জঘন্যতম এ জঙ্গীগোষ্ঠীকে ইসলামিক স্টেইট (Islamic State)’ নামে অভিহিত করা কেন?

বছর খানেক আগে ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি জঙ্গীগোষ্ঠী ইরাক ও সিরিয়ার বড় একটি অংশ মধ্যযুগীয় অত্যাচারের চেয়ে নিকৃষ্ট প্রক্রিয়ায় সন্ত্রাস চালিয়ে দখল করে নিয়ে সেই অংশটিকে ‘ইসলামিক স্টেইট অব ইরাক এন্ড সিরিয়া‘ নামের একটি তথাকথিত খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। তারা তাদের সংক্ষিপ্ত নাম দেয় আইএসআইএস। আর তার পর থেকে সকল মিডিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবাই অবলীলায় তাদের ‘ইসলামিক স্টেইট’ নামে সম্বোধন করা শুরু করে। বড়জোর কেউ কেউ বলে, তথাকথিত ইসলামিক স্টেইট। কয়েকদিন আগে অনলাইনে গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি নিউজ পড়ে হঠাৎ চিন্তা আসে আমরা কেন তাদের ইসলামিক স্টেইট বলি। তারা তো ইসলাম বা অন্য কোন ধর্মের মূলনীতি মানার ধারে কাছেও নেই। এ নামে ডেকে আমরা তাদের পরোক্ষভাবে মানুষের চোখে ভাল হিসেবে উপস্থাপন করছি । নিজেদেরকে তারা যে নাম দিয়েছে সেটি যদি একেবারেই অযৌক্তিক হয় এবং তাদের সত্য পরিচয়কে প্রকাশ না করে তবে তাদের সে নামে ডাকা কি আমাদের উচিত? যদি চোর বা ডাকাত দল তাদের নাম দেয় জাতীয় সৎ নাগরিক সমাজ তবে কি আমরা তাদের ‘সৎ নাগরিক’ নামে ডাকব? যদি মকিম গাজীর ডাকাত দল তাদের নাম দেয় ইসলামিক শক্তি, যদি দস্যু ফুলন দেবী তার নাম দিত সন্ত ফুলন বা বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী যদি আগামীকাল থেকে তাদের নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘বাংলাদেশ জামাতে মুক্তিযুদ্ধা দল’ তবে কি আমরা তাদের সে নামে ডাকতাম? আমাদের মিডিয়া কি তাদের সে নামে সম্বোধন করা শুরু করত? নিশ্চয়ই না। আমরা তাদের ডাকতাম তাদের কাজের পরিচয় বহন করে এমন একটি নামেই। আমার এক সহকর্মীর নাম ছিল ডেভিড মেইকপিছ। সে ছিল অফিসে যত গন্ডগোল বাঁধানোর হোতা তাই আমরা তকে ডাকতাম ডেভিড মেইকট্রাবল (Make Trouble) বলে। আমার গ্রামের এক জনের নাম মনটু জুপিটার। সে জমিসহ বিভিন্ন ধরণের প্রতারণামূলক কর্মে হাত পাঁকিয়েছে। তাকে এখন সবাই ডাকে মনটু চিটার বলে। সদ্য প্রয়াত ডিগবাজী বিশেষজ্ঞ রাজনীতি-ব্যবসায়ী কাজী জাফরকে আমরা তার চিনি কেলেঙ্কারীর স্বীকৃতি (!) স্বরূপ ‘চিনি জাফর’ বলেই কিন্তু ডাকতাম। তাই যদি সত্যি হয়, তবে রাজনৈতিক স্বার্থান্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ঐ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যারা কাজে কর্মে আর নীতিমালাতে ইসলামিক না হয়েও নিজেদের ইসলামিক বলে জাহির করার অপপ্রয়াশ চালাচ্ছে তাদের আমরা কেন ‘ইসলামিক স্টেইট’ বলে ডাকি। আমাদের উচিৎ তাদেরকে এমন একটি নামে ডাকা যা কিনা তাদের কর্ম পরিচয় বহন করে। উদাহরণ স্বরূপ, তাদের বলা যেতে পারে, Terrorists Using the Name of Islam in Syria & Iraq (TUNISI/ তুনিজি) বা সে রকম কিছু। কোন মিডিয়ারই উচিৎ নয় তাদেরকে ইসলামিক স্টেইট হিসেবে উল্লেখ করা এমনকি তথাকথিত ইসলামিক স্টেইট বলাও উচিৎ হবে না। আর তাছাড়া তারা তো পৌরনীতির কোন বিচারেই একটি রাষ্ট্র্র বা স্টেইট নয়, তবে কেন আমরা বা আমাদের মিডিয়া তাদেরকে স্টেইট বলতে যাবে।
আর একটি বিষয় দেখেও আমি খুব অবাক হই। এ জঙ্গী গোষ্ঠীটি শান্তির ধর্ম বলে দাবীকৃত ইসলাম ধর্মের নামটির যে এমন যথেচ্ছা অপব্যবহার করছে, এর যারপরনাই অবমাননা করছে, এ ধর্মটি সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষকে ভুল বার্তা দিচ্ছে, ইসলামকে চরম কুৎসিত ভাবে বাইরের পৃথিবীর নিকট উপস্থাপন করছে- তা দেখে কেন প্রকৃত ভাবে যারা ইসলাম অনুসরণ করেন তারা ক্রূদ্ধ এবং বিরূপ হচ্ছেন না। প্রকৃত ইসলাম অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে এখন কেন আঘাত লাগছে না। ইসলামের নামে সামান্য কিছু বললে বা কোন সামান্য কার্টুন বা উক্তিকে কেন্দ্র করে তো অনেক সময় লংকা কান্ড ঘটে যায়, হয়ে যায় কত খুনোখুনি। এরা যখন লাইসেন্স বিহীনভাবে আরও অনেক জঘন্য ভাবে ধর্মটির অবমাননা করছে তখন কেন কোন প্রতিবাদ হচ্ছে না? তবে কি ধরে নিব, ‘প্রকৃত ইসলাম অনুসরণকারী গণ কখনই ইসলামের অবমাননা দেখে ক্রদ্ধ বা উত্তেজিত হন না। তারা তাতে মর্মাহত হন নিশ্চয়ই। কিন্তু তার প্রতিবাদ করেন ইসলামিক ধার্মিকতা বজায় রেখেই। তারা এসব ঘটনার জন্য আল্লাহ’র নিকট মোনাজাত করেন, তিনি যাতে এসবের বিচার করেন। তিনি যেন অবমাননাকরীদের মন পরিবর্তন করেন বা শাস্তির বিধান করেন। তারা বিশ্বাস করেন, ইসলাম সত্য ধর্ম। কিছু সংখ্যক বিপথগামী ব্যক্তির কারণে এর এতটুকু ক্ষতি হবে না। আল্লাহ সর্ব শক্তিমান। তিনিই তার সত্য ধর্মকে ঐসব কুচক্রীদের কাছ থেকে রক্ষা করেছেন, করছেন এবং করবেন।’ আর যারা ইসলাম ধর্মের অবমাননার উছিলা তুলে বা কোন কার্টুন বা উক্তির ধুয়ো তুলে রাস্তায় নেমে আসে, জঙ্গীপনা প্রদর্শন করে, মানুষ হত্যা করে বা যাবতীয় নেতিবাচক পন্থায় প্রতিবাদ করে- তারা আসলে প্রকৃত ইসলাম অনুসরণকারী নন। তাহলে কি ধরে নেয়া যায় , বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যারা ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে সমস্ত অনৈসলামিক পন্থায় জঙ্গীপনা সর্বশ্য প্রতিবাদ করে থাকে তারা আসলে উপরোল্লেখিত তুনিজি বা তাদের অনুসারী বা সমর্থক। আর এ কারণেই ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করে তুনিজি কর্তৃক করা অনৈসলামিক তো বটেই এমন কি সাধারণ মানবতার লেশ বিহীন পন্থায় পরিচালিত জঘন্য হত্যালীলা‘র কোন প্রতিবাদ করছে না।
একথা আর কারও বুঝতে বাকী নেই যে, ইসলামের অবমাননার ধুয়ো তুলে বা কোন কার্টুন, লেখা বা উক্তির উছিলা দেখিয়ে যারা প্রতিবাদের নামে হত্যা আর জঙ্গীপনা করে তারা আসলে ইসলামের ধারক বা অনুসারী নয়। তারা আসলে, ইসলামের ঢাল ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও জাগতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার অভিপ্রায়ে এসব করে থাকে। তাই যারা প্রকৃত ইসলাম অনুসরণ করে থাকেন তাদের উচিৎ যথাযথ ইসলামিক ধার্মিকতা বজায় রেখে তুনিজি’র এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করা। আসুন এ সাধারণ সত্যটি সবাই উপলদ্ধি করার চেষ্টা করি, ধর্ম আর যা ই করুক, অন্তত পক্ষে এটি এর ব্যবহার করে সৃষ্টির সেরা জীব কোন মানুষকে হত্যা করার বিষয় অনুমোদন করতে পারে না।

৭ thoughts on “জঘন্যতম এ জঙ্গীগোষ্ঠীকে ইসলামিক স্টেইট (Islamic State)’ নামে অভিহিত করা কেন?

  1. কুরান ও হাদিসের শতভাগ অনুসরণ
    কুরান ও হাদিসের শতভাগ অনুসরণ করেই গড়ে উঠেছে তথাকথিত আইএস।ঠিক কোন কাজ তাদের ইসলাম বিরোধি তা কিন্তু আপনার লেখায় উল্লেখ নেই।

    1. উনার মতে আইসিসের জঘন্য
      উনার মতে আইসিসের জঘন্য কাজগুলো ইসলামের বিরোধী। অর্থাৎ, আইসিস যদি আজ জঘন্য কাজ ছেড়ে দিয়ে রবিন হুডীয় পন্থায় যাকাত দানের জিহাদ চালু করে, উনার মতে ইটস পার্টলি ফাইন। উহাতে যাকাত দানকে কলংকিত করা হবে আর কি।

    2. আমি কোন ধর্ম সম্বন্ধেই ভাল
      আমি কোন ধর্ম সম্বন্ধেই ভাল জানি না। তবে আমার কমন সেন্স থেকে এটুকু প্রত্যাশা করি যে, কোন ধর্মই হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট বা যে কোন ধরণের জঙ্গীপনা অনুমোদন করতে পারে না। যদি কোন ধর্ম সেই ধর্মের নামে এগুলো করাকে অনুমোদন করে তবে সবার আগে সে ধর্মকে নিষিদ্ধ করা উচিৎ। যদি সে ধর্ম কোন দেশে বিদ্যমান থাকে তবে সে দেশের উচিৎ সেটা নিষিদ্ধ করা আর যদি পৃথিবীর অনেক দেশে সেটির অস্তিত্ব থেকে থাকে তবে আন্তর্জাতিক সমাজের বা জাতিসংঘের উচিৎ সেটিকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহন করা। আর যদি তা করা না হয় তবে আমাদের সবার উচিৎ সে ধর্ম নিষিদ্ধ করার দাবী উত্থাপন করার, সে ধর্মের এমন কুৎসিৎ দিক গুলো সম্বন্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার।

      1. “আমার কমন সেন্স থেকে এটুকু
        “আমার কমন সেন্স থেকে এটুকু প্রত্যাশা করি যে, কোন ধর্মই হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট বা যে কোন ধরণের জঙ্গীপনা অনুমোদন করতে পারে না”- এই কথার প্রেক্ষিতে বলতে চাই, সকল ধর্মেই হত্যার নির্দেশ দেয়া আছে।আরেকটা কথা-ধার্মিকদের কমনসেন্স নেই,কমনসেন্স থাকলে ধার্মিক হওয়া যায় না।

        1. “সকল ধর্মেই হত্যার নির্দেশ
          “সকল ধর্মেই হত্যার নির্দেশ দেয়া আছে” এ বক্তব্যটি সঠিক নয়। কিছু ধর্মে হত্যার নির্দেশ দেয়া থাকলেও থাকতে পারে তবে এমন কিছু ধর্ম আছে যেখানে বলা হয়েছে ‘জীব হত্যা/নর হত্যা মহা পাপ।’ সাধারণ ধার্মিকরা কিন্তু ধর্ম প্রবর্তন করেননি, করেছে প্রবক্তারা। তারা সবাই ধার্মিক ছিল কিনা সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ হতে পারে তবে তাদের অনেকেই যে বুদ্ধিমান ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কাজেই তারা তাদের ধার্মিকতার প্রভাবে না হলেও তাদের বুদ্ধিমত্তার জোরে হত্যাকে ধর্মে অনুমোদন করেননি। আপনার শেষ কথায় বলা যায়, সকল ধার্মিক বা অধার্মিকই কমমসেন্স পূর্ণ নয়, তবে তাদের কেউ কেউ কমনসেন্স পূর্ণ। এখন আপনি যদি ডিগ্রী অব কমনসেন্স নিয়ে প্রশ্ন করতে চান সেটা আপনার, আমার, ডঃ মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, আইনস্টাইন, মাদার তেরেসা সহ সবার ব্যাপারেই করা যায়।

          1. সুন্দর সুন্দর কথার ফুলজুরি
            সুন্দর সুন্দর কথার ফুলজুরি থাকলেও ধর্ম প্রতিষ্ঠায় পথিবীর সব ধর্মই গণহত্যা চালিয়েছে, মানুষ মেরেছে। আপনার কমনসেন্স একটু ঝালাই করা দরকার।

          2. আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
            আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আমি লিখেছি, “তবে আমার কমন সেন্স থেকে এটুকু প্রত্যাশা করি যে, কোন ধর্মই হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট বা যে কোন ধরণের জঙ্গীপনা অনুমোদন করতে পারে না।” এখন যদি আমি আমার কমনসেন্স ঝালাই করতে যাই তবে বলতে হবে,‘ ধর্ম হত্যা অনুমোদন করতে পারে।‘ যদি ধর্ম হত্যা অনুমোদন করে তবে সেটি আর ধর্ম থাকে না সেটি হয়ে যায় অধর্ম।
            তবে আমি আপনার সাথে এ বিষয়ে একমত যে,ধর্মে অনুমোদিত থাকুক বা না থাকুক, প্রায় সকল প্রধান ধর্মের নাম ব্যবহার করেই গণহত্যা চালানো হয়েছে। সেজন্যেই বলতে চাই, যখন ধর্মের নাম ব্যবহার করে হত্যার মত জঘন্য অপরাধ করা হয় তখন তাদেরকে ধর্ম পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিতে দেয়া যাবে না। তাদেরকে পরিচিত করতে হবে হত্যাকারী গোষ্ঠী হিসেব, ধর্মগোষ্ঠী হিসেবে নয়।
            শুধু ধর্ম নয়, অন্য কোন সংগঠনই তাদের নীতিমালাতে থাকা সুন্দর সুন্দর কথার ফুলজুরি প্রয়োগিক ক্ষেত্রে পুরোপুরি অনুসরণ করেনা। সে জাতি সংঘ, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ওআইসি যেটির কথাই বলুন। তবে এ কথা উল্লেখ করে আমি ধর্মের নামে করা হত্যাকে জায়েজ করার অপচেষ্টা করছি না। আমি বলতে চাই, ধর্মকে যদি প্রকৃত ধর্ম হতে হয় তবে অন্য কেউ না করলেও ধর্মকে তাদের সুন্দর সুন্দর কথার সব কিছু প্রয়োগিক ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আর না হোক, ধর্মের নাম ব্যবহার করে মানুষের অনিষ্ট করা যাবে না। যে ধর্ম সেটি করতে পারবে না আমাদের সেটি‘র দরকার নেই। যদি কোন ধর্মই সেটি করতে না পারে তবে তাদের কোনটিরই প্রয়োজন নেই আমাদের। যে ধর্ম হত্যা অনুমোদন করে সেই ধর্ম সমেত পৃথিবীর চেয়ে ধর্মহীন পৃথিবীই আমাদের কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *