প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে ঈশ্বরের ধারনা……………………………………(২)

যোগ দর্শন: যোগ দর্শন ঈশ্বর অস্তিত্বকে স্বীকার করেছে। এ দর্শন সাংখ্য দর্শনের অনেক তত্ত্ব, যেমন পুরুষ, প্রকৃতি, বুদ্ধি ইত্যাদি পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব ছাড়াও অতিরিক্ত ঈশ্বর তত্ত্বকে স্বীকার করেছে। এজন্য একে সেশ্বর সাংখ্য বলা হয়। যোগদর্শন মতে- ঈশ্বর পরমপুরুষ। তার সাধারন পুরুষের মতো রাগ, অবিদ্যা, দ্বেষ, মৃত্যুভয় ইত্যাদি থেকে মুক্ত। অর্থাৎ তিনি সবকিছুর উর্দ্ধে।

যোগ দর্শন: যোগ দর্শন ঈশ্বর অস্তিত্বকে স্বীকার করেছে। এ দর্শন সাংখ্য দর্শনের অনেক তত্ত্ব, যেমন পুরুষ, প্রকৃতি, বুদ্ধি ইত্যাদি পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব ছাড়াও অতিরিক্ত ঈশ্বর তত্ত্বকে স্বীকার করেছে। এজন্য একে সেশ্বর সাংখ্য বলা হয়। যোগদর্শন মতে- ঈশ্বর পরমপুরুষ। তার সাধারন পুরুষের মতো রাগ, অবিদ্যা, দ্বেষ, মৃত্যুভয় ইত্যাদি থেকে মুক্ত। অর্থাৎ তিনি সবকিছুর উর্দ্ধে।
যোগ দর্শনের প্রবর্তক পতঞ্জলি ঈশ্বর সম্পর্কে বলেছেন- অবিদ্যা, অস্মিতা প্রভৃতি পঞ্চ ক্লেশ, কর্ম, বিপাক ও আশয় থেকে যে পুরুষ মুক্ত, তিনিই ঈশ্বর। যোগ দার্শনিকগণের মতে- ঈশ্বর সর্বদোষমুক্ত, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং সর্বত্র বিরাজমান। তিনি নিত্য ঐশ্বর্যশালি, পূর্ন অনাদি ও অনন্ত। তিনি জগতের শাসক। ঈশ্বরই পরমগুরু, এমনকি তিনি মুক্ত পুরুষদেরও গুরু।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে দার্শনিকগণ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করেছেন-
১. বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্রে ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্পষ্ট উক্তি আছে। যেহেতু বেদ, উপনিষদ অভ্রান্ত। সেহেতু ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করতেই হবে।
২. যে সব পদার্থের মাত্রাভেদ আছে, তাদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্প স্তর থাকবেই; যেমন আয়নের দিক থেকে পরমানু ক্ষুদ্রতম এবং আকাশ বৃহত্তম। তেমনি জ্ঞান ও শক্তির ক্ষেত্রেও মাত্রাভেদ আছে। অর্থাৎ কারো বেশি কারো কম। সুতরাং এমন একজন পুরুষ আছে যার জ্ঞান ও শক্তি সর্বোচ্চ সীমায়। তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। এবং এই পুরুষই হলো ঈশ্বর।
৩. যোগ দার্শনিকগণের মতে- প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনের ফলেই জগতের অভিব্যক্তি এবং বিয়োগের ফলে বিনাশ। কিন্তু প্রকৃতি ও পুরুষ বিপরীতধর্মী; যেমন পুরুষ সচেতন কিন্তু প্রকৃতি অচেতন। এ দুয়ের মিলন স্বাভাবিকভাবে হতে পারে না। প্রশ্ন উঠে, বিরুদ্ধধর্মী এ দুয়ের মিলন বা বিয়োগের জন্য দায়ী কে? যোগ দার্শনিকরা বলেন- কোন সচেতন, সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ পুরুষের সাহায্যে এই সংযোগ ও বিয়োগ সংগঠিত হয়। এই মিলন ও বিয়োগসাধনকারি পুরুষই ঈশ্বর।
৪. জীব তার অদৃষ্ট অনুসারে জন্ম- মৃত্যুর অধীন। জীবের জ্ঞান সিমিত বলে তার নিজে অদৃষ্ট সম্পর্কে তার কোন সম্যক জ্ঞান থাকে না। তাই সে নিজের অদৃষ্টকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। অদৃষ্ট হলো জীবের কর্মজাত শক্তি ও অচেতন। এবং প্রকৃতিও অচেতন। এই অচেতন অদৃষ্ট ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রনের জন্য অবশ্যই কোন সচেতন, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান পুরুষের প্রয়োজন; এই পুরুষই ঈশ্বর।
ন্যায় দর্শন:
ন্যায় দর্শন মতে আত্মা দুই প্রকার; জীবাত্মা ও পরমাত্মা। পরমাত্মাই হলো ঈশ্বর। ঈশ্বর সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। তিনি পরমানু, দেশ, কাল, আকাশ, মন ও আত্মার সাহায্যে জগত সৃস্টি করেছেন। এই পদার্থগুলো ঈশ্বরের ন্যায় নিত্য; ঈশ্বর এগুলো সৃস্টি করেন নি। অর্থাৎ জগত সৃস্টির পূর্বে এগুলোর অস্তিত্ব ছিল এবং ধ্বংসের পরেও থাকবে। সুতরাং ঈশ্বর জগত সৃস্টির উপাদান কারন নয়; নিমিত্ত কারন। কুম্ভকার যেমন মাটির সাহায্য ঘট তৈরি করেন, তেমনি ঈশ্বর এসব নিত্য দ্রব্যের সাহায্য জগত সৃস্টি করেছেন। তিনি জগত রক্ষা করেন, প্রয়োজনবোধে ধ্বংসও করবেন। এজন্য তাকে জগতের স্রস্টা, রক্ষক ও সংহারক বলা হয়।
ন্যায় দার্শনিকগণের মতে- ঈশ্বর এক, অসীম ও নিত্য। তার সৃস্ট জগত তার দেহ স্বরুপ, আর তিনি আত্মা। জীবের সাথে তার সম্পর্ক পিতা- পুত্রের মতো। জীবের অতীত কর্মানুসারে তাকে কর্মে নিযুক্ত করেন। জীব কর্মক্ষেত্রে আংশিক স্বাধীন। ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে তাদের মুখ্য যুক্তি হলো-
১. কার্য-কারন সম্পর্কিত যুক্তি: চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি যৌগিক পদার্থ। এগুলো যেহেতু সাবয়ব ও সীমিত পরিসরযুক্ত। সেহেতু এদের কারন থাকবেই। কারন আবার দুই প্রকার; উপাদান কারন ও নিমিত্ত কারন। এদের উপাদান কারন হলো- ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ। কিন্তু নিমিত্ত কারন কে? এর নিমিত্ত কারন অবশ্যই এমন একজন হবে যার উদ্দেশ্য সাধনের ইচ্ছা ও ক্ষমতা আছে। তাকে অবশ্যই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান হতে হবে। এবং এই নিমিত্ত কারনই হলো ঈশ্বর।
২. ‘অদৃস্ট’ ভিত্তিক যুক্তি: জগতে সকল জীবে অবস্থা একরুপ নয়। কেউ ধনী, কেউ গরিব। কেউ পন্ডিত, কেউ মুর্খ। জীব তার কর্মফল অনুসারে ফলভোগ করেন। জীবের কর্মফল যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা হলো অদৃস্ট। কিন্তু অদৃস্ট হলো জড় ও অচেতন, সে কিভাবে জীবের কর্মফলদাতা হতে পারে। সুতরাং অবশ্যই কোন সচেতন, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান সত্তা অদৃস্টের পরিচালক। এই সত্তাই হলো ঈশ্বর।
৩. বেদের কর্তারুপে: নৈয়িকদের মতে- বেদকে সবাই অভ্রান্ত ও প্রামান্য গ্রন্থ হিসেবে মান্য করে। কিন্তু বেদ যে অভ্রান্ত ও প্রামন্য এর পক্ষে যুক্তি কি? তাদের মতে- বেদের রচিয়তাই বেদের প্রামাণ্যের কারন। আমরা বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস করি বলেই, বিজ্ঞান বিশ্বাস করি। সেভাবেই বেদের রচিয়তাকে বিশ্বাশ করি বলেই বেদকে বিশ্বাস করি। কিন্তু ঈশ্বরেই যে বেদের রচিয়তা এর প্রমান কি? কোন মানুষের পক্ষে কোন অভ্রান্ত গ্রন্থ রচনা করা অসম্ভব। কারন মানুষের ভুল-ভ্রান্তি থাকবেই। সে জন্য বেদের রচিয়তা অবশ্যই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। এবং তিনিই ঈশ্বর।
শ্রুতির যুক্তি: বেদ, উপনিষদ ও ভাগবদগীতায় স্পষ্ট করেই ঈশ্বরের উল্লেখ আছে। কৌষিতকী উপনিষদে বলা আছে- ঈশ্বর সকল পুরুষের কর্তা ও এই জগতের স্রস্টা। ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- আমি এই জগতের পিতা, মাতা, পিতামহ, এবং একমাত্র জ্ঞেয় ও পবিত্র বস্তু, ইত্যাদি। এই সব শ্রুতি ও স্মৃতিবাক্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। অতএব ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বীকার করতেই হয়।

বৈশেষিক দর্শন:
বৈশেষিক দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি কণাদ তার বৈশেষিক সূত্রে ঈশ্বর সম্পর্কে কোন তত্ত্ব দেন নি। কিন্তু পরবর্তীতে শঙ্কর মিশ্র, প্রশস্তপাদ, শ্রীধর ইত্যাদি ভাষ্যকারেরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, ঈশ্বর বেদের রচিয়তা, তিনি অনন্ত, সর্বজ্ঞ ও নিত্য। তিনি সর্ব প্রকার রাগ দ্বেষ বিবর্জিত, তিনিই জগতের নিমিত্ত কারন আর পরমানু জগতের উপাদান কারন।
মীমাংসা দর্শন:
মীমাংসা দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি জৈমিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন নি। প্রাচীন মীমাংসকদের মতে- কর্ম-নিয়ম অনুসারেই জীব তার কর্মফল ভোগ করে; জগত স্রস্টারুপে, কর্মফলদাতা রুপে কিংবা বেদের রচিয়তা রুপে ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নেই। উপরন্তু তাদের প্রশ্ন- ঈশ্বর যদি জগত স্রস্টা হন তাহলে তিনি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। যেহেতু তিনি কাউকে সুখি কাউকে দুঃখী করেছেন। কিন্তু ঈশ্বরের এ দোষ থাকতে পারে না।
কিন্তু মীমাংসা দর্শন বেদে বিশ্বাসী। তারা বিভিন্ন দেবতার নামে যজ্ঞ করতেন। তাদের কাছে যজ্ঞ-বিধাতা কেবল গুনবাচক মন্ত্র। ঈশ্বরের কোন স্থান তাদের কাছে ছিল না।
বেদান্ত দর্শন:
বেদান্ত শব্দের অর্থ হলো- বেদের অন্ত বা শেষ। বেদের শেষ হলো উপনিষদ; এখানে বেদের গূঢ় তাৎপর্য সম্বলিত দার্শনিক আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রচিত উপনিষদগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সামন্জস্য করে বাধরায়ন ব্রক্ষ্মসূত্র রচনা করেন। অনেক ভাষ্যকার এগুলোর ব্যাখা করেন। তন্মধ্যে শঙ্কর ও রামানুজনের ভাষ্য জনপ্রিয়তা পায়। দুজনই অদ্বৈতবাদী হলেও এদের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
শঙ্করের কেবলাদ্বৈতবাদ: কেবলাদ্বৈতবাদীগণ এক ব্রক্ষ্ম ছাড়া কারো অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি। তাদের মতে দুই প্রকার দৃষ্টিভঙ্গী হতে ব্রক্ষ্মকে বিচার করা যায়; ব্যবহারিক ও পরমার্থিক দৃষ্টিভঙ্গী। ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গীতে জগত সত্য এবং ব্রক্ষ্মই এর স্রস্টা, রক্ষক ও সংহারক। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ইত্যাদি সদগুনের অধিকারি। আর এই গুনবান ব্রক্ষ্মই সদগুন ব্রক্ষ্ম বা ঈশ্বর।
পরমার্থিক দৃষ্টিতে ব্রক্ষ্ম নিরাকার ও নির্গুন। তিনি জগতের স্রস্টা, রক্ষক, সংহারক কিছুই নন। এই মতে জগত মিথ্যা এবং ব্রক্ষ্মই সৎ। তাই জগতের স্রস্টারুপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না।
রামানুজের বিশিষ্টাবাদ: বিশিষ্টাবদানুসারে ব্রক্ষ্ম এক ও অদ্বিতীয়। তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও সৎ গুনের অধিকারী। তিনি জগতের স্রস্টা, রক্ষক ও সংহারক। তার কোন অসৎ গুন নেই বলে তাকে নির্গুন বলা হয়। তিনিই জগতের উপাদান ও নিমিত্ত কারন। তার কোন অভাব নেই তাই তিনি অভাব পুরনের জন্য জগত সৃস্টি করেন নি। এই জগত তার লীলা মাত্র। রামানুজের মতে ঈশ্বরের করুনা ছাড়া জীবের মুক্তি অসম্ভব।
প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকগণের মধ্যে অনেকেই ঈশ্বরের প্রয়োজন অনুভব করেছেন, আবার অনেক তার প্রয়োজন অনুভব করেন নি। সবাই তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোন থেকে তাদের মতবাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। অন্যরা আবার যুক্তিখন্ডন করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *