উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা: মুসলিমদের আগমন ও নির্মম অত্যাচারের শুরুর কথা………………………….(পর্ব-২)

ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীযয অসহিষ্ণুতা শুরু হয় প্রাচীনকাল থেকে। বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি ধর্মের উদ্ভবের সাথে সাথে ধর্মীয় অসহিষ্ণতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এছাড়াও ছিল হিন্দু ধর্মে নিজেদের মধ্যে অত্যাচারের কাহিনী। ব্রাক্ষ্মনবাদের উত্থানের সাথে বৃদ্ধি পায় নিম্ন বর্নের হিন্দুদের প্রতি অত্যাচার। সে সময় এরকম আইন ছিল-শুদ্ররা বেদ পাঠ বা শুনলে তাদের মুখে ও কানে তপ্ত সীসা ঢেলে দেয়া হতো। তাদের মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, যা আজো অনেক স্থানে বিদ্যমান। ঘৃন্যতম অশৌচ প্রথা আজো অনেক স্থানে টিকে আছে। হিন্দু রাজা কতৃক বৌদ্ধ বা অন্য ধর্মালম্বীদের উপড় অত্যাচারের অনেক কাহিনীই ইতিহাসে বর্নিত আছে। প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম আক্রমনের শিকার হয় মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা। এরা ছিল প্রচন্ড বৌদ্ধ বিদ্বেষি। এরপর আক্রমনের স্বীকার হয় হিন্দু রাজা শশাঙ্ক কতৃক। শশাঙ্ক ছিল শিবের ভক্ত এবং প্রচন্ড বৌদ্ধ বিদ্বেষী। তিনি অনেক বৌদ্ধ মঠ ধুলিস্যাৎ করেন এবং বুদ্ধগয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করেন যে এর কিছুই অবশিষ্ঠ ছিল না।
মুসলিম আক্রমন এবং শাসন: এরপর শুরু মুসলমান কতৃক হিন্দু ও বৌদ্ধদের উপড় অত্যাচারের করুন কাহিনী। তাদের অত্যাচারের মাত্রা এতো বেশি ছিল যে, অধ্যাপক কে,এস লালের মতে- ১০০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৮০ মিলিয়ন কমে গিয়েছিল। এর শুরুটা হয়েছিল নবি মুহাম্মদের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই। খলিফা ওমরের শাসনামলে ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় সীমান্তীয় থানা অঞ্চলটি আক্রমণ ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে ভারতে ইসলামি হামলার সূচনা হয়। পরবর্তীতে খলিফা ওসমান, আলী ও মুয়াবিয়ার সময়ে এরূপ আরো আটবার লুণ্ঠন অভিযান চালানো হয়। এসব প্রাথমিক আক্রমণে কখনো কখনো লুটতরাজ ও হত্যাকাণ্ড ছাড়াও লুণ্ঠনদ্রব্য ও ক্রীতদাস সংগ্রহ করে, কিন্তু ভারতে ইসলামের স্থায়ী শাসন স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। খলিফা আল-ওয়ালিদের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুতে উবায়দুল্লাহ ও বুদাইলের নেতৃত্বে দু’টো অভিযান প্রেরণ করেন। উভয় অভিযানই চরমভাবে ব্যর্থ হয় । পরবর্তিতে অন্তরে ক্ষতবিক্ষত হাজ্জাজ এরপর ৬০০০ সৈন্যের নেতৃত্বে ১৭-বছর-বয়স্ক তারই ভাতিজা ও জামাতা কাসিমকে পাঠায়। মোহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধুর দেবাল বন্দর জয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইসলামের শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তি রচনা করে। বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ আল-বিরাদুরী লিখেছেন: ‘দেবাল আক্রমণ করে সেখানে তিনদিন ধরে লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। মন্দিরের পুরোহিতদের সবাইকে হত্যা করা হয়। কাসিম ১৭ বছরের অধিক বয়সী পুরুষদেরকে তলোয়ারের ডগায় হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাস বানায়। দেবালে কত লোককে বন্দি করা হয়েছিল সে সংখ্যা লিখা হয়নি, তবে তাদের মধ্যে ছিল মন্দিরে আশ্রয়গ্রহণকারী সাত শ’ত রমণী। লুণ্ঠিত মালামাল ও ক্রীতদাসদের মধ্যে খলিফার এক-পঞ্চমাংশের হিস্যায় ছিল পঁচাত্তর জন কুমারী, যাদেরকে হাজ্জাজের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অবশিষ্টদেরকে কাসিম তার সেনাদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়।
রাওয়ার আক্রমণে সম্পর্কে লিখিত হয়েছে চাচনামায়- বন্দিদের গণনা করলে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০০০০, যাদের মধ্যে ছিল সেনাধ্যক্ষদের কন্যারা ও একজন ছিল রাজা দাহিরের বোনের মেয়ে। বন্দি ও লুণ্ঠিত মালামালের এক-পঞ্চমাংশ হাজ্জাজের নিকট প্রেরণ করা হয়। চাচনামা অনুসারে, ব্রাহ্মণাবাদ যখন মুসলিম আক্রমণে পতিত হয়, তখন ৮০০০ থেকে ২৬০০০ লোককে নিধন করা হয় এবং বন্দিদের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ বন্দিকে আলাদা করে গণনা করা হলে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার; অবশিষ্টদেরকে যোদ্ধাদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়।’ অর্থাৎ এ আক্রমণে প্রায় ১০০,০০০ নারী ও শিশুকে ক্রীতদাস করা হয়েছিল।
খলিফার হিস্যা হিসেবে একবার প্রেরিত লুণ্ঠনদ্রব্য ও ক্রীতদাসদের মধ্যে ছিল ৩০,০০০ নারী ও শিশু এবং নিহত দাহিরের ছিন্ন মস্তক। সেসব বন্দির মধ্যে ছিল সিন্ধুর বিশিষ্ট মর্যাদাবান পরিবারের কিছু তরুণী কন্যা। হাজ্জাজ লুণ্ঠনদ্রব্য ও ক্রীতদাস বহনকারী বহর দামেস্কে খলিফা আল-ওয়ালিদের নিকট পাঠিয়ে দেন। চাচনামা মতে: ‘তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রশংসা করেন। তিনি সেনাধ্যক্ষদের কন্যাদের কিছুকে বিক্রি করে দেন এবং কিছু উপহার হিসেবে প্রদান করেন। তিনি রাজা দাহিরের ভগ্নির কন্যাদেরকে যখন দেখেন, তাদের সৌন্দর্য ও মনোহর রূপে এতই অভিভূত হন যে, হতবাক হয়ে আঙ্গুল কামড়াতে থাকেন।
মুলতান আক্রমন সম্পর্কে, আল-বিলাদুরী লিখেছেন- মুলতান আক্রমণে বন্দি হওয়া লোকদের মধ্যে ‘মন্দিরের পুরোহিতদের সংখ্যাই ছিল ৬ হাজার’। কাসিম একই রকমের অভিযান চালিয়েছিল সেহওয়ান ও ধালিলায়। তাছাড়া কাসিম জাঠ, মেঠ, ও ভুট্টো সম্প্রদায়ের উপড় চালায় অকথ্য নির্যাতন। তার শাসনামলে তিনি বিধর্মীদের ‘ধিম্মি’ হিসেবে থাকতে দিযেছিলেন।
তিনি অসংখ্য মন্দির, মঠ উপাসনালয় ধ্বংস করেছিলেন এবং কিছু স্থানে মন্দিরের স্থলে মসজিদ, মিনার নির্মান করেন , যেমনটি করুছিলেন দেবাল, নেরুন ও সেহওয়ান শহরে।
এছাড়াও এসময় সিন্ধুর সেনাপ্রধান জুনাইদ বিন আব্দুর রহমান কয়েকটি বিজয় অভিযানে লিপ্ত হন। কিরাজ আক্রমণে তিনি আকস্মিকভাবে হানা দিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ছাড়াও লুটতরাজ ও লোকজনকে বন্দি করেন। উজ্জ্বেন ও বাহারিমাদ আক্রমণে তিনি শহরতলীর বাড়িঘর ভস্মীভূত করেন ও বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ লুণ্ঠন করেন। তার দ্বারাই বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
(চলবে)

১ thought on “উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা: মুসলিমদের আগমন ও নির্মম অত্যাচারের শুরুর কথা………………………….(পর্ব-২)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *