প্রসঙ্গ মুনতাসির মামুনঃ ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন!’

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এপর্যন্ত যতগুলি মিথ্যাচার হয়েছে, অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের এই একটি লাইন সেসবের সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গিয়ে একক কর্তৃত্বে শ্রেষ্ঠতম মিথ্যাচার হিসেবে স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতম দাবীদার। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, নাকি বাঙালি স্বাধীনতা এনেছে, নাকি তৃতীয় কোনও সত্যি আছে- সেই বিতর্কের অবসান বহু আগেই করে গেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবিগণ। কিন্তু, প্রফেসর মামুনের বক্তব্য টি একটি বিপদজনক মিথ্যাচার । কি কারণে?


মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এপর্যন্ত যতগুলি মিথ্যাচার হয়েছে, অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের এই একটি লাইন সেসবের সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গিয়ে একক কর্তৃত্বে শ্রেষ্ঠতম মিথ্যাচার হিসেবে স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতম দাবীদার। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, নাকি বাঙালি স্বাধীনতা এনেছে, নাকি তৃতীয় কোনও সত্যি আছে- সেই বিতর্কের অবসান বহু আগেই করে গেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবিগণ। কিন্তু, প্রফেসর মামুনের বক্তব্য টি একটি বিপদজনক মিথ্যাচার । কি কারণে?

যখন আপনি বলছেন বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তখন এটা নিশ্চিত যে আর যাই হোক বাঙালি স্বাধীনতা চায়নাই! তার মানে সম্পুরক আরেকটি ভাবনাও থাকে, সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙালি নির্লিপ্ত ছিলো, ফলে- এই স্বাধীনতাকে অর্জন সে করতে চায়নি সুতরাং করেওনি। তাকে অন্য কোথাও থেকে এনে বাঙালিকে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবর রহমান! এবার অন্য কোথাও থেকে আনার বিষয়টা খুবই সুস্পষ্টভাবে একটা জায়গা করে দেয় স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে, সাথে সাথে বাঙলাদেশকে ঘিরে নানাবিধ ধান্ধায় ডুবে থাকা অন্যান্য রাষ্ট্রগুলিকে। কি সেই জায়গা?

খুবই সহজ। ভারত আর পাকিস্তান যুদ্ধ করছে,সেই যুদ্ধের সময় শেখ মুজিব পাকিস্তানে আছিলেন। যুদ্ধ শেষ হইছে, যুদ্ধবিজয়ী ভারত পরাজিত পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দিয়েছে। সেই ভাঙা অংশটা ভারত শেখ মুজিবকে গিফট করেছে এবং মুজিব সেইটা পকেটে করে এনে পূর্ববাঙলার বাঙালিদেরকে দিয়েছিলেন, যেই বাঙালি কিনা আদতে স্বাধীনতাই চায়নাই!

এবার দেখেন, মুনতাসির মামুনের এই মহান বাণীটি কিভাবে ভারত,পাকিস্তান,জামাত এবং রাজাকারের সাথে আওয়ামী লীগের একটা চমৎকার মেলবন্ধন গড়ে দেয়? পাক-ভারত যুদ্ধের ফলে বাঙলাদেশ স্বাধীন হয়েছে- এই প্রোপাগাণ্ডা ভারত এবং পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবেই অনুমোদিত প্রচারণা। আর জামাতের সাথে রাজাকারসহ গোটা স্বাধীনতাবিরোধী চক্রেরই প্রলাপটি হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধ আসলে ইণ্ডিয়ার ষড়যন্ত্র!’ আর আওয়ামী বুদ্ধিজীবি মুনতাসির মামুনের প্রলাপটি এই দুই আলোচনার পূর্ববঙ্গীয় পারস্পেক্টিভ!পাকিস্তানপন্থীরা যখন পাকিস্তানের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙালির অনিচ্ছাকে দেখছে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে, ভারতপন্থীরা যখন ভারতের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙালির অনিচ্ছাকে দেখছে ভারত রাষ্ট্রের বদ্যানতা আর বীরত্বের গাঁথা হিসেবে, মুনতাসির মামুনরা তখন স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙলির অনিচ্ছাকে দেখছেন শেখ মুজিবের একক অর্জন হিসেবে! এই তিনের বক্তব্য একটি বিন্দুতে এক, সেটি হচ্ছে – বাঙালি আর যাই হোক, স্বাধীনতা চায়নাই!
এইসব আলোচনার জন্যে আমরা ভারতকে ধুয়ে দিতে পারি, গালিগালাজকরে পাকিস্তান-পাকিস্তনাপন্থীদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে পারি, ফরহাদ মজহারকে লুঙ্গি খুলে বলাতকার করতে পারি, কিন্তু এই একই আলাপের জন্যে জনাবে আলী আল্লামা মুন্তাসির মামুন আমাদের কাছে পীরানে পীর! কেননা তিনিই একমাত্র তাঁর আলাপে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন! আহা! তালিয়া হবে ভাইলোগ!

কিন্তু বাস্তব সত্যিটা কি? বাস্তবে, একজন মুজিব স্বাধীনতার প্রশ্নে কতটা আগ্রহী ছিলেন, সেই বিতর্কে আপাতত না গিয়ে যাই বাঙালি অনাগ্রহী ছিলো- এই ডাহা মিথ্যাচারের সুলুক সন্ধানে। সামরিকভাবে অপ্রস্তুত, ন্যুনতম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই একটা জাতির ওপর আক্রমণ হলো। এই পরিস্থিতিতে ‘বেতার ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে’ – এই অপেক্ষায় একটি জাতি বসে ছিলো- এরকম ভাবনা যারা ভাবেন, তাদের আয়োডিনের যথেষ্ট ঘাটতি আছে মাথায়! দশ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটা বেতারকেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রচার করেছে আর সেই ঘোষণা শুনে সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার আগে সবাই স্প্রিন্টারদের মত রেডি সেট গো মোডে ছিলো -এরকম বালখিল্য আলাপ আমরা নেয়ার দরকার মনে করিনা! দশ কিলোওয়াটের একটা ট্রান্সমিটার চট্টগ্রাম বিভাগটাকেই কাভার করতে পারবে কিনা-সে নিয়ে সংশয় আছে। ফলে, মুজিব-হান্নান-জিয়া মার্কা লাইনআপ দিয়া মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণার যেই বাহাস চলে,সেই ফাত্রামোয় কান না দেয়াই ভালো আমাদের। এই বেতার ভাষণটি বাঙালির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাদের জন্যেই দরকারী যাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর মালিকানা দরকার। বাঙালির নিজের মুক্তিযুদ্ধে তার নিজের মালিকানার প্রশ্নই আসেনা, কাজেই এই যুদ্ধকে ব্যবহার করে যারা পরবর্তীতে বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসবে- তাদের জন্যেই দরকার এই স্বাধীনতার ঘোষণা তত্ত্ব! স্বাধীনতার সংগ্রাম কোনও তাতক্ষণিক বিষয় নয়, সুদীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। সেই ধারাবাহিকতায় বাঙালি ২৬ মার্চের বহু আগে থেকেই সসস্ত্র সমরের বিষয়ে আগ্রহী ছিলো, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাকে সেদিকে যেতে দেয়নি- তার ভুড়ি ভুড়ি প্রমাণ আমরা দেখাতে পারি খোদ তাজউদ্দিন আহমেদের বয়ান থেকেও। এখানেই পরিস্কার হয়ে যায়, অনিচ্ছাটা কার ছিলো, মুজিবের নাকি বাঙালির। সে আলোচনায় আমরা যাবোনা। সেটা নিয়ে তারা বসে থাকুক।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ চালাচ্ছে শহরে বন্দরে গ্রামে আর মানুষ মরছে, ধর্ষিত হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেই প্রতিরোধযুদ্ধটাও শুরু হয়ে গেছে। এই প্রতিরোধযুদ্ধ ভারত করেনাই, পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি প্রায় খালি হাতেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে! ভারতের দরকার ছিলো রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে দুর্বল করে দেয়া, কোনওভাবেই তাকে ভেঙ্গে দুইভাগ করা নয়। কারণ রাষ্ট্র পাকিস্তানকে দু ভাগ করার অর্থই হচ্ছে দ্বিজাতিতত্ত্বকে অসাড় প্রমাণ করা। দ্বিজাতিতত্ত্ব অসার প্রমাণিত হলে ভারতের যা বিপদ, তার তুলনায় পাকিস্তানের বিপদ কিছুই না।কেননা ভারতের পাশে যদি তার প্রতিবেশী দেশের নিপীড়িত প্রদেশটি স্বাধীনতা লাভ করে বসে দ্বিজাতিতত্ত্বকে অসাড় প্রমাণ করে, তাহলে ভারতে ওরকম কম করে ২০ টি নিপীড়িত জাতিসত্তার প্রদেশ রয়েছে যারা স্বাধীনতাকামী হয়ে উঠবে! সেই বিপদ ভারত নিজে থেকেই ডেকে আনার কোনও চান্স নাই! কিন্তু পাকিস্তানকে দুর্বল করে দিয়ে পুর্ববাঙলায় ভারত তার অনুগত একটি সরকার বসাতে পারলে তার বহুবিধ লাভ। বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি রাজনৈতিক এবং প্রতিরক্ষাজনিত সুবিধাও সে পায়। এই হিসাব কষতে বসে যখন ভারত শেখ মুজিবসমেত বাঙালির পক্ষে, পাকিস্তানও তখন ভারতের এই ধান্ধা বুঝতে পেরে পাল্টা জাউরামো শুরু করে। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে তার ভারতে পাঠাতে হবে তখন। এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে ভারতে ঢুকিয়ে দিয়ে ওখানে আটকে রাখতে পারলেই ভারতের জন্যে এক বিষফোড়া পয়দা করে রাখতে পারে সে ভারতের শরীরে। আর পূর্বপাকিস্তানকে শতভাগ মুসলিমের দেশ বানানো যায়! তাতে পাকিস্তানের দ্বিমুখী লাভ, প্রথমত পূর্বপাকিস্তানের যাবতীয় স্বাধিকারের দাবীকে তার হিন্দুর তথা ভারতের ষড়যন্ত্র মনে হত, এখন হিন্দু যদি পূর্ববাঙলায় না থাকে, তাহলে আর পূর্বপাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের ষড়যন্ত্র আর হালে পানি পাবেনা। দ্বিতীয়ত, এক কোটি উটকো জনসংখ্যার চাপ ভারতের জন্যে কঠিন দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তার সমাজ অসুস্থ থাকবে বারোমাস, অর্থনীতি আর রাজনীতি থাকবে অসুখে কাতর। এই দুই সমীকরণ থেকে পাকবাহিনী গণহারে দেশান্তরে বাধ্য করছিলো বিশেষত হিন্দু বাঙালিদের।
এবার ভারত সেই যে এক ধান্ধা করেছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেবার, সেই ধান্ধা তার জন্যে বুমেরাং হয়ে ফিরে এলো এক কোটি শরণার্থীর মাধ্যমে। এহেন পরিস্থিতিতেও ভারত তার সমীকরণ ঠিক রেখে শরণার্থী পাঠানোর জন্যে সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়েই আগ্রহী ছিলো, পাকিস্তানের শত উস্কানীতেও সে যুদ্ধে জড়ায়নি পাকিস্তানের সাথে। আর এদিকে কি হচ্ছে?

এদিকে বাঙালির নিজস্ব প্রতিরোধ একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে এবং এই যুদ্ধে বাঙালির বিজয় অনিবার্য, আর এই জনযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে- তারা বামপন্থী। এখন এই লড়াইটা বাঙালি নিজেরাই করছে, নিজেদের স্বাধীনতার জন্যে জীবনও দিচ্ছে বাঙালিরাই। ত্রিশ লাখ মানুষ মরে গেছে একটা দেশের স্বাধীনতার জন্যে, এইটাকে যদি কেউ জাতির অনিচ্ছা বলে, আমি তাকে শুয়ারের বাচ্চা বলতে দ্বিধা করিনা!রুমি বদীদের জন্যে আজকাল মায়াকান্নার অভাব দেখিনা! এই রুমি বদীরা মোটেও আওয়ামী মতাদর্শের যোদ্ধা ছিলেন না, বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপেরই ছিলেন। জগতজ্যোতি দাশ, সিরাজ শিকদারদের লিজেণ্ডারী প্রতিরোধ পাকিস্তানীদেরকে নাকানিচুবানী দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্যে মহাবিপদ। একদিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন বাঙলাদেশ ভারতের অন্যান্য জাতিগুলিকে স্বাধীনতার পথ দেখাবে,পাশের পশ্চিমবাঙলার নক্সালাইটরা বাম নেতৃত্বের বাঙলাদেশ পেলে ভারত থেকে পশ্চিমবাঙলাকে আলাদা করতে সেকেণ্ডও সময় নেবেন না! আরেকদিকে ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সুবিধা তো দূরের কথা, নতুন বাঙলাদেশকে সামলানোই তার জন্যে নবতর চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে! তাই, তখনও সুবোধ ভারতের একমাত্র কর্তব্য পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক আলোচনায় সমাধানে আসা!
এই হিসাব যখন সীমান্তের ওপাড়ে হচ্ছে, তখন বাঙালি সমানতালে মরছে এদেশে, আর মারছে। যুদ্ধ এগিয়ে চলেছে তার নিজস্ব গতিতে। তবে তার চেহারা ক্রমাগত ভিয়েতনামী জনযুদ্ধের আকার ধারণ করাটা পাকিস্তানের জন্যে নিশ্চিত পরাজয় তো বটেই, ভারতেরও ভরাডুবিকে নিশ্চিত করছে। কে বলে এই বাঙালি অনিচ্ছুক ছিলো?

এই পরিস্থিতিতে, এক কোটি অতিরিক্ত মানুষকে দেশে রাখতে ক্রমেই পশ্চিমবাঙলার জনগণ হাপিয়ে উঠছিলো, তাদের দরকার ছিলো দ্রুত শরণার্থীদের দেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। আরেকদিক থেকে নক্সালবাদীদের চোটপাট। পশ্চিমবাঙলার তরুণদের দেখানোর জন্যে তখন নতুন মাল পেয়েছে ভারতের সরকার। দেখো- পূর্ববাঙলার তরুণরা দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্যে লড়ছে, আমাদের এখানে এসে ট্রেনিং নিচ্ছে! আর তোমরা কি করছো? নিজের দেশের মানুষ মারছো? যাইহোক, তখনও ভারতের সামনে রাজনৈতিক সমাধানই সর্বশেষ ভরসা! আবার, আরেকদিকে অখণ্ড পাকিস্তানের পূর্ববাঙলায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমাতে যেই চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনেই তার যুদ্ধের প্রশিক্ষণ কিংবা অস্ত্রের যোগান দেয়াটাও আবশ্যক। শরণার্থী সাহায্য দিয়ে ভারত কোনও দৈবকর্ম করে বসেনি, জেনেভা কনভেনশন মতে এটা তার একান্তই দায়িত্ব।

ভারতের এই বিপদ বুঝতে পেরে পাকিস্তান আরও উগ্র হয়ে ওঠে। শেষের দিকে ভুট্টো আর ইয়াহিয়ার উদ্ধত আচরণের কারণটাও এখানেই নিহিত। ভারত সত্যিই কোনঠাসা ঐমুহুর্তে। গোঁয়াড় পাকিস্তান তাই আরও উদ্ধত, এদিকে বাঙালির প্রতিরোধ চলছে দুর্দান্তগতিতে। এই অবস্থায় পূর্ববাঙলায় পরাজয় আসন্ন হয়ে যায় একটা পর্যায়ে। এটা দেখে মাথা বিগড়ে গেছে পাকিস্তানের। তার কার্যকারণ সুত্রমতে এই আসন্ন পরাজয়ের একমাত্র শত্রু ভারত। সে বোকার মত ভারত আক্রমণ করে বসে। ফলে, ভারত একেবারে শেষের মাসে এসে মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে আসে। আটটা মাস আমরা যুদ্ধ করে কাবু করে ফেলেছি পাকিস্তানীদের। হতাশা, রোগ, বিশৃঙ্খলায় ইতোমধ্যেই যেই পাকিবাহিনী বিপর্যস্ত, তাকে হারাতে বাঙালিই যথেষ্ট ছিলো। ভারত শেষমুহুর্তে যুদ্ধে যোগ দিলো, তার পরের কাহিনী আওড়ে আর আমাদের লাভ নেই। কষ্ট আছে। সোনার ফসল লুট হয়ে যাবার কষ্ট। যুদ্ধে যোগ দিয়ে ভারতের শাপে বর হলো। পূর্ববাঙলায় তার অনুগত একটি সরকার ক্ষমতায় বসানো গেল, বামপন্থীরা ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে চলে গিয়ে স্বাধীনতার শত্রু বনে গেল কেউ কেউ, শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানো গেলো। যে লড়াই বাঙালি করে বিজয় আনলো, যেই লড়াইয়ের ফসল পুরোটাই লুটে নিয়ে গেলো ভারত, কেননা পাকিস্তানী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙ্গে বাঙালির মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্নসাধ পুরণ হয়নি কোনওদিন, ভারতের সকল কিছুই হয়েছে বেশ ভালোভাবেই। আর এই লোপাটের সহযোগীরাই হলো ভালোমানুষ, বাঙালি স্বাধীনতাই চায়নাই! এর চাইতে বড় বাটপারি আর কিই বা হতে পারে?

বায়ান্ন, চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি, আটষট্টি, উনসত্তুর, সত্তুর, একাত্তর- এই সংখ্যাগুলি যদি মিথ্যা হয়, তাহলে মুনতাসির মামুনের বয়ান সত্যি। জনতার আকাঙ্খায় যদি এই ইতিহাসের বাঁকগুলি না থাকে, তাহলে মুনতাসির মামুন ঠিক বলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই সালগুলি বাঙালির মুক্তির জীবনপণ লড়াইয়ের সাল। বাঙালি নিজ ভুখণ্ডে লড়েছে জানে-মালে। সোনাগাছি সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা হয়নি বাঙালি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় নিয়েই সে মাঠ ছাড়ার ক্ষমতাও রাখে।

এত কথা বলার একটাই কারণ, মুনতাসির মামুনরা আওয়ামী দৈত্যের সর্বাগ্রসৈনিক। ইনারা স্বাধীনতার সকল কৃতিত্ব্ব এক মুজিবের ওপর সমর্পণ করে বাঙালিকে নিস্ক্রিয় প্রমাণ করতেই চাইবেন, তাতে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার পায়া ভারী হয়। স্বাধীনতার ফসল যতটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটাকে এককভাবে আওয়ামীলীগের করে রাখা যায়। তুমি ব্যাটা বাঙালি স্বাধীনতাই চাওনাই, তোমারে স্বাধীনতার ফসল দিবো কেন? এই কামড়াকামড়ি করতে গিয়ে সে আমাদের মহান স্বাধীনতার সংগ্রামে আমাদের নিজস্ব বীরত্বগাঁথাকে, আমাদের ত্যাগকে অস্বীকার করার পাক-ভারতীয় প্রোপাগাণ্ডায় জ্বালানী সরবরাহ করছে। কিন্তু স্বাধীনতার লড়াই, মুক্তির যুদ্ধ আমাদের একান্তই নিজস্ব লড়াই, নিজেদের প্রয়োজনেই আমরা লড়েছি। এবং স্বাধীনতাকেও আমরাই লড়াই করেই ছিনিয়ে এনেছি!

এইসব বাটপারি ধান্ধাবাজী রুখে দেয়া দরকার। আমাদের প্রয়োজনেই আমাদের রুখে দেয়া দরকার। আওয়ামী বুদ্ধিজীবি মুনতাসির মামুন, জামাতী বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার- এরা সকলেই দিনশেষে পোষা বুদ্ধিজীবি, বাঙালির নয়। বাঙালির লড়াইকে তাই অন্যের হাতে সমর্পণ করার আগ্রহ তাঁদের থাকতেই পারে! আমাদের সেটা আটকাতে হবে।

২ thoughts on “প্রসঙ্গ মুনতাসির মামুনঃ ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন!’

  1. মুক্তিযুদ্ধের সময় মুনতাসির
    মুক্তিযুদ্ধের সময় মুনতাসির মামুন কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন? তিনি যুদ্ধ করেছিলেন নাকি নিরাপদ স্থানে লুকায়িত ছিলেন? যদি লুকায়িত থাকেন তয় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার বিষয়ে কথা বলার অধিকার তার নাই। তাকে অন্য বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে বলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *