মায়ায় মায়ায় সেই সন্ধ্যায়

শাহেদ বিকালটা একা একা উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ক্যাম্পাসে কাটানোর চিন্তা করছিলো। দুপুরের খাবারের পর, ঘুম ঘুম আসছিল। বিছানাটা বড্ড আকর্ষণীয় লেগে উঠলেও সে অনুভবকে অগ্রাহ্য করলো। আজকাল তো অহরহ এমন অনেক অনুভবকেই পাশ কাটাতে হচ্ছে।
সিগ্রেট বাদ দিয়েছে। না হলে এখন বারান্দায় গিয়ে এই বদকর্মটি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতো।
মৃত্যু। উপভোগের বিষয়? হয়ত। কারো কারো জন্য। নাহলে অনেকেই তো ঝুলে পড়ে বা ঘুমের ট্যাবলেট খায়- কিংবা অন্যভাবে একে ডেকে আনে।
কেন এত অস্থিরতা?

ভাবনার গভীরে ডুবে যাবে, এমন সময় ছোট মেয়ে রেডি হয়ে এসে বলে-
‘ বাবা, চলো এক নাম্বার গেটে যাই।’

শাহেদ বিকালটা একা একা উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ক্যাম্পাসে কাটানোর চিন্তা করছিলো। দুপুরের খাবারের পর, ঘুম ঘুম আসছিল। বিছানাটা বড্ড আকর্ষণীয় লেগে উঠলেও সে অনুভবকে অগ্রাহ্য করলো। আজকাল তো অহরহ এমন অনেক অনুভবকেই পাশ কাটাতে হচ্ছে।
সিগ্রেট বাদ দিয়েছে। না হলে এখন বারান্দায় গিয়ে এই বদকর্মটি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতো।
মৃত্যু। উপভোগের বিষয়? হয়ত। কারো কারো জন্য। নাহলে অনেকেই তো ঝুলে পড়ে বা ঘুমের ট্যাবলেট খায়- কিংবা অন্যভাবে একে ডেকে আনে।
কেন এত অস্থিরতা?

ভাবনার গভীরে ডুবে যাবে, এমন সময় ছোট মেয়ে রেডি হয়ে এসে বলে-
‘ বাবা, চলো এক নাম্বার গেটে যাই।’
যাওয়া লাগবেই। ছোট বাবুর বায়না। শাহেদ এমনই। জীবনও এখন তার জন্য এমন।
আনন্দের?

সন্ধ্যায় বাসায়। কণা বিছানায়। মেয়েদের নানী এসেছেন। তিনি তার মেয়ের মাথার চুলে মেহেদী লাগিয়ে দিচ্ছেন। ছোট নাতির বায়নায় ওর হাতেও আল্পনা একে দিলেন। কণা বিরক্ত। মেয়ের উপর। নিজের উপর। শাহেদের উপর ও কি?
‘ কাল বাদে পরশু পরীক্ষা। কিছুই রিভিশন শেষ করেনি। এখন মেন্দী হাতে বসে আছে। পড়বে কখন?’
একটু চুপ থেকে মেয়েকে দেখে। মেয়ের চোখ হাতের আল্পনায়। কান মায়ের দিকে। কণা বিরক্ত হয়ে শাহেদের দিকে শুয়ে থেকেই একটু তাকায়। ওর কথায় কি ঝাজ থাকে?

‘ তুমি নাকি এক নাম্বার থেকে বাসায় ফেরার পথে ওকে বিকালে ইফতির সাথে র‍্যাকেট খেলতে যেতে বলেছ?’

ল্যাপটপ কোলের পরে। মন স্ক্রীণে। শিহাব আনমনে উত্তর দেয়,
– হ্যা, বলেছিলাম।

বাবার সমর্থন ছোট বাবুটার ভিতরে কোথায় যেন, আগে থেকেই মায়ের প্রতি জমা হওয়া সুক্ষ্ণ অভিমান, এবারে তা বিস্ফোরণ্মমুখ হয়ে ওঠে। কণার কথা তখনও শেষ হয়নি,
‘ যেমন বাপ তেমন মেয়ে। রক্তের দোষ।’
শাহেদ একবার তাকায় কিছু দেখে কি? কী-বোর্ডে আংগুল। সে উত্তর দেয়,
– একই কথা মানে একই উদাহরণ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। নতুন কিছু স্টকে থাকলে বলো।
‘নতুন কিছু শুনবা, যখন রোল নাম্বার এক থেকে পিছিয়ে অনেক নিচে নামবে তখন। এবার প্লেসেই থাকবে না দেইখো… তখন ভালো লাগবে।’ এই বলে মেয়ের দিকে তাকায় কণা। মেয়ের চিবুক ততক্ষণে বুক ছুঁয়েছে।
– প্রত্যেকবারই যে ফার্স্ট হতে হবে, তাও তো নয়… কি বলো পাপা? মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে শাহেদ। মেয়ের মাথা নিচু। সামনের চুলগুলো চোখ ঢেকে রেখেছে। উত্তর দিলেন মেয়ের নানী,
‘ প্রেস্টিজের ব্যাপার না? সবাই বলবে ম্যাডামের মেয়ে…খারাপ লাগবে না?
মায়ের সমর্থনে কণাও আবেগী। বলে,
‘ দুজনেই এইটা কি বুঝে?’
শাহেদ নিজেকে কাঠগড়ায় দাড়ানো দেখতে পায়।
ওদিকে এতোক্ষণ যে বাধভাংগা জোয়ার আটকে ছিল, এবার তা বের হবার রাস্তা পেয়ে গেলো। ছোট মেয়ে নিজের হাতের মেহেদী বিছানার চাদরে মাখিয়ে বেসিনের দিকে আগায়। যেতে যেতে মেঝেতে দুমদাম পা ফেলে আর নানীকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘ তুমি তো তোমার বাবুর পক্ষই নিবা?’

সব দেখে কণার ভিতরেও কোথায় যেন ভাংচুর হয়। শাহেদের দিকে তাকিয়ে মাকে শুনিয়ে বলে,
‘ দুইজনই একই রকম। আমারে একটু শান্তি দিল না। ও ও যেমন ঘরের ভিতর হই চই করে, ছোটটাও একই স্বভাবের।’

মাকে উদ্দেশ্য করে বলে, না শাহেদকে শোনায় কণা, ঠিক বুঝে না শাহেদ। কণার চোখের কোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামে- নিরবে। শাহেদের ইচ্ছে করছিল ওই ফোটাগুলি- অমূল্য মুক্তোর স্বেদ বিন্দুগুলি নিজের করতলে জমিয়ে রাখে। কান্নারত কণাকে বড্ড অসাধারণ- মায়াময় লাগছে! ওর ঠোঁটের দুই কোণ তিরতির করে কাঁপছে। অন্য এক অনুভব! রোমান্টিসিজমের ওপারে বিচ্ছিন্ন এক দুর্বোধ্য বিহবলতায় শাহেদ ডুবে যায়। কিন্তু মুহুর্তগুলোর তন্ময়তা কেটে যায় ছোট মেয়ে হাত ধুয়ে যেভাবে চলে গিয়েছিল সেভাবেই কণার সামনে বিছানায় বসতেই। বই খাতা বিছানায়ই ছিল। জেদের বশে বইয়ের পাতা উল্টে চলে সে। এরই ফাঁকে একবার মাকে দেখে। মায়ের চোখের জল তার চোখে পড়ে। মুহুর্তে সে মায়ের কোলে ঢুকে যায়। কান্নায় ভেংগে পড়ে। মাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। শক্ত করে। শাহেদ হাসে। কণাও চোখে জল নিয়ে মেয়েকে ধরে রাখে। সে ও নিজেকে সামলাতে পারে না। নিজের আদরের ধনের ছোট্ট বুকের কষ্ট- অভিমান ওকে একাধারে কষ্ট এবং ভালোলাগার পরশে আবিষ্ট করে রাখে। মায়েরা এমনই…
শিহাব ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শবাশুড়ি ভেতরের রুমের দিকে পা বাড়ান। মুখে হাসি।

মা-মেয়ের বেদনা-বিদূর মুহুর্তের সাথী হয়ে শিহাব ভাবে, এই মুহুর্তগুলোতেও একজন বাবার ভুমিকা কেমন হওয়া উচিত? সে নিরবে দুজনের পাশে বসে থাকে। একজন নিরব দর্শক।
এই তিনজনের হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলোর আরো একজন দর্শক থেকে যান। তিনি এই সব মুহুর্তগুলো তৈরী করেন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *