আদিবাসীর খোলা চিঠি

প্রিয় বাংলাদেশ,
জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা! দেখতে দেখতে তুমি অনেক বড় হয়ে গেলে। এক দু বছর নয়, পাক্কা চুয়াল্লিশ বছর। তা কি ছেলেখেলা??!! কিসিন্জারের মতো পোড় খাওয়া এক প্রভাবশালী কূটনীতি কে ভুল প্রমাণ করে তুমি এগুচ্ছো, তলাবিহীন ঝুড়ির দিকে নয় তলাযুক্ত ঝুড়ির দিকে!! অভিনন্দন তোমাকে! 🙂


প্রিয় বাংলাদেশ,
জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা! দেখতে দেখতে তুমি অনেক বড় হয়ে গেলে। এক দু বছর নয়, পাক্কা চুয়াল্লিশ বছর। তা কি ছেলেখেলা??!! কিসিন্জারের মতো পোড় খাওয়া এক প্রভাবশালী কূটনীতি কে ভুল প্রমাণ করে তুমি এগুচ্ছো, তলাবিহীন ঝুড়ির দিকে নয় তলাযুক্ত ঝুড়ির দিকে!! অভিনন্দন তোমাকে! 🙂

আমি অনেক কথা বলি। প্রায়ই বলি। আজ তোমার জন্মদিনেও অনেক কথা বলবো। বলার পর উপলব্ধি হবে অনেক কথায় বলাই হলো না, তোমাকে!!! কি অদ্ভুতরে ব্যাপার, তাই না?? কোথা হতে শুরু করি বলো তো, ঠিক ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার একটা এই সমস্যা!! সূচনাটা সবসময়ই শুরু করতে কষ্ট হয়। যাক, কিছু যখন বলবো বলেছি, বলেই ফেলি। তবে কথাগুলো শুধু তোমার জন্মের কথা নিয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করবো।

তোমার জন্ম দাতাদের ইতিহাস পড়লে নিজের অজান্তে এখনো আমার মাথা নত হয়ে আসে। কি অসীম সাহস তাঁদের, আর কি সীমাহীন ভালোবাসা- ভবিষ্যৎ আর অনাগত প্রজন্মের প্রতি..তা না হলে কেউ কি নিজের জীবন বাজি রেখে অত বড় এক সমরাস্ত্রে সজ্জিত এক রাষ্ট্রের বিপক্কে যুদ্ধে যায়??? ভাষার জন্য জীবন দেয়?? সেগুলো পড়তে পড়তে চোখ ছলছল করে উঠে আমার। রাগে ক্ষুব্ধ হই পাকিস্থানিদের প্রতি। এখনো সে হানাদারদের প্রতি আমার রয়েছে চরম ঘৃণা।

বাংলাদেশ! তোমার জন্মের কথা বলছি আমি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তোমার জন্মের সময় ঘটেছে সংক্ষিপ্ত সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যা। বিশ্বাস করি ত্রিশ লক্ষ শহীদের কথা। বিশ্বাস করি দুই লক্ষের মতো বীরাঙ্গনাদের কথা। বিশ্বাস করি কোটির উপর সীমান্ত পাড়ি দেওয়া সেই হতভাগা উদ্ভাস্তুদের কথা। বিশ্বাস করি বিভিন্ন ধর্মের লোকদের যুদ্ধে যাওয়ার কথা। আর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আদিবাসীরাও তোমার জন্মের সময় যুদ্ধ করার কথা। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আদিবাসী বীরাঙ্গনাও রয়েছে এবং তাঁদের সংখ্যাও অনেক। হুম, তোমার পরিচালকেরা হয়ত সেটা অবিশ্বাস করবে।

বাংলাদেশ, এতোগুলো মানুষের সামনে আমার মিথ্যা বলা বাঁধে। আর আমার মিথ্যা বলাও অভ্যাস নেই। তাই, আমি সত্যি করে বলছি তোমার জন্মের অবদান আদিবাসীদেরও রয়েছে। তার অহরহ প্রমাণ আছে। কিন্তু তুমি সেগুলো লিপিবদ্ধ করো নি, বা করার প্রয়োজন অনুভব করো নি। আর আদিবাসীরাও কোন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য তোমার জন্মের সহযোগিতা করতে যুদ্ধ করে নি, তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব থেকেই করেছে। হুম, আমি অস্বীকার করি না, আদিবাসীদের তৎকালীন চাকমা রাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তিনি তো পাকিস্তানিদের পক্কে অস্ত্র ধরেন নি, একটা মানুষও হত্যা করেন নি, তো উনার কারণে পুরো আদিবাসীদের দোষারোপ করা কি সাজে??? তারা তো যুদ্ধ করেছিল তোমার হয়ে। তো??? যুদ্ধের পর চাকমা রাজা এখানে থাকেন নি, কিন্তু তোমার সংখ্যা গরিষ্ঠদের অনেকেই পাকিস্তানিদের হয়ে অস্ত্র ধরেছিল যারা পরবর্তীতে এখানে বেইমানের পর বেঈমান করেছিল এবং এখনো করে যাচ্ছে। এখনো তোমার অনেক অনেক লোক পাকিস্তানিদের প্রতি অনুভব করে চরম ভালোবাসা!!! এখনো তোমার অনেক অনেক লোক পাকিস্তানিদের মতো বিশ্বাস করে তুমি ভারতের একটা প্রদেশ। আর তোমার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরাই তো তোমার জন্মের সময় বেঈমান করুয়াদের, তোমার মেধাবীদের, হত্যাকারীদের মন্ত্রী বানিয়েছিল, তোমার পতাকা তাঁদের গাড়িতে শোভা পেয়েছিল। কিন্তু আদিবাসীরা সেরূপ কখনো বেঈমান করে নি।

বাংলাদেশ, তোমার জন্মের পর পরই আদিবাসীদের স্বীকার করতে চাও নি। কেনো চাও নি, সেটা বলতে গেলে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু আমি সে সব বলতে চাই না। আমি শুধু ভেবে অবাক হচ্ছি, এখনো হই- যে রাষ্ট্রের সন্তানেরা অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, যে রাষ্ট্রের সন্তানেরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল সে রাষ্ট্রের সন্তানেরা কি করে অত্যাচারীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে??? যে রাষ্ট্র পাকিস্তানিদের দ্বারা পরিচালিত “অপারেশন সার্চলাইট” নামে লক্ষ লক্ষ লোকের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল সে রাষ্ট্র কি করে তার জন্মের পর পরই ( ২০ মার্চ ১৯৭২) পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের উপর “অপারেশন বাগেরথাবা” পরিচালনা করতে পারে??? এভাবে একটার পর একটা একে একে কীভাবে পাঁচ পাঁচ টি অপারেশন পরিচালনা করতে পারে!! যার সর্বশেষটি একবিংশ শতাব্দীর ২০০১ সালে অপারেশন উত্তরণ নামে শুরু হয়েছিল, যেটি এখনো চলমান!!!! কেনো বাংলাদেশ এই অপারেশন??????

তোমার পরিচালকদের যুক্তি খুব হাস্যকর!! আদিবাসীরা বিছিন্নতাবাদি!! তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম কে বিচ্ছিন্ন করতে চাই!!! তাই এই অপারেশন!! আচ্ছা বোলওঁ তো নিজেদের ভুমিতে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চাওয়া, নিজেদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সর্বোপরি মানুষ হিশাবে বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়া কি অপরাধ, বাংলাদেশ???? তো তারা কীভাবে বিচ্ছিনতাবাদি হয়, বাংলাদেশ??? আর তোমার সংখ্যাগরিষ্ঠদেরও আমার অনেক করুণা হয়, যে জাতি জন্মের পর তিন মেয়াদে প্রায় ১৫ বছেরর মতো সামরিক শাসনে ছিল সে জাতি কি করে পার্বত্য চট্টগ্রামে নীরব বা প্রকাশে সেনা শাসন কামনা করে?!

কথা ছিল, শুধু তোমার জন্ম নিয়ে কিছু কথা বলার, তাই অনেক কিছু বলার থাকলেও অন্য কিছু নিয়ে বললাম না আর। এখানেই ইতি টানবো। ভালো থেকো অনেক, বাংলাদেশ, ভালো থেকো আর হয়ে উঠো সকল মানুষের প্রতি অনেক সহানভুতিশীল…

সব শেষে আমার বলা আর না বলা, সব কথাগুলো প্রিয় লেখক হুমায়ন আজাদের একটা বইয়ের শিরোনাম দিয়ে শেষ করবো, “আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম?”

১ thought on “আদিবাসীর খোলা চিঠি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *