জবরদস্তী নাই

আমার পাশের ফ্লাটের মালিকের মেয়ের বিয়ে, আজকে গায়ে হলুদ। এ বাড়ির গেট সব সময়ই আটকানো থাকে ।এ বাড়ির ৩য় তলা এবং ৪র্থ তলায় দুটি হিন্দু পরিবার বাস করেন। বিয়ে উপলক্ষ্যে এই বাড়ির গেট আজকে সারাদিন খোলা দেখলাম। আমার এক রিলেটিভ এই ফ্ল্যাটের ২য় তলার বাসিন্দা। কোন কারন ছাড়াই শুধুমাত্র বাসার গেট খোলা এই কারনেই অনেক বার গেলাম । বাধা হীন যাতায়ত, স্বাধীনতা যাকে বলে আর কি! জাকজমক করেই বিয়ে হচ্ছে। মুছলিম দেশের এই অনুষ্ঠানটি হতে পারে ভয়াবহ এক হামলা আশঙ্কা করছিলাম শুরু থেকেই। মেয়ের বিয়ে হচ্ছে তাও আবার এমন ধুমধাম করে যা শরিয়ত বিরোধী এবং হিন্দুদের কে বাড়ি ভাড়া দেয়া হচ্ছে আর এক অন্যায়। আমিরে মোজাদ্দেদিয়া আল ইসলামের শাঁখা অফিস এই মহল্লায় থাকার কারনে তাদের কানে খবর টা যেতে খুব বেশি দেরি হয় নাই। ব্যান্ড পার্টির আওয়াজেই তাদের কাছে খবর পৌছে গেছে। এতদিন তারা জানতো না এই বাড়িতে কোন বিধর্মী ভাড়া থাকেন। আমিরে মোজাদ্দেদিয়া আল ইসলাম এর সদস্যরা সন্ধ্যার দিকে মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ পরেই চলে এসেছেন। বাড়িতে সুনসান নিরবতা। ছোট ছেলে-মেয়েগুলো শুধু “আল্লা আল্লা” করছে। আমিরে মোজাদ্দেদিয়া আল ইসলামের নাম এ দেশের সবাই কম বেশি শুনেছে। তাদের কাজই হচ্ছে দেশকে ইছলামী দেশে রুপান্তর করা। গতকালও এক হিন্দুর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। লক্ষ্মী নামের আমার এক বান্ধবীকে তুলে নিয়ে গিয়েছে এখনো খোজ মেলেনি তার। মোহাম্মদ রফিক নামের আমার বাল্যবন্ধু সংগঠনটির এই অঞ্চলের প্রধানের দায়িত্বে আছেন। তিনিই অপারেশনের নেতৃত্তে আজকে থাকবেন। অন্তত ভাবসাব দেখে তাই মনে হচ্ছে আমার। যে যেখানে ছিলেন সে খানে দাড়িয়ে থাকুন হুংকার ছাড়লেন মোহাম্মদ রফিক।
মোঃ রফিক- মেয়ের বাবা কে? যার সাথে বিয়ে হচ্ছে সে ছেলের বাবা কি এখানে উপস্থিত আছেন? প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন ।

জনৈক- আসসালামু আলাইকুম হুজুর।
জ্বি মেয়ের বাবা আছেন, উনি মুর্ছা গেছেন আপনাদের আসার সংবাদ শুনে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি।

মোঃ রফিক- ছেলের বাবা কোথায় ? এখানে নেই নাকি?

ছেলে – আসসালামু আলাইকুম হুজুর। আব্বা আসেন নি এখনো, চলে আসবেন পথেই আছেন।

মোঃ রফিক- তুমি আমাকে সালাম দিলে; তুমি কি মুছলিম?

বর- জ্বি হুজুর আমি মুছলিম সুন্নী ।

মোঃ রফিক- তোমার পোশাক কি তাই বলে?
সবার দিকে উদ্দেশ্য করে একই কথা আবারও বললেন এই ছেলের পোশাকে কি বুঝা যায় এ মুছলিম নাকি অন্য ধর্মের?

তার সাথের লোকেদের জবাব – জ্বী না হুজুর একে দেখে বোঝা যাচ্ছে না এই ছেলে মুছলিম কিনা!

রফিক- তাহলে এই ছেলের দাবি ভিত্তিহীন!
মেয়ের বাবার জ্ঞান ফিরেছে। ভদ্রলোক সরকারী আমলা ছিলেন এখন অবসর প্রাপ্ত।
সালাম দিয়ে সদর কক্ষে প্রবেশ করলেন।

রফিক- আপনি কে?

বাবা- আসসালামু আলাইকুম হুজুর। আমি মুনার বাবা।

রফিক- আপনার মেয়ের আজকে বিয়ে দিচ্ছেন এই ছেলের সাথে?

বাবা- জ্বি হুজুর। আল্লার ইচ্ছেতে আজকে বিয়ে হচ্ছে তাদের। আপনাদের দাওয়াত দিতে যেতে পারিনি
বলে দুঃখিত। তবুও আপনারা এসেছেন আমার খুবই ভালো লাগছে। আপনারা আমার মেয়েকে দোয়া করে যাবেন। আমার মেয়ে যেন সুখে থাকে।

রফিক- অবশ্যই আমরা দোয়া করবো। আল্লাহ যদি চান তবে আপনার মেয়ে সুখে থাকবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এ বিয়ে ইছলাম মতে হচ্ছে না। রসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন, যতটা সম্ভব অনাড়ম্বর ভাবে বিবাহ সম্পন্ন করতে এবং তিনি এও বলেছেন, প্রত্যেক মুমিনার জন্য একজন মুমিন নির্ধারিত। কিন্তু আপনার মেয়েকে যার সাথে বিয়ে দিচ্ছেন সে ছেলে বেশরিয়তি মনোভাবাপন্ন এবং পশ্চিমা ইহুদী সংস্কৃতি থেকে প্রভাবিত। এ রকম ছেলের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে হতে পারেনা। আপনি যেহেতু একজন মুছলিম সেহেতু আপনার মেয়ে হবেন পর্দানশীল এবং দ্বীন ইলম প্রাপ্ত পুরুষের স্ত্রী। কিন্তু আপনার মেয়েকে যে ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছেন সে মোনাফেক। একজন দ্বিনি মুমিনার কোন মোনাফেকের সাথে বিয়ে হতে পারেনা। কাজেই এ বিয়ে হতে পারেনা।

বাবা- হুজুর তাহলে উপায় কি ? কে করবে আমার মেয়েকে বিয়ে? তাছাড়া ওদের সাথে আমাদের সব কিছু পাকাপাকি করেই এই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সবাইকে নিমন্ত্রনও দেয়া হয়ে গিয়েছে। এখন যদি এ বিয়ে না হয় তাহলে আমার মুখ দেখবো কি করে সমাজে? আর সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে মুনা আসলাম কে ভালোবাসে। দীর্ঘদিন ধরেই ওদের মধ্যে সম্পর্ক!

রফিক- নাউজুবিল্লাহে মিন জালেক! ছিঃ ছিঃ! এত অধঃপতন! আমার আল্লার রাসুল বলেন, প্রেম ভালোবাসা এসব বিবাহের আগে সম্পুর্ন নিষেধ। প্রেম করতে চাইলে সেটা হতে পারে আমার আল্লা আর তার পেয়ারা হাবিব রসুল্লাহ (সঃ) এর সাথে। এ ব্যতীত অন্য প্রেম হতে পারেনা। আপনার ছেলে মেয়েকে ইসলামী শিক্ষাদানে ত্রুটি ছিলো এটা এখন স্পষ্ট হয়েছে।
আপনার ও সাজা হতে পারে। তার আগে এমন কঠিনতম বিপদকে কাটিয়ে উঠতে দিন। এটাই আল্লাহর পরীক্ষা যা আমাকে দিতে হচ্ছে।
আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হবোই ইন্সোয়াল্লাহ।
কোন শয়তানি শক্তিই আমাকে দমাতে পারবে না।

সংগঠনের মধ্য থেকে একজন চীৎকার করে বলছেন –‘ নারায়ে তাকবীর’ বাকিরা বলছেন ‘আল্লাহু আকবর’ মুহুর্মুহু ধ্বনীতে বাড়িটা কেপে উঠছে মনে হচ্ছে। রফিক হাত ইশারা দিয়ে থামতে বলে সবাইকে। থেমে গেছে সবাই।

রফিক আবারো বলে চলেছে- এই ছেলে মুছলিম হয়েও এখন অন্য ধর্মের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে তার পোশাক আশাকে। প্যান্ট শার্ট স্যুট বুট কোন সুন্নাতী পোশাক নয়। এ ছেলের আমাদের সংগঠনের খেদমতে লাগিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হোক। আর এই মেয়ের যেহেতু আজকেই বিয়ে সেহেতু এমন শুভ কাজকে পন্ড করলে আল্লাহ নারাজী হবেন। সুতরাং এ মেয়ের ও বিয়ে অন্য কারো সাথে দিয়ে দেয়া হোক যিনি কোরান সুন্নাহর আলোকে আমাদের চোখে একজন দ্বিনি বান্দা। এ মেয়েকে বিয়ে দেবার আগে এর নাম রাখা হোক মোসাম্মত খাদিজা বিবি। আজ থেকে এ নামই এই মেয়ের নাম। ভুলেও যেন কেউ অন্য নামে এ না ডাকে।

মিনিট দশেক মাথা নিচু করে ভাবছে কিছু একটা মোহাম্মদ রফিক (র) ।
মাথা তুলে একজন সদস্য’র দিকে তাকিয়ে বলেছেনঃ-
এখানে আমি অনেক পাত্রই দেখছি আমাদের সংগঠনের, কিন্তু যোগ্য বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে না কাউকেই। তাছাড়া , সামর্থ্যের দিক থেকেও অনেকেই অনেকের থেকে আগে পিছে আছে। কি করা যায়?

উক্ত্ ব্যক্তি- হুজুর বেয়াদবী না নিলে আপনাকে আমি একটা উপদেশ দিতে পারি। আপনি যদি মোসাম্মত খাদিজা বিবিকে আপনার বিবি করে নেন আমার মনে হয় না এখানে কারো দ্বিমত থাকবে। তাছাড়া এই বিপথগামী মেয়েটিকে আল্লাহর রাস্তায় পরিচালনার জন্য হলেও আপনার মত একজন আল্লাহর সৈনিকের তাকে বিয়ে করাটা জরুরী বলেই আমি মনে করি।

রফিক এবার সবার দিকে তাকালেন। তাকানোর ভঙ্গিতেই বুঝা যাচ্ছে সবার মতামত জানতে চাইছে সে।

সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রফিক বুঝে নিলেন নিরবতাই সম্মতির লক্ষন।

রফিক এবার বললেন- তবে তাই হোক। আমি মোসাম্মত খাদিজা বিবিকে নিকাহ করে আমার ৪র্থ বিবির মর্যাদা দিতে চাই। কাজী সাহেব কে ডাকা হোক। আর সমস্ত আলো নিভিয়ে দেয়া হোক। শুধু ঘরের গুলো ছাড়া। কারনা এগুলা অপচয় । অপচয়কারী শয়তানের ভাই।

কাজী সাহেব এলেন ৩ বার কবুল বলে রফিক তাকে বিয়ে করে ফেললেন। এদিকে এশার আযান পড়ে গেছে নামাজে যেতে হবে। মেয়ের বাবা আবারো মুর্ছা গেছেন। আসলাম কে ধরে নিয়ে গেছে আমিরে মোজাদ্দেদিয়া আল ইসলাম এর টর্চার সেলে। আগে তাকে পিটায়ে ইহুদীদের ভুত তাড়াতে হবে মাথা থেকে।

রফিক – এশার আজান পড়ে গেছে। সালাতে যেতে হবে মসজিদে। এখানে শুনেছি আমি দুটা হিন্দু পরিবার আছে। তাদেরকে বলে দেয়া হোক। নামাজের পড়ে আমি আসছি তাদেরকেও এক আল্লাহ ও এক নবীর তরিকায় চলতে হবে। মুসলমান হতে হবে। এ মহা সওয়াবের কাজ আমিই করবো ইনশোয়াল্লাহ। আমার আল্লাহ যদি চান তবে অবশ্যই আমাকে এ কাজে সাহায্য করবেন। আল্লাহ ছাড়া আর কোন সাহায্য কারী নেই। থাকতে পারে না। আর যদি ত হিন্দু পরিবার দুটি চায় তবে তাদের কে একটি সুযোগ দেয়া হোক। আমাদের ফিরে আসার আগেই তাদেরকে এ স্থান ত্যাগ করতে।
কেননা, আমার আল্লাহ বলেছেন লা ইক রাহা ফিদ্দিন- ধর্মে কোন জবরদস্তী নেই।
সবাই মসজিদের পানে চলো– ফি আমানিল্লাহ।
(কাল্পনিক গল্প)

২ thoughts on “জবরদস্তী নাই

  1. ঝরঝরে গল্প বলার ভঙ্গি দারুণ
    ঝরঝরে গল্প বলার ভঙ্গি দারুণ লেগেছে। কাল্পনিক গল্প বললেও দুনিয়াতে এ ধরণের ইসলামী শাসন দেখেছে। বর্তমানেও দেখছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *