ভাগ্যের পরিহাস : সরকারকে থামানো গেলেই দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়

১৯৯১ সাল থেকে নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালুর পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনেই দেশ চলেছে। মাঝে কিছুদিন ছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এসব সরকারের আমলে জ্বালানি খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা দেশবিরোধী, গণস্বার্থবিরোধী বলে প্রতিবাদ হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা প্রতিবাদকারীদের উন্নয়নবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে ও তাদের বিরুদ্ধে চালায় দমন-নিপীড়ন। জোর করেই এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের থামাতে হয়েছিল।

সময়ের বিবর্তনে এসব সরকারি সিদ্ধান্ত অকাট ভুল প্রমাণিত হয়। গত দুই দশকের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গ্যাস রপ্তানি, নাইকো চুক্তি, সার রপ্তানি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, টাটার বিনিয়োগ প্রকল্প, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে চুক্তি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি, মডেল পিএসসি, কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সব ইস্যুতে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যেত।

তবে গুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুতে গণস্বার্থ রক্ষার জন্য কোনো সরকার ওই প্রতিবাদকারীদের ধন্যবাদ দিয়েছেন বা কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এমনটা শোনা যায়নি। বরং এখনও যখন এই খাতে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে, সরকার আগের ধারাবাহিকতায়ই এগুচ্ছে। বিরোধীদের মতকে বিবেচনায় না নিয়ে আগের মতো করেই তাদের দোষারোপ ও দমন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।

ঠিক বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে সুন্দরবনের রামপালে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সুন্দরবন অপরিমেয় ক্ষতির মুখে পড়বে। এর পক্ষে তারা সুস্পষ্ট গবেষণা হাজির করলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। বরং পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও এমনকি তাদের নিন্দা করেছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ।

বর্তমানে সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরতরা বলছেন, এবারও তাই হবে। গণআন্দোলনই সরকারকে থামাবে এবং অবশ্যই প্রমাণ হবে যে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল! সুন্দরবন ইস্যুতে কী ঘটে তা এখনও সময়ের ওপর নির্ভরশীল। তবে যেসব ইস্যুতে সরকার নিজেই দেশের স্বার্থহানী ঘটানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সেগুলোর আদ্যোপান্ত জানাটা জরুরি!

গ্যাস রপ্তানি, পিএসসি
বাংলাদেশের গ্যাস খাত সরকারি সিদ্ধান্তেই কয়েকবার পথে বসার উপক্রম হয়েছিল। ৯০ দশকের শেষদিকে শুরু হয় গ্যাসের বিরাট সমৃদ্ধির প্রচার। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রচার করতে থাকেন দেশ গ্যাসের সাগরে ভাসছে। এই গ্যাস যদি রপ্তানি না করা হয়, তাহলে তা পচে যাবে। এর মধ্যেই ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে রাজি না হওয়ায় আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারতে হয়েছে।

২০০২ সালে ভারতে গ্যাস রপ্তানির জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জোর তৎপরতা চলে। খনিজ অনুসন্ধানকারী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ইউনোকল তখন আশা প্রকাশ করেছিল, বাংলাদেশ সরকার ভারতে গ্যাস রপ্তানির সিদ্ধান্তই নেবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত এক সমীক্ষায়ও পাইপলাইনে ভারতে গ্যাস রপ্তানির পক্ষে মত দেয়া হয়। ২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে নামা অবধি বিএনপি সরকার গ্যাস রপ্তানির চেষ্টা চালায়। কিন্তু অব্যাহত প্রতিবাদের কারণে তাদের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবাদ করে বিভিন্ন দল ও সংগঠন, বিশেষ করে বামপন্থিদের গড়া নাগরিক সংগঠন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।

১৯৯৭ সালের উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি তথা মডেল পিএসসিতে গ্যাসকে তরলীকৃত (এলএনজি) করে রপ্তানির সুযোগ ছিল। বিএনপির বিদায়ের পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ক্ষণস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৭ সালের তুলনায় ২০০৮ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে এলএনজি (তরলীকৃত) হিসেবে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রেখে মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুমোদন করে এবং সাগরের সর্বমোট ২৮টি গ্যাসব্লক একসঙ্গে ইজারা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। তাতে জনগণের মধ্যে প্রবল আপত্তি দেখা দেয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষকেরা, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন গ্যাসব্লক ইজারা দেয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত বলে জরুরি অবস্থার মধ্যে এ ধরনের কাজের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। ফলে নয়টি ব্লক একত্রে ইজারার জন্য চূড়ান্ত হলেও চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। দলীয় প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা কিনা প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানিতে রাজি না হওয়ায় ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ৮ বছর পর ক্ষমতায় এসে সেই আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস রপ্তানি প্রশ্নেই বিরাট আন্দোলনের মুখে পড়ে। তখন বিরোধীরা এও বলে যে, এবার রপ্তানির দাসখত দিয়েই লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে। পিএসসি ২০০৮, যাতে কিনা গ্যাস রপ্তানির সুযোগ ছিল, তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে আওয়ামী সরকারের ভয়ানক পুলিশি নির্যাতনের মুখে পড়ে আন্দোলনকারীরা। পুলিশ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পা ভেঙে দিয়ে এবং অন্যদের জখম করে জানান দেয় যে, সরকার গ্যাস রপ্তানির প্রশ্নে অবিচল। এ সময় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আনু মুহাম্মদকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং গ্যাস রপ্তানির বিরোধিতা করেন। পরবর্তীতে আন্দোলনের চাপে সরকার নতুন পিএসসি প্রণয়ন করে ও গ্যাস রপ্তানির ধারা বাদ দেয়।

শুধু গ্যাস রপ্তানির ধারা নয়, পিএসসির বিষয়টা ছিল তার চেয়েও বড়। এর মাধ্যমেই বিদেশি কোম্পানি প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করে এবং এই চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলিত সম্পদ বণ্টন হয়। পিএসসির অন্য অনেক ধারা নিয়েও আপত্তি ছিল জাতীয় কমিটির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকারীদের। উত্তোলনকারী কোম্পানিকে বেশি সুবিধা দেয়া, তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সকে অকার্যকর করে রেখে উপর্যুপরি বিদেশি কোম্পানি ডেকে আনা এবং দেশের স্বার্থ হানি করে অসম চুক্তি করার মতো অভিযোগ ছিল। আন্দোলনকারীরা সরকারকে চাপ দিতে থাকেন এই বলে যে, গ্যাস সম্পদ সীমিত, তা যথার্থভাবে কাজে লাগাতে হবে। রপ্তানি বা অন্য কোনো উপায়ে এ থেকে দেশের মানুষ বঞ্চিত হলে তা জাতীয় অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু সরকারগুলো আন্দোলনকারীদের বরাবরই দেশের উন্নয়নের বিরোধী বলে প্রচার চালিয়েছে। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাসীনরা আন্দোলনকারীদের ‘টোকাই’ বলেও অভিহিত করেছেন।

গত ৭ আগস্ট, ২০১৫ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ রয়েছে ১৪ দশমিক ৩২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। আর গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক টিসিএফ। কিন্তু বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় গ্যাস উত্তোলন ও বিতরণ করা হয় তাতে বার্ষিক ঘাটতি থাকে অন্তত এক হাজার ৮২৫ কোটি ঘনফুট। এ তথ্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সূত্রের। উত্তোলন ও ব্যবহারের হার একই মাত্রায় থাকলে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মজুদ গ্যাস ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু দেশের শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি চাহিদা। ক্রমবর্ধমান গ্যাস-জ্বালানির চাহিদা ও মজুদের হিসাব কষে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯ সালেই গ্যাস সংকটে পড়বে দেশ। তাই এ বিষয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

এ থেকে প্রমাণ হয় যে, আন্দোলনকারীরা সঠিক পথেই ছিলেন। তাদের বদৌলতেই গ্যাস রপ্তানি ঠেকানো গেছে। তখন সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ হলে অর্থাৎ গ্যাস রপ্তানি হলে আজ দেশের অর্থনীতি বিরাট হুমকির মুখে পড়ত। জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত শিল্প ও পরিবহন খাত। নিজেদের গ্যাস হারিয়ে চড়া দামে আজ আমাদের বিদেশি কোম্পানি থেকে গ্যাস কিনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হতো।

নাইকো ও কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি
কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো ও আমেরিকার কোম্পানি কনোকোফিলিপসের সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের জন্য সরকার যে চুক্তি করে তার প্রচণ্ড বিরোধিতা হয়েছিল। নাইকো চুক্তির সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই সরকারই যুক্ত। আর কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তিটি হয়েছে আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানেই। এই দুটি চুক্তির বিরোধিতা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো আমলে না নিলেও পরে এসব বিষয়ে অনিয়ম ধরা পড়ে এবং এর দ্বারা যে জাতীয় স্বার্থের বিপুল ক্ষতি হয়েছে, তা প্রমাণ হয়।

১৫ ডিসেম্বর ২০১০ বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৌফিক-ই-ইলাহী আওয়ামী লীগ সরকারের জ্বালানি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, চুক্তির সব বিষয় গোপন রাখা হবে এমন বিধান রেখে তখন নাইকোর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন তিনি। নাইকোকে বিনা দরপত্রে গ্যাসক্ষেত্র বরাদ্দ দেয়ায় ওই সময় রাষ্ট্রের মোটা অঙ্কের ক্ষতি হয়।

নাইকোকে কাজ দিতে ছাতক ক্ষেত্রে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাস মজুদ থাকা সত্ত্বেও তা পরিত্যক্ত দেখানো হয়। এছাড়া কায়দা করে নাইকোকে ছাতক (পশ্চিম) ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র দেয়ার ব্যবস্থা হয়। সব কাজই হয় তৌফিক-ই-ইলাহীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে। তবে ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ও গ্যাস উত্তোলনে নাইকোর দেয়া প্রস্তাব পেট্রোবাংলা গ্রহণ না করলেও জ্বালানি মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করে। এ নিয়ে ১৯৯৯ সালের আগস্টে বাপেক্স ও নাইকোর মধ্যে যৌথ সহযোগিতা চুক্তির খসড়া স্বাক্ষরিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, উত্তোলিত গ্যাসের ৮০ ভাগ নাইকো ও ২০ ভাগ পাবে বাংলাদেশ।

সরকার বদলের পর নাইকোর নিয়োগ প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হয়। বিগত সরকারের এই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল পরবর্তী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আমলেও। খালেদা জিয়া পূর্ববর্তী সরকারের অনুমোদিত ‘প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন’ সংক্রান্ত যৌথ সহযোগিতা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। সে মোতাবেক যৌথ সহযোগিতা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার পর তা অনুমোদনের জন্য পুনরায় ২০০৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। কিন্তু কোনোরকম অনুমোদন ও অনুশাসন ছাড়াই তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফেরত পাঠানো হয়।

এরপর ওই বছরের ৮ অক্টোবর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন এ-সংক্রান্ত নথিতে নিজ হাতে লেখেন, তার সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেহেতু এর আগে বিষয়টি একবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে, তাই পুনঃঅনুমোদন প্রয়োজন পড়ে না। এরপর ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর নাইকোর সঙ্গে বাপেক্সের যৌথ সহযোগিতা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নাইকো ছাতক ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে ন্যূনতম ১০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস উত্তোলনের অবৈধ সুযোগ পায়। বেআইনিভাবে নাইকোর মতো অদক্ষ একটি কোম্পানিকে গ্যাস উত্তোলনের কাজ দেয়ার কারণে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ হয়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়।

জানা গেছে, ছাতক গ্যাসক্ষেত্র টেংরাটিলায় অনুসন্ধান কূপ খননের সময় ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুনে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটায় নাইকো। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যাওয়াসহ ক্ষেত্রটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতি হয় গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশ এলাকার পরিবেশের। বাংলাদেশে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক অনুসন্ধান কমিটি এ বিস্ফোরণের জন্য নাইকোর কারিগরি অদক্ষতাকেই দায়ী করে।

২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দুদকের করা নাইকো দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী দীর্ঘদিন হাজতবাস করেন। একই মামলায় অভিযুক্ত হন শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ দুই সরকারের অনেকেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এখন কেবল বিএনপি সরকারের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেই এ মামলার বিচার চলছে, যার মধ্যে অন্যতম বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। নাইকো চুক্তির বিরোধিতা করলেও আন্দোলনকারীরা এটা থামাতে পারেননি। সরকার এই বিরোধিতাকে দমন করেছে এবং নাইকোর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছে। ফলত দেশের ক্ষতি হয়েছে বিপুল।

নাইকোর মতো কনোকোফিলিপসের সঙ্গে সমুদ্রবক্ষের গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তিরও বিরোধিতা হয়েছিল। এই চুক্তিও হয়েছিল অনিয়মের মধ্য দিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাউস্টোনভিত্তিক এ কোম্পানিটিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তৌফিক-ই-ইলাহী প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগ আছে, চুক্তির আগেই তিনি বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপসকে পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জে এফ মরিয়র্টিকে।

১৬ জুন, ২০১১ গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি সই করে পেট্রোবাংলা। চুক্তিটি করা হয় পূর্বেই বিরোধিতার মুখে পড়া ‘মডেল পিএসসি-২০০৮’ অনুসারে। ওই পিএসসির ১৫.৫.৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়, বাংলাদেশ যদি সমুদ্রের ১৭৫ মাইল দূরের গ্যাসক্ষেত্র পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা (পাইপলাইন) স্থাপন করে, তাহলেই কেবল বাংলাদেশের পক্ষে পেট্রোবাংলা তার অংশের ‘প্রফিট গ্যাস’ রাখার অধিকারপ্রাপ্ত হবে। তবে তা কোনো মতেই মোট ‘বাজারজাতযোগ্য গ্যাসের’ ২০ শতাংশের বেশি হবে না। কিন্তু এই পাইপলাইন তৈরি করতে বাংলাদেশের যে খরচ পড়বে, তা কনোকোফিলিপসের প্রাথমিক বিনিয়োগের ৩ গুণ বেশি। এভাবেই শতভাগ গ্যাস বিদেশে রপ্তানির সুযোগ করে দেয়া হয়।

চার বছর পর এখন খবর এসেছে, কনোকোফিলিপস চলে গেছে। তারা ওই দুই ব্লকে কাজ করবে না বলে চূড়ান্ত চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলাকে। এ থেকে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এই চার বছরে আমাদের অগ্রগতি কী? কনোকো জানিয়েছে, দুটি ব্লকে তারা অনুসন্ধান চালিয়েছে। প্রথম দফার দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ শেষে তারা গ্যাসের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পায়নি। এরপর দ্বিতীয় দফায় অনুসন্ধান চালিয়ে ১১ নম্বর ব্লকের একটি অংশে গ্যাস স্তর খুঁজে পায় তারা। এতে চার টিসিএফ গ্যাসের মজুদ আছে বলে ধারণা দেয় কোম্পানিটি। তবে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মনে হয়নি তাদের।

অগ্রগতি একেবারে শূন্য নয়। চার টিসিএফ গ্যাসের ধারণা মিলেছে। কিন্তু মজুদ সম্পর্কিত বিস্তারিত জরিপ প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত জমা দেয়নি কনোকো। অথচ বাংলাদেশ ছাড়ার ঘোষণা তারা দিয়ে দিয়েছে। সেটা চূড়ান্ত বলেই ইতোমধ্যে বিদেশি কোম্পানিটি তাদের ব্যাংক গ্যারান্টির টাকা ফেরত নিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ এখন কোনো অপরাধের প্রমাণ মিললেও কনোকোকে আটকানোর কোনো সুযোগ আর সরকারের হাতে নেই। অথচ ১১ জুলাই, ২০১১ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের দুটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বৈঠক শেষে কমিটিদ্বয় কনোকোর সঙ্গে হওয়া চুক্তিটিকে ‘দূরদর্শী’ ও ‘সাহসী’ আখ্যা দেয়। আজ সেই দূরদর্শিতার ফল দেখা যাচ্ছে!

এভাবে কনোকোফিলিপস বাংলাদেশের জ্বালানি উন্নয়নের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। বঙ্গোপসাগরের নানা ধরনের ভৌগোলিক তথ্য বগলদাবা করে চলে যায়। কিন্তু দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কনোকোফিলিপসের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। নাইকোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়। উভয় চুক্তিই হয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে। সরকার সেই অনিয়মের পক্ষে ছিল। আন্দোলনকারীরা সরকারকে তার অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি বলে দেশের ক্ষতি হয়ে গেল। সরকারের সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল তা আজ প্রমাণিত। কিন্তু সেই ভুল স্বীকার করা ও তা থেকে শিক্ষা নেয়ার কেউ নেই।

উন্মুক্ত খনি, এশিয়া এনার্জি
২০০৫ সাল থেকে বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় রপ্তানির উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উত্তোলনের প্রচেষ্টা এবং সে উদ্দেশ্য সফল করার জন্য কয়লানীতি প্রণয়নের তৎপরতাও আন্দোলনের কারণে ব্যর্থ হয়। বিধান অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগে যদি কয়লা তোলা হয়, তাহলে রয়্যালটি হিসেবে সরকার পাবে সেই কয়লার ৬ শতাংশ বা তার সমতুল্য বাজারমূল্য। বাকি ৯৪ শতাংশ কয়লা পাবে বিদেশি বিনিয়োগকারী। যদি কয়লার পরিবর্তে কয়লার বাজারমূল্যে বিনিয়োগকারী রয়্যালটি পরিশোধ করে, তাহলে উৎপাদিত সমুদয় কয়লার মালিক হবে এই বিনিয়োগকারী কোম্পানি।

উন্মুক্ত খনন ও এশিয়া এনার্জিকে কেন্দ্র করে সরকার ও আন্দোলনকারীদের বিবাদ তুঙ্গে উঠেছিল। সরকারি বাহিনীর গুলিতে আন্দোলনকারীদের এজন্য জীবনও দিতে হয়েছিল। এ আন্দোলনের ফলে এখন পর্যন্ত বৃহৎ পরিসরে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন এবং এশিয়া এনার্জির তৎপরতাকে আটকে রাখা গেছে। জানা যায়, ১৯৯৮ সালে বিএইচপি মিনারেলসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি অ্যাসাইনমেন্ট (মালিকানা হস্তান্তর) চুক্তির সূত্রে এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (বাংলাদেশ) ২ অক্টোবর ২০০৫ উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লাক্ষেত্রের কয়লা উন্নয়ন ও উত্তোলনের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কাছে একটি ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি প্রতিবেদন দাখিল করে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ওই প্রস্তাবটি মূল্যায়নের জন্য ১৭ নভেম্বর ২০০৫ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কমিটি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬ প্রথমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তৎকালীন সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।

কমিটির সুপারিশে বলা হয়, আইনগত, প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি দুর্বলতার কারণে এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (বাংলাদেশ) কর্তৃক দাখিলকৃত প্রকল্প প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়। কমিটির সুপারিশ কর্তৃপক্ষের মনঃপূত না হওয়ার কারণে দাখিলকৃত প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপস্থাপিত হয়নি। এর মধ্যেই চলেছে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জোর বিরোধিতা। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প ঘিরে এই আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি পায়। শেষ পর্যন্ত গুলি করে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা চালায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ২৬ আগস্ট ২০০৬ সালে তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) গুলিতে তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হয়।

এরপর তেল গ্যাস কমিটির সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয় খালেদা সরকার। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে না। সেই সময় বিরোধী দলের নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এক জনসভায় তেল গ্যাস কমিটির আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেছিলেন, জাতীয় কমিটির সঙ্গে বিএনপি সরকারের চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা উচিত।

বিশেষজ্ঞরা উন্মুক্ত খননের নানা ক্ষতির তথ্য সামনে টেনে এনেছেন বহুবার। কিন্তু সরকার এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে যুক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে গেছে অব্যাহত। আন্দোলনের চাপে একপর্যায়ে যেমন তারা ফুলবাড়ী থেকে সরে এসেছে, তেমনি উন্মুক্ত খনন না করতেও সম্মত হয়েছে। তবে এশিয়া এনার্জির পক্ষের লোকেরা এখনও সরকারে রয়েছে। তাই মাঝে মাঝেই সরকারের পকেট থেকে এশিয়া এনার্জির পক্ষে নানা সমন বের হয়।

১৫ জানুয়ারি, ২০১২ আইইবি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ‘কয়লা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মজুদ থাকুক। ভবিষ্যতে হয়ত এমন প্রযুক্তি আসবে, যখন কয়লা উত্তোলন না করেই সেখান থেকে শক্তি ব্যবহার করা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়লা আমদানি করা যায়। বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।’ যা কিনা প্রমাণ করে যে, অবশেষে সরকার উন্মুক্ত খননের বিপদকে আমলে নিয়েছে।

কয়লা উত্তোলনে যদি উন্মুক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ হতো, তাহলে আজ হাজার হাজার একর জমি উজাড় হয়ে যেত। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নষ্ট হতো, মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ এলাকার জমি উত্তোলিত কয়লার চুয়ানো পানিতে উর্বরতা হারাতো। বসতি থেকে উচ্ছেদ হতো লাখো মানুষ। আর এত ত্যাগের ফলে যা পাওয়া যেত, সেই কয়লা রপ্তানি হয়ে যেত। দেশ বঞ্চিত হতো নিজস্ব সম্পদ থেকেও। তীব্র গণআন্দোলনই এক্ষেত্রে সরকারকে ভুল পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছে। জীবন দিয়ে তারা দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং প্রমাণ করেছে গুলি চালনাকারী সরকার কতটা ভুল ছিল! তা সত্ত্বেও কয়লানীতি নিয়ে এখনও সরকার প্রশ্নাতীত কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

আন্দোলনের কারণে দস্যু প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি এখন ফুলবাড়িতে ঢুকতে পারছে না। কিন্তু ফুলবাড়ির কয়লা নিয়ে লন্ডনের শেয়ার বাজারে ব্যবসা করছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে এখনও দেশের ক্ষতি করে হলেও এশিয়া এনার্জি ও তার প্রভুদের সঙ্গে সু সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিতেই হাঁটছে সরকার।

সার রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ
ভারতীয় টাটা কোম্পানির কর্ণধার রতন টাটা ২০০৪ সালের ১৩ অক্টোবর বিনিয়োগ বোর্ডের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে রপ্তানিমুখী সার কারখানা, স্টিল মিল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের আগ্রহপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। এছাড়া সরকার অনুমতি দিলে টাটা কোম্পানি উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগেও আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। টাটার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি প্রবল গণবিরোধিতার কারণে।

বিদেশি বিনিয়োগে রপ্তানিমুখী শিল্প এর বাইরেও আরও অনেক হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দেশের লাভ বলতে কর্মসংস্থান ও কিছু শুল্ক আদায়। কিন্তু এর মাধ্যমে বিদেশিরা পায় কম মূল্যের শ্রমশক্তি, কম দামের জ্বালানি ও দুর্নীতিজনিত অন্যান্য সুবিধা। যা কিনা তাদের লাভকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। টাটার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে আজ দেশে বিরাট গ্যাস সংকট তৈরি হতো। এখনও যে পরিমাণ গ্যাস সংকট আছে, তার জন্য দায়ী রপ্তানিমুখী বিদেশি বিনিয়োগ।

যেমন, কম দামে দেশীয় গ্যাস কিনে উৎপাদিত সার বিদেশে রপ্তানি করে কর্ণফুলী সার কারখানা (কাফকো)। আর বাংলাদেশ কিনলেও তা আন্তর্জাতিক দামে কিনে। এছাড়া চুক্তি অনুসারে গ্যাস সরবরাহে প্রাধান্য পায় কাফকো। দেশের সার কারখানায় গ্যাস না দিয়ে আগে কাফকোকে গ্যাস সরবরাহ কর হয়, এমন নজিরও রয়েছে। টাটা এলে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটত। জ্বালানির ঘাটতি ও দেশের ক্ষতি বেড়ে যেত। আজ নিজস্ব শিল্পগুলো পড়ে যেত জ্বালানি সংকটে।

টাটার বিনিয়োগ ঠেকানো গেলেও দেশের সম্পদে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক দামে কেনা বা অবাধে রপ্তানি হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়নি। বিদেশি বিনিয়োগ ও তাতে জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার সংক্রান্ত সরকারি অনেক সিদ্ধান্ত এ যাবৎ দেশের স্বার্থবিরোধী বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার বিষয়ক কোনো গণমুখী নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।

শেষ কথা
এরকম আরও অনেক ইস্যু আছে। রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদেশ থেকে পুরনো যন্ত্রপাতি ক্রয়, বিভিন্ন কোম্পানিকে ঘুষের বিনিময়ে বেশি সুবিধা দেয়ার মতো অনেক খাতে ও অনেক কিছুতেই এভাবে দেশের স্বার্থহানী ঘটিয়েছে ক্ষমতাসীনরা, এখনও তা চলছে। দুই সরকারের কয়েক মেয়াদে ঘটে চলা এসব ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু এসবের জন্য কারা দায়ী, তাদের খুঁজে বের করা বা বিচারের মুখোমুখি করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না এখন পর্যন্ত।

জ্বালানি খাতে সরকারের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। সংগঠনটির নেতারা বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও তার বাস্তবায়ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, প্রকল্প এলাকার প্রতিনিধি ও সরকারের সমন্বয়ে এই খাতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যারা ইতিপূর্বে দেশের স্বার্থহানি ঘটিয়েছেন তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে দেখা করে সম্প্রতি এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, আমাদের আন্দোলন দেশের স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। আর সরকারকে দেখা গেছে আমাদের পক্ষে না দাঁড়িয়ে তার দলের মধ্যে থাকা সুবিধাভোগীদের পাশে থাকতে। যারা কিনা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করে না। তবে আন্দোলনের মাধ্যমেই আমরা সরকারের অনেক ভুল সিদ্ধান্তকে থামিয়েছি। সরকার আমাদের গালি দিয়েছে, আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। এভাবেই আমাদের শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে। আজ আমাদের আন্দোলনের সামর্থ্য অনেক বেড়েছে। আশা করছি, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনেও আমরা জয়ী হব। সরকারের যদি অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার মানসিকতা থাকত তাহলে আমরা এতদিনে জাতীয় সমৃদ্ধিতে আরও অনেকখানি এগিয়ে থাকতাম।’

৮ thoughts on “ভাগ্যের পরিহাস : সরকারকে থামানো গেলেই দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়

  1. লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ এক
    লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে বিবেচিত হবে। সরকারগুলো কিভাবে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের পকেট ভরেছে তরুণরা তা জানলে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ সহজতর হবে। ধন্যবাদ রইল।

  2. তথাকথিত গনতন্ত্রের নামে এই
    তথাকথিত গনতন্ত্রের নামে এই ধরনের একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে বাধ্য করতে হয়।

  3. চমৎকার একটা লেখা। সরকারগুলোর
    চমৎকার একটা লেখা। সরকারগুলোর কু-কর্মের আর্কাইভ হয়ে থাকবে। চেতনার আর্কাইভ, গনতন্ত্রের আর্কাইভ, একনায়কতন্ত্রের আর্কাইভ, রাজনৈতিক পরাজয়ের আর্কাইভ।

  4. এই সরকারের চরিত্র
    এই সরকারের চরিত্র অপরিবর্তনশীল, এদেরকে নসিহতে কাজ হবে না। সুতরাং এর একমাত্র বিকল্প হইল জামাত-বিএনপি-বামাতির দেশপ্রমিক মুমিন জোটকে লাল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনা।

  5. বিএনপি আর লীগারদের চরিত্র
    বিএনপি আর লীগারদের চরিত্র এটাই। তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে! এ কারণেই দেখেন উপরে কিভাবে একে অপরের কাজকে কন্টিনিউ করেছে। আপনিও ঠিক একইভাবে বিম্পিকে বিকল্প করে দিলেন। এটাকে আমি বলি চেতনার দাসত্ব! কার কাছে দাসত্ব? এস্টাবলিশমেন্টের কাছে। এই চিন্তা দ্বারা চালিত হওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠিত দুই বড় দলের বাইরে আর কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছেন না।

Leave a Reply to আনিস রায়হান Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *