শিশু-কিশোররা বিবর্ণ পাতার পুষ্টিহীন চারাগাছ

কোন দেশের সাগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি একটি চারাগাছের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে সে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে গাছের মূল বা শিকড় হিসেবে গণ্য করা যায়। এই মূল রসে কি পরিমান পুষ্টি ও পরিচর্যা তার উপর নির্ভর করে গাছের পরিবৃদ্ধি ও বিকাশ কেমন হবে। তেমনি প্রাথমিক শিক্ষার উপর নির্ভর করে শিক্ষার পরবর্তী ধাপের মান কেমন হবে ও কি ধরনের শিক্ষিত মানুষ সমাজে তৈরি করা যায়। আমাদের সমাজে দেখা যায় শিশুরা অভাব অনটনের মধ্যে পড়ে বিদ্যালয় যেতে পারে না। তারা ছোট বয়সে অধিক চাপ নিয়ে থাকে। পরিবার ও সংসারের চাপ নিতে না পারায় অনেকে আবার খুব ছোট বয়সে বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে ও বাবা-বড় ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া একটা মানুষের শৈশবে পাওয়া শিক্ষা সংস্কৃতি ও মনস্তত্ব তার মধ্যে সামগ্রিক মানবিক গুণাবলী ও চারিত্রিক বিকাশ ও মেধার উৎকর্ষতা তৈরি করে। এই বিষয়ে বিশিষ্ট লেখক বিনয় মিত্রের ভাষায় প্রকত প্রস্তাবে মূলের বিদ শক্ত না হলে গাছের কান্ড, শাখা প্রশাখা যেমন নড়বড়ে হয়ে পড়ে, হেলে পড়ে দোলে পড়ে বা ভেঙ্গে যায় তেমনি শিক্ষার প্রথম শুরুটা যদি দুর্বলভাবে আকীর্ণ থাকে, বিজ্ঞান বর্জিত অযৌক্তিক পথে এগোয়, তাহলে মূলের অপুষ্টতা বা চিত্তের দীনতা পরবর্র্তী কালে কাটিয়ে উঠা খব একটা সম্ভব হয়না। কাজেই নিজেদের স্বার্থে দেশের কল্যাণে সার্বিক শিশু শিক্ষা মনস্তত্বধর্মী, উদ্দীপক, বিজ্ঞানসম্মত ও বস্তুনিষ্ট আবশ্যক।

বাংলাদেশে শিক্ষা বত্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্য মতে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৩৭,৬৭২টি। অন্যদিকে বিভিন্ন ধারায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৬,৩৪৫টি। অর্থ্যাৎ সরকারের দায়িত্বে পরিচালিত বিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিমাণই বেশি। একই তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মধ্যে ৩৬% সরকারী আর ৬৪% বেসরকারি। ্অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে এই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিমাণ ছিল ৩৬, ১৬৫টি যা মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৯% আর বাকী ১% ছিল বেসরকারি। অর্থ্যাৎ গত ৪১ বছরে দেশে ক্রমবর্ধমান জনগণের চাহিদার বিপরীতে সরকারী বিদ্যালয়ের বেড়েছে মাত্র ১৫০৭টি তাও নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ করে নয় বিভিন্ন সময়ে সরকারী করনের মাধ্যমে এই সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব শিক্ষক বেতনসহ নানা অব্যবস্থাপনায় ধুকছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে সরকারী উদ্যোগ কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক করনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। দেশের কোটিপতিরা এখন অন্যান্য খাতে টাকা না ইনভেস্ট করে শিক্ষা ক্ষেত্রে টাকা ব্যয় করে। কারণ শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্য মাত্রায় থেকে অনেক বেশি লাভ। ফলস্বরুপ ১৯৮৫ সালে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৭০৩৪ টি যা মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭% । বর্তমানে এইটাই হয়ে গেছে প্রধান ধারা। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও বর্তমানে প্রায় ১২ ধারায় পরিচালিত প্রাথমিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হল “ বেসরকারি নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি অনিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরীক্ষামূলক বিদ্যালয়, এবতেদায়ী মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্টেন, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, কমিউনিটি বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা সংযুক্ত এবতেদায়ী অংশ, উচ্চ বিদ্যালয় সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়, ব্যাক সেন্টার, আর.ও.এস.সি. বিদ্যালয়, শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ আরো অন্যান্য।
পৃথিবীতে আর কোথাও এরকম প্রাথমিক স্তরে বিভক্তি আছে বলে আমি মনে করিনা। এই ধারাগুলো সব প্রায় বেসরকারি বানিজ্যিক ধারা। এই পরিস্থিতিতে বহাল রেখে জাতীয় শিক্ষানীতি- ২০১০ এ বলা হয়েছে, “ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে রাষ্টের দায়িত্ব্য……… কোন ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও প্রাথমিক শিক্ষা কল্পে শিক্ষাপতিষ্ঠান পরিচালনা করতে চাইলে তাহা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমাত সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় বিধি বিধান পালন করিতে হইবে”। (অধ্যায়-২ পৃষ্ঠা ৪,৫) ফলস্বরুপ সরকার মখে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, উন্নয়ন, শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি কথার ফানুস উড়ালেও কার্যত বেসরকারি করন ও ব্যবসায়ীদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে শিক্ষার ভিত্তি এই বুনিয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা।
প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি দায়িত্বে এই হতাশাজনক চিত্রে পাশাপাশি আশঙ্কাজনক আরো একটা বিষয় হলো এই প্রাথমিক স্তরে শিক্সার মান ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নানা দক।
ঢ়ৎরসধৎু বফঁপধঃরড়হ বাবষড়ঢ়সবহঃ ঢ়ৎড়মৎধস ( চঊউচ-১১) পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায় “ ৫ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনকারীদের মদ্যে ৬৯% বাংলা সংবাদপত্রের শিরোনাম সঠিক ভাবে পড়তে পারেনা। ৮৭% সাধারণ গনিত যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করতে পারে না। ৭২% নিজ থেকে ছোট অনুচ্ছেদ লিখতে পারেনা”।
প্রাথমিক শিক্ষার এই মান নিয়ে সরকারের কাছে কোন মাথা ব্যাথা নেই। একদিকে জিপিএ ৫ পাওয়ার পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে অন্যদিকে ধসে পড়ছে গুণগত দিক। সরকার স্কুলে স্কুলে কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট দেয়ার কথা বলছে অথচ ৫২% সরকারী, ৬৮% বেসরকারি স্কুলে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। যেখানে চোক, বোর্ড এর ব্যবস্থা নেই সরকারী ২৬% বেসরকারি ৩২% স্কুল গুলোতে সেখানে এই শিক্ষার বেহাল ধশা হওয়াই স্বাভাবিক।
পাশাপাশি বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও পাঠদান পদ্ধতি অভাব ও শিক্ষার নি¤œমানের কারণ। এই বছরের সরকার ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক সহ দেশের আরো অন্যান্য স্থানের মহাসড়কে সিএনজি অটোরিক্সা বন্ধ করে দেয়। কারণ খুব ছোট ও নরম জিনিস হওয়াতে ক্রমশই এর দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। এর প্রধান কারণ হল অশিক্ষিত তরুন অধক্ষ কিশোর চালক। এই জন্য সরকার এই গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অটোরিক্সা বন্ধ করে টেম্পু ইত্যাদি গাড়ি নামিয়েছে। এতেও একই অবস্থা। ক্রমশই দেখা যাচ্ছে অধক্ষ কিশোর চালক ও শিশু হেলপার। যারা এই বয়সে পড়া লেখা করার কথা। যে সময়ে তারা গাড়ির পেছনে হেলপারি করছে সে সময়ে তারা স্কুল কলেজে থাকার কথা। তাদের স্কুল কলেজে না যাওয়ার প্রধান কারণ হল তারা দারিদ্রতা। দারিদ্রতার কারণেতারা পড়া লেখা করতে পারছেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *