পাড় ভাংগা কান্না

জহির বেশ ক’দিন ধরে নিলুকে ওর মনের কিছু না বলা কথা বলতে চাইছে। কিন্তু সেরকম পরিবেশ না পাওয়াতে আর কিছুটা মনের জোরের অভাবে বলা হয়ে উঠেনি। আজ কোনোরকম ইতস্তত না করে ওর মনের অব্যক্ত কথা নিলুকে বলেই ফেলে।
এরপর অনেকক্ষণ দু’জনে চুপ থাকে। জহির মাথা নীচু করে নিলুর উত্তরের প্রত্যাশায় উন্মুখ! নিলু নীরবতা ভেঙ্গে যখন কথা বলে- জহিরের মনে হয় এক সুদূরতম গহীন উপত্যকার চূড়ায় বসে নিলু কথা বলছে। বিষন্ন… নিরাবেগ কন্ঠে নিলু বলে চলেছে,

‘ আমাকে যেভাবে তুমি দেখছ, আসলেই কি আমি তেমন? হাতি যে দাঁত দেখায় সেটা দিয়ে সে খায় না। তোমার চোখে আমি কেমন তা জানি না। কিন্তু আমার ভিতরের আমিকে আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?’

জহির বেশ ক’দিন ধরে নিলুকে ওর মনের কিছু না বলা কথা বলতে চাইছে। কিন্তু সেরকম পরিবেশ না পাওয়াতে আর কিছুটা মনের জোরের অভাবে বলা হয়ে উঠেনি। আজ কোনোরকম ইতস্তত না করে ওর মনের অব্যক্ত কথা নিলুকে বলেই ফেলে।
এরপর অনেকক্ষণ দু’জনে চুপ থাকে। জহির মাথা নীচু করে নিলুর উত্তরের প্রত্যাশায় উন্মুখ! নিলু নীরবতা ভেঙ্গে যখন কথা বলে- জহিরের মনে হয় এক সুদূরতম গহীন উপত্যকার চূড়ায় বসে নিলু কথা বলছে। বিষন্ন… নিরাবেগ কন্ঠে নিলু বলে চলেছে,

‘ আমাকে যেভাবে তুমি দেখছ, আসলেই কি আমি তেমন? হাতি যে দাঁত দেখায় সেটা দিয়ে সে খায় না। তোমার চোখে আমি কেমন তা জানি না। কিন্তু আমার ভিতরের আমিকে আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?’

একটু থামে নিলু। মাথা নীচু করে থাকা জহিরকে একপলক দেখে… তারপর সামনের দিকে তাকায়। ইলেক্ট্রিক আলোয় পড়ন্ত বৃষ্টিকণাকে কেমন জান্তব মনে হয়। সে বলে,

‘ আমাকে কেউ একজন নীল পরী বলে ডেকেছিল। আমি চোখ বুজে উড়তে উড়তে এক এক করে সাতটি আসমান পার হই… চোখ খুলে দেখি, কী ভীষণ একা! আমার চারপাশে কেউ নেই… নেই… নেই… কেউ নেই! কষ্টের আগুনে আমার ডানা পুড়ে গেলো…আমি ধপ করে পড়ে গেলাম সাত আসমানের উপর থেকে… আমি চুর চুর হয়ে গেছি! যা একবার ভেঙ্গে যায় তা আর জোড়া লাগে না কখনো। সে ফুলদানিই হোক বা মানুষের মনই হোক।’

নিলু থামতেই জহির মাথা উঁচু করে। নিলুর দিকে তাকায়। ওর চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে। এরপর ধীরে ধীরে বলে,

‘ একবার তোমার ডানা পুড়েছে বলে এখন কল্পনাতেও উড়তে ভয় পাচ্ছ? একজনের নীল পরী ডাক শুনে কাছে গিয়ে শুন্যতাকে ফিরে পেয়েছ বলে এখন অন্য কারো ডাক শোনার সময় একেবারে কানই বন্ধ করে রাখতে হবে?’

জহিরের চোখে চেয়ে নিলু উত্তর দেয়,

‘ আমার কাছে কল্পনা আলাদা নয়। সেটা সত্যের অন্য রূপ মাত্র। আমি যা করি মন থেকেই করি। এখন আমার মনই নেই… তাই সত্য নেই- কল্পনাও নেই।’

নিলুর কথাগুলো মন দিয়ে অনুভব করে জহির। একটু ব্যথিতও হয়। তবে মুখে হাসি এনে বলে,

‘ মন ছাড়া মানুষ… হৃদয় ছাড়া নারী- এ কি সম্ভব? এখন আবার আমাকে বলো না যে, তুমি নারীই নও। দেহহীন ভালোবাসা সম্ভব হলেও হৃদয়হীন ভালোবাসা কীভাবে সম্ভব বলোতো?’

নিলু কিছুই বলে না। রাস্তার উপর বৃষ্টির ফোটাগুলো প্রচন্ড গতিতে এসে কীভাবে ফেটে যাচ্ছে, এক দৃষ্টিতে তা দেখতে থাকে। এরপর সামনে তাকিয়ে থেকেই নিলু বলে,

‘ আমি এখন কষ্ট বা সুখ কোনোটাই অনুভব করিনা। আমি এখন আর কাঁদতে ও পারিনা। জহির বলে,
‘ তবে তুমি কি পারো?’
জহিরের দিকে ফিরে নিলু বলে,
‘ আমি স্মৃতির তীরে বসে নুড়ি কুড়াই। কখনও সুখের, কখনও অপমানের… বেদনার!
‘আজীবন কি একজন সুখ-দুঃখের নুড়ি কুড়ানেওয়ালিই থেকে যেতে চাও?’ জহির জিজ্ঞেস করে।

নিলু হাসে… পুর্ণ এক নারীর অপুর্ণ হাসি। যা কান্নার মতো দেখায়। সে বলে, ‘ জানো জহির, ওর বাম হাতের তর্জনী টার নখে একটা কাঁটা দাগ ছিল। ছোট বেলায় দাঁ নিয়ে খেলতে গিয়ে কেটে গেছিলো। খুব দুষ্ট আর দুরন্ত ছিল সে। এখন কোনো মানূষের সাথে পরিচয় হলে আমার চোখের দৃষ্টি আনমনেই মানুষটার হাতের পানে চলে যায়। তাঁর হাতের সাথে নতুন মানুষটার হাত মনে মনে পাশাপাশি রাখি। তুলনা করি, অন্যমনস্ক হয়ে। তারপর ঘর ভাঙ্গে… আবার মর্তে ফিরে আসি।’

জহির নিলুর একটা হাত নিজের হাতে নেয়। এই প্রথম। নিলু কেঁপে উঠে। নিলুর চোখে পুর্ণ দৃষ্টি মেলে জহির বলে,

‘ তোমার জন্য যে কষ্ট আমার বুকে বয়ে বেড়াচ্ছি ইদানিং, এগুলো মুক্তোর মতো… স্বচ্ছ… নির্লোভ। এখনো তুমি একজন বন্ধুই আমার। জানো তো বন্ধুর সীমানা অনেক বড়। সেখানে একজন প্রেমিকার অবস্থান খুবই ছোট। তুমি আমার প্রেমিকা হতে ভয় পাচ্ছ। বন্ধু হয়ে আমার সাথে আকাশ পাড়ি দিতে ভয় কিসের? এখন আর সেখান থেকে ধপ করে পড়ে যাবার ভয় নেই। এই বন্ধু তোমাকে না ছুঁয়েই তোমার পাশে পাশে হাত ধরে থাকবে… আগুনে ডানা পোড়ার ভয়ও আর নেই। এখন তোমার হাতে সব কিছু। আমি আছি … তোমার সিদ্ধান্ত আমাকে জানিও।
… … … …

বৃষ্টি আরো চেপে বসেছে। বারান্দার শিক ধরে দাঁড়িয়ে নিলু ভাবছে, কি বলবে সে জহিরকে? ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে যেমন ভয় পায়- নিলুও সম্পর্কের গভীরে যেতেও ভয় পাচ্ছে। সেকি ফিরে যাওয়া একজনের ডানাহীন নীল পরী হয়ে থাকবে? নাকি নিলু হয়ে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দেয়া মানুষটিকে নিয়ে শেষ একবার উড়বার চেষ্টা করবে?

বাইরে অশান্ত প্রকৃতি… নির্জন এক বাসা বাড়িতে শান্ত এক নারী হৃদয়ে পাড় ভাঙা অশান্ত ঢেউকে শান্ত করবার চেষ্টা করে যায়। একবারে পারবে না সে অবশ্য… তাই তাঁকে বারবার চেষ্টা করে যেতে হয়।।

// ছোটগল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *