ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ….

আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও বর্ষ পরিক্রমায় আবারো আমাদের দ্বারে ঘুরে এলো পবিত্র মাহে রবিউল আউয়াল মাস। বিশ্ব মানবের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সার্বিক কল্যাণ, পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, নবুয়্যতি গুণের মুহাম্মদীয়ুল শক্তি ও বেলায়তি গুণের আহম্মদীয়ুল শক্তি নিয়ে আজ থেকে প্রায় সাডে ১৪শ’ বছর আগে ৫৭০ খৃস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদেকের সময় জাজিরাতুল আরবের মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে পিতা আবদুল্লাহ(র.) ও মা আমেনা(র.)’র কুলে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত রহমাতুল্লীল আলামিন, সায়্যিদুল মুরসালিন, খাতেমুন্নবীয়্যিন, তাজাদারে মদীনা আহম্মদ মুজতবা মুহাম্মদ(স.) ধরার এ বুকে আবির্ভূত হন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, “ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়/আয়রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়”। মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু, সৃষ্টিকূলের করুণার প্রতিমূর্তি হযরত আহম্মদ মুজতবা মুহাম্মদ(স.) যে সময়ে আবির্ভূত হন, সে সময়কে ঐতিহাসিকগণ ‘আইয়্যামে জাহিলিয়্যত’ তথা বর্বরতার যুগ, মূর্খতার যুগ, অন্ধকার যুগ বলে অবিহিত করেছেন। ঈসায়ী সপ্তম শতকের পৃথিবী। সে সময়ে মানবতা ছিল বিপর্যস্ত, নৈতিকতা ছিল বিধ্বস্ত, শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল নির্বাসিত। সর্বত্র দাঙ্গা-হাঙ্গামা। ব্যক্তি, পরিবার, রাষ্ট্র, ধর্ম সর্ব ক্ষেত্রেই ছিল নৈরাজ্য আর অশান্তি। জুলুম-নির্যাতনে পৃথিবী ছিল একেবারেই অতিষ্ঠ। পূর্বেকার মহামানবদের জ্ঞান বা ঐশী বাণীর যাবতীয় শিক্ষা মানব সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মানবতার ও সভ্যতার এহেন অশান্তিময় দূরাবস্থায় খোদা তায়ালার হুকুমে এ ধরায় তশরীফ আনলেন মহানবী (স.)। পেশ করলেন শান্তির বাণী। মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে তিনি তদানীন্তন আরবে এক শান্তিময় রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করলেন। প্রশস্ত করে দিলেন মানবতার শান্তি ও মুক্তির প্রশস্ত পথ। গোটা মানবজাতি খুঁজে পেয়েছিল সঠিক পথের দিকনির্দেশনা। মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে আল্লাহপাক বান্দার কল্যাণর্থে অসংখ্য নিয়ামত ও রহমত প্রদান করেছেন। তাঁর মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও রহমত হচ্ছে রাসূল(স.) এর ইহধামে শুভাগমন। আর রাসূল প্রেমে সিক্ত হয়ে এই নিয়ামত ও রহমতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই আছে মানবজাতির ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির উপায়। মানবতার কাণ্ডারী রাসূল(স.) এর আগমন নিঃসন্দেহে মানবজাতি কল্যাণময় পথের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা, মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতার গভীরতম চেতনা লাভ করে ধন্য হয়। যার নূরের স্পর্শে বিশ্ব জাহান হয়ে উঠে উদ্ভাসিত, আলোকিত ও মহামান্বিত। অধিকার বঞ্চিত মানুষ ফিরে পায় আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। কন্যা শিশু ও নারী ফিরে পায় তাঁর যথাযথ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা। খোদা সন্ধানি পায় এলমে মারেফতের গোপন রহস্য ও খোদা মিলনের সরল পথ। সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সুন্দরভাবে জীবনধারনের সাহস ও আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে তাঁরই উসিলায়। রাসূল(স.) এর সার্বিক জীবন-যাপন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সুদূর বাল্যকাল থেকেই তিনি উত্তম গুণাবলীর পরিচায়ক ছিলেন। তাঁর অতুলনীয় আদর্শ ফুঁটে উঠেছিলো মাতৃ দুগ্ধপান অবস্থায়। ইহধামে তশরীফ আনার পাঁচ মাস পূর্বেই গর্ভস্থ শিশু মুহাম্মদ(স.) এর পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তত্কালীন বংশানুক্রমিক রীতি অনুযায়ী শিশু মুহাম্মদের(স.) লালন-পালনের দায়িত্ব অর্পিত হয় বনী সাদ গোত্রের বিবি মাতা হালিমা(র.) এর উপর। এ সময় বিবি হালিমার আরেকটি দুগ্ধপানকারী শিশু পুত্র ছিলো। বিবি হালিমা (র.) বর্নণা মতে, শিশু মুহাম্মদ(স.) সবসময় আমার ডান স্তনের দুগ্ধ পান করতো। আমি তাঁকে আমার বাম স্তনের দুগ্ধপান করাতে চাইতাম কিন্তু কখনো তিনি তা পান করতেন না! আমার বাম স্তনের দুধ তিনি তাঁর অপর ভাইয়ের জন্য মজুদ রাখতেন। দুগ্ধপানের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ নিযমনীতি পালন করেছেন। অপরের হক, ন্যায় বিচার ও সাম্যের মহান আদর্শের দৃষ্টান্ত রাসূল(স.) মাতৃ দুগ্ধপান অবস্থা থেকেই মানবজাতির জন্য শিক্ষাস্বরূপ রেখে গেছেন। এ রকম অসংখ্য আদর্শিক ঘটনা রাসূল(স.) এর জীবন বৃত্তান্তে বিদ্যমান। যা বিরলদৃষ্টান্ত হিসেবে আজও পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। রাসূল(স.) ছিলেন ধৈর্যের প্রতিক, শান্তির পতাকাবাহী, মহানায়ক, আদর্শ বালক, আদর্শ যুবক, আদর্শ সেবক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, আদর্শ মহাবিজ্ঞানী ও আদর্শ পথপদর্শক। রাসূল(স.)এর সার্বিক গুণাবলীর প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক পবিত্র আল-কোরাআনে বলেন, “আমি আপনাকে(রাসূল)সমগ্র সৃষ্টিকূলের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি” (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। রাসূল(স.) এর আচরনে পরমসহিষ্ণুতা ও সামাজিকতার লেশমাত্র ঘাটতি ছিলো না। সামাজিক যে কোনো কাজে তিনি সাহাবায়ে কেরামদের পরামর্শ চাইতেন। নিজের মতের সঙ্গে তাঁদের মতভিন্নতা দেখা দিলেও তিনি অধিকাংশের মতের প্রাধান্য দিতেন। রাসূল(স.) ছিলেন দয়ার সাগর এবং উম্মতকেও দয়া ও সৌহার্দ্যের শিক্ষা দিয়েছেন। মূলত রাসূল(স.) এর এই দয়া ও সৌহার্দ্যময় স্বভাবই মুশরিকদের হৃদয় জয় করতে সফল হয়েছিলো। এই মর্মে রাসূল(স.) বলেন; যে ব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত সে সমূহ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। রাসূল(স.) সাহাবাদের শান্তির দিকে উত্সাহ দিতে গিয়ে বলেন; মহান দয়ালু আল্লাহ দয়াকারীদের প্রতি দয়া করে থাকেন, সুতরাং তোমরা দুনিয়াবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। তদানীন্তন সমাজ পরিবর্তনের ধারায় রাসূল(স.) যুবক বয়সে উপনীত হয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তত্কালীন সমাজের হৃদয় বিদারক চিত্র দর্শনে তাঁর মন ব্যথিত হয়ে উঠে। তাই তিনি তত্কালীন সমাজব্যবস্থা বদলিয়ে যুগপযোগী সমাজব্যবস্থা ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘবদ্ধ কিছু যুবক নিয়ে গঠন করেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি শান্তি সংঘ। এবং পরবর্তীতে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিচ্ছিন্ন গোত্রীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাসূল(স.) জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ব্যক্তির আচার ধর্মের ভিন্নতার প্রেক্ষিতে নৈতিক ধর্মে ঐক্যবদ্ধ করে গঠন করেন পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান খ্যাত ‘মদিনার সনদ’। রাসূল(স.) এর অনুপম আদর্শের ভূঁয়সী প্রশংসা করে প্রখ্যাত দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবী জর্জ বার্ণাডশ এ মত ব্যক্ত করেন, I believe that if a man like prophet Muhammad was to assume the dictatorship of modern world, would success in solving it’s problem in a way that would being in men needed peace and happiness. অর্থাত্‍ “আমার বিশ্বাস নবী মুহাম্মদের মতো কোনো ব্যক্তি যদি বর্তমান বিশ্বের এক নায়কের পদে আসীন হতেন, তাহলে তিনিই বর্তমান বিশ্বের সমস্যবলীর এমন সমাধান দিতে পারতেন, যার ফলে সমস্ত বিশ্বে কাংক্ষিত শান্তি ও সুখ নেমে আসতো”। তথাকথিত বিশ্বায়নের এই যুগে হাজারো সমস্যায় জর্জরিত আজকের বিশ্ব। মানবতা আজ নিষ্পেষিত। জাতিতে-জাতিতে সংঘর্ষ সর্বত্র। মানুষের মানবিকতা তথা নৈতিকতার অধঃপতন হচ্ছে হরদম। চারিদিকে চলছে নোংরামীর প্রতিযোগিতা। কপটতা, ভণ্ডামী, সংঘাত, অসাম্য, ঘৃণা, প্রতিশোধ, ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয়স্বার্থ আজ প্রকট হয়ে দাঁডিয়েছে। ধর্মের নামে চলছে অধর্ম। রাজনীতির নামে চলছে নীতিহীনতা। শাসনের নামে চলছে শোষণ। মুসলিম বিশ্বের অবস্থা আরো ভয়াবহ! সর্বত্র মুসলমানরা আজ নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত, নিগৃহিত। রক্তের হোলিখেলায় মেতে তোলা হয়েছে মুসলিম বিশ্বকে। মুসলমান মুসলমানের উপর অনৈক্য সৃষ্টি করে মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে গোপনে ধ্বংস করে দিচ্ছে একটি গোষ্ঠী। ফলে ইসলামের মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে মুসলিম বিশ্ব হয়ে পডেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দাস। ইসলামের ছদ্মবেশে মধ্য প্রাচ্যের কিছু নামধারী মুসলিম সাম্রাজ্যবাদীয় দোসর মৌলবাদী শক্তির যোগান দিতে দাঁড করিয়েছে আইএস, তালেবান, আল-কায়েদার মতো নৃশংস জঙ্গি সংগঠন। সৃষ্টি করেছে ইরাক-সিরিয়া-আফগানিস্তান-লেবানন-তুরুস্ক যুদ্ধ। বিশ্বে চলমান এহেন দূরবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্ব মানবতার মহাভ্রাতৃত্ব ও মহাঐক্যের প্রয়োজন। তাই বর্তমান সমস্যাসংকুল বিশ্বের প্রেক্ষিতে মানবতার মুক্তির একমাত্র উপায় নূরে মুহাম্মদীর সঠিক প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতায় আনুগত্য স্থাপনপূর্বক ঈমান এনে এত্তেবা করা, এত্তেবার আঙ্গিকে মোত্তাবেয়ীন হওয়া। এবং অন্তঃকরণের উত্কর্ষতা চর্চাজনিত আত্মশুদ্ধির সঠিক কর্মপন্থা অবলম্বন করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দলমত নির্বিশেষে নৈতিক ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নূরে মুহাম্মদীর উপর পরিপূর্ণ মহব্বত স্থাপনের মাধ্যমে রাসূল(স.) এর জীবনাদর্শের চর্চা ও অনুশীলন করে খোদা তায়ালার নৈকট্য লাভ করা। এতেই রয়েছে গোটা মানবজাতির সার্বিক কল্যাণমুখী শান্তি। একমাত্র রাসূল(স.) প্রেম এবং তাঁর নির্দেশিত পথই ইনসানে কামেলে পরিণত হতে বা মানব শ্রেষ্ঠত্বকে অর্থবহ করতে সক্ষম। আমাদের সামষ্টিক জীবনে তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ-অনুকরণ করে মানবজীবন পরিচালিত করা আবশ্যক। দিদারে এলাহী পেতে এছাডা আর কোনো বিকল্প পথ ও মত নেই। তাই আসুন রাসূল প্রেমে সিক্ত হয়ে আবারো জাতীয় কবির ভাষায় গেয়ে উঠি,
আল্লাহকে যে পেতে চাই হযরত কে ভালবেসে
আরশ-কুরসী লওহ-কালাম না চাইতে পেয়েছে সে…

রাসূল প্রেমের রশি ধরে, যেতে হবে খোদার ঘরে
নদী তরঙ্গে যে পডেছে ভাই, দরিয়াতে সে আপনি মিশে…

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *