ধর্মভীরুতা, উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতাঃ প্রেক্ষাপট চট্টগ্রাম।

একটু পিছন থেকে শুরু করি। ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নন্দীরহাট গ্রামে ছড়িয়ে পরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। ভাংচুর করা হয় শ্রী লোকনাথ আশ্রম সহ বেশ কয়েকটি মন্দির। সহিংসতার সূত্রপাত তার আগেরদিন অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারী লোকনাথ আশ্রমের একটি রথযাত্রা থেকে মসজিদের সামনে ঢোল বাজানো কেন্দ্র করে। স্থানীয় গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটির মীমাংসা হলেও রাতে মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে রাখা হয় এবং সেটাকে কেন্দ্র করে নন্দীরহাট এবং তার আশেপাশের এলাকার মসজিদে জুম্মার নামাজের খুতবা থেকে মুসুল্লিদের উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে জড়ো করে হিন্দুদের উপর হামলা করতে করতে উদ্বুদ্ধ করে। পরবর্তীতে জানা যায় জসীম নামে একজন দিনমজুরকে দিয়ে মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে জামাতের কর্মীরা মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে নেয় এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করে।
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে এবং ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও পটিয়ায় কুরআন অবমাননার ছবি প্রচার করে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে বৌদ্ধদের উপর ব্যাপক তান্ডব চালানো হয়। এখানে বাঙালী মুসলমানদের সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গারাও যোগ দেয়। পরবর্তীতে তদন্তে জানা যায় এখানেও মাস্টার প্লানিং ছিল জামাতের।
যুদ্ধাপরাধী, কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীর মামলার রায় হবার পর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমান নামধারী কিছু মানুষ ভয়াবহ রকমের সহিংস হয়ে ওঠে। প্রায় সারাদেশেই আক্রমন হলেও সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ছিল বাঁশখালীতে। জামাতের কর্মীরা বিভিন্নভাবে উস্কানী দিয়ে সাধারন মানুষকে ব্যবহার করে হিন্দুদের মন্দির এবং বসতবাড়ির উপর হামলা চালায়।
এখন পর্যন্ত সর্বশেষ ফটিকছড়িতে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে আওয়ামীলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীদের উপর জঘন্যরকম হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার আগে পর্যন্ত প্রায় সব হামলাই অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর হলেও এবারে হামলার লক্ষ্য ছিল বিপরীত মতাদর্শের রাজনৈতিক কর্মী। হামলার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তিত হলেও হামলার প্যাটার্ন কিন্তু আগের মতই। যথারীতি ইসলাম ধর্মের উপর আক্রমণের ধূয়া তুলে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মানুষ পিটিয়ে মারা, অগ্নিসংযোগ।
পুরনো ঘটনা নতুন করে আবার বলার কারন একটা ব্যাপার খেয়াল করানো। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রায় সবগুলোই চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের বাইরে কয়েকটা ছাড়া এরকম ঘটনা খুব বেশী নেই। কিন্তু কেন? খুব সহজেই কেন চট্টগ্রামে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যায়। ঠিক এই প্রশ্নের উত্তরটাই খোঁজার চেষ্টা করা হবে লেখার পরবর্তী অংশে।
ঐতিহ্যগতভাবেই চট্টগ্রামের মানুষ ধর্মভীরু। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সুফী, পীর-আউলিয়াদের পদচারণা এই অঞ্চলে বেশী পড়েছে। কিছুদূর পরপর বিভিন্ন মাজার এই কথার সত্যতা প্রমান করে। সুতরাং, বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টলায় মানুষ তুলনামূলক বেশী ধর্মভীরু হবে এটা অস্বাভাবিক না। তবে ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে এখানে বেশকিছু ভাগ দেখা যায়। মাজারপন্থী, কওমী মাদ্রাসাপন্থী, সুন্নিয়তের অনুসারী এরকম আরো বেশকিছু ভাগ। তুলনামূলকভাবে দেশের অন্যান্য জায়গার থেকে এখানে মাদ্রাসার সংখ্যাও অনেক বেশী। প্রায় প্রতিটা এলাকায় অন্তত একটি মাদ্রাসা আপনি খুঁজে পাবেন। এমন অনেক জায়গাও আছে যেখানে হয়ত একটি বিদ্যালয় নেই কিন্তু দুই- তিনটি মাদ্রাসা রয়েছে। এটাই বাস্তবতা।
এত এত মাজার-মাদ্রাসা থাকার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ ধর্মভীরু হয়ে বেড়ে উঠলেও ধর্মপালনের ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা যায় ভিন্নচিত্র। তাদের ধর্মভীরুতার তুলনায় সঠিকভাবে ধর্মপালনের হার অনেক কম। এবং অনেকটাই লোকদেখানো ধরনের। এই পয়েন্টটা খেয়াল রাখবেন। নিজেদের ধর্মকে তারা অসম্ভবরকম শ্রদ্ধা করে কিন্তু ধর্মের বিধি-নিষেধ পালনের ব্যাপারে যথেষ্ঠই অনীহা। ঠিক এই জায়গাটাকেই ব্যবহার করে তাদের ধর্মভীরুতাকে উন্মাদনার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সহিংসতার মত ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
ব্যাপারটা কিভাবে ঘটে সেটা দেখার আগে আরেকটু জেনে আসি ধর্মের খেদমত করার ব্যাপারটা তারা কিভাবে দেখছে। ইসলাম ধর্মে সবার আগে ফরয পালনের নির্দেশ দেয়া হলেও এ অঞ্চলে অনেককেই ফরজের থেকে ধর্মের অন্যান্য অনুশাসন পালন করতেই বেশী আগ্রহী। যেমন দেখা যায়, সারা বছর ফরয নামায হয়ত পড়া হয়না কিন্তু বছরের একটা সময় একটা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করে, ১০টা গরু জবাই করে মেজবান দিয়ে তারা ধর্মের খেদমত করে ফেলেছেন বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। আবার বিভিন্ন মাজারে ওরশের সময় ৫টা গরু পাঠানো বা মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের টাকা অনুদান দেয়াকেই যথেষ্ঠ ধর্মপালন হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু যাদের এরকম আর্থিক সঙ্গতি নেই তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় ওইসব মাহফিলে টুপি মাথায় দিয়ে বসে থাকতে যদিও আসরের নামাযটা পড়ে আসা হয়নি। ২ জন সন্তান থাকলে একজনকে মাদ্রাসায় পড়তে পাঠানো যার পূণ্যে বেহেস্তে যাওয়া সহজ হবে। আমি অনেককে এমন বলতেও শুনেছি পীর না ধরলে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব না। সুতরাং, পীরের খেদমত করো, তুমি জান্নাতে চলে যাবে। মোটামুটিভাবে এটাই হচ্ছে চট্টগ্রামের বেশীরভাগ অঞ্চলের অবস্থা।
লেখার শুরুতেই নন্দীরহাট গ্রামে সংঘটিত সহিংস ঘটনার কথা বলেছিলাম। এই ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিভাবে একদল মানুষকে উস্কে দিয়ে তান্ডব চালাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল সেটা একেবারে কাছ থেকে দেখেছি। সব জায়গায় একদম হুবহু না হলেও উস্কানী এভাবেই দেয়া হয় নিশ্চিত। একটু উনিশ-বিশ এই যা। জুম্মার নামাযের খুতবায় ঈমাম সাহেবের খুতবার সারমর্মটা ছিল এরকম- “আপনারা কেমন মুসলমান? আল্লাহর ঘরের ওপর কাফিরদের আক্রমন হল আর আপনারা ঘরে বসে থাকলেন। আপনারা ঠিকমতো নামায পড়েননা, রোজা করেননা, আল্লাহর রাস্তায় খেদমত করেননা তাহলে কাল হাশরের ময়দানে কি জবাব দেবেন? আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করবে তোমরা কোথায় ছিলে যখন আমার ঘর ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল, কি জবাব দেবেন? আজ যদি আল্লাহর রাস্তায় কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন আল্লাহ পরম করুণাময় হয়ত সেদিন এর উসিলায় আপনাদের জান্নাতি করে দেবেন।” চারপাশের মানুষগুলোর চোখে আসন্ন জান্নাত প্রাপ্তির লোভ চকচক করে উঠেছিল আমার মনে আছে। এমনকি যে মানুষটি নামাযে আসেনি সেও আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিতে দিতে মন্দির ভাংতে চলে গিয়েছিল।
এভাবেই উস্কানী দেয়া হচ্ছে, সাধারন মানুষের ধর্মভীরুতাকে জামাতের লোকজন কৌশলে উন্মাদনার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মনের ভেতর বুনে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার বীজ। যত্র-তত্র গড়ে ওঠা সরকারের নিয়ন্ত্রহীন কওমী মাদ্রাসায় দ্বীনি এলমের নামে চর্চা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বড় হচ্ছে অন্যধর্মের মানুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে। নিজেদের স্বার্থে যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই এদের ধর্মানুভূতিকে উস্কে দিচ্ছে জামাতীরা। আর যেহেতু হুজুর বলেছে, জান্নাত প্রাপ্তির আশায় তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একদল মানুষ।
এই চিত্রটা বদলানো না গেলে ভবিষ্যতেও এধরনের ঘটনা ঘটবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের কাজটা সহজ না। প্রথম যে কাজটা করতে হবে সেটা হচ্ছে ইসলামের সত্যিকারের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। আর তার জন্য এ অঞ্চলে বড় বড় যত আলেমরা আছেন তাদের এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামের সঠিক শিক্ষাদান হচ্ছে কিনা সেটা খেয়াল রাখতে হবে। সত্যিকারের ইসলাম চর্চা হলে জান্নাতের লোভে মন্দির ভাংতে যাবার লোক পাওয়া যাবেনা নিশ্চিত। এছাড়াও শিক্ষিত যে শ্রেনী রয়েছে তাদেরও সচেতন থাকার বিকল্প নেই। নিজ নিজ এলাকায় উস্কানীদাতা কাউকে পেলে তাকে প্রতিহত করা, মসজিদে উগ্র সাম্প্রদায়িক কথা-বার্তা যেন কোনভাবেই না বলা হয় সেটা খেয়াল রাখা। সম্মিলিত প্রতিরোধ হলেই জামাতীরা তাদের নোংরা ষড়যন্ত্র নিয়ে পালাতে বাধ্য হবে। তার একটা উদাহরন দিয়েই শেষ করি। বাঁশখালীতে সহিংসতা শুরু হবার পর চট্টগ্রামের হাঠহাজারী থানার মির্জাপুর গ্রামে পুরো গ্রামবাসী আক্ষরিক অর্থেই দল-মত নির্বিশেষে রাত জেগে মন্দিরগুলো পাহারা দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কে ছিলেন না। যার ফলে ওই গ্রামে কোন মন্দিরে হামলা হতে পারেনি। আক্রান্ত হয়নি কোন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পরিবার।
এভাবেই জেগে উঠুক প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, গ্রাম। জেগে উঠুক পুরো বাংলা। তৈরি হোক আমাদের স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

৫ thoughts on “ধর্মভীরুতা, উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতাঃ প্রেক্ষাপট চট্টগ্রাম।

  1. একদম ঠিক বলেছেন । আমাদের
    একদম ঠিক বলেছেন । আমাদের দেশের বেশিরভাগ মুসলমানরা নিজ ধর্ম ঠিক মত পালন না করলেও অন্য ধর্মকে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় কে গালি দিতে ওস্তাদ ।

    1. ভিন্নধর্মের প্রতি আক্রোশ বা
      ভিন্নধর্মের প্রতি আক্রোশ বা ঘৃণার এই জায়গাটাই ব্যবহৃত হয়ে আসছে সবসময়। এর প্রতিকার করতে না পারলে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেনা।

  2. আপনার পোস্ট পড়ে আমার একটা
    আপনার পোস্ট পড়ে আমার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এটি সত্য ঘটনা। একদিন একজন ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে গল্পের ছলে আমি বললাম আপনাকে তো নামাজ পড়তে দেখি না? তিনি বললেন, নামাজ পড়ি আর না পড়ি বেহেশত কিনতে ভূল করিনা। আমি বললাম কি রকম? তিনি বললেন, আমার বাড়ির পাশে একটি হাট আছে। সপ্তাহে ২ দিন হাট বসে। হাটের দিনে ব্রীজের পাশে বসে মাইকে মাদ্রাসার জন্য মানুষদের কাছ থেকে দান হিসেবে টাকা পয়সা চাওয়া হয়। যে লোকটি পাঞ্জাবী পরে মাথায় টুপি দিয়ে মাইকে বলে দশ টাকা দান করুন, আল্লাহ আপনাকে দশটা বেহেশত দিবেন! চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, আমি প্রতি সপ্তাহে ঐ লোকটাকে টাকা দান করে বেহেশত কিনে বাড়ি চলে আসি। সুতরাং বেহেশত তো প্রতি সপ্তাহেই কিনছি, নামাজ কম পড়লেও চলবে!

    পাঠক ঐ চেয়ারম্যান সাহেব কয়েক বছর পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁকে আল্লাহ পাক বেহেশত দান করুন এটাই কামনা করি….

    1. আপনার গল্পটা অনেকের কাছে
      আপনার গল্পটা অনেকের কাছে জোকসের মত শোনালেও এরকমটা আসলেই হচ্ছে। অন্তত গ্রামাঞ্চলে অবস্থাটা আসলেই করুণ। শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যতা একটা বড়ো কারন এটার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *