খামের পেছন দিকটা

এক

এই রুমটা বেশ বড়। গার্ড পড়েছে চারজন। অন্যান্য সব হলে দুজন করে গার্ড পড়লেও এই রুমটাতে চারজন স্যারের তদারকির ব্যাপারটা কেউই খুব সহজভাবে নিল না। সেক্ষেত্রে রুমটা যতই বড় হোক । পরীক্ষা শুরু হতে আর দশ মিনিট বাকি। খুব গভীর মনোযোগের সাথে স্কেল এপাশ ওপাশ করে খাতায় মার্জিন টেনে যাচ্ছে রাশেদ।


এক

এই রুমটা বেশ বড়। গার্ড পড়েছে চারজন। অন্যান্য সব হলে দুজন করে গার্ড পড়লেও এই রুমটাতে চারজন স্যারের তদারকির ব্যাপারটা কেউই খুব সহজভাবে নিল না। সেক্ষেত্রে রুমটা যতই বড় হোক । পরীক্ষা শুরু হতে আর দশ মিনিট বাকি। খুব গভীর মনোযোগের সাথে স্কেল এপাশ ওপাশ করে খাতায় মার্জিন টেনে যাচ্ছে রাশেদ।

রাশেদের বাম পাশের সিটটা এখনও খালি পড়ে আছে। কেউ এসে বসেনি তাতে। রাশেদ পুরো ক্লাস জুড়ে একবার নজর বুলিয়ে গেল। শুধু মাত্র তার পাশের সিটটাই ফাঁকা পড়ে আছে। পরীক্ষার প্রথম দিন সবচেয়ে দেরী করা স্টুডেন্টটাও আগে এসে বসে থাকে পরীক্ষার হলে। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হতে আর পাঁচ মিনিট বাকি থাকলেও তার পাশের ছাত্রটির খবর নেই। তার পাশে এসে ছাত্র বসবে না ছাত্রী বসবে সে বিষয় নিয়েও একটু আকটু চিন্তায় আছে রাশেদ। যদিও তার প্রস্তুতিতে কোনোরকম ঘাটতি নেই। তবুও পাশে ভালো স্টুডেন্ট বসলে যে একটু আকটু হেল্প পাওয়া যায় সেটা সবার মতো রাশেদও ভালো করেই জানে।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট পর যে মেয়েটা হুড়মুড় করে ক্লাসে ঢুকে তার সিট খুঁজতে লাগল সেই মেয়েটাই যে এসে তার পাশে বসতে যাচ্ছে তা আর বুঝতে রাশেদের সময় লাগল না। তার একটু মন খারাপও হল বটে। কেননা মেয়েরা দেখাদেখির ব্যাপারে বরাবরই কেমন যেন হয়ে থাকে। তা রাশেদ আরেকটা পরীক্ষা দিতে গিয়ে টের পেয়েছিল। মেয়েটা যা উত্তর বলেছিল তার অর্ধেকই ছিল ভুল কিন্তু রাশেদের কাছ থেকে সে ফুল মার্কসই দেখে লিখেছিল। ফলাফল প্রকাশের দিন রাশেদের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মেয়েটাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে বা কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিতে কিন্তু শেষমেশ করা হয়নি। সেই থেকে যেকোন পরীক্ষায় মেয়েদের সুমিষ্ট কণ্ঠকে এড়িয়ে চলে রাশেদ।

‘আপনার কাছে এক্সট্রা কলম আছে ?’
প্রথম বাক্য বিনিময়েই মেয়েটার কাছ থেকে এমন ধারমূলক কোন প্রশ্ন মোটেই আশা করেনি রাশেদ। কিছুটা অবাক হলেও নিজেকে যতটুকু পারা যায় সাবলীল রেখে হাসি হাসি মুখে রাশেদ বলল, ‘জ্বী আছে’।

মেয়েটা কলম পেয়েই রেলগাড়ির গতিতে লেখা শুরু করেছে। প্রশ্নটাও বোধহয় ঠিকমত দেখছেনা। রাশেদ অস্বস্তিবোধ করছে। পরীক্ষার প্রথম দিনেই যে দেরীতে হলে ঢোকে, সাথে কলম থাকে না, হাত দিয়ে মার্জিন টানে তা আর যাই হোক ভালো কোন ছাত্রীর লক্ষণ না। তার সাথেই কেন এমন হয় ? বরাবরের মতো এরূপ একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লাগল রাশেদ। ‘ওয়ান নং কোয়েশ্চেন অ্যান্সার’ এটুক লিখেই সে বসে আছে। তার কেন জানি মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। মেয়েটাকে তার মোটেও সহ্য হচ্ছে নাহ। সে আগের লাইনটা কেটে আবার লিখল ‘অ্যান্সার টু দা কোয়েশ্চেন নং ওয়ান’। কাটাকাটি দিয়েই তার প্রথম পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। এটা ভেবে তার মেজাজ আরও বিগড়ে যাচ্ছে।
ওদিকে মেয়েটা তার কপালের ঘাম মুছবে নাকি লিখবে সেটা নিয়ে রাশেদ নিজেই চিন্তিত। তার দুহাত সমান ভাবেই চলছে। বাম হাত দিয়ে ঘাম মুচ্ছে তো ডান হাত দিয়ে লিখছে। মেয়েটা মনে হয় খুব জার্নি করে এসেছে। তাছাড়া কেন জানি অস্বাভাবিক লাগছে মেয়েটাকে! রাশেদ মেয়েটার আপাদমস্তক একটু সন্দেহ চোখে দেখছে। একটা স্বাভাবিক মেয়ের গড়ন যেরকম থাকে তার চেয়ে মেয়েটাকে তার একটু ভিন্ন মনে হতে লাগল। হঠাৎ সে কিছুটা চমকে উঠল। মেয়েটার পেটটা সামান্য উঁচু মনে হতে লাগল তার কাছে।

দুই

বাস ধরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে রাশেদ। একটার পর একটা বাস চলে যাচ্ছে। সে একটাও ধরতে পারছে নাহ। প্রচুর ভিড়। দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে বাস ধরার অভ্যাস তার আছে তবে আজ আর তা ইচ্ছে করছে নাহ। একদিন দৌড়ে বাস ধরতে গিয়ে তার বাবার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রাশেদের সামনে দিয়ে যে লোকটা প্রাণপণে ছুটছিল বাস ধরার জন্য সেই ব্যক্তিটাই যে তার বাপ ছিল তা পেছন থেকে চিনতে রাশেদের মোটেও অসুবিধা হয়নি। কোনোমতে উঠে বাবা বাসের গেটে ঝুলছিল। এতো ভিড়ের মাঝেও সেদিন সে রাশেদকে পা রাখবার জায়গা করে দিয়েছিল বাসে।

‘আপনার কাছে ৫০ টাকা হবে?’
রাশেদ ঘুরে দেখল সেই মেয়েটি। তার অবাকের মাত্রা এবার স্কয়ার এ পরিণত হল।
‘আসলে তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়ে সিএনজিতে পার্সটা ফেলে এসেছি। সমস্যা নেই আপনার মোবাইল নাম্বার দিলে আমি টাকা লোড করে পাঠিয়ে দিব’
‘না না সমস্যা নেই। লোড করতে হবে নাহ’
টাকা হাতে নিয়েই সে বারবার নাম্বার চাচ্ছে রাশেদের। রাশেদ বারবার বলছে তার টাকাটার প্রয়োজন নেই তবুও মেয়েটা যেন তা শোধ করবেই। সেই রাশেদের দেয়া টাকার উপরই মেয়েটা কলম দিয়ে নাম্বার লিখতে লাগল। রাশেদ ভাবছে মেয়েটার মাথায় আদৌ কোন গণ্ডগোল আছে কিনা। পরে কার না কার হাতে টাকা যাবে আর ফোন আসবে রাশেদের নাম্বারে। এই টাকাটা হয়তো তার নাম্বার নিয়ে সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়াবে এখন।

তিন

ভাত খাওয়া আর মুভি দেখা রাশেদের ইদানিং নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। বেশ আয়েশ করে সে মুভি দেখতে বসে। ডানে পানির বোতল, বামে লবনের বাটি, সামনে ল্যাপটপ। এখন যে মুভিটা সে দেখছে তার নাম ‘দ্যা জাপানিস ওয়াইফ’। কুনাল বসুর গল্পে অপর্ণা সেনের ডিরেকশন। চিঠি নিয়েই পুরো সিনেমাটির কাহিনী। চিঠি বিষয়টা রাশেদের বেশ লাগে। কিন্তু এ যুগে চিঠির চল নেই। এ নিয়ে তার অনেক আফসোস। তার প্রায়ই মনে হয় চিঠির যুগে জন্মাতে পারলে বুঝি তার অনেক চিঠি লেখার সাধ পূরণ হতো। এই মোবাইল, ইন্টারনেট যুগের সাক্ষাৎপর্ব তার আর ভালো লাগে নাহ। টিপে দিলেই যার তার সাথে যোগাযোগ করা যায়, কথা বলা যায়। কিন্তু একদিন মানুষ কতো অপেক্ষা করত একটা চিঠির জন্য। মাসের পর মাস চলে যেত তবুও যখন চিঠি আসতো না প্রেয়সীর দুয়ারে তখন বিষণ্ণতায় আকাশ ঢাকলেও পরাণে যেন ভালোবাসা বেড়ে যেতো দিগুণ। সেই একটা চিঠির আশায় বেকার ছেলেটা বারবার ছুটে যেতো পোস্ট অফিসে। আজকাল যখন রাশেদ পোস্ট অফিসের সামনে দিয়ে যায় তখন একনাগাড়ে চেয়ে থাকে কতক্ষণ অফিসের দিকে। কি নীরব নির্জীবভাবে অফিসটা পড়ে আছে। কিন্তু এককালে এখানে ছিল কতো মানুষের ভিড়! কতো মানুষের পদচারণা! কতো মানুষ দূর দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসতো। খামটা পেয়েই কেউ ভ্যানিটি ব্যাগে লুকিয়ে ফেলত আবার কেউ বুক পকেটে। খুলতে যেন ইচ্ছেই হতো না। খুললেই তো পড়া হয়ে যাবে। আর পড়লেই তো শেষ হয়ে যাবে সব আকাঙ্খা। সব প্রেম। সব অনুভূতি। এসব ভাবতে ভাবতেই রাশেদের ফোন,

‘হ্যালো আসসালামু আলাইকুম’
‘আমি সপ্না’
‘কোন সপ্না?’
‘আমি সপ্না’
‘তাতো বুঝলাম। কিন্তু আমি তো সপ্না নামে কাউকে চিনিনা’
‘আপনি আমার কাছে ৫০ টা টাকা পান’
‘ও আচ্ছা আপনি!’
‘জ্বি। আমার নাম সপ্না’
‘আসলে আপনি এতো অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন যে নামটাও জানা হয়নি। বাই দ্যা ওয়ে আমি রাশেদ’
‘ও। আপনার টাকাটা ফ্লেক্সিলোড করেছি পেয়েছেন?’
‘খেয়াল করিনি। ম্যাসেজ চেক করা হয়না। পাঠিয়েছেন যেহেতু অবশ্যই এসেছে’
‘নাহ তবুও দেখুন যদি না সে !’
‘না আসলে সমস্যা নেই’
‘কিন্তু আমার সমস্যা আছে’
‘কিরকম ?’
‘টাকাটা পুরোপুরি গচ্ছা যাবে তাহলে। তাছাড়া টাকাটা আপনি পান আমার কাছে’
‘আপনি তো ফোনে বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু সামনাসামনি এতো অস্থির অস্থির হয়ে পড়েন কেন?’
‘আমি সবার সামনে ফ্রি হতে পারিনা’
‘কেউ ফ্রি হতে না পারলেই যে অস্থির হয়ে যায় জানতাম না’
‘এখন তো জানলেন?’
‘হুম। আচ্ছা আপনি ওরকমভাবে নকল করছিলেন কেন? যেকোনো সময় ধরা খেতে পারতেন’
‘আপনি দেখেছেন?’
‘হুম। না দেখার তো কোন কারণ নেই। আপনার পাশে আমিই ছিলাম। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলাম সামনের দিকে যদি কোন স্যার এসে আবার দেখে না ফেলে। ভাবছিলাম কোন স্যার এদিকে আসলেই আপনাকে সতর্ক করব। কিন্তু সৌভাগ্যবশত কোন স্যার আসেনি এদিকে’
‘আপনি কি আমার নকল পাহারা দিচ্ছিলেন নাকি?’
‘নাহ ঠিক ওরকম না। আপনি যেভাবে নকল করছিলেন আমি নিজেই আমার পরীক্ষায় ধ্যান দিতে পারছিলাম না’
‘আপনার ধ্যানে বিরক্ত করার জন্য সরি’
‘এখন সরি বলে লাভ নেই। পরীক্ষাই তো শেষ! আচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে’
‘জ্বি করতে পারেন’
‘আপনি কি অসুস্থ শারীরিকভাবে?’
‘আমি শারীরিক এবং মানুষিক দু দিক থেকেই অসুস্থ’
‘কিরকম?’
‘কোনটা আগে বলব? শারীরিক না মানুষিক?’
‘শারীরিক’
‘আমি প্রেগন্যান্ট’
কথাটা শুনে মুভিতে পজ দেয়ার পাশাপাশি রাশেদের খাওয়াতেও পজ দিতে হল। তার ধারণা এবং পরীক্ষার হলে চমকে ওঠা মিলে গেল। রাশেদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে নাহ।

‘আচ্ছা, আমি খাচ্ছি। আমি আপনাকে দশ মিনিট পর ফোন দেই? এটা কি আপনার নাম্বার?’
‘জ্বি’

এরপর এরকম অসংখ্যবার দশ মিনিট পর পর কথা হতে থাকে রাশেদ-সপ্নার। সপ্না নামের জীবনটা সম্পর্কে সে অনেককিছু জেনে যায়। শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি ওখানে ইতি ঘটলেও মানুষিক অসুস্থতা নিয়ে চলে তাদের দীর্ঘ ফোনালাপ। এরপর তাদের নিয়মিত পরীক্ষা দেয়ার পাশাপাশি হতে থাকে নিয়মিত কথোপকথন।

চার

মায়া এমনই এক জাল সেই জালে একবার পা পড়লে তাৎক্ষণিক ভাবে ওঠার আর কোন রাস্তাই অবশিষ্ট থাকে না। সপ্নার সেই মায়াজালে রাশেদ আটকে যায়। খুব ভালোভাবেই আটকে যায়। প্রবল মায়া গ্রাস করতে থাকে তাকে। সপ্নার প্রতি তার অন্যরকম একটা সফট কর্নার তৈরি হয়ে যায় মনের মধ্যে। প্রচুর সিম্প্যাথি কাজ করতে থাকে সপ্নার জন্য। সপ্না তার পুরো জীবনকাহিনী জানায় রাশেদকে। রাশেদ প্রতিটা রাত গভীরভাবে শুনতে থাকে সে কথা। জীবনের কথা। বাস্তবতার কথা।

সপ্নার সাথে যার প্রেমের সম্পর্ক সেই ছেলেটা যে আস্তে আস্তে পিছলে পার পাবার চেষ্টা করছে সপ্নার কাছ থেকে, তা আর সবার মতো সপ্না নিজেও খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছে নাহ। যেমন কিছু করতে পারেনি প্রেগনেন্সি পিল খেয়েও। পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠবার আগেই ঘটে যায় অনেক কিছু। প্রেগনেন্সি ব্যাপারটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে নতুন ভীত গড়লেও সপ্নার ব্যাপারে তা হচ্ছে পুরোপুরি উল্টো। ছেলেটা অ্যাবোরশন করার কথা বললেও সপ্না তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে। একটা জীবন নষ্ট করা সপ্নার পক্ষে কখনই সম্ভব না। সে এখন একজন মা। একজন মা হয়ে সন্তানকে মেরে ফেলা তো দূরে থাক চেষ্টাও করতে চায় না সে কোনোদিন।

সপ্নার মা বাবা থাকে গ্রামে। এসব ব্যাপারের কিছুই তারা জানেন না। খুব সচ্ছল পরিবার থেকে সপ্না উঠে আসেনি। ছোটকাল থেকেই বাস্তবতাকে লালন করে, কষ্টকে পুঁজি করে বড় হয়েছে। ঢাকায় এসে ক্যারিয়ার গড়ার সপ্নে বিভোর সপ্নার জীবনে হঠাৎ এমন করে শ্যাওলা ধরে যাবে তা একটিবারের জন্যও কল্পনা করেনি সে। কয়েকজন বান্ধবীকে পুরো বিষয়টা শেয়ার করলেও তাদের কোনোরকম পরামর্শ সপ্নাকে ছুঁয়ে যায়নি।

এদিকে রাশেদ আস্তে আস্তে ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে সপ্নার। রাশেদের জীবনে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় না থাকলেও সে তার জীবনের ছোট্ট ছোট্ট কাহিনীগুলোকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে সপ্নার কাছে। এতে সপ্না কতটুকু আকর্ষিত হচ্ছে তা খুব একটা বোঝা যায় নাহ। অথবা বুঝতে রাশেদের বেশ সময় লাগছে।

এরকম একটা মেয়ের প্রতি রাশেদ এভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে তা সে কখনোই ভাবেনি। মেয়েটার দুঃখ, কষ্ট, সহজবোধ্যতা এভাবে ছুঁয়ে যাবে রাশেদকে তা সে অসতর্কতার বশেও খেয়াল করেনি কখনও। একটা প্রেগন্যান্ট মেয়েকে নিয়ে সে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। পার্কে বসে। বাদাম চিবোয়। আশেপাশের সবাই সাধারণভাবেই তাদেরকে কোন দম্পত্তি মনে করছে অথবা কপোত-কপোতী। বা অনেকেই ভাবছে একটা প্রেগন্যান্ট মেয়ের সাথে ছেলেটা রাস্তা ঘাটে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। আবার অনেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করছে নাহ। কিন্তু যারা করছে তারা কি ভাবছে এ নিয়ে রাশেদের কোন চিন্তা নেই। সে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে।

পাঁচ

‘দেখো রাশেদ এটা সম্ভব না’
‘কেন সম্ভব না?’
‘তুমি একটুও ভবিষ্যৎ চিন্তা করছো নাহ’
‘আমি তোমাকে বিয়ে করব’
‘তুমি পুরোপুরি ভ্রমের ভেতরে আছো’
‘এটা ঠিক যে ভ্রমে আছি। কিন্তু এই ভ্রমের সৃষ্টিতে তুমি ছিলে সমাপ্তিতেও তুমি থাকবে আর মাঝখানটাতে জীবন’
‘আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারি নাহ এখন। খুব করে চাইলেও নাহ’
‘ওই ভণ্ড ছেলেটার কারণে মানুষের উপর বিশ্বাস কেন হারাচ্ছ?’
‘ও ভণ্ড নাহ’
‘তাহলে এখন কাউকে বিশ্বাস করতে কেন পারছো না?’
‘জানি না’
‘আমি আগেও বলেছি এই উত্তরটা আমার খুব অপছন্দ’
‘দেখো, ভবিষ্যৎ চিন্তা কর। পরে এ সবকিছু নিয়ে একদিন না একদিন ঝামেলা হবেই। কথা উঠবেই। এই সন্তান তোমাকে বাবা জানবে। কিন্তু বিষয়টি তো পুরোপুরি মিথ্যা’
‘মাঝে মাঝে মিথ্যার কার্যকারিতা সত্যের চেয়েও অর্থবহ হয়ে ওঠে, উপসংহার টেনে দেয়’
‘যেখানে সূচনাতেই ভুল থাকে সেখানে উপসংহার টেনে কি লাভ?’
‘এতো কমপ্লিকেটেড চিন্তা কেন করছো?’
‘আমার জীবনটাই তো এখন কমপ্লিকেটেড’
‘তুমি তা আরও কমপ্লিকেট করছো’
‘একটা প্রেগন্যান্ট মেয়ের সাথে তুমি রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছ। মানুষ যা তা ভাবছে। তোমার কাছে এসব সহজ মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে নাহ’
‘তাই বলে দেখা করা বন্ধ করে দেবে? সহজ ব্যাপারটাকেই তুমি জটিল করে তুলছো’
‘আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তুমি এই মায়া থেকে বেরিয়ে এসো’
‘মায়া থেকে বের হওয়া যায় নাহ, সাময়িক সরে আসা যায়’
‘তবে তাই কর’

ছয়

‘ভাইয়া আফনের চিঠি’
‘কিসের?’
‘জানিনা। তয় মনে অয় দুইদিন আগের। লেটার বাক্স চেক করতে আমার খিয়াল ছিল নাহ কাইলকার’
‘আচ্ছা ঠিকাছে’

প্রত্যেকবারই যখন কোন চিঠি আসে এই দারোয়ান ব্যাটা এসে পান চিবুতে চিবুতে একই কথা বলে। গত বছর আরেকটুর জন্য রাশেদের ইন্টার্ভিউটাই মিস হয়ে যেতো। ইন্টার্ভিউর লাস্ট ডেটের আগের দিন এসে পান চিবুতে চিবুতে চিঠিটা বাসায় দিয়ে গিয়েছিল। শিগগিরই রাশেদ কোন ইন্টার্ভিউ দেয়নি। তবে চিঠি কোত্থেকে আসল এসব ভাবতে ভাবতেই সে চিঠিটা খুলল,

রাশেদ,
তোমাকে আমি গ্রহণ করতে পারিনি। তুমি বলেছিলে মায়া থেকে বের হওয়া যায় না। সত্যিই আমি শুদ্রের মায়া থেকে বের হতে পারছিলাম না। চেষ্টা যে করিনি তা না। অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। শুদ্রের দোষও আমি দেবো নাহ। ওর পক্ষে এতো তাড়াতাড়ি আমাকে গ্রহণ করাটাও সম্ভব ছিল না। তাই তোমার কথামতোই সাময়িক চলে গেলাম। একদম সাময়িকের জন্য। আমি তার সাথে দেখা করেই একেবারে বিশুদ্ধরূপে ফিরে আসব তোমার কাছে। সাথে আমার সন্তানকে নিতে পারলাম না। ওকে রেখে গেলাম কোন এক দত্তকখানায়। আমার আর কিছু করার ছিল নাহ। সুখে থেকো।
– সপ্না

চিঠিটা পড়ে রাশেদের সবার প্রথম দারোয়ানের প্রতি মেজাজ গরম হয়ে গেল। ইচ্ছেমত কতক্ষণ দারোয়ানকে বকাবকি করে ওই অবস্থাতেই বেরিয়ে পড়ল। দারোয়ান যদি লেটারবক্স আগে চেক করত তো রাশেদও হয়তো ঠিক সময়ে চিঠিটা হাতে পেতো। তার পরনে থ্রি কোয়াটার প্যান্ট। সে ওই অবস্থাতেই সপ্নার হোস্টেলে গেল। সপ্না নেই। কোন বান্ধবীও খোঁজ দিতে পারল না। বরং জানতে পারল দুদিন ধরে তার কোন খোঁজ নেই।
সপ্নার এলাকার আশেপাশে সকল হসপিটালে সে খোঁজ করল। কোথাও সপ্না নামে কোন মেয়ে ভর্তি হয়নি। এরপর সে খুঁজতে লাগল দত্তকখানা। দত্তকখানা কোথায় আছে তা সে জানেও না ঠিকঠাক মতো। পুরো আগারগাঁও এলাকা সে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল দত্তকখানা। কিন্তু একটা দত্তকখানারও হদিস দিতে পারল না কেউ। তার এখন রাস্তায় বসে পড়তে ইচ্ছে করছে। যেন আকাশটা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়বে রাশেদের মাথায়। মাটি সরে যাবে পা থেকে। সপ্না এটা কি করল? কেন করল? নিজেকে শেষ করে কি সমাধান মিলে যায় তারপর?
ভার্সিটিতে গিয়েও সপ্নার কোন খোঁজ মিলল না। সে শূদ্র নামের ছেলেটাকে খুঁজতে লাগল। পাওয়া গেল নাহ। অনেক খোঁজ নিয়ে জানা গেল সে দু বছর আগে এখান থেকেই পাশ করে গেছে। এখানে সপ্নার কোন বান্ধবীকেও পাওয়া গেল নাহ। রাশেদ আবার গেল হোস্টেলে। কোন খোঁজ নেই। তার পরিবারকেও কেউ চেনে না এখানে।
বাসায় এসে গুগলে সার্চ দিয়ে ঢাকা শহরে যতগুলো দত্তকখানা আছে তার একটি তালিকা তৈরি করল। পরদিন সকালে তালিকা অনুযায়ী রওনা দিল রাশেদ। রাতে কি যেন একটা স্বপ্ন দেখেছে রাশেদ। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে নাহ সকালে।
কোনকিছুতেই কোন লাভ হল নাহ। এই ধূর্ত শহরে মানুষ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া খুব সহজ না।
রাশেদ আর তার মাঝে নেই। প্রচণ্ডভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। হঠাৎ উদয় হওয়া সুখগুলো মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। সে তো মনে প্রানেই চেয়েছিল সপ্নাকে। তবে এরকম কেন হল। তার মাঝে তো কোন কপটতা ছিল নাহ। মন দিয়ে চাইলে নাকি ঈশ্বরকেও পাওয়া যায় তবে সপ্না কেন হারিয়ে গেল।

এখন এরকম হাজারও প্রশ্ন নিয়েই রাশেদ বাঁচছে। সবকিছু থেকে রাশেদ অনেকদিন দূরে। ভার্সিটির আশেপাশেও নেই বহুদিন। ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল তার জীবন থেকে। সবকিছু এতো তাড়াতাড়ি না ঘটলেও পারতো। সেদিনের সেই পরীক্ষা, নকল, বাস স্টপে ফের দেখা এসব চোখ বুঝলেই সে স্পষ্ট দেখতে পায়। দু একটা দত্তকখানার খোঁজ মিললেও সেখানে গিয়ে কোন লাভ হয়নি। জোয়ার শেষ ও ভাটার শুরুতে পানি যেমন থমকে থাকে ঠিক সেভাবে থমকে আছে রাশেদের সময়। রাশেদের মুহূর্ত।

সাত

আজ রাশেদের বিয়ে। রাশেদের উদ্ভট চলাফেরা কিছুতেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না তার বাবা মায়ের কাছে। পরিবারের অনেকখানি চাপ আর মেয়েটার আগ্রহেই সবকিছু। মেয়েটার পরিবারের সাথে অনেক আগে থেকেই তার বাবা মায়ের সখ্যতা। ফলে প্রায়ই যাতায়াত ছিল। মেয়েটার সেই অবিরাম চেয়ে থাকাকে আজ প্রাধান্য দিতে হচ্ছে তাকে ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে। রাশেদেরও একটু বেরিয়ে আসা চাই এ আবর্ত থেকে। দিনে দিনে অসহ্য হয়ে উঠছে জীবন। এই দুবছরে মাঝে মাঝে তার নিজেরই আত্মহত্যাকে আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে হয়েছে প্রবলভাবে। এই ইচ্ছেকে দমন করতে তার বেশ কষ্ট হয়েছে কয়েকবার। ইচ্ছেটাকে পিষে ফেলতে চায় সে এবার।
মেয়েটাকে সবকিছু বলে দেয়ার চেষ্টা করেও আবার কি মনে করে যেন সে পিছিয়েছে। সে এই অধ্যায়টা কাউকে জানাতে চাচ্ছে নাহ হয়তো। একটি মাত্র বন্ধু ছাড়া সপ্নার বিষয়টি কেউ জানে না।

তারপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রত এগুতে থাকে।
কিছুদিন পর তারা জানতে পারে তারা কখনোই সন্তান নিতে পারবে না। সমস্যাটা কার সেটা নিয়ে রাশেদের স্ত্রীর সামান্য মাথা ব্যাথা উঠলেও রাশেদ এ ব্যাপারে নির্বিকার। দুজনের মধ্যে অনেক আলাপ আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্তে আসে বাচ্চা দত্তক নেবে। ডাক্তারের পরামর্শে তারা পুরান ঢাকার এক দত্তকখানায় যায়। সেখান থেকে তারা দুবছরের একটি শিশুকে দত্তক হিসেবে নেয়। বাচ্চাটার কোন নাম দেয়া হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, বাচ্চাটার নাম মেঘা। নামটা বেশ পছন্দ হয় রাশেদের।

রাতে সপ্নার দেয়া সেই চিঠিখানা খুলল রাশেদ। প্রায় অনেকদিন চিঠিখানা খোলা হয়নি। ছোঁয়া হয়নি। আধা ভাঁজ করা খামটা থেকে চিঠিটা আবার খুলল রাশেদ। প্রত্যেকবার পড়ার সময় তার অনুভূতিতে নতুনত্বের ছোঁয়া থাকে। পড়েই আবার খামের ভেতরে আলতোভাবে পুরে রাখল চিঠিটা। হঠাৎ চোখ গেল খামের পেছনের অংশে। এক লাইনে ছোট ছোট গুটি হাতে লেখা,
‘‘বাচ্চার নাম দিয়ে গেলাম মেঘা। আমি মেঘের মতো উড়তে চেয়েছিলাম’’

কিছুক্ষন ঝিম মেরে বসে রইল রাশেদ। খামের পেছনের দিকটাতে কখনোই খেয়াল করা হয়নি রাশেদের। তার মাথা কাজ করছে না। তাহলে এই মেঘাই কি সপ্নার মেয়ে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত বাজে দুটো। এই মুহূর্তে ফোন করাটাও সম্ভব না। তবুও সাহস করে একবার ফোন দিল সেই দত্তকখানায়। কেউ ধরল না। এতো রাতে ধরার কথাও নাহ। নামে নাম মিলতেই পারে তো কি! কতজনের নামই তো কতজনের সাথে মিলে যায়। তো? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করতে থাকে সে। সারারাত প্রশ্ন উত্তরের দ্বন্দ্বে দণ্ডিত হয়ে সকালে রওনা হল পুরান ঢাকার দিক।

‘মেঘা নামের মেয়েটার মায়ের নাম কি ছিল?’
‘আপনারাই তো বোধহয় গতকাল মেঘাকে নিয়ে গেলেন’
‘হ্যাঁ আমরাই নিয়েছি কিন্তু এই বাচ্চার মায়ের নাম কি?’
‘এটা তো আমরা কাউকে প্রকাশ করি নাহ’
‘প্লিজ ওর মায়ের নাম জানাটা খুব জরুরী’
‘সরি ভাই’
‘ভাই আপনার পায়ে পড়ি। প্লিজ একটু দেখুন। দোহাই লাগে’
‘আচ্ছা আচ্ছা দেখছি। আপনি অপেক্ষা করুন এখানে’
‘জ্বি আচ্ছা’

প্রায় আধা ঘণ্টা পর লোকটা আসল। অধীর হয়ে অস্থির হয়ে বসে ছিল রাশেদ। লোকটা বলল,
‘ওর মায়ের নাম সপ্না। এই যে সকল কাগজপাতি আর স্বাক্ষর’

বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল রাশেদ। ধুপ করে বসে পড়ল চেয়ারে। মেঘা তাহলে সপ্নারই মেয়ে। কোনোমতে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বাসার দিকে হাঁটল রাশেদ। হাঁটার শক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে সে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই কষ্ট হচ্ছিল তার। এসেই মেঘাকে দেখার জন্য মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে যেন।

‘তনু? তনু?’
‘হ্যাঁ আমি রান্নাঘরে’
‘মেঘা কোথায়?’
‘ঘুমুচ্ছে’

রুমে গিয়ে মেঘার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাশেদ। চোখটা ছলছল করে উঠছে তার। মেঘার পাশে এসে বসল। আঙ্গুলে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিল। সাথেই সাথেই আঙ্গুল ধরল মেঘা। আঙ্গুলটা ধরেই ঘুমুচ্ছে। কি মায়া চেহারায়। এই সেই মায়া যা থেকে রাশেদ আজও বের হতে পারেনি। কখনও পারবেও নাহ। চোখের কোণে জল আসার কারণ নেই তবুও কেন জানি কোণটা ভিজে উঠছে রাশেদের।
তনু আসছে। রাশেদ কৌশলে পানিটুকু মুছে ফেলে চোখ থেকে। সময়ে অসময়ে এরকম অসংখ্যবার চোখের পানি মুছে যায় রাশেদ। কিন্তু তনু কখনোই কোনোদিন সেই ভেজা চোখ দেখতে পারে না।

৪ thoughts on “খামের পেছন দিকটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *