বন্ধুত্ব এবং তারপর…

আজ হঠাৎ আমাদের সমাবর্তনের ছবিটার দিকে চোখ গেল। এই ছবিটিতে আমার ডান পাশে যে দাড়িয়ে আছে তার নাম লিয়ানা। লিয়ানা আমার বন্ধু, শাসন কারী, সোহাগ কারী সব সব সব। লিয়ানার সাথে আমার পরিচয় আমাদের ভার্সিটির নবীন বরনের দিন। আমার ভার্সিটি লাইফের বেশিরভাগ স্মৃতিতে এই মেয়েটি জড়িয়ে আছে। সেদিন যদি মেয়েটার সাথে পরিচয় না হত তাহলে আমার ভার্সিটি লাইফটা হয়ত অন্যরকম কোন গল্পের সৃষ্টি করতো।


আজ হঠাৎ আমাদের সমাবর্তনের ছবিটার দিকে চোখ গেল। এই ছবিটিতে আমার ডান পাশে যে দাড়িয়ে আছে তার নাম লিয়ানা। লিয়ানা আমার বন্ধু, শাসন কারী, সোহাগ কারী সব সব সব। লিয়ানার সাথে আমার পরিচয় আমাদের ভার্সিটির নবীন বরনের দিন। আমার ভার্সিটি লাইফের বেশিরভাগ স্মৃতিতে এই মেয়েটি জড়িয়ে আছে। সেদিন যদি মেয়েটার সাথে পরিচয় না হত তাহলে আমার ভার্সিটি লাইফটা হয়ত অন্যরকম কোন গল্পের সৃষ্টি করতো।

যাইহোক, ভার্সিটিতে ঢুকে তাড়াতাড়ি করে উপরের ফ্লোরে উঠতে গিয়ে নিজের বেখেয়ালেই ধাক্কা দিয়ে ফেলি মেয়েটিকে। ধাক্কাটা খুব জোরে ছিলনা বলে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। মেয়েটিকে সরি বলতে যাবো এমন সময় চশমা ঠিক করতে করতে মেয়েটাই সরি বলে হাটা দিলো। কি রকম একটা বোকা বোকা চেহারা মেয়েটার। কলেজ লাইফে আমাদের ব্যাচের একটা ছেলে ছিলো অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট, লিয়ানাকে দেখে আমার তার কথা মনে হয়ে গেল। ছেলেটা পড়ালেখায় যতটা ভালোছিলো আচার ব্যাবহার আর গ্যাট-আপে ছিলো ঠিক ততটাই আনাড়ি। সেও চশমা পড়ত, লিয়ানাকে তার সাথে তুলনা করার কারন হচ্ছে ওর বেকুব মার্কা চেহারাটা।

মেয়েটা মনেহয় পড়ালেখায় খুব ভালো। যাইহোক সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অডিটোরিয়াম রুমে ঢুকলাম। আজ নবীন বরন তাই বড় ভাইয়েরা রজনীগন্ধা আর গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো। নবীনবরন শেষে আমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে লাগলাম। আমাদের ব্যাচে সাতাশজন ছেলে আর মেয়ে মাত্র তিনটা। আমি মেয়েগুলোর সাথে পরিচিত হতে গিয়ে লিয়ানার সামনে পড়লাম। খাইছে! এই ব্রিলিয়ান্ট তাইলে আমাদের ব্যাচে। আমি গিয়ে ওকে আমার পরিচয় দিতে লাগলাম।

-হ্যালো, আমি সাইফুল।
=হু? কিছু বললেন?
-হুম বলেছিত। শুনতে পাননি?
=না। আবার বলুননা প্লিজ।
-আমি সাইফুল।
=আমি লিয়ানা। কিছু মনে করবেননা আমার কানে একটু প্রব্লেম হচ্ছে কয়েকদিন ধরে। চিকিৎসা চলছে ঠিক হয়ে যাবে।
-ও আচ্ছা! ব্যাপারনা। আগামী চার বছরের মধ্যে ঠিক হলেই হবে।
=হয়ে যাবে। আপনার বাসা কোথায়?
-কুমিল্লায়। আপনার?
=পটুয়াখালি।
-ও আচ্ছা। নদীতে ভাইসা ঢাকায় আসলেন ক্যামতে?
=আপনি মুড়ির টিনে ঝুইল্যা যেমনে আসছেন আমিও সেভাবেই।
***দুজনেই হেঁসে ফেললাম।***

-আগামী চার বছরত একসাথেই কাটাতে হবে। পড়াশোনা+ অন্যান্য প্রয়োজনে আশা করি পাশে পাবো আপনাকে।
=বন্ধু হবেন? আমি কিন্তু বোরিং একটা মেয়ে।
-তাই?
=হুম।
-সমস্যা নাই। আপনার ফেবু আইডিটা দেন।
=ওকে নাও।
-তুমি করে বললে?
=হুম।
– আচ্ছা, আচ্ছা দাও।

ফেবু আইডি নিয়ে আমি অন্যদের সাথে পরিচিত হতে লাগলাম। একজন খুব ভাব নিলো, বুঝলাম হয়ত বড়লোকের আদুরের মেয়ে তাই এমন। যাইহোক, পরিচয় পর্ব শেষে সবাই ডিসিশন নিলো স্মৃতিসৌধে ঘুরতে যাবে। রিকশা নিতে গিয়ে ঘটলো আরেক বিপত্তি। একজন মেয়েকে আলাদা বসতে হবে। বাকি দুইজন লিয়ানাকে আলাদা বসতে বললো। লিয়ানা মেনে নিলো, আমি আর মারুফ এক রিকশায় উঠেছিলাম। কিন্তু লিয়ানা এসে আমার রিকশার পাশে দাড়ালো। মারুফকে অন্য রিকশায় যেতে অনুরোধ করলো। মারুফ অন্য রিকশায় গেল। আমি ভাবিনি লিয়ানা এমন করবে। পুরো রাস্তায় আর বেশি কথা হয়নি। প্রায় একঘন্টা স্মৃতিসৌধ ঘুরে যে যার যার বাসায় চলে যেতে লাগলো। লিয়ানাকে জিজ্ঞেস করলাম বাসা কোথায়? সে জানালো ফুলের ট্যাক। আরে আমার বাসাওত সেখানেই। যথারীতি যা হবার তাই, আমরা একসাথে আবার ব্যাক করলাম। রাতে ওকে ফেবুতে অ্যাড করলাম। রাত দুইটা পর্যন্ত চ্যাট করে অবশেষে ঘুমালাম। সকালে ক্লাস ছিলো। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরলাম লিয়ানার সাথে। লিয়ানা এখানে একা একটা বাসায় থাকে আমার বাসার পাশেই বাসা। এভাবেই চলতে লাগলো লিয়ানার আর আমার লাইফ। সকালে ওঠা তারপর একসাথে ক্লাসে আসা যাওয়া………

ক্লাস শুরু হওয়ার মাসখানেক পর একদিন ভার্সিটি থেকে আসছিলাম। হটাত বড় ভাইরা ডাক দিলো। আমি বুঝতে পারলাম র‍্যাগ দিবে। যাওয়ার পর বড় ভাইরা এমন বিহ্যাব করতে লাগলো যে, লিয়ানা কাদতে কাদতে দৌড়ে পালালো। কিন্তু আমি আসিনি, পাক্কা তিনপ্লেট ফুচকা খেয়ে এসেছিলাম। সেদিন বুঝেছিলাম লিয়ানাকে কত সহজে কাদানো সম্ভব। আমি ফেরার পথে লিয়ানাকে কল দিয়েছিলাম। ও তখনো কাদছিলো। আমি শান্তনা দিয়ে বুঝালাম এসব কোন ব্যাপারনা। সে আসলে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে ওকে ফোন দিলাম। প্রথমবার রিসিভ করেনি। দ্বিতীয় বার রিসিভ করার পর ও জানালো ওর জ্বর আসছে। আমি ওকে নাপা খাওয়ার জন্য বলে রেখে দিলাম।

চারটার দিকে লিয়ানা কল দিলো,
=কি করছো তুমি?
-শুয়ে আছি। ঘুম আসছেনা।
=বের হও।
-কেন?
=একটু পিএইচএ তে ঘুরতে যাবো।

আমি রেডি হয়ে বের হয়ে ওর বাসার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। ও বোরখা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে আসলো। আমরা পিএইচএ তে ঘুরতে লাগলাম। পুকুর পাড়ের ঐদিকটায় যেইতেই একটা পাকা পেয়ারা দেখলাম। পেয়ারাটা দেখেই ও বাচ্চা মেয়ের মত আমাকে তা পেড়ে দিতে অনুরোধ করলো। আমি বহু কষ্টে সেই পেয়ারাটা ওকে পেড়ে দিলাম। পেয়ারাটা হাতে পেয়ে ও এতটাই খুশি হয়েছিলো যে, ও আমার হাত ধরে ফেললো। ও খুশির চোটে ধরলেও আমার ভেতর দিয়ে যেন সাইক্লোন বয়ে গেল। আমরা আরো কিছুক্ষন ওখানে হেটে বাসায় চলে আসলাম। আমি কিছুতেই বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলামনা। ওর সেই প্রথম হাত ধরা আমার আজো মনে পড়ে।

এর কয়েকদিন পরের ঘটনা, লিয়ানা ফোন দিয়ে জানালো ওর আম্মু এসেছে বাসায়। আমাকে দাওয়াত করেছে যেতে। দাওয়াত পেয়ে আমি ভাবতে লাগলাম কি করা যায়? যাবো কি যাবোনা? আমার মধ্যে একধরনের ইতস্ততা কাজ করতে লাগলো। সন্ধার পর থেকে লিয়ানা কল দিতে লাগল। কিন্তু আমি তখনো ডিসিশন নিতে পারছিলামনা যাবো কি যাবোনা। অবশেষে লিয়ানার অনেক বকা খেয়ে ওর বাসায় গেলাম। খাওয়া দাওয়া করলাম ওর আম্মু আমার পাশে এসে বসে কথা বলতে লাগলেন।

-বাবা তোমার বাসায় কে কে আছেন?
=আব্বু, আম্মু, আর ছোট বোন।
-তোমার আব্বু কি করে?
=ব্যাবসা করে।
-ও আচ্ছা। বাবা মেয়েটাকেত এখানে একাই থাকতে হয়। এখানেত আমাদের আত্নীয় স্বজন কেউ নেই। তুমি একটু খোজ খবর রেখ।
=জ্বী আন্টি।

এই সময় ফাজিলটা আমাকে এসএমএস দিলো “দায়ীত্বত একটা পেয়ে গেলা”। এসএমএস পেয়ে মেজাজ চরম হয়ে গেল। শালী আমি এমনিতেই তোর খোজ খবর নেইনা? আচ্ছা আজকা দেখাবো মজা। আমি ওর বাসা থেকে চলে এলাম।
************************

নখ কাটাতে ওর চরম অনীহা ছিলো। আমি মাঝে মাঝেই বিরক্ত হয়ে যেতাম। ওর জন্মদিনে আমি ওকে নেল কাটার উপহার দিয়েছিলাম। কিন্তু কিসের কি? ওর নাকি নখ কাটতে ভয় লাগে। তাই আমিই মাঝে মাঝে ওর নখ কেটে দিতাম। একবার আমি দুইদিন বলার পরেও ও নখ কাটেনি তাই আমি ব্লেড কিনে এনে ভার্সিটিতেই ওর নখ কেটে দিলাম। ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তাই সেও আমার হাত থেকে ব্লেড নিয়ে আমার ছোট ছোট নখ কেটে দিতে লাগলো। খুব তাড়াতাড়ি আর হাতের কাপুনিতে আমার বৃদ্ধা আঙ্গুল কেটে গেল। কিছুতেই রক্ত বন্ধ হচ্ছিলনা। এটা দেখে ও বাচ্ছা মেয়েদের মত কান্নাকাটি শুরু করলো। আমি চরম বিরক্ত হয়ে বাসায় চলে আসলাম। ওর ফোন ধরছিলামনা। কিন্তু, ফাজিলটা বাসায় এসে হাজির। এরপর দেড়মাস আমি কোন এসাইনমেন্ট করিনি। আমার সব এসাইনমেন্ট ওই করে দিতো।

ওর বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে লাগলো। ওর আম্মু আমাকে কল দিয়ে ওকে বুঝাতে বলেছে। আমি ওকে বিয়ের জন্য বুঝাতে লাগলাম। লিয়ানার বিয়েতে আমি কত মজা করবো। কত কত প্ল্যান করে রাখছি। কিন্তু ওকেই রাজি করাতে পারছিনা। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, শেষ পর্যন্ত রোজার ঈদের চারদিন আগে ওকে রাজি করাতে পেরেছিলাম। ও শুধু বলেছিলো তুই খুশিত? আমি বলেছিলাম অবশ্যই অনেক খুশি।

লিয়ানার আম্মু কল করে জানিয়েছে ওর জন্য ছেলে ঠিক হয়েছে। পাত্র পক্ষ ওকে অনেক পছন্দ করেছে। ঈদের পর ওর বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হবে আমি যেন সেদিন অবশ্যই আসি। আমিত অনেক খুশিমনে ওর বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মারুফকে নিয়ে ঈদের পঞ্চম দিন লিয়ানার বাসার উদ্যেশ্যে রওনা দিলাম। লিয়ানাকে লাস্ট কয়েকদিন ধরে ফোনে তেমন একটা পাচ্ছিনা। আজো বেরুনোর আগে ফোন দিয়েছিলাম কিন্তু বন্ধ শেষে আন্টিকে ফোন দিয়ে জানালাম আমরা আসছি। আমি ওকে ওর ফোন বন্ধের ব্যাপারে কিছু জিগেস করতামনা। হয়ত ওর হবু স্বামীর সাথে অন্য সীম লাগিয়ে কথা বলে তাই।

লিয়ানাদের বাসায় পৌছে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। কিন্তু লিয়ানার খোজ নাই আন্টি জানালো ও অসুস্থ তাই ঘুমোচ্ছে। আমি আন্টির কথায় বিরক্ত হলাম। সারাদিন জার্নির কারনে শরীর খারাপ লাগায় আমি আর মারুফ ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাতৎ মাঝরাতে আমার কানের কাছে কার যেন ফিশ ফিশ কথা শুনতে পেলাম। অনেক্ষন পরে বুঝলাম লিয়ানা আমাকে বলছে, এই বাইরে চল কথা আছে। আমিও ওর কথা মত বাইরে এলাম। স্বাভাবিক কুশল বিনিময়ের পর ও এমন একটা কথা বললো যা শুনে মাথা হ্যাং হয়ে গেল।

-সাইফুল আমায় বিয়ে করবি?
=লিয়ানা বাহ মজাত ভালোই শিখেছিস!গুড। {নিজেকে সামলে}
-আমি সিরিয়াস।
=পাগল নাকি?
-হ্যা পাগল। শোন সাইফুল, আমি রেগুলার নখ কাটবো। আমি রেগুলার কানের ঔষধ খাবো। তোর সাথে ঝগড়া করবোনা। তোর এসাইনমেন্ট করে দিবো। আমরা বিয়ে করে একসাথে থাকবো। আমাদের অনেক গুলো বাচ্চা হবে। আমি আমি…………… আমি………… আর কিছু জানিনা। তুই আমাকে বিয়ে কর প্লিজ। আমি তোকে ছাড়া বাচবোনা।

এসব বলতে বলতে হাউ মাউ করে আমার বুকে আচড়ে পড়ে কাদতে লাগলো। আমি চলে আসতে চাইলাম কিন্তু লিয়ানা আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। এই হাত আমি উপেক্ষা করতে পারিনি। শুধু বলেছিলাম সবাইকে সামলাতে পারবি?

এরপর আর আমাকে কিছু করতে হয়নি। ওই সব করেছিলো কিন্তু ও কথা রাখেনি, এখনো আমিই ওর নখ কেটে দেই। ঔষদ খায়িয়ে দেই। প্রচন্ড বকা দিতে ইচ্ছে করে ওকে কিন্তু বকা আর দেয়া হয়না কারন পাগলীটাকে যে আমি ভালোবাসি।

মূল লেখাঃ আমার নিজের ব্লগে

২ thoughts on “বন্ধুত্ব এবং তারপর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *