অবৈধ অভিবাসী সমস্যা, অনন্ত বিজয় দাস হত্যাকান্ড ও জঙ্গীবাদ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু ভিন্ন চিন্তা

ক’দিন ধরে টিভি নিউজে দেখছি ট্রলারে করে অবৈধ পথে ইন্দোনেশিয়া-মালেশিয়া-থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা প্রচুর বাঙালি সহ রোহিঙ্গা আটক করা হয়েছে। সেই সাথে আরো প্রায় ৮হাজার নাকি সমুদ্রে ভাসমান! এদের নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বেশ চিন্তিত। কিন্তু আমি ভাবছি ভিন্ন কথা।


ক’দিন ধরে টিভি নিউজে দেখছি ট্রলারে করে অবৈধ পথে ইন্দোনেশিয়া-মালেশিয়া-থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা প্রচুর বাঙালি সহ রোহিঙ্গা আটক করা হয়েছে। সেই সাথে আরো প্রায় ৮হাজার নাকি সমুদ্রে ভাসমান! এদের নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বেশ চিন্তিত। কিন্তু আমি ভাবছি ভিন্ন কথা।

এসেব অবৈধ পথে যাত্রাকারীরা কি আউটগোয়িং নাকি ইনকামিং? অর্থাৎ,তারা কি যাচ্ছিলো, নাকি আসার জন্য অপেক্ষা করছিলো? হয়তো আমি অহেতুক জুজু দেখছি। যেটা আশঙ্কা করছি, হয়তো বিষয়টা ততোটা গভীর নয়। আসলে বাঙলাদেশের সমুদ্রসীমাটা খুব বেশি নিশ্ছিদ্র নয়। এই উন্মুক্ত বিশাল সমুদ্রসীমা যা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল রুট হিসেবে পরিচিত, এই পথ দিয়ে অবৈধ পণ্য-অস্ত্র-মাদক আমদানিসহ মানবপাচার হয় অহরহ। বাঙলাদেশ ও মায়ানমারের সাথে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এই পথেই।

মধ্যপ্রাচ্য সহ অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত দেশগুলোতে নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে মুজাহিদ পাচার হয়, উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা দেশে এসে অরাজকতা সৃষ্টি করে। আরাকানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়শই এসবের প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সংবাদ দেখি আমরা পত্রিকায়। অবৈধ পথে যাত্রাকারীরা কিংবা আগমনকারীদের মধ্যে এমন প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা আছে কী না, সে সম্পর্কে আমরা কতোটা নিশ্চিত? যাদেরকে কোষ্টগার্ড ও নৌবাহিনী হেফাজতে রেখেছে, তাদের সবার পরিচয় কি আমরা জানি? প্রায়ই শোনা যায় মধ্যপ্রাচ্যে রোহিঙ্গারা বাঙলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে যাত্রাকালে আটক হয়। প্রশ্ন হলো, এই পাসপোর্ট বানাতে সহযোগিতাকারী দেশিয় দোসররা কেন বার বার লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়?

এভাবে প্রতিনিয়ত সীমান্ত পথে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত জঙ্গীরা দেশে অনুপ্রবেশ করছে। সীমান্ত যেখানে সবচেয়ে সুরক্ষিত হওয়ার কথা, ততোটা কি আদৌ সুরক্ষিত? প্রতিটি দেশে বিমানবন্দর/স্থল/নৌবন্দরগুলোতে ইমিগ্রেশন সিস্টেমটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট হিসেবে দেখা হয়। ক’দিন আগে একটা রিপোর্টে দেখলাম, ফুটবলার পরিচয়ে এদেশে বহু আফ্রিকান অবৈধভাবে বসবাস করছে। গতকালও দুই নাইজেরিয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। এর আগে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সাথে জড়িত একটা গ্যাংকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছে, যারা ইপিজেড এর বিদেশি প্রতিষ্ঠানে টেকনিশিয়ান হিসেবে ভিসা নিয়ে এসেছে। এছাড়াও আফ্রিকানদের জাল ডলার ব্যবসা তো অনেক পুরনো। দেশে আফগান ফেরত, সিরিয়া-লিবিয়া ফেরত জঙ্গীদের খবর মাঝে মাঝেই পাওয়া যায়। এরা সব ধরনের নাশকতামূলক কর্মকান্ডের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। সেই ভাইরাস সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে তারা প্রতিনিয়ত। আর সেই আগুনে বাতাস দিচ্ছে দূতাবাস কর্মকর্তারাও (পাকি দূতাবাস : উদাহরণ)। আইএস-তালেবান-আলকায়েদা কিংবা আনসারুল্লা-হিজবুত সহ সাম্প্রতিক আল বায়্যিনাতগোষ্ঠী এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি, এদেরকে পরিচর্যা করা হয়েছে, হেকমতি বীজ মাথার ভেতরে বপন করা হয়েছে।

সরকারী কর্তারা আল কায়েদা সম্পর্কে বলছেন, দেশে নাকি এখনো তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি! তাদের টনক এখনো নড়েনি। ব্লগার-বিজ্ঞানমনষ্ক-মুক্তমনারা সব মরে সাফ হয়ে গেলে তবে তাদের টনক নড়বে? হুমায়ুন আজাদ স্যার এর ওপর হামলা দিয়ে শুরু, এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে প্রতিনিয়ত হুমকি প্রদান, আসিফ মহিউদ্দীনের ওপর হামলা, রাজীব-অভিজিৎ-ওয়াশিকুরের পর গতকাল চলে গেলেন- অনন্ত বিজয় দাস!! এদের মাঝে আরো অনেকেই হত্যা-হামলার শিকার হয়েছেন, হুমকি তো প্রতিনিয়ত চলছেই। এসব হত্যাকান্ড সরকারকে সচেতন করতে পারেনি এখনো। নাগরিক অধিকার (পড়ুন দলীয় নেতা কর্মীদের পেট্রোলবোমা মারার অধিকার) নিয়ে সোচ্চার যে বিএনপি, তারাও পর্যন্ত তাদের কোন ইস্যুতে মুক্তমনা লেখকদের প্রসঙ্গ তোলে না, পাছে কিছু সমর্থক কমে যায়।

সরকারের সাফল্য বলতে মানসিক বৈকল্যের শিকার ফারাবিকে গ্রেফতার! মনিরুজ্জামানের চিবিয়ে চিবিয়ে মুখস্ত করা বচনামৃত শুনতে শুনতে আমরাও ক্লান্ত। এত যে উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা, র‍্যাব, পুলিশ ও তাদের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, তারাও কি আসলে খুঁজে বের করতে পারছে না এই জঙ্গী নেটওয়ার্কগুলো? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? জঙ্গীরা যদি সত্যিই আমাদের সেনাবাহিনী-র‍্যাব-পুলিশ-সোয়াত থেকে অভিজ্ঞ হয়ে থাকে, তবে আর এই বাহিনীগুলোর পেছনে এত হাজার কোটি টাকা খরচ করার অর্থ কী?

সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিনা, কিন্তু সবকিছুর একটা সীমা আছে, সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক আগে। যে কাজটি জামাত করেছিলো ‘৭১এ, একটা জাতিকে পুরোপুরি পঙ্গু বানিয়ে কয়েকশ’ বছর পেছনে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলো বুদ্ধিজীবি হত্যার মাধ্যমে, সেই গহ্বর থেকে এখনো আমরা উঠে দাঁড়াতে পারিনি। কিছুটা হয়তো উঠে এসেছিলাম, কিন্তু এই ইসলামি জঙ্গীগোষ্ঠী আমাদেরকে আবারো পিছিয়ে দিচ্ছে। জঙ্গীবাদের প্রতি সরকারের বিস্ময়কর নমনীয় মনোভাব আমাকে হতাশ করে না বরং আমার আস্থার জায়গাটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মুক্তমনা লেখকদের খুব বেশি চাওয়া পাওয়া নেই। দেশের রাজনীতি নিয়ে তারা সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেন ঠিকই, কিন্তু তারা কেউই কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের অপরাজনীতিতে জন্ম নেয়া দলটির প্রতি সহনশীল মনোভাব প্রকাশ করেন না, সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দলটির বিরুদ্ধেও সম্পূর্ণ কঠোর অবস্থান ধারন করেন। তবুও তাদেরকে সেই প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক দলটির ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে? এরচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার আর কি হতে পারে? এখন একটাই গণদাবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেয়া হোক, তাদেরকে দলীয় উদ্দেশ্য সাধনের চাইতে বরং জাতীয় সংকট মোকাবেলায় কাজে লাগানো হোক। প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশ গড়তে তাদের জোরালো ভূমিকায় দেখতে চাই। সেই সাথে এইসব হত্যাকান্ডকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় নিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

৫ thoughts on “অবৈধ অভিবাসী সমস্যা, অনন্ত বিজয় দাস হত্যাকান্ড ও জঙ্গীবাদ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু ভিন্ন চিন্তা

  1. সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন

    সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিনা

    সরকারের সদিচ্ছা দেখলেন কই? যুবরাজের বক্তব্যের পর সদিচ্ছা যারা দেখে তাদের বুঝার অনেক ভুল আছে। সব কিছুর দায় সরকারের। চেতনার ব্যবসায়ীদের। চেতনার ব্যবসা সামলাতে গিয়ে যে পাছার কাপড়টাও বন্ধক দিয়ে দিচ্ছে সেটা কি এখনো টের পাচ্ছেন না?

        1. বুঝতে পারছি। কিছুক্ষণ আগে
          বুঝতে পারছি। কিছুক্ষণ আগে দেখলাম।

          এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম স্তম্ভ ধর্ম নিরপেক্ষতা। আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতেও এটা আছে। ধর্ম নিরপেক্ষতার অর্থ সব ধর্মের সমান অধিকার, নিজের ধর্ম সমানভাবে পালনের সুযোগ। সেই সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট- কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত না দেয়া। নাস্তিক/মুক্তমনাদের যেসব লেখা দেখিয়ে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে সেটা ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে বিশাল গুনাহ। সেই ধর্মান্ধদের দোসররা এই হত্যাকান্ডগুলো জায়েজ মানছে। ধর্মপ্রানদের ধর্মানুভূতি যাতে আঘাত না পায় সেই নীতি নিয়া রাজনীতি করা একটা দল ধর্মীয় উস্কানীর পক্ষ নিবেনা। এটা তাদের দলের নীতি। দেশে এখন বাকস্বাধীনতার চর্চার পথ রূদ্ধ। ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনীতি করা আওয়ামী লীগ কখনোই নাস্তিকদের পক্ষে থাকবে না। এটা সুস্পষ্ট। তাদেরকে ভোট হিসাব করে চলতে হয়। রাজনীতি এমনই!

          জয় যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা একজন মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী হিসেবে আমি কখনোই সমর্থন দিতে পারি না। দিচ্ছিও না। আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি, তার মানে এই না- তারা আমার অপছন্দের বিষয়টাকে পছন্দ করতে বললে মেনে নেব। আমার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র এবং বিবেচনাবোধ আমাকে দলকানা হতে দেয়নি। সমর্থক হয়েও আমি সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করি না। চাটুকারিতা করতে পারিনি বলে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছি বহু বছর। এটা অনেকেই জানেন।

          পোষ্টের যে বক্তব্যের ব্যাপারে আপনার আঙুল তুলেছেন, সেটা হলো- ‘সরকারের সদিচ্ছা’ আমি সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং ড্র-ব্যাকগুলো মাথায় রেখেই টার্মসটা ব্যবহার করেছি। কিন্তু এও বলেছি, সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন সেই ‘সীমাবদ্ধতা এবং ড্র-ব্যাকগুলো’ গলায় ঝুলিয়ে রাখার অবকাশ নেই। দায়ভার সম্পূর্ণই সরকারের ওপর বর্তায়।

  2. বিশ্লেষণ ভালো হইসে। ইদানিং
    বিশ্লেষণ ভালো হইসে। ইদানিং ব্লগে সময় দিতে পারছি না ব্যস্ততার কারনে। কিন্তু আপনার পোষ্টটায় একটা ভিন্ন চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। এভাবে কেউই ভাবেনি, অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি। রোহিঙ্গাদের সাথে আরাকানি বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য, অমুকবাদি, তমুকুল ইসলাম…ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা যুক্ত হয়ে সরকারি ছত্রছায়াতেই সহী ভাবে দেশে প্রবেশ করার সুযোগ খুঁজতে পারে। বিষয়ট বেশ উদ্বেগজনক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *