শহীদ বুদ্ধিজীবী মোহাম্মদ মোর্তজা এবং আমাদের ট্রাজেডি

১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় দিবস পালন করি। এর ঠিক আগে আগে ১৪ ডিসেম্বর আমাদের পালন করতে হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। আনন্দের পূর্ব মুহূর্তে শোক। হয়ত সমস্ত বিজয়ের আনন্দের পেছনেই শোকের ছায়া থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন এক ঐতিহাসিক ট্রাজিক নাটকের কুশিলব, যাকে শোকের কালো ছায়া তাড়া করে ফিরছে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও। লক্ষ মানুষের বীরতত্মপূর্ণ সংগ্রাম আর অগণিত মহৎ প্রাণের আহুতির মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি – এই স্বাধীনতাই তাঁদের কাম্য ছিল?

১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় দিবস পালন করি। এর ঠিক আগে আগে ১৪ ডিসেম্বর আমাদের পালন করতে হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। আনন্দের পূর্ব মুহূর্তে শোক। হয়ত সমস্ত বিজয়ের আনন্দের পেছনেই শোকের ছায়া থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন এক ঐতিহাসিক ট্রাজিক নাটকের কুশিলব, যাকে শোকের কালো ছায়া তাড়া করে ফিরছে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও। লক্ষ মানুষের বীরতত্মপূর্ণ সংগ্রাম আর অগণিত মহৎ প্রাণের আহুতির মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি – এই স্বাধীনতাই তাঁদের কাম্য ছিল?
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের সকাল – যে সকাল ছিল রাতের চেয়ে বেশি অন্ধকার। এ জাতি যেন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেই চক্রান্তই বাস্তবায়ন করে যায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী। আসলে ২৫ মার্চের কালো রাতেই শুরু হয় বুদ্ধিজীবীদের নিধন। পরিকল্পিতভাবে ১৪ ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনার একটি। শত শত শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়। পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে রেখে যায় ঘাতক বাহিনী। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ খুঁজে পায়। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা। কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি। অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষতচিহ্নের কারণে অনেকেই প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন। যে লেখক-সাহিত্যিক-নাট্যকার-সাংবাদিক-চিকিৎসক-শিক্ষক বুদ্ধিজীবীরা জাতির মুক্তির জন্য লড়াই করছিলেন, তাদের হত্যা করে পরাজিত পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে শেষ মরণ ছোবলটা দিয়ে যায়।
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৪ ডিসেম্বরকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ১৮, মতান্তরে ২৯ তারিখে বেসরকারিভাবে ‘বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন’ গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এর রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। এরপর “বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি” গঠিত হয়। এই কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাও ফরমান আলী এদেশের ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা মতো হত্যাযজ্ঞ চলেনি। কারণ ফরমান আলীর টার্গেট ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদেরকে গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা। বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদেরকে বাছাই করে আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য, ওই কমিশনের আহবায়ক ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান যিনি নিখোঁজ হন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। তাজউদ্দিন আহমেদ একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর । কিন্ত তার এই সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি।
গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, মোহাম্মদ মর্তুজা, সেলিনা পারভীন, ড. আবুল খায়ের, রাশিদুল হাসান, আনোয়ার পাশা, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, সিরাজউদ্দিন হোসেন, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, আ ন ম গোলাম মুস্তফা, আলতাফ মাহমুদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রণদাপ্রসাদ সাহা, মেহেরুন্নেসা – এমন কত নাম। এই নামের তালিকায় আছেন চিকিৎসকেরাও। বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ড. আব্দুল আলীম চৌধুরী, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বী, অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ, ডা. হুমায়ুন কবীর, ড. মোহাম্মদ মোর্তজার মতো অনেক মেধাবী মানুষদের হত্যার সাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশের মাটি।
১৪ ডিসেম্বর অনেক বুদ্ধিজীবীর মধ্যে একজন ছিলেন মোহাম্মদ মোর্তজা। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চন্ডীপুর গ্রামে। সাম্প্রদায়িক চিন্তার ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হবার পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাড়তে থাকলে শিক্ষাজীবনের মাঝপথে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) আসতে বাধ্য হন তিনি। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে প্রিয় জন্মভূমিকে ছাড়ার বেদনা তার মনকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। ধর্মীয় সংঘাত, ধর্মের কারণে রক্তপাত, দেশত্যাগ কোনোটাই তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু তারপরও এই মানুষটি এদেশকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন এদেশের মানুষকে।
ষাটের দশকে প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মোর্তজা। মার্কসীয় আদর্শে উজ্জীবিত মোর্তজা সমাজকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পান। সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ-নিপীড়ন, শ্রেণী সংগ্রাম এসব বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করতে থাকেন এবং সমাজতন্ত্রের আদর্শকে বাস্তবায়নের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অবতীর্ণ হন। সে কারণে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে, এখানকার চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগ দেন মোর্তজা। নিজের বাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মার্কসবাদের শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। নিজের আদর্শকে কলমের মাধ্যমে তুলে ধরেন পত্রিকার পাতায়। ছুটি মিললেই চলে যেতেন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে, যেখানে গরিব রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করতেন, চিকিৎসা করতেন। ব্যক্তিজীবনে সাধাসিধে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি কখনো রিক্সায় উঠতেন না, অন্যের ওপর নিজের বোঝা না চাপিয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে চলার নীতি বলিষ্ঠভাবে অনুসরণ করতেন। চিকিৎসা করতে এসে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ‘সমাজের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন না করলে’ ডাক্তার হয়ে মানুষের প্রকৃত দুর্দশা মোচন করা যায় না। এদেশের অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্যের শিকার। কাজেই ডাক্তার হয়ে পথ্য নির্বাচন করলেও এই মানুষদের প্রকৃত রোগের সমাধান হয় না। ডাক্তাররা হয়তো সাময়িকভাবে রোগের উপশম করতে পারে। কিন্তু শেষ বিচারে এই চিকিৎসা অর্থহীন। এই সমাজের প্রকৃত চিকিৎসা না হলে ডাক্তার হয়ে কোনও লাভ নেই।
এই মহান চিকিৎসক অনুভব করেছিলেন তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা এদেশের অধিকাংশ দরিদ্র রোগীদের রোগের কারণটা সামাজিক। তিনি বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত চিকিৎসা দিয়ে মানুষের এ রোগ সারানো সম্ভব নয়। যে ব্যাধিটার মূলে রয়েছে শোষণ-নিপীড়ন, বৈষম্য আর দারিদ্র্য; সেই ব্যাধিতে আক্রান্ত জরাগ্রস্ত সমাজে বাস করলে সমাজের মানুষগুলোর আত্মিক বা শারীরিক কোনো রোগই সারবে না। গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া পুরো সমাজটাই প্রতিনিয়ত রোগে ধুঁকছে। এই সমাজের রোগ না সারালে মানুষের মুক্তি আসবে না। তাই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য মার্কসীয় দর্শনকে চেতনায় ধারণ করে আমৃত্যু লড়েছিলেন এক মহান মানবতাবাদী চিকিৎসক, মোহাম্মদ মোর্তজা। পেশাগত জীবনে তিনি ব্যাধির কারণ নির্ণয় করে ওষুধ দিয়েছেন, আবার সামাজিক ও জাতীয় জীবনের ব্যাধিগুলো নির্ণয় করে সেগুলোকে নির্মূলের সংগ্রাম করেছেন।
শুধু মোর্তজাই নন, তাঁর আরো অনেক সহকর্মী চিকিৎসক, সহযোদ্ধা রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থীই সেদিন একটি গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থার দাবিতে লড়েছিলেন। তাঁরা শুধু স্বাধীনতার জন্য লড়েন নি, দেশের মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে তাঁদের সে স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়েছে? সেই মহান চিকিৎসক আজ কোথায়, যিনি শুধু রোগীর চিকিৎসা করেই ক্ষান্ত হন না, রোগের উৎস নির্ণয় করে তা সমূলে উৎপাটন করার আকুতি ধারণ করেন? চিকিৎসার অধিকার কি দেশের গরিব মানুষের আছে? উত্তর হল, নেই। মাত্র ১ হাজার টাকা ফি জমা দিতে না পারার কারণে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক যখন অকালে মৃত্যুবরণ করেন তখন দেশের সাধারণ মানুষের কথা বলাই বাহুল্য।
আসলে শুধু চিকিৎসাক্ষেত্রেই নয়, কোনো ক্ষেত্রেই মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়িত হয়নি। সে ধরনের রাষ্ট্র বা সমাজ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এখন চিকিৎসকেরা টাকার হাতে বন্দি, শিক্ষকেরা টাকা আর ক্ষমতার হাতে বন্দি। মোর্তজা যে মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই মার্কসীয় দর্শনের আকর-গ্রন্থ কমিউনিস্ট ইশতেহারে, আজ থেকে প্রায় দুইশ বছর আগে মার্কস-এঙ্গেলস লিখেছিলেন : “এতদিন যেসব পেশা- বৃত্তিকে মানুষ সম্মান করে এসেছে এবং দেখে এসেছে শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমের চোখে, সেসব প্রতিটি পেশা- বৃত্তির মাহাত্ম্যই বুর্জোয়াশ্রেণী ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইনজীবী, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী – সবাইকে এরা পরিণত করেছে নিজেদের বেতনভুক মজুরি-শ্রমিকে।” আর সর্বোপরি বুর্জোয়াশ্রেণী এনেছে “… নগ্ন, নির্লজ্জ, প্রত্যক্ষ, পাশবিক শোষণ”। যে স্বাধীনতার জন্য মোহাম্মদ মোর্তজা এবং অন্য সব শহীদ বুদ্ধিজীবীরা প্রাণ লড়াই করলেন, প্রাণ দিলেন, সেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৪৪ বছর পেরিয়ে গেছে। শুধু যে তাঁদের স্বপ্নের স্বদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি তাই নয়, তাঁদের স্বপ্নগুলোই আজ আমরা ভুলতে বসেছি। এটাই কি আমাদের সবচেয় বড় ট্রাজেডি নয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *