বাংলা চলচ্চিত্রের চালচিত্র : প্রেক্ষিত অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত

উলঙ্গকাল থেকেই আমি টিভি আসক্ত নয়। একদম নয় বললেই নয়। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিত এই যেমন, যখন রাজনীতি পাড়ায় আগুন লাগে, ম্যনহোলে যখন শিশু খুঁজা হয়, সখিনারা যখন রানা প্লাজার চিপায় প্রাণ হারায়, রাজনদের যখন পিঠিয়ে মারা হয়, আলবদরের যখন মৃত্যুদণ্ড হয়। এই ধরণের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে টিভির সাথে আমার একটা ক্ষণস্থায়ী সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়। টিভি অনাসক্ততার কারণে সিনেমাখোরও ততটা নয়। আমাদের পরিবারব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক হলেও টিভি রুমটা এর বিপরীত মানে নারীতান্ত্রিক 🙂 সকাল অবধি সন্ধ্যা এখানে আমার শ্রদ্ধেয় আম্মাজান ও বোনের একচেটিয়া রাজত্ব চলে। সিরিয়ালি রাজত্ব। নব্বয়ের দশকে এরশাদ চাচার স্বৈরতন্ত্র হঠিয়ে গণতন্ত্র নামের কিছু একটার জয়জাত্রা হয়েছিল দেশে; আমাদের টিভিরুমে তা শুধু ইতিহাসের মারপ্যাঁচ আর কথার ফুলঝুডি :)। যার কারণে টিভির সাথে আমার যোজন যোজন দূরত্ব। ক্ষুধার্ত হায়েনার মুখ থেক মাংস কেড়ে নেয়ার সাহস দেখানো যায়, একজন সিরিয়ালাসক্ত নারীর কাছ থেকে রিমোট কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখানোর পরিণতি কতো ভয়াবহ; তা হয়তো আমার মতো নির্যাতিত মরদ’দের নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনবোধ করছিনা। যতবার আমি টিভি রুমে গিয়ে রিমোট নিয়ন্ত্রন করার অপচেষ্টা করেছি ততবারই আমি ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে’ নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি!
গত পরশু সন্ধ্যা ঠিক সাত কি আট’টার সময় আমাদের টিভি রুমটা হটাত্‍ জনশূণ্যতায় ভোগছিলো দেখে রুমে ঢুকে রিমোট নিয়ে সুযোগের সদ্ব্যহার করলাম! সময় ব্যয়ের অপকৌশল হিসেবে স্থির করলাম একটা সিনেমা দেখাযাক। তাও আবার বাংলা সিনেমা (সংস্কৃতিমনা নাগরিক বলে এ চিন্তা)। যে চিন্তা সে কাজ। অবশেষে কোনো একটা চ্যানেলে (স্মৃতিভ্রমের কারণে চ্যানেলটার নাম ঠিক মনে করতে পারছিনা) সিনেমা দিচ্ছে দেখে তা দেখা শুরু করলাম। সিনেমার নাম কিন্তু পাক্কা মনে আছে ‘রিকশাওয়ালার প্রেম’ এ টাইপের কিছু একটা। রিকশাওয়ালার প্রেম দেখতে দেখতে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শেষ। সিনেমার গল্প, বিষয়বস্তু, স্থান-কাল-পাত্র, ডায়ালগ শোনে আমি এতোই রোমাঞ্চিত হয়েছি যে, সিনেমা নির্মাতার জন্ম শুদ্ধতা নিয়ে গবেষণা করার মনোবাসনা জাগলো!
সাম্প্রতিককালের বাংলা চলচ্চিত্রের চালচিত্র। এখানে নেই কোনো শিল্পের নিপুণতা, নেই কোনো ইতিহাস-ঐতিহ্য, কল্পনা শক্তির গভীরতা। যেমন খুশী তেমন সাজো মনোভাব নিয়ে কাজ করছে প্রত্যেক নির্মাতাগণ! কালে কম্মিনে দু’একটা সূর্য দীঘল বাড়ী আর শ্যামল-ছাঁয়া ক্যাটাগরির চলচ্চিত্রের উপস্থিতি দেখা গেলেও থিয়েটারে দর্শক সারির আসনগুলো উপস্থিতহীনতায় ভোগে! এ দায় কার? সৃষ্টিশীল নির্মাতার অভাব, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যর্থতা, চাহিদার তুলনায় যোগানের অপ্রতুল্যতাসহ ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক কারণে বাংলা চলচ্চিত্রের আজকের এই দৈনদশা। কিন্তু কেন? আমরা-ই তো জন্ম দিয়েছিলাম সত্যজিত রায় আর ঋত্বিক ঘটকদের মতো ক্ষণজন্মা প্রতিভাগুলোকে। এই অনাক্ষাঙ্খিত বাস্তবতার জন্য সব ব্যর্থতাকে ছাড়িয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। যে দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী স্বাধীন দেশ উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসন, চিন্তা-চেতনা ও মনশীলতায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; সে দেশে চলচ্চিত্রের জয় জয়কার কল্পনাতীত রয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। চরম এই ব্যর্থতার প্রতিনিয়ত ভোক্তভোগী হচ্ছি আমরা তরুণ প্রজন্ম। রাষ্ট্র যদি এই ব্যর্থতার দায় এড়াতো। আমরা যদি সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটকদের ধরে রাখতে পারতাম। তবে ‘আক্কাসের প্রেম জরিনার ভালোবাসা’! ‘জান দেবো তবুও প্রাণ দেবো না’! চলচ্চিত্রের নির্মাতার জন্ম হতো না। তরুণ প্রজন্মের আর ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ দেখে ফেসবুকে তুলকালাম পোষ্ট দিতে হতো না। চায়ের দোকান আর ক্যাম্পাসে বসে শাহরুখ খান, সালমান খান নিয়ে পিএইচডি করতে হতো না। আমরা পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণ রেখা দেখে মুগ্ধ হতাম। সৃষ্টিশীলতার নব নব প্রেরণা পেতাম। অতৃপ্তির হাহাকার গুছাতাম।
এতো দৈনতার পরেও এখনো আশায় বুক বাঁধি অচিরেই এখানে আবার মহাকালের মহাসৃষ্টি নিয়ে ফিরে আসবে সত্যজিতরা। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা’র শূট হবে। পোশাকশিল্প, পাটশিল্প, কুটিরশিল্পের মতো বিশ্বদরবারে আমাদের চলচ্চিত্রও শিল্পের খ্যাতি পাবে। পত্রিকার প্রথম পাতার বিশেষ হেড লাইন হবে “দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চলচ্চিত্র শিল্পের চোখ ধাঁধানো অবদান”। দেশ-বিদেশে আমাদের চলচ্চিত্র ভাষান্তর হবে, বাংলাদেশ ফ্লিম রিসার্চ ইনস্টিটিউট হবে। হয়তো একদিন এমনও শোনা যাবে, ‘সুবর্ণ রেখা’ দেখতে না নেয়ায় পাশের ফ্ল্যাটের সুদর্শনা তরুণীটি তাঁর প্রিয়তমর সাথে তিন দিন সম্পর্কচ্যুত। পাড়ার কাশেম চাচার সদ্য কথা বলতে শেখা শিশুটি মায়ের সাথে বায়না ধরেছে “মাগো ওমা চলনা আজ ‘অনিল বাগচীর একদিন’ দেখে আসি……..

২ thoughts on “বাংলা চলচ্চিত্রের চালচিত্র : প্রেক্ষিত অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *