উদারতাবাদের বিরোধিতা করুন | মাও সেতুং

উদারতাবাদ অর্থ হচ্ছে কোনো একটা বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা বা সত্যকে হাল্কা করে দেখা, তার গুরুত্বকে খাটো করা, মোটকথা সত্যটাকেই আড়াল করে ফেলা। নানা অজুহাতে উদারতাবাদীরা সত্যকে আড়াল করেন। এভাবে উদারতাবাদীরা মতাদর্শকে পেছনে ঠেলে দেন। নীতিহীন সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন। যা কিনা মতাদর্শের প্রয়োগকে অসম্ভব করে তোলে। অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য প্রবন্ধটি লেখা হয় ১৯৩৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। ‘মাও সেতুঙের রচনাবলীর নির্বাচিত পাঠ’, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, পিকিং, প্রথম সংস্করণ: ১৯৭৯ থেকে এটি নেয়া হয়েছে।

 

আমরা সক্রিয় মতাদর্শগত সংগ্রামের পক্ষে, কারণ এটা হচ্ছে আমাদের সংগ্রামের স্বার্থে পার্টির ভেতরকার ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর ভেতরকার ঐক্যকে নিশ্চিত করার হাতিয়ার। প্রত্যেক কমিউনিস্ট ও বিপ্লবীর উচিত এই হাতিয়ার তুলে নেওয়া।
কিন্তু উদারতাবাদ মতাদর্শগত সংগ্রামকে বাতিল করে দেয় এবং নীতিহীন শান্তির পক্ষ নেয়, এইভাবে তা ক্ষয়িষ্ণু ও অসংস্কৃত মনোভাবের জন্ম দেয় এবং পার্টি ও বিপ্লবী সংগঠগুলোর কোনো কোনো ইউনিট ও ব্যক্তির রাজনৈতিক অধঃপতন ঘটায়।

উদারতাবাদ বিভিন্নভাবে নিজেকে প্রকাশ করে।

যখন সুস্পষ্টই দেখা যায় যে, কোনো লোক ভুল পথে যাচ্ছেন, অথচ সে লোক একজন পুরানো পরিচিত লোক, একই জায়গার অধিবাসী, সহপাঠী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রিয়জন, সহকর্মী বা পুরানো অধস্তন লোক বলে তাঁর সঙ্গে নীতির ভিত্তিতে যুক্তিতর্ক না করা, শান্তি ও সখ্যতা বজায় রাখার জন্য অবস্থার অবনতি ঘটতে দেওয়া। অথবা তাঁর সঙ্গে সম্ভাব বজায় রাখার জন্য হাল্কাভাবে কিছু বলা, কিন্তু চূড়ান্তভাবে মীমাংসার চেষ্টা না করা। – এর ফলে সংগঠন ও ব্যক্তি-বিশেষ উভয়েরই ক্ষতি হয়। এটা হচ্ছে প্রথম প্রকারের উদারতাবাদ।

নিজের প্রস্তাব সংগঠনের সামনে সক্রিয়ভাবে উত্থাপন না করে আড়ালে দায়িত্বজ্ঞানহীন সমালোচনার প্রশ্রয় দেওয়া। সামনা-সামনি কিছু না বলে পেছনে বাজে গুজব রটনা করা; সভায় কিছু না বলা কিন্তু পরে আজে বাজে কথা বলা। যৌথ জীবনযাত্রার নীতির প্রতি আদৌ কোনো প্রকার শ্রদ্ধা না দেখিয়ে নিজের ঝোঁকে চলা। এটা দ্বিতীয় প্রকারের।

যে ব্যাপার নিজকে স্পর্শ করে না তাকে চলতে দেওয়া; কোনো বিষয়কে স্পষ্টতঃই ভুল জেনেও সে বিষয় সম্পর্কে যথাসম্ভব কম বলা; বিষয়কর্মে বিজ্ঞ হওয়া, এবং গা বাঁচিয়ে চলা ও কেবলমাত্র দোষ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা। এটা তৃতীয় প্রকারের।

আদেশ অমান্য করা এবং নিজের মতামতকে প্রথম স্থান দেওয়া। সংগঠনের কাছ থেকে শুধু বিশেষ সুবিধা দাবি করা, কিন্তু সংগঠনের শৃংখলা অস্বীকার করা। এটা চুর্তথ প্রকারের।

ঐক্য বা অগ্রগতি অথবা সুষ্ঠুভাবে কর্ম সম্পাদনের জন্য ভুল মতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো, ঝগড়া বাধানো, ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ করা বা প্রতিহিংসা নেওয়ার চেষ্টা করা। এটা পঞ্চম প্রকারের।

ভুল মতামত শুনেও তা খণ্ডন না করা, এমন কি প্রতিবিপ্লবী মন্তব্য শুনেও সে সম্বন্ধে কোনো রিপোর্ট না করা, বরং সেগুলো নির্বিকারভাবে গ্রহণ করা যেন কিছুই ঘটে নি। এটা ষষ্ঠ প্রকারের।

জনসাধারণের মধ্যে থেকেও তাঁদের মধ্যে প্রচার না চালানো এবং তাঁদেরকে উত্তেজিত না করা, সভায় বক্তৃতা না দেওয়া, তাঁদের মধ্যে তদন্ত ও অনুসন্ধান না চালানো, তাঁদের সুখদুঃখের প্রতি কোনো রকম যত্ন না নেওয়া, বরং তাঁদের সম্বন্ধে উদাসীন থাকা এবং নিজে যে একজন কমিউনিস্ট সে কথা ভুলে একজন অ-কমিউনিস্টের মতো আচরণ করা। এটা সপ্তম প্রকারের।

কেউ জনসাধারণের স্বার্থের ক্ষতি করছে দেখেও ক্রোধ অনুভব না করা বা তাকে উপদেশ দিয়ে বিরত না করা, না থামানো, যুক্তি দিয়ে তাকে না বুঝানো, বরং জেনে শুনেও তাকে সে কাজ করে যেতে দেওয়া। এটা অষ্টম প্রকারের।

কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা লক্ষ্য ছাড়া উৎসাহহীনভাবে কাজ করা, যেন-তেন প্রকারে কাজ করা এবং জগাখিচুড়ী পাকিয়ে চলা- ‘যতদিন মঠের সন্ন্যাসী থাকবো ততদিন ঘন্টা বাজিয়েই যাবো’। এটা নবম প্রকারের।

বিপ্লবের জন্য নিজে বিরাট অবদান রেখেছেন বলে মনে করা, প্রবীণ অভিজ্ঞ বলে নিজেকে জাহির করা, বড় কাজ করতে অসমর্থ হওয়া সত্বেও ছোট কাজ করতে ঘৃণা করা, কাজে অযত্নবান হওয়া এবং পড়াশুনায় ঢিল দেওয়া। এটা দশম প্রকারের।

নিজের ভুল জানতে পেরেও তা সংশোধনের চেষ্টা না করা, নিজের প্রতি উদার মনোভাব অবলম্বন করা। এটা একাদশ প্রকারের।

আমরা আরো কয়েকটি ধরনের কথা উল্লেখ করতে পারি। কিন্তু এই এগারোটিই প্রধান। এর সবগুলিই উদারতাবাদের অভিব্যক্তি।

বিপ্লবী যৌথ সংগঠনের ভেতরে উদারতাবাদ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটা হচ্ছে একটা ক্ষয়কারক বস্তু যা ঐক্য নষ্ট করে, সংহতি ধ্বংস করে, কাজে নিস্ক্রিয়তা আনে এবং মতভেদ সৃষ্টি করে। এটা বিপ্লবী বাহিনীকে দৃঢ়বদ্ধ সংগঠন ও কঠোর শৃংখলা থেকে বঞ্চিত করে, নীতিগুলোকে পুরোপুরি কার্যকরী করা অসম্ভব করে তুলে এবং পার্টি যাঁদের পরিচালনা করে সেই জনসাধারণ থেকে পার্টি সংগঠনকে পর করে দেয়। এটা অত্যন্ত খারাপ ঝোঁক।

পাতি বুর্জোয়া স্বার্থপরতা হতে উদারতাবাদের জন্ম, এটা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রথম স্থান দেয় এবং বিপ্লবী স্বার্থকে দেয় দ্বিতীয় স্থান। ফলে মতার্দশগত, রাজনীতিগত ও সংগঠনগত উদারতাবাদের উদ্ভব ঘটে।

উদারতাবাদীরা মার্কসবাদের নীতিগুলোকে বিমূর্ত বেদবাক্যের মতো মনে করেন। মার্কসবাদকে তাঁরা অনুমোদন করেন, কিন্তু তাকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে তাঁরা প্রস্তুত নন, নিজেদের উদারতাবাদের পরিবর্তে মার্কসবাদকে গ্রহণ করতে তাঁরা তৈরী নন। এই সব লোকের আছে তাঁদের মার্কসবাদ, আবার তাঁদের উদারতাবাদও আছে; মুখে তাঁরা মার্কসবাদের কথা বলেন, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁরা প্রয়োগ করেন উদারতাবাদ; অন্যদের প্রতি তাঁরা প্রয়োগ করেন মার্কসবাদ, কিন্তু নিজেদের প্রতি প্রয়োগ করেন উদারতাবাদ; দুই ধরনের জিনিসই তাঁরা মজুদ রাখেন, এবং প্রত্যেকটিই ব্যবহার করেন। কোন কোন লোকের চিন্তা এইভাবে কাজ করে থাকে।

উদারতাবাদ সুবিধাবাদের এক প্রকারের অভিব্যক্তি এবং মার্কসবাদের সঙ্গে এর মৌলিক সংঘর্ষ রয়েছে। এটা নেতিবাচক এবং বাস্তব ক্ষেত্রে এটা শত্রুকে সাহায্য করার ভূমিকা গ্রহণ করে। তাই, শত্রুরা আমাদের মধ্যে এর সংরক্ষণকে স্বাগত জানায়। উদারতাবাদের প্রকৃতি যখন এইরূপ তখন বিপ্লবীদের মধ্যে তার কোন স্থান থাকতে পারে না।

নেতিবাচক উদারতাবাদকে দূর করার জন্য আমাদের মার্কসবাদের ইতিবাচক ভাব-মানস গ্রহণ করতে হবে। একজন কমিউনিস্টকে উদার মনের অধিকারী, একনিষ্ঠ ও সক্রিয় হতে হবে, বিপ্লবের স্বার্থকে নিজের প্রাণের মতো ক’রে দেখতে হবে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিপ্লবের স্বার্থের অধীনে রাখতে হবে; তাঁকে সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রেই সঠিক নীতিতে দৃঢ় থাকতে হবে এবং সমস্ত ভুল চিন্তাধারা ও আচরণের বিরুদ্ধে অক্লান্তভাবে সংগ্রাম করতে হবে, যাতে করে পার্টির যৌথ জীবনকে সুসংবদ্ধ এবং পার্টি ও জনসাধারণের মধ্যকার সংযোগকে জোর দার করা যায়; ব্যক্তি-বিশেষের চাইতে পার্টি ও জনসাধারণের সম্বন্ধে এবং নিজের চেয়ে অপরের সম্বন্ধে তাঁকে বেশী যত্নশীল হতে হবে। শুধু তা হলেই তাঁকে একজন কমিউনিস্ট বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সকল বিশ্বস্ত, সৎ, সক্রিয় এবং ন্যায়পরায়ণ কমিউনিস্টকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু সংখ্যক লোকের মধ্যে উদারতাবাদের যে ঝোঁক রয়েছে তার বিরোধিতা করে তাঁদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে হবে। এটাই হচ্ছে আমাদের মতাদর্শগত ফ্রন্টের অন্যতম কর্তব্য।

৫ thoughts on “উদারতাবাদের বিরোধিতা করুন | মাও সেতুং

  1. আমার মতে, মার্কসবাদীরা
    আমার মতে, মার্কসবাদীরা সংগ্রামের প্রথম পর্বে (১৮৪৮-১৯৭৬) সারা দুনিয়াতেই দুটো ফ্রন্টে প্রধানত পরাজিত হয়েছে। একটা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, আরেকটা এই উদারতাবাদ। সমস্ত পার্টির অভ্যন্তরেই এই দুই রোগ বাসা বেঁধেছিল। যে কারণে পার্টিগুলো আন্তর্জাতিকতাবাদী ও শ্রেণীসংগ্রামের মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয় এবং ক্রমিক ভুলের বৃত্তে আটকে ধ্বংসের পথে যাত্রা করে। আলোচ্য প্রবন্ধটি আমাদের উদারতাবাদের স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করে। মতাদর্শিক ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে। সকলকে প্রবন্ধটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার আহবান রইল। গতকাল ছিল কমরেড মাও সেতুঙের জন্মদিন। এরকম সময়ে এ লেখা প্রকাশ হওয়াটা তাৎপর্যপূর্ণ। পোস্টদাতাকে ধন্যবাদ।

  2. উদারতাবাদের ১১টি লক্ষন পড়ে
    উদারতাবাদের ১১টি লক্ষন পড়ে বুঝলাম শুধু মার্কসবাদ নয়, যে কোন ধরনের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস উদারতাবাদের কারণে নষ্ট হতে পারে।

  3. যে কোন আন্দোলনের জন্য
    যে কোন আন্দোলনের জন্য উদারতাবাদ ক্ষতিকর। উদারতাবাদকে সুবিধাবাদ বলা যায়। এই আর্টিকেল সম্পর্কে জানা ছিল না। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *