্পূর্ণ ধারণায় পর্যবসিত হয়। একমাত্র গণযুদ্ধের রাস্তাই দূরবর্তী লক্ষ্য ও আশু লক্ষ্যের মধ্যে বা রণনীতি এবং রণকৌশলের মধ্যে যোগসূত্র বজায় রাখতে পারে। যদি সর্বহারার পার্টি নিজেকে রণনৈতিক কাজের জন্য ধাপে ধাপে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং সামরিক দিক থেকে প্রস্তুত না করতে পারে তবে সে কোনোদিন ক্ষমতা ছিনিয়ে আনতে পারবে না এবং এমনকী সংকটের মূহুর্তে নিজে এতটাই অপ্রস্তুত এবং অপরিণত বোধ করবে যে সেই সংকটকে নিজের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হবে।

শত্রুকে পরাস্ত করার প্রশ্নে গণযুদ্ধেই আজ পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা বিকশিত, তীক্ষ এবং অবশ্যম্ভাবী পদ্ধতি। এ হল চীনা বিপ্লবী যুদ্ধের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার এক সারসংক্ষেপ যা ওই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে সাধারণভাবে একটা নীতি ও সূত্রে গ্রথিত করেছে যার একটা আন্তর্জাতিক তাৎপর্য আছে। ঠিক যেমন নির্দিষ্ট অনুশীলনের মধ্য থেকেই সমস্ত ত্তত্ত্ব ও জ্ঞান জন্ম নেয়, তেমনি চিনা বিপ্লবের নির্দিষ্ট অনুশীলনের মধ্য থেকেই গণযুদ্ধের সার্বজনীন তত্ত্ব, গড়ে উঠেছিল। বুর্জোয়াদের ধ্বংস করার জন্য সর্বহারার হাতে এটাই সবচেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বিকশিত যুদ্ধের তত্ত্ব। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এটাই হল মূখ্য হাতিয়ার।

দ্বিতীয় পর্ব । বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে গণযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা
আমরা এই পর্বকে দুটো অংশে ভাগ করব। প্রথম – বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দ্বিতীয় – সেই পরিস্থিতিতে গণযুদ্ধের প্রয়োগ।

(১) বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
এই সহস্রাব্দের শেষে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শুধু যে গভীর সংকটের আবর্তে রয়েছে তাই নয়, সে তার ধ্বংসের পর্যায়ে, পৌঁছেছে। ধীরে হলেও সুনিশ্চিতভাবে এই অর্থতৈনিক ব্যবস্থা এক গভীরতম অথনৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছে যার ফলে হয়ে চলেছে অকল্পনীয় বাস্তুচ্যুটি, ফ্যাসিস্ট নৃশংসতা এবং ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ।

ফাটকা পুঁজি এমন এক দানবাকার চেহারা নিয়েছে যে, অর্থনীতির উৎপাদনের ক্ষেত্র তুলনামূলভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে, পুঁজিবাদ শতগুণ বেশি পরজীবী হয়ে উঠেছে। আরও বেশি নির্মম ও সর্বগ্রাসী চেহারা নিয়েছে। এক ইন্দ্রিয়সর্বস্ব অহঙ্কারী অভিজাতের মতন পুঁজিবাদ উৎপাদনশীল অর্থনীতির রক্তচোষা জোঁকে পরিণত হয়েছে। লগ্নি পুঁজি এমনই ভঙ্গুর হয়ে গেছে যে পৃথিবীর প্রত্যন্ত কোণে সামান্যতম ভাঙন ধরলে তার আঘাত তরঙ্গের মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। দিনে দিনে তার পচন বেড়ে চলেছে এবং দুর্গন্ধ তীব্র হচ্ছে। অবদমিত দেশগুলোকে অন্ধকার যুগে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। লুণ্ঠনের মাত্রা ঔপনিবেশিক যুগকেও দ্রুত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাধী দেশগুলেতেও আজ মহানন্দার মতোই অবস্থা বিরাজ করছে এবং তা দ্রুত জনগণকে গ্রাস করছে।

লগ্নি পুঁজির দুনিয়া আরও জটিল, পুঁজির ফাটকাজাত দ্রুত সঞ্চালন প্রকাশো দেখা যায় না; নির্দিষ্টভাবে বললে তাদের বৈশিষ্ট্য এবং যে শঠ পদ্ধতিতে তারা অর্থনীতির প্রাণটুকু গিলে খায় তা সাধারণভাবে বোঝা যায় না। সারা বিশ্বজুড়ে জনগণের জীবনের ওপর বল্পাহীন অত্যাচার এবং তাদের হাড়াভাঙা খাটুনি সঞ্জাত বিপুল উদ্বৃত্ত (মুনাফা) বাজারের দোদুল্যমানতার জন্য লাভজনক পুনলগ্নিকরণের রাস্তা খুজে পায় না। ফলে অতি উৎপাদনের সংকট দেখা দেয়। এটা থেকে বাঁচার জন্য উন্মাদের মত পুঁজির পূনর্গঠন করা হয় একত্রীকরণ এবং অধিগ্রহণের মাধ্যমে। ফলে জন্ম হয় আরও বৃহৎ একচেটিয়াদের। ফটিকা পুঁজির পুনর্লগ্নিকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা হয়ে ওঠে আরও ভঙ্গুর। নিম্ন মজুরির ক্ষেত্রগুলোতে পুঁজির বিনিয়োগের ফলে বেকারত্ব আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। নিপীড়িত দেশগুলোতে লঠের মাত্রা লাফ দিয়ে বেড়ে ওঠে, মানুষ আরও বেশি নিঃস্ব হয়। এমনকী পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও শ্রমিকশ্রেণীর ওপর ব্যাপক আক্রমণ বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি করেছে এক অস্থিরতা।

আজকে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের এবং জাপানের গভীর মন্দার সাথে সাথে রাশিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতি ভয়ংঙ্করভাবে ভেঙে পড়েছে। এই পর্বে লাতিন আমেরিকার ভাঙন আসন্ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপাত সংকট-মুক্তি তার গলায় বাঁধা ফাঁসের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। লগ্নি পুঁজির কর্তারা আতঙ্কিত, তারা জানে না কখণ এবং কোথায় ধাক্কা আসবে। বাজারের নৈরাজ্য, যার আর এক নাম ‘বাজার সংস্কার’ এমন এক চরম অবস্থায় পৌঁছেছে যা মুধু মাত্র পণ্য এবং পরিষেবাকেই গিলছে না, তার সঙ্গে গ্রাস করছে মুদ্রা, সুদের হার, ঋণ, স্টক এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি। বাজারের এই নৈরাজ্য সমস্ত ব্যবস্থাটিকে তছনছ করে দিয়েছে।

সমস্ত কিছুকে পণ্যে পরিণত করার তাদের যে উম্মত প্রচেষ্টা, তাতে তারা কিছুই দেয়নি- খেলাধুলা, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, চারুকলা সবই আজ পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক রণনীতিতে। ভোগবাদ প্রত্যেকের জীবনের সমস্ত দিক গ্রাস করেছে, এমনকী আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়াকেও। প্রতিটা কাজ, প্রতিটি মূল্যবোধ এবং প্রতিটা চিন্তা উৎসরিত হয় পূর্বশর্তাধীন রোবট নিয়ন্ত্রিত এক গর্জনশীল প্রচার মাধ্যমের ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে। তথ্য প্রযুক্তির উল্লম্ফন এমন এক প্রজন্মের জন্ম দিয়েছে যারা সাংস্কৃতিক, নান্দনিক এবং সামজিকভাবে দুর্বল যাদের বোবা করে রাখা হয়েছে টি.ভি- কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের সমন্বয়ে। এর ফলে সামাজিক ক্রিয়াকলাপ হ্রাস পেয়েছে। মানুষের বিচ্ছিন্নতা এক চরম অবস্থায় পৌঁছেছে, এক নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা-সর্বস্ব আবহাওয়ায় সাফল্য পাওয়ার এক টিকে থাকার জন্য উন্মত্ত প্রচেষ্টা চলছে যার থেকে জন্ম নিচ্ছে-লোভ, স্বার্থপরতা, নিজেকে জাহির করা এবং চূড়ান্ত আত্মসর্বস্বতা। শৈশব থেকেই মানুষ অসংবেদনশীল, নিষ্ঠুর এবং সামাজবিরোধীতে পরিণত হচ্ছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জায়গায় ব্যক্তিপূজা, জিনিসপত্রের এবং আত্মকেন্দ্রিক আনন্দের মধ্যে সুখ খোঁজা; প্রেম ও ভালোবাসা কেবলমাত্র বিনিময় মূল্য দ্বারা নির্ধারিত হওয়া অর্থাৎ যখন পাওনার প্রশ্ন নিশ্চিত তখনই প্রেম ভালোবাসা দেওয়া যায়; নিজস্ব স্বার্থ মিটলে তবেই বন্ধুত্ব করা যায়- এমন সব ধারণার জন্ম দিচ্ছে। এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তার অভাব, বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব এবং বর্তমান জীবনের টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বজুড়ে ‘আধ্যাত্মিকতা’-র ধারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই ব্যবস্থা মানবপ্রজাতিকে কখনও এতটা ধ্বংসের অবস্থায় নিয়ে আসেনি- যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করা হয়েছে, পেশিশক্তির ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলে তার সমস্ত মানবিক গুনকে পঙ্গু করে ফেলেছে। আরও বেশি মুনাফার লোভ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দিক থেকে কেবলমাত্র আমাদের জল, মৃত্তিকা এবং বনজসম্পদকে ধ্বংস করেই সে ক্ষান্ত থাকেনি, বায়ুমন্ডল, স্ট্রাঠোস্ফিয়ার, সমুদ্র, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ওপরেও তার প্রভাব পড়েছে। রোগ, ব্যাধি লাফ দিয়ে বেড়ে চলেছে এবং সারা বিশ্বকে তা গ্রাস করেছে- প্রতিষেধকে কাজ না হওয়া পুরোনো রোগগুলো পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নতুন রূপে ফিরে আসছে। গভীর সংকটের প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা জায়গায় আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্রের গভীর অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। অর্ধাহার এবং দারিদ্রের মধ্যে থাকা চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ভয়ংকর বেড়ে গেছে। মুদানের বীভৎস ছবিতে কেবলমাত্র হিমশৈলের জেগে থাকা চূড়াটুকু দেখা যাচ্ছে, ‘প্রতিদিন আরও কয়েক লক্ষকে টেনে নামানো হচ্ছে। বেকারি, মুদ্রাস্ফীতি, রোগ, প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে ব্যাপক মধ্যবিত্ত মানুষ দারিদ্রের গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধুমাত্র নিপীড়িত দেশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়- এক বৃহৎ সংখ্যক পুঁজিবাদী দেশ যেমন রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, বলকান দেশগুলোও একই সমস্যার সম্মুখীন। এমনকী উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও বেকারের সংখ্যা ১৯৩০-এর সময়কে ছাপিয়ে গেছে।

সর্বোপরি, সংকুচিত বাজার ও প্রভাবাধীন এলাকার দখলদারির জন্য প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যেকার প্রবল দ্বন্দ্বের ফলে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। একমাত্র মহাশক্তিধর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি ইউরোপ ও জাপানের কাছে তার অর্থনৈতিক প্রাধান্য দ্রুত হারিয়ে ফেলছে। যদিও অমেরিকা এখনও এগিয়ে, তবু এই তিন শক্তির মধ্যেকার পার্থক্য ক্রমশ কমে আসছে। প্রবল মন্দা সত্ত্বেও জাপান এখনও অর্থনৈতিক শক্তিতে এগিয়ে আছে। তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও এখনও কয়েকটা কোম্পানি পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম। যদিও আগের অবস্থায় ফিরে আসতে তার আরও কয়েক বছর লাগবে, কিন্তু একবার বেঁচে উঠলে সে হয়ে উঠবে আমেরিকার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী।

ইউরোপ সম্পর্কে বলা যায় সে ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক শক্তিতে আমেরিকার প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। ১৯৯৭ সালের পর থেকে তারাই বিশ্বের প্রধান উন্নয়নের কেন্দ্র- যেখানে আমেরিকার উন্নয়ন ঋণাত্মক এবং জাপান মন্দা আক্রান্ত। ফলে নতুন করে তারাই এবার ছড়ি ঘোরাবে এবং যেহেতু ইউরোপ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তারাই আমেরিকার প্রধান শত্রু হয়ে উঠবে। বিরোধ ইতিমধ্যেই গভীর হয়ে উঠেছে। কিছু কিছু নিপীড়িত দেশ যে আজ আমেরিকা বিরোধী হয়ে উঠছে তা তাদের স্বাধীন স্বতন্ত্র নীতির জন্য নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপ ও জাপান (প্রধানত ইউরোপ) এর কাছাকাছি আসায়।

বাস্তবিক ফ্রান্স সারা বিশ্ব জুড়ে কূটনৈতিক দিক থেকে ক্রমাগত মার্কিন নীতিগুলোর বিরোধিতা করছে। অসমসত্ত্বতা (সাক্ষী ব্রিটেন) এবং স্বতন্ত্র সামরিক শক্তির অভাবই ইউরোপের দ্বিধাগ্রস্ততার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে (আমেরিকার তুলনায়), তবুও আরও গভীরভাবে সংহত ইউরোপীয় যদি ভেঙে পড়া রাশিয়ার শক্তিশালী সামরিক শক্তির সঙ্গে মিলিত হয় তবে তা আগামী দিনে আমেরিকার প্রধান বিপদ। আজকে, এই ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব অনবরত ছায়া যুদ্ধের মধ্যে এবং সারা পৃথিবী জুড়ে আরও সামরিকীকরণ ও উত্তেজনার মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাই তার প্রভাবাধীন অঞ্চলে দাদাগিরি অক্ষুন্ন রাখতে পেশি শক্তির আস্ফলন চালিয়ে যাবে। আজকের পৃথিবীতে ঘনীভূত সংকট সমস্ত দ্বন্দ্বগুলোকে প্রকট করে তুলছে এবং বিপ্লবের জন্য অনুকুল অস্তুগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। সমাজের পচন এমন সর্বগ্রাসী হয়ে এর আগে কখনও পরিব্যাপ্ত হয়নি। পরিবর্তনের জন্য এত তীব্র চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা এর আগে কখনও প্রকাশ পায়নি। দূভার্গ্যবশত, আজ এমন কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই যা বিশ্বের জনগণকে উদ্দীপ্ত করতে পারে।এতৎসত্ত্বেও সমাজের সমস্ত ব্যাধি তা সে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক যা-ই হোক না কেন তার প্রতিকার একমাত্র সাম্যবাদের মধ্যেই নিহিত আছে এবং তাকেই মাও এবং মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব আরও সমৃদ্ধ করেছে। একমাত্র যে শক্তি কার্যকরীভাবে সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করতে পারে তা গড়ে উঠেছে গণযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করেই।

(২) বিশ্ব পরিস্থিতিতে গণযুদ্ধের প্রয়োগ
সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংকটের মধ্যে ফ্যাসিবাদ আবার সারা পৃথিবী জুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। একদিকে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এবং পার্টি গড়ে উঠছে, অন্যদিকে সরকার এবং রাষ্ট্র ক্রমশ দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠছে। বলপ্রয়োগের ব্যবস্থাকে উন্নত করা হচ্ছে; উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জাল দেশগুলোকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে; জাতপাত, জাতিদাম্ভিকতা, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি ফ্যাসিস্ট গুন্ডাবাহিনীর জন্য উর্বর জমি তৈরি করেছে। এই পরিমণ্ডলে যেখানে শাসকশ্রেণীর হাতে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রযন্ত্র রয়েছে, রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থা সেখানে নীতিগতভাবে গণযুদ্ধই একমাত্র পারে গেরিলা যুদ্ধ প্রয়োগ করে শত্রুর কার্যকরী মোকাবিলা করতে। এই কথা বহু বছর আগে কেবলমাত্র কমিউনিস্টরা নয় অন্যান্য শক্তিও বুঝতে পেরেছে।

বাস্তবিক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিজমের উত্থানের সময় থেকেই গ্রামে-শহরে জনগণ তাদের মোতাবিলা করেছিল সারা ইউরোপ জড়ে এবং নিদির্ষ্ট করে স্পেনে এবং ফ্রান্সে পার্টির কর্মীরা কার্যকরীভাবে গেরিলা পদ্ধতিতে ফ্যাসিস্টদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। সেখানে কমিউস্টিরা ছাড়া দেশপ্রেমিকরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকী যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, যে সমস্ত জাতীয় মুক্তি আন্দোলন গেরিলা পদ্ধতিকে এবং গণযুদ্ধের নীতিকে কাজে লাগিয়েছিল তারাই লড়াইকে ধরে রাখতে পেরেছিল। তাদের মধ্যে ইরিত্রয়া, সোমালিয়া, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর এমনকী ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আই. আর. এন কিংবা সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগান জনগণকে সশস্ত্র করে এবং গেরিলা রণকৌশল অনুসরণ করে কয়েক দশক ধরে তাদের সংগ্রাম ধরে রেখেছিল।

যেখানে যেখানে তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল, তা তাদের ভুল সামরিক কৌশলের জন্য নয়, বরঞ্চ তাদের অসর্বহারা এবং আত্মসমর্পণবাদী রাজনৈতিক নীতির জন্য। মাও বলেছেন, আজকের দুনিয়ায় কোনো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনই সফল হবে না, যদি না তা সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তবুও গণযুদ্ধ এবং গেরিলা রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে তারা কার্যকরীভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে কয়েক দশক চালিয়ে যেতে পেরেছিল। ভারতের ক্ষেত্রে উত্তর- পূর্বাঞ্চলের, কাশ্মীরের সংগ্রামী জাতিসত্তাগুলো এবং শ্রীলঙ্কায় এল.টি.টি.ই. কয়েক দশক ধরে তাদের সংগ্রাম জিইয়ে রাখতে পেরেছে। কেবলমাত্র চীন বিপ্লবের সাফল্যই গণযুদ্ধের সঠিকতা প্রমাণ করেনি; বরং তার পর থেকে সমস্ত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এটা শাসকশ্রেণী এবং সাম্রাজ্যবাদকে চরম আঘাত হানার এক অমোঘ অস্ত্র। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রথাগত যুদ্ধের পদ্ধতি এবং জঙ্গি কাজকর্মকে সহজেই গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। আজকে যদি উন্নত রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করে পরাস্ত করতে হয়, তবে জনগণকে গণযুদ্ধের মাধ্যমে গেরিলা পদ্ধীততে সংগঠিত করতে হবে।

সম্প্রতি, গণযুদ্ধই পেরেছে সাম্রাজ্যবাদীদের অন্তরে মৃত্যুভয় জাগাতে। ভিয়েতনাম এবং আফগানিস্থানে অপমানকর পরাজয়ের পর আজকে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আর সামরিক শক্তির জোরে কোনো ক্ষুদ্র এবং অসহায় দেশকে দখল করতে সাহস করে না। সোমালিয়া থেকে তাড়াহুড়ো করে মার্কিন সৈন্য অপসারণের মধ্যে এই সত্যই প্রকাশ পেয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপনাস্ত্র প্রয়োগ কৌশল এবং অতি উন্নত আধুনিক সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও, গণযুদ্ধের নীতি সর্বশেষে তাদের কাগুজে বাঘ প্রমাণ করেছে।

চলবে… তিন পর্বে সমাপ্য!

১ thought on “মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব এক

  1. পড়া শুরু করেছি। শেষ হলে
    পড়া শুরু করেছি। শেষ হলে কন্টেন্টের বিষয়ে মতামত দিব। বিষয় বিবেচনায় নিঃসন্দেহে লেখাটার গুরুত্ব অসীম। কারণ এটা ভারতের মাওবাদী পার্টির যুদ্ধ বিষয়ক একটা লেখা কেবল নয়, বরং এটা হচ্ছে যুদ্ধকালীন একটা পার্টির যুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা। এর বাস্তব গুরুত্ব সীমাহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *