‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ’

১৯৭১ আমাদের গর্ব। বাঙালী থেকে বাংলাদেশী হওয়ার ইতিহাসের বছর। নির্মম, নৃশংস, লাশের গন্ধ ভেসে আসার সময়। রক্ত বিধৌত হয়ে একটি লাল সবুজ পতাকা নিজস্ব ভূমি খুঁজে পেয়েছিল সে বছর। এই স্বাধীনতা অজর্নে সূর্য সন্তানদের অবদান শোধ করতে পারবো না আমরা।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছে। এর পক্ষে বিপক্ষে নেহাৎ কম লোক নেই। তবে ১৯৭১ সালে বাঙালীর ক্রান্তিকালে যে নরখাদকরা বাঙালী নিধনের উৎসবে মেতেছিলেন তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এখনো সন্ত্রস্থ করে রাখছে বরিশালবাসীকে। তাহলে আমরা কোন স্বাধীনতা পেলাম?


১৯৭১ আমাদের গর্ব। বাঙালী থেকে বাংলাদেশী হওয়ার ইতিহাসের বছর। নির্মম, নৃশংস, লাশের গন্ধ ভেসে আসার সময়। রক্ত বিধৌত হয়ে একটি লাল সবুজ পতাকা নিজস্ব ভূমি খুঁজে পেয়েছিল সে বছর। এই স্বাধীনতা অজর্নে সূর্য সন্তানদের অবদান শোধ করতে পারবো না আমরা।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছে। এর পক্ষে বিপক্ষে নেহাৎ কম লোক নেই। তবে ১৯৭১ সালে বাঙালীর ক্রান্তিকালে যে নরখাদকরা বাঙালী নিধনের উৎসবে মেতেছিলেন তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এখনো সন্ত্রস্থ করে রাখছে বরিশালবাসীকে। তাহলে আমরা কোন স্বাধীনতা পেলাম?

লোমহর্ষক কথা হল দেশ বিরোধী সে সব দানবদের সন্তানরা এখন দাবড়ে বেড়ায় সরকার দলসহ স্থানীয় রাজনীতি। একাত্তর সালে বরিশাল থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর সংস্করণ এবং অন্যান্য পুরানো দলিল ঘেটে পাওয়া গেল তেমন তথ্যই।

যেমন বরিশাল জেলা আ’লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক সৈয়দ আনিচুর রহমান। তার পিতা আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ শের আলী মোক্তার ছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের নিধনে গঠিত শান্তি কমিটির দপ্তর সম্পাদক।

শুধু তিনি কেন, সুরভী নেভিগেশন কোম্পানীর মালিক প্রয়াত গোলাম মাওলার কথাই ধরুণ। এখন গোলাম মাওলার কয়েকশ কোটি টাকা। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা তাকে ও তার বংশের মানুষের কথায় উঠছেন বসছেন। বলছেন ‘জয়তু গোলাম মাওলা গং’। সেই গোলাম মাওলা ছিলেন শান্তি কমিটির ট্রেজারার এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের সংগঠন ফুলকুড়ি আসরের উপদেষ্টা।

এদিকে জেলা মানবাধিকার জোটের সভাপতি সৈয়দ ডেন্টালের ডা: সৈয়দ হাবিবুর রহমানকে মানবাধিকার রক্ষার দ্বায়িত দেয়া হয়েছে এসময়ে। কিন্তু তিনিও ছিলেন শান্তি কমিটির পাকিস্তানের সমন্বয়ক।

শুধু এরাই নয় এভাবে ৩২ জন জাদরেল ‘প্লেয়ার’ নিয়ে গঠন করা হয়েছিল ‘বরিশাল জেলা শান্তি কমিটি’। কালের পরিক্রমায় আর আমাদের নতজানু চিন্তায় আজ হয়তো তাদের বিশিষ্টজন বলে চিনি। কেউ এদের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি হন না। ওই শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন দু’জন।

প্রথমজন এ্যাড. আব্দুর রব। তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সভাপতির দায়িত্ব নেন এ্যাড. আব্দুর রহমান বিশ্বাস। যিনি ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মজার কথা হল কমিটিতে কেবলমাত্র মুসলমানরাই ছিলেন না; ছিলেন হিন্দুও। কমিটির চারজন সহ-সভাপতির মধ্যে প্রথম সহ-সভাপতি (হিন্দু) ছিলেন হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা এ্যাড. প্রমথ কুমার। বাকি তিনজন সহ-সভাপতি হল সদর রোডের শাহজাহান চৌধুরী, প্যারারা রোডের এ্যাড. সমসের আলী এবং স্ব-রোডের বাসিন্দা সৈয়দ হাতেম আলী ওরফে হাতেম মীর।

এদের মধ্যে দেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তানীদের সাথে পালাতে গিয়ে মিত্র বাহিনীর গোলার আঘাতে কীর্তনখোলা নদীতে মারা যান শাহজাহান চৌধুরী। কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন সিএন্ডবি রোডের এ্যাড. আবুল হোসেন। জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন নূরিয়া স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জামায়াত নেতা খলিলুর রহমান।

শান্তি কমিটির নির্বাহি সদস্য ১৩ জন হল গীর্জা মহল্লার মাওলানা বশিরুল্লাহ আতাহারি, কলেজ রোডের এ্যাড. বিডি হাবিবুল্লাহ, আলেকান্দার আদম আলী হাজী, সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কাজী মোতাহার হোসেন, সদর রোডের ডা: নজিব উদ্দিন আহম্মেদ, হাটখোলার সামসুদ্দিন তালুকদার, সদর রোডের ডা: ঈমান আলী, কাউনিয়ার নোয়াব আলী, হাটখোলার আমজেদ মৃধা, নবগ্রাম রোডের এ্যাড. মিনহাজউদ্দিন আহম্মেদ খান, আলেকান্দার মীর আনোয়ার হোসেন, বগুড়া রোডের সৈয়দ ফজলে আলী, সৈয়দ মুনসুর আলী, ভাটিখানার আতাউর রহমান তালুকদার, বৈদ্যপাড়ার কাঞ্চন গাজী, নবগ্রাম রোডের রাজ্জাক চৌধুরী, বাজার রোডের শরুব আলী মিয়া, হাসপাতাল রোডের জনাব আলী, ব্রাউন কম্পাউন্ডের আফসার উদ্দিন সরদার ও বিএম স্কুল রোডের এ্যাড. আব্দুল মজিদ মুন্সি।

ওদিকে শরুব আলী মিয়ার ছেলে সেলিম হাওলাদার নগরীর ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন, রাজ্জাক চৌধুরীর ছেলে ইরান চৌধুরী মহানগর জাতীয় যুব সংহতির সাধারন সম্পাদক ছিল এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী।

কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে এ্যাড. কাজী মুনিরুল হাসান ১/১১’র সময় বরিশালের গুরুত্বপুর্ন দুটি ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি ছিলেন। পরে আ’লীগে যোগদান করে বর্তমানে জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক।

এ্যাড. আব্দুল মজিদ মুন্সির মেয়ে জামাতা এ্যাড. মীর্জা সালাউদ্দিন বিগত তত্ত্ববধায়ক আমলে বরিশাল জেলা জজ আদালতের পিপি ছিলেন। তার দু’মেয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য বলে জানা যায়।

ডা. ঈমান আলীর পুত্র সৈয়দ গোলাম মাসউদ বাবলু বরিশালের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা।

ঢাকায় দাপটের সঙ্গে মিডিয়া অঙ্গণে বিচরণ করছেন বিডি হাবিবুল্লাহর ছেলে আমানউল্লাহ।

সৈয়দ হাতেম আলীর পুত্র কাওসার হোসেন ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান।

জানা যায়, ৩২ সদস্যের শান্তি কমিটির মধ্যের আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও সৈয়দ হাবিবুর রহমান বেঁচে আছেন। দেশ স্বাধীন হবার পর ভারতে পালিয়ে যান প্রমথ কুমার। এসব তথ্য লোকমুখে এবং দালিলিক ভাবে স্বিকৃত।

কিন্তু কথা হল ১৯৭১ সালে যারা এই বাংলাকে অস্বিকার করতো এবং সে অনুসারে জেনোসাইড চালিয়েছিল তাদের বংশধররা এখনও ‘কাঁপায়’ এই শান্ত নগরী। হুকুম দেয়। হুকুম কায়েম করেন।

তাহলে আমরা যারা স্বাধীনতা দেখিনি তারা কি ধরে নেব বাংলাদেশে স্বাধীনতার মানে রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটি বংশ পরম্পরায় টিকে থাকবে বাংলাদেশে? কখনো রাষ্ট্রপতি হবে, কখনো আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে বলবে ‘জয় বাংলা’?

এসব অবস্থা দেখে পরিহাসে মনে পরে কবি গুরুর ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার চরণ

‘আমি শুনে হাসি, আঁখি জলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে-
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *