আমার সোনার বাঙলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…

সময়টা ২০০৫ এর মাঝামাঝি। একটা ছোট খাটো প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে খন্ডকালীন চাকুরি করি। একদিন প্রতিষ্ঠানের দু’জন কর্ণধারের একজনের সাথে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে জোব্বা পরা এক সৌম্যকান্তি বয়স্ক বুজুর্গ আসলেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। আমার তখন ক্লাস ছিলো না, এক পাশে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম।


সময়টা ২০০৫ এর মাঝামাঝি। একটা ছোট খাটো প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে খন্ডকালীন চাকুরি করি। একদিন প্রতিষ্ঠানের দু’জন কর্ণধারের একজনের সাথে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে জোব্বা পরা এক সৌম্যকান্তি বয়স্ক বুজুর্গ আসলেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। আমার তখন ক্লাস ছিলো না, এক পাশে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম।

কর্ণধার এসে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন বুজুর্গকে। তিনি কর্ণধারের এলাকায় স্থানীয় একটি মাহফিলে বক্তা হিসেবে এসেছেন সুদূর পাকিস্থান থেকে! এটা শোনার পর আমার মাথা থেকে একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ শিরদাঁড়া বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেলো। আমি বাড়ানো হাতটা গুটিয়ে নিলাম। এমনকি বুড়ার দেয়া সালামেরও জবাব দিলাম না। এটা দেখে প্রতিষ্ঠান কর্ণধার আমার দিকে একটা কঠিন দৃষ্টি দিলেন। আমি অগ্রাহ্য করলাম সেটা। কিন্তু পাকির বাচ্চাটা এসবরে তোয়াক্কা না করে আমার হাত টেনে নিয়ে কোলাকুলি করার চেষ্টা করতেই ভেতরের আক্রোশটা তীব্রভাবে বেরিয়ে এলো। ডান হাত দিয়ে সজোরে তাকে ঠেলে দিলাম। পাইক্যাবুড়া আরেকটু হলেই পেছনের দিকে পড়ে যাচ্ছিলো। প্রতিষ্ঠান কর্ণধার তাকে সামলে আমার দিকে তেড়ে এলেন।

আমাকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, একজন সম্ভ্রান্ত মেহমানের সাথে এধরনের অভদ্র আচরণের কারন কি?
আমি স্পষ্ট করে বললাম, আমি এক বালতি গু গায়ে মাখতে রাজি, কিন্তু কোন পাকিস্থানীর সাথে হাত মেলানো দূরে থাক, কথা বলতেও ঘৃণা বোধ করি।
পাইক্যা বুড়া সম্ভবত আন্দাজ করে নিয়েছে বিষয়টা, তবুও কর্ণধারকে জিজ্ঞেস করলো- ক্যায়া বাত হ্যায় … ছাহাব?
কর্ণধারও তাকে উর্দুতে জবাব দিলো- এই বেয়াদবটা আপনার সাথে হাত মেলাতে চায় না।
পাইক্যা জিজ্ঞেস করলো- কেন?
কর্ণধার বললো- জানি না।
আমি তখন তাকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললাম- ‘৭১-এ পাইক্যারা এ দেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, লাখ লাখ মানুষ মেরেছে ধর্মের নামে, খুন-ধর্ষন করেছে তাতে আমৃত্যু তাদেরকে ক্ষমা করা সম্ভব না কোন বাঙালির পক্ষে।

রাগে আমার সারা শরীর কাঁপছিলো তখন। কর্ণধার উত্তেজিত ভঙ্গিতে অবস্থা বেগতিক দেখে আমার সামনে থেকে পাইক্যাকে ঠেলে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
কিন্তু বুইড়াও উর্দুতে তার জবাব দিলো- পৃথিবীর ইতিহাস পরিবর্তন হয়, কিন্তু সেটা নিয়ে বসে থাকলে কি আর অগ্রগতি সম্ভব? আমরা মুসলমান, ভাই-ভাই। একসাথে এগিয়ে যাওয়া উচিত আমাদের…।

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বললাম- দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে তোকে আমি পাছায় লাথি মেরে এই চারতলা থেকে ফেলে দিতাম।
প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষক, ছাত্র আর কর্মকর্তারা সবাই আমাকে দেখছিলো চোখ বড় বড় করে। আমার এই চেহারা তারা বিগত ৪মাসে দেখেনি। কর্ণধার ততক্ষণে বুইড়াকে নিয়ে তার কামরার দিকে চলে গেলো।

আমার চাকরির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেছিলো। রিজাইনিং লেটার টাইপ করে এডমিনে পাঠিয়ে বেরিয়ে এলাম। যদিও বিকেলের দিকে অন্য কর্ণধার আমাকে ফোন করে বললেন, সিদ্ধান্ত বিবেচনা করে দেখতে। আমি সরাসরি বলে দিলাম পাকিদের মতো পাকিপ্রেমীও সমান ঘৃণা করি। আমার কাছ থেকে কটু কথা শোনার আগেই ফোন কেটে দিলেন তিনি। চলতি মাসের খন্ডকালীন পেমেন্টও প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।

[লুৎফর রহমান রিটন ভাই’র একটা লেখা পড়ে বহু বছর আগের কথা মনে পড়লো। শ্রদ্ধেয় বড়ভাই রিপণ মজুমদারের অনুরোধে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।]

২ thoughts on “আমার সোনার বাঙলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *