৭০০ কোটি মানুষের প্রাণবাজি!

বাতি জ্বলে উঠেছে। সরঞ্জাম প্রস্তুত। সার্জনদের প্রস্তুতি শেষ। খুবই সেনসিটিভ অপারেশন। ব্যর্থ হলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। অবশ্য সর্বনাশটা কেবল রোগীর নয়, অন্যদেরও। সে কারণেই এত ভয়। সবাই জানে- এ অপারেশন ব্যর্থ হলে রোগীর শরীর থেকে অপ্রতিরোধ্য প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে আকাশে-বাতাসে, পানিতে ও ভূমিতে। ধ্বংস হবে মানুষ, জীব-জন্তু, গাছপালা সব। আর তার দায় নিতে হবে ওই সার্জনদের যারা ইচ্ছে করেই সুস্থ শরীরে জীবাণু পুশ করেছিল, রোগকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছিল এই আত্মবিশ্বাস থেকে যে, রোগ যত জটিলই হোক, সময় হলে সারিয়ে তোলা যাবে। তারা চেয়েছিল রোগ নিয়ে খেলতে, ব্যবসা করতে কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। আজ তাদের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি দণ্ডায়মান। এখন প্রশ্ন একটাই, সার্জনরা কি পারবে শেষাবধি সুক্ষ্ম অপারেশন চালিয়ে রোগীকে প্রাণে বাঁচাতে? এতই সুক্ষ্ম অপারেশন, পৃথিবীর ইতিহাসে যার মুখোমুখি হতে হয় নি কোনো সার্জনকে।
না, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি কোনো হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের নয়। এ পরিস্থিতি সমগ্র পৃথিবীর, সমস্ত মানবজাতির। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সারা পৃথিবীর মানুষকে জিম্মি করে এতদিন যে পাশবিক খেলা চালিয়ে এসেছে তার অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। স্বার্থ, শোষণ, আধিপত্য, ষড়যন্ত্র, ভোগ, হিংসা ও প্রতিহিংসার চর্চা করতে করতে সাম্রাজ্যবাদীরা পৃথিবীটাকে এমন একটি বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে যে, কয়েক মিনিটের মধ্যে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ধ্বংস করার জন্য এখন তাদের একটি ভুল সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। অপারেশন থিয়েটারে মানবজাতির ভাগ্যের পরীক্ষা নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী সার্জনরা।
সাম্রাজ্যবাদীরা প্রত্যেকেই স্বীয় বিজয় চায়। প্রতিপক্ষের ধ্বংস চায়। এতে যদি তৃতীয় বারের মতো মহাযুদ্ধের আয়োজন করতে হয়, তাও তারা করবে। অন্তত হাতে অপ্রতিরোধ্য মহাশক্তিশালী পরমাণু বোমা থাকা অবস্থায় কেউই হার স্বীকার করবে না। মরার আগে মেরে মরবে। কিন্তু ভয়ানক ব্যাপার হলো- বিবদমান পক্ষগুলোর হাতে যে পরিমাণ পারমাণবিক বোমা ও হাইড্রোজেন বোমা জমেছে তার আংশিক প্রয়োগ ঘটলেও জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে মানবজাতির অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের। শত্র“কে মারলে নিজেকেও মরতে হবে। নিজের পরিণামের এই ভয়ই শুধু পৃথিবী ধ্বংসকারী অস্ত্রগুলোকে ব্যবহার থেকে সাম্রাজ্যবাদীদেরকে বিরত রেখেছে। যান্ত্রিক ‘সভ্য’ ভাষায় এর নাম (উবঃবৎবহঃ), দা’তাত। আর এ কারণেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো লাঠি না ভেঙ্গেই সাপ মেরে ফেলার কৌশলগত উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। মানবজাতিরও প্রত্যাশা তেমনই। সকলেই চাচ্ছে, আর যা-ই হোক, অন্তত যেন যুদ্ধটা বেঁধে না যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক গতিপ্রকৃতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, কেবল স্ট্র্যাটেজির উপর ভর করে একটি পক্ষ জয়ী হয়ে যাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবু সার্জনরা চেষ্টা করছেন, ভেবে চিন্তে সাবধানে ছুরি-কাঁচি চালাচ্ছেন, এতে যে পক্ষই সফল হোক অন্তত মানবজাতি বাঁচবে। আর যদি এতে বিফলতা আসে, অর্থাৎ স্ট্র্যাট্রেজিনির্ভর কর্মপদ্ধতি ব্যর্থ হয়, শুরু হবে শক্তির প্রতিযোগিতা যাকে বলা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ। পরিণতি? আগেই বলা হয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদীরা যে পলিসি মেনে চলে তাতে গুরুত্বের অগ্রাধিকার মোটামুটি এরকম- প্রথমত সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা বিধান, দ্বিতীয়ত অন্য শক্তিগুলোর উপর স্বীয় আধিপত্য স্থাপন বা বশীভূতকরণ, তৃতীয়ত প্রতিযোগী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র, চতুর্থত শক্তিহীন সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ। অর্থাৎ শক্তিহীন ও ক্ষমতাহীন মানুষের স্বার্থের চেয়ে তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হয় অনেক বেশি। মানুষ না চাইলেও যুদ্ধ করতে হয়। কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে মারতে হয়। প্রয়োজনে বিশ্বযুদ্ধও ঘটাতে হয়। এটা সাম্রাজ্যবাদের ধর্ম। এ ধর্মকে অমান্য করলে সাম্রাজ্যবাদ টিকে না। সাম্রাজ্যবাদ আছে মানেই এটা ঘটবে। কবে নাগাদ ঘটবে সেটাই এতদিনের চিন্তার বিষয় ছিল। অবশেষে সে চিন্তারও অবসান ঘটতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিগত শতাব্দীর ’৯০ এর দশকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার মধ্য দিয়ে যে øায়ু যুদ্ধের (ঈড়ষফ ডধৎ) পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, বলা চলে তা পুনরায় ফিরে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিকে øায়ু যুদ্ধকালীন বিশ্ব প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করছেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শীতল যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল এবং যেভাবে রক্তপাতহীন পরিণতির দিকে গড়িয়েছিল এবারেরটা তেমন হবার সম্ভাবনা নেই বলেই তাদের অভিমত। পরিস্থিতি দ্রুত মহাযুদ্ধের দিকে গড়াচ্ছে।
জয়ের উচ্ছ্বাস ভোলা যত সহজ, পরাজয়ের গ্লানি ভোলা ততটাই কঠিন। øায়ু যুদ্ধের পরাজিত শক্তি রাশিয়া চাইছে বিগত শতাব্দীর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী নীতির কাছে হেরে গিয়ে আফগানিস্তানে যে মার তারা খেয়েছে তা ফিরিয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি ভ­াদিমির পুতিন। সিরিয়া ও আইএস ইস্যুতে ইঙ্গ-মার্কিন জোট ইতোমধ্যেই রাশিয়ার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি উড়ছে ন্যাটো ও রাশিয়ার বিমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র তিরিশ সেকেন্ডে বেঁধে যেতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইতোমধ্যেই তুরস্ক রাশিয়ার একটি সামরিক বিমান বিধ্বস্ত করায় উত্তেজনা চরমে উঠেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ডেইলি স্টারের একটি সংবাদে বলা হচ্ছে- ‘সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। এ যুদ্ধে ‘হাইড্রোজেন বোমা’ ও ‘কেয়ামতের বিমান’ ব্যবহৃত হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন কেয়ামতের বিমান দ্রুত অভিযান-উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
‘হাইড্রোজেন বোমা’ ‘কেয়ামতের বিমান’ শব্দগুলো নিছক শব্দ নয়, একেকটি ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক। যে ধ্বংসলীলার পশ্চাতে মানবজাতির অস্তিত্বই হয়তো থাকবে না। তৃতীয় মহাযুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রাশিয়ার আক্রমণাত্মক এই দৃঢ় অবস্থান চিন্তায় ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটকে। তারা এখন প্রাণপণে চেষ্টা করছে যুদ্ধকে এড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে অক্ষুণœ রাখার।
এদিকে আইএসকে কেন্দ্র করে যে বৈশ্বিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্ব। পৃথিবীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘সভ্যতার সংঘাত’ এক নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতা কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাম্প্রতিক একটি ভাষণ থেকে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বারাক ওমাবা মুসলিম দুনিয়ার সাথে পাশ্চাত্যের তীব্র ব্যবধান ও সাম্প্রতিক তিক্ততা উপলব্ধি করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। আইএস চাচ্ছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আমেরিকা ও ইসলামের মধ্যকার লড়াই হিসেবে চিত্রিত করতে। তেমনটা মনে করা অনুচিত হবে।’
বারাক ওবামার ভাষণে এ প্রসঙ্গ আসবে কেন? কেনই বা মুসলিমরা মনে করতে যাবে যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্য শক্তিগুলো সন্ত্রাসের নাম করে আসলে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে? বস্তুত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র (ধিৎ ড়হ ঃবৎৎড়ৎ) নাম করে বর্তমানে যা চলছে ও অতীতে যা হয়েছে সে প্রেক্ষাপটই এমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ প্রশ্নের হালে পানি পেয়েছে বলেই, প্রশ্নটি অতি বাস্তবসম্মত বলেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট তার উত্তর দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেছেন। সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু তার এ ভাষণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় দাবি তোলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক।’ বারাক ওবামার করা মন্তব্যের ঠিক উল্টো মন্তব্য। তার এই মন্তব্য স্মরণ করায় ইরাক আগ্রাসনের পূর্বে জর্জ বুশের মুখে উচ্চারিত ‘ক্রুসেড’ শব্দটাকে। আলোচনায় আসে ক্রুসেডের নামে ইউরোপীয় মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মব্যবসায়ীদের চালানো দুইশ বছরের অযাচিত যুদ্ধ, ইউরোপের বর্তমান মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, দুঃসহ্য সামাজিক বৈষম্য বা বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষী অবাধ সাহিত্য-ম্যাগাজিন, কার্টুন, মুভি নির্মাণ ইত্যাদি বিষয় যা ইতিহাসে ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিমবিদ্বেষের প্রতীক হয়ে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প- এর মন্তব্যের প্রেক্ষাপটও বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি এই মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য রেখেছেন নির্বাচনী প্রচারে। প্রশ্ন হলো- নির্বাচনী প্রচারাভিযানে সাধারণত একজন প্রার্থী কী ধরনের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেন? অবশ্যই ওই এলাকার জনসাধারণের মানসিকতার উপযোগী বক্তব্য। সে অর্থে ডোনাল্ড ট্র্যাম্প- এর ওই মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অমুসলিম সম্প্রদায়ের মুসলিমবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলাটাও অযৌক্তিক হয় না। সার্বিক বিবেচনায় তাই সন্দেহ দেখা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে যা করে চলেছে, ইউরোপজুড়ে জঙ্গিনিধনের যে মহোৎসব চলছে, ইরাক-সিরিয়ায় হামলার প্রতিযোগিতা চলছে, তার পরিণতিতে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্যের সভ্যতার সংঘাতই প্রকট হয়ে ওঠে কিনা। যদি তা-ই হয়, তাহলে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, সভ্যতার এই সংঘাতও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নামক পরিণতির দিকেই গড়াবে।
এতকিছু মাথায় রেখে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে কার্যত চুলের মতো সুক্ষ ও তলোয়ারের চেয়ে ধারালো পুলসেরাত অতিক্রম করতে হচ্ছে। একদিকে সাম্রাজ্যবাদ অক্ষুণœ রাখা, সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা, সভ্যতার সংঘাতের মতো বিরাট পরিসরে এখনই ঢুকে না পড়া, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ক্রমাগত আঘাতের সমুচিত জবাব দিয়েও পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, সব মিলিয়ে সাতশ’ কোটি মানুষের প্রাণকে হাতের মুঠোয় ধারণ করে এক মহাকুশলী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা এগোচ্ছে বা এগোতে চাইছে, যেখানে এতটুকু অসাবধানতাও কেবল নিজেরই নয় সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে ফেলতে পারে। এ মহাকুশলী যাত্রাকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং অপারেশন বলাটা ভুল হয় কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *