জিতহার

– ক্যামন আছেন, মিস মিথি…?

– ক্যামন আছেন, মিস মিথি…?
এমন সহজ-সাবলীল-শান্ত অথচ ব্যাঙ্গাত্তক তিরস্কার কণ্ঠে কে ডাকল আমায়! বন্ধুরা তো না, কোন স্যারও হওয়ার কথা না। প্রায় পাঁচ বছর পর মিথি এ পার্কে এসে বসেছে। ক্যাম্পাসে আসাও তো কম করে হলেও চার বছর পর। এক সময় প্রায় প্রতিদিনই এদিকে আড্ডা হত, আসা হত- চির পরিচিত এই জায়গা-বাগান-গাছপালা অথচ আজ মনেহচ্ছে একেবারেই অপরিচিত কোথাও আছে সে, তার দুনিয়া থেকে অনেক দুরে। কিন্তু এখন এখনকার কেউ তো তাকে চিনার কথা নয়, কিজানি কে! মিথি ফাইল থেকে মাথা তুলে ডানদিকে মুখ ঘুরালেই তার স্বাভাবিক ভঙ্গির এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। কয়েক মুহুর্ত আগে মনেমনে এমন ভাবও এসেছিল যে স্বাভাবিকভাবেই আগন্তুককে বলতে হবে- এইতো চলছে, তুই, তোর বা তোদের, এমনকি এর বেশি হলে আপনি সম্মোদন করে জানতে হবে তার ক্যামন চলছে। কিন্তু একোন বজ্রের আঘাতে বিক্ষত যাত্রীর মত থেমে গেছে সে! তার স্বাভাবিক থাকা তো আর হল না; তার পরিবর্তে সে অবাক দেখছে আগন্তুককে। এমন কাউকে তার প্রত্যাশাই ছিল না এই মুহুর্তে- কিন্তু অপ্রত্যাশিত ব্যাক্তি ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে। তাইলে কি করা উচিত মিথি ভুলে গেছে। তবে এই মুহুর্তে অপ্রত্যাশিত হলেও রবির সাথে যে মিথির একদিন দেখা হবে তা সে মনেমনে জানত- জানত কি; ভাবত, ভাবতে ভাবতে এক সময় নামটা অপ্রত্যাশিতের খাতায় চলে গেলেও- তাকে কি ভোলা যায়! জীবনে এই মানুষটিকে ভুলতে পারলে তো কোন কথাই ছিল না! তার চেতনে-অচেতনে-অবচেতনে কোথায় ছিল না সে! যাই হউক, তারপরও শেষ পর্যন্তও মিথির বিশ্বাস ছিল রবি তার বিয়েতে আসবে। মিথি-ফারদিন দুজনেই তাকে আসতে বলেছিল, তার যাওয়ারও কথা ছিল কিন্তু হঠাত রবি উধাও। তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি, তার পরিচিতজনদের সবাই গেছে। কিন্তু রবি নাই, রবির খোঁজও কারো কাছে নাই। মিথি তখন চিন্তাও করতে পারেনি রবি এমন ডুব দিবে, মিথি শেষে এ-ও ভেবেছে যে সে কষ্ট পেয়েছে হয়ত। কিন্তু রবির ব্যাপারে মিথি খুব ভাল করেই জানে- ওর কিছুই হবে না, হওয়ার কথা না, ওর কষ্ট পাওয়ার কথা না। আর যদি কষ্ট পেয়েও থাকে তাইলে ঠিকই আছে- তার কষ্ট পাওয়ার দরকারও ছিল। ভালোই হয়েছে। এখন বুঝুক। সেই থেকে আজ, এতদিন পর সামনে হাজির হয়েছে রবি। মাঝখানে পাঁচ-ছয় বছর কোথায় ছিল সে? জানতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ভয়ে-দ্বিধায়-দোটানায় কিছুই বলা হয় না, পারে না; পাচে যদি পুরনো ইতিহাস সামনে আসে, থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে! এই থলের বিড়ালটা আবার কি? রবিরও তো তাকে অপরাধী করার সুযোগ আছে- যদিও সে করবে না। কিন্তু মিথির নিজেরও যে দোষ আছে তা তো সে নিজেই জানে। আজ আর ইতিহাস ঘাটতে ভাল লাগছে না। মিথি কি করবে, কি বলবে বুঝতে পারছে না। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ভদ্রতা দেখানোর জন্য হলেও তো ওকে বসতে বলা উচিত ভেবে বলে উঠল- পাশটা তো খালিই পড়ে আছে, বসেন!
– পাশে বসতে যে ভয় ক’রে!
রবির এক কথায় মিথির সব কথা-চিন্তা-স্মৃতি গুলিয়ে যায়, বিকল হয়ে যেতে চায় তার যন্ত্র- এ-কি বলল ও! একসাথে পাশাপাশি কত বসেছে দুজন, রিক্সায়, গাড়িতে, এমনকি এই পার্কের, হ্যাঁ এই বেন্সিতাতেও তো বসা হয়েছে অনেকবার। আবার প্রায় এক-দেড় বছর একসাথে থাকার পর যে মানুষটির ভয় হয় বলতে চায়- তার কথায় ফাঁকি আছে। সে যে এখন এমন কথা বলে তার কি এই খেয়াল নাই যে তাদের ফেলে যাওয়া বাদামের খোসা কাছে-ধারে এখনো খুঁজলে পাওয়া যাবে, আর সেই রবি আজ বলে কি! তার সাথে বসতে নাকি ভয় হয়। ও কি এমন খোঁচাগুলো না দিয়ে থাকতে পারে না, পারবে না, এতদিন পরও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় শুধু খোঁচা দেয়ার জন্য! রবি কখনো চিতকার-চেঁচামেচি-গর্জন করত না, করে না- কথা দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করতে চায়। কথা শুধু! চূড়ান্ত বিষ ছুঁড়ে মারে একেক সময়; যেই বিষ গিয়ে লাগে কলিজায়, রক্তে মিশি যায়, জীবনে হাহাকার শুরু হয়- এমন বাঁচার বুঝি কোন মানে নাই। এই অভ্যাসগুলো এখনো যায়নি তার। এমন কথা বলবে যেন এক কথায়ই কলিজা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। রবিকে বিয়ে না করার এটাও একটা কারণ হতে পারত। একসময় মিথি রবির উপর ক্ষেপে যায়, অনেক রাগ হয় তার, ভাবে এই ভ্যাগাবন্ড নিয়ে সংসার করতে তার বয়েই গেছে, করবে না তার সাথে সংসার, করবে না তাকে বিয়ে- কি হবে! মিথির কাছে তার অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ আছে, যার জন্য হঠাৎ করে ফারদিনকে বিয়ে করা। একদিনেই দেখা, সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত হয় বিয়ে করবে। তার কয়েকদিনের মধ্যে বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ে হয়েছে প্রায় ছ’বছর। তারপর থেকে আজ এর সাথে প্রথম দেখা।
মিথি তাকিয়ে আছে মানুষের ভিড়ে। পার্কের এদিকটা আগের মতই জনবহুল। ভ্রাম্যমাণ চা-সিগারেট, বাদাম-ঝালমুড়ির দোকান, সবই আছে। ওদিকে মানুষের জটলা। দাঁড়িয়ে বসে বাদাম-ঝালমুড়ি, সিগারেট-চা সবই চলছে। একটা কুকুরদল পাহারা দিয়ে যাচ্ছে তাদের সীমানা, হেমন্তের হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, এমন দিনে যদি মিথির মত এ জনমের সবচেয়ে আপন কাউকে হঠাৎ একা চোখে পড়ে রবির কি আর ভাল লাগে, সে কি তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতে পারে! কত স্মৃতি, কত ভালবাসাময় রাত-দিন-সকাল, কত হাতে-হাত, ঠোঁটে-ঠোঁট, মান-অভিমানে ঢুবে থাকা দিনগুলোর স্মৃতি-ছবি-গল্প সবকিছুর বোঝা বয়ে বেরিয়েছে রবি, এখনো হয়ত বয়ে বেড়ায়। কিন্তু সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেও বুঝতে দেয় না। সেই রবি রাস্তা থেকে মিথিকে একা বসে থাকতে দেখে চিনতেও পারে, এবং এগিয়েও যায় তার দিকে। চারিদিকে তাকিয়ে বসল মিথির পাশে। হাতে একটা সিগারেট, সামনে থাকা দোকান থেকে জ্বালিয়ে নিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে।
– তো ম্যাডামের হঠাৎ এতদিন পর এদিকে আগমন! সার্টিফিকেট তুলবেন বুঝি?
রবির পাঁচ বছর আগের সেই একই বেশ-ভূষা, গায়ের গন্ধ, কথার ঢঙ, একটু হেঁয়ালি- সব মিলিয়ে খুব একটা পরিবর্তন নাই তার। তবে আজকাল মনেহয় দু’চারটা মাস পরে হলেও দাড়ি-গোঁফ কাটে, চোখে আগের চেয়ে গম্ভীরতার ভাব কিছুটা বেশি, অনেক বয়স্ক মনেহচ্ছে ওকে, চোখের নীচটা আগের চেয়ে পরিষ্কার, মুখটা আরেকটু ভরাট হয়েছে, গেটাপটাও একই, আগের মতই ক্যাজুয়াল, এক্সপ্রেশন অর্ডিনারি, ওজন দু’চার কেজি বাড়লেও বাড়তে পারে, আগের চেয়ে আরেকটু ফর্সাও মনেহচ্ছে, চেহারায় আগের মতই দীপ্তিমান-আত্মবিশ্বাসী- এখনো এটা খুবই চিন্তার কথা মিথির জন্য। মিথির বিশ্বাস ছিল একদিন রবি জীবন-যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ফিরে আসবে তার কাছে, তার সামনে এসে বলবে-আমি পারলাম না কিছুই করতে, আমাকে দিয়ে হবে না, তুমি আমাকে একটু ছায়া দাও, আশ্রয় দাও তোমার মাঝে। কিন্তু তা নয়, সে সেই একই রকম স্বাভাবিক। তবে কোন সন্দেহ নাই সে জানু প্লেয়ার- পরাজিত হলেও এখন ধরা দিবে না, মিথি চাইলে খবরটা বের করতে পারবে কিন্তু সেটা বের করার আগ্রহ তার নিজেরই কমে গেছে অনেক। ও এখনো আগের মতই আছে!- রবিকে কখনোই কিছু বুঝানো যেত না সহজে, তার চিন্তা আর কর্মের প্রতি সে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী, যেন সে নিশ্চিত ঠিক পথেই আছে, এবং এর স্ট্যান্ডার্ডও সে নিজেই, কাউকে গোণারও টাইম নাই তার, কেউ প্রশ্ন তুলতে গেলে যা-তা বলে তাকে, খুব কাছের মানুষ হলে বেশি মেজাজ ঝাড়ে; দুরের-অপরিচিত মানুষের জন্য কিছুটা ছাড়। আগের মত মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল করার অভ্যাসটা আছে কিনা কে জানে! সব মিলিয়ে, এ পর্যন্ত যা বুঝা গেছে তাতে তার খুব একটা পরিবর্তন বলা যাবে না। খুব পরিবর্তন আশাও করে না মিথি- এ পুরান মাল; পালটাবার নয়। কিন্তু তার পরিবর্তন-অপরিবর্তন নিয়ে মিথি এতোটা ভাবছে কেন! এ নিয়ে এতোটা ব্যাকুলতা কেন তার? রবির তো গোল্লায় যাওয়া উচিত- সে যা কষ্ট দিয়েছে মিথিকে তা এই পৃথিবীর সবগুলো মানুষ মিলে দিতে পারবে না। এতো অবহেলা করেছে বলে শেষ কর যাবে না। দেশের সব মেয়েদের পিছিয়ে পড়ার ক্ষোভ যখন-তখন মিথির উপর ঝেড়েছে। কোন কিছু তার মন মত না হলেই হেয়ালি করে কথা বলত, সুর থাকত তিরস্কারের, চোখে ক্যামন যেন এক ক্ষভের আগুন। মিথি জানত এ ক্ষোভ তার একার উপর নয়; এটা নারী জাতীর উপর। তাই ভেবে মিথি ভয় কিছুটা কমত। তখন তার চোখের দিকে তাকালে মিথি তাকে চিনতে পারত না- একোন রবি! ভয়-আতঙ্ক কাজ করত তাকে দেখে। কোন ব্যাপারে মিথি তার সাথে একমত না হতে পারলে খুব তাচ্ছিল্য করত, বলত তোমরা মুর্খের হাড়ি। মিথিকে কতবার বকেছে- শুধু নিরাপদ জীবন চাও, সেইফ সাইডে অন্যের বোঝা হয়ে কেন থাকতে চাও, সংগ্রাম করতে চাও না কেন, সংগ্রাম করতে জান না কেন, কেন ঝুঁকি চেলেঞ্জ নিতে চাও না, খাচার ভেতরে ঢুকে যেতে চাও, তোমাদের মত মানুষ আর গরু-ছাগলের মাঝে তফাৎ আছে কি! বেশি ক্ষেপে গেলে গালাগালিও করত মাঝে মাঝে, বলত বাল হবে তোমাদের মত নারীদের দিয়ে, বাল ছিঁড়বা তোমরা- এই দেশটাকে তোমরাই পেছন থেকে টেনে ধরে রেখেছ মুর্খতা দিয়ে, অজ্ঞতা দিয়ে, অসভ্য-বর্বর মানুষগুলোর চেয়েও তোমরা বেশি অসভ্য-বর্বর। কারণ তোমরা সভ্য মানুষের মুখোশ পরে থাক, জামাকাপড়ে ঢেকে রাখো তোমাদের আবর্জনা, তোমাদের ঘোমটা পরেই চলা উচিত, লজ্জা করাই উচিত। তবে একটা দিক ওর ভাল ছিল- খুব উত্তেজিত হয়ে গেলেও ব্যাবহার অমার্জিত হত না। তখনকার মত ঝগড়া করার, চিল্লাচিল্লি করার এতো জোশ, এতো এনার্জি, বা ইচ্ছা আজ কি আর আছে ওর মাঝে? নাহ, আছে বলে মনেহয় না।
রবির এমন ভয়ঙ্কর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মিথির সয্য হত না, খুব কষ্ট হত, নিজেকে খুবই ছোট মনে হত, মানুষই মনে হত না নিজেকে একেক সময়- কিন্তু রবি মিথিকে ভালবাসত তা মিথি ভাল করেই জানে, জানত। রবি একাধিক প্রেম আগেও করেছে, মিথির সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও হয়ত করেছে, তাদের সাথে একসাথে থেকেছেও। কিন্তু এট আ টাইম দুইজনের সাথে সম্পর্ক রাখেনি, এটাও ভাল দিক। যখন যার সাথে ছিল তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবেসেছে, তার মাঝেই ডুবে আছে। এর সাক্ষী তো মিথি নিজেই। আর রবির সাথে অধিকাংশ সময়ই মিথির আনন্দে কাটতো, সঙ্গি হিসেবে রবি অসাধারণ, জ্ঞানী-বুদ্ধিমান-বিচক্ষণ, খুব সুন্দর করে-আন্তরিকভাবে কথা বলে, মুখে যা বলে অন্তরেও তা-ই ধারণ করে, বিশ্বাস করে। ভেতরে বেশি একটা ছল-চাতুরী নাই- এজন্য তাকে বেশি ভাল লাগত। তা এই ভাল মানুষ দিয়ে তো আর আধুনিত জীবন চলে না, চলতে পারে না, এখানে মানুষকে খুবই ক্রিটিক্যান হতে হয়, কত কিছু ফেস করতে হয়, কত কঠিন সংগ্রাম করে জীবন চালাতে হয়। আচ্ছা, রবি কি সংগ্রাম করেনি, করছে না, করে না? হ্যাঁ, তা করে, ওর মত সংগ্রামী আর ধোর্যশীল ক’জন পাওয়া যাবে খুঁজে! দিনের পর দিন না খেয়েও থেকেছে, ওসব বাস্তব জীবনের সংগ্রাম মিথির চেয়ে রবিই বেশি করেছে। তবে মিথির সংগ্রামটা অনেকটা সামাজিক-পারিবারিক; নিজ পরিবার থেকে সৃষ্ট, বাবামার সাথে খুব বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক না হওয়া থেকে সৃষ্ট। কিন্তু রবির? কত ইচ্ছে তার পূরণ হয়নি অর্থের অভাবে তা মিথি চেয়ে বেশি আর কে জানবে, বুঝবে? এক সময় মিথির ইচ্ছাও ছিল- কখনো তার অনেক টাকা হলে রবির ইচ্ছাগুলো পূরণ করবে। কিন্তু আর হল কই? তবে কি এতো কষ্ট-সংগ্রামের পরও সে তার পথ ছাড়েনি, এক চুলও সরে আসেনি নিজের বিশ্বাস থেকে, নিজের ব্যাক্তি দর্শন থেকে, নিজের চিন্তা থেকে। মিথি মাঝে মাঝে আশ্চর্যও হত রবিকে দেখে- এতোটা নির্লিপ্ততা, এতোটা উদাসিন জীবনের প্রতি, এতো চাওয়াহীন মানুষও হয়! আর এটাই তো মিথির সবচেয়ে কাল; ভালবাসার দাবী নিয়েও কখনো রবিকে সরিয়ে রাখা যেত না তার ইচ্ছা থেকে, তার চাওয়া থেকে, তার বিশ্বাস থেকে। ভালবাসতে গেলে যে মানুষকে কোথাও কোথাও সেক্রিফাইস করতে হয় তা রবি মানত না, ওকে ইমশনালি ব্ল্যাকমেলও কখনো কেউ করতে পারবে না, পারে না। শত কঠিন বাঁধা আসলেও নিজের বিশ্বাসে অটল-নির্বিকার; ওকে জীবনের কোন কিছুরই পাল্লায় ব্ল্যাকমেল করা সম্ভব না, করা যাবে না, যে নিজের ভালবাসার জন্যও সেক্রিফাইস করতে চায় না, করে না- তার বেশি আর গুরুত্বপুর্ণ কি থাকতে পারে মানুষের জীবনে, আর সেই মানুষকে কি আর সরানোর চেষ্টা করে লাভ আছে কোন? তবে এগুলো নিয়ে তো মিথির কোন সমস্যা নাই, সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়- রবি জীবনের প্রতি এতোটাই উদাসীন ছিল, সংসার পাতার ব্যাপারে তার বিন্দু মাত্র চিন্তা ছিল না। আচ্ছা বাবা ভালো তো মিথিও তাকে কম বাসেনি, ভালবেসেছে বলেই তো তাড়াতাড়ি কাছে চেয়েছে, বিয়ে করতে চেয়েছে, সংসার পাততে চেয়েছে, সারাটি জীবন আগলে ধরে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সে কি দিল তার প্রতিধান! তার মত যাযাবর-বাউন্ডুলেকে নিয়ে কেউ সংসার পাতবে- এতো তার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য, এমন অদ্ভুত মাল নিয়ে জীবন চালানোর চিন্তা করাটা কি চাট্টেখানে কথা, এটা কি আত্মঘ্যাতি নয়! তবুও সে সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে- তাকে বিয়ে করবে। কিন্তু তার জন্য যে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে সেদিকে বাবুর কোন খেয়ালই ছিল না। সারারাত বই, কবিতা, গান, আড্ডা, আরও কত কি! আর সারাদিন ঘুম পাড়ো। মা-ই বলেছিল- ঐ ছেলের কপালে খারাপি আছে, সাথে সাথে তোর কপালেও। সারাদিন মানুষ ঘুমালে কাজ-কর্ম করার সুযোগ কই? শুধু রাত জেগে বই পড়ে গেলে সংসারে ভাত-কাপড় আসবে, সংসার চলবে? তুই একে দেখ ঠিক করতে পারিশ কি-না, এভাবে চলবে না! আমরা দেখে-শুনে এমন ছন্নছাড়ার হাতে তোকে তুলে দিতে পারি না, পারব না। আর ও হবে আমাদের বড় জামাই, তোমার ছোট আরও দুইটা বোন আছে- সে জন্য সংসারের দায়িত্ব তার ঘাড়ে অনেক বেশি- এগুলোর কোন সেন্স আছে তার? দেখ বুঝিয়ে শুনিয়ে কিছু করতে পারিশ কিনা! মিথি ওকে কি ঠিক করবে, কি বুঝাবে? ও উল্টা আরও মিথিকে ওর মত ঠিক করতে চায়, বুঝাইতে চায় যে- শুধু খাওন-দাওন আর বিসর্জনই মানুষের একমাত্র কর্ম নয়, এছাড়াও বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে তার আরও বেশি কিছু করা উচিত। তার চিহ্ন এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়া উচিত, কালের বিচারে যে ক’জন মানুষকে পৃথিবী মনে রাখবে সে তাদের একজন হতে চায়। আবার বাঙালির এটাও নাকি একটা কমন সমস্যা, সব গাধা- স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে নাকি পালে পালে গাধা তৈরি করছে সার্টিফিকেট দিয়ে, কিচ্ছু বালও শিখায় না, আর তারা গিয়ে দাসত্ব করে বিদেশী কর্পোরেটদের, চাকুরী করতে করতে একসময় তোমার কিছু টাকা হবে, বউ হবে, সন্তান হবে, তারা বড় হবে, একসময় সে রিটায়ার করবে, তার কিছুদিন পর মরে যাবে- এই তো তাদের কাম, নাকি আর কিছু আছে? তাইলে এরা রাষ্ট্রের কি বালটা ছিঁড়ল? রাষ্ট্রের জন্য কি করল, কি কাজে লাগল রাষ্ট্রের? রাষ্ট্র কেন তাদের পেছনে এতো টাকা ঢালল? দালাল, দালাল তৈরি করতেছে রাষ্ট্র- এরা তৈরি হচ্ছে সম্রাজ্যবাদিদের জন্য।
মিথি এমন সব কথা চুপ করে শুনত। কিন্তু তার লাইনে গিয়ে তার সাথে তর্ক করতে পারে না- আচ্ছা, রবির সাথে লাগা কি তার কাজ! সে ছোট বেলা থেকে সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থাকে, এগুলো সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করে, মিথি কি-করে এগুলো করবে, আর এতো পড়াশুনা আর জ্ঞান দিয়েই বা তার কি হবে! আবার রবির সাথে থাকার সময় আরও কিছু সমস্যা হয়েছিল, এগুলো লোক-সমাজে সচরাচর বলাও যায় না- তারা যখন একসাথে থাকত হাজারীবাগের একটা সাবলেটে- মিথি তখন সিগারেট খাওয়া শিখেছিল- এখন অবশ্য খায় না। আচ্ছা, সিগারেট খাইতে চাইলে কি ফারদিন না করত, করত না মনেহয়। কিন্তু বিয়ের পর আর সে সিগারেট খায়নি, ইচ্ছে হয়নি, নাকি পরিবেশের সাথে যায় না বলে ভুলে গেছে, সেক্রিফাইস করেছে তা বলা কঠিন। মিথি নিজেই জানে মিথির মত মেয়েদের এই সমাজে অনেক কিছুই সেক্রিফাইস করতে হয়, অনেক কিছুই চেপে যেতে হয়, সব মেয়েদের পরিবারগুলো শুধু চাপিয়ে যেতে শিখায়, ব্যালেন্স করতে শিখায়- এমন চাপিয়ে যাওয়ার ভিড়ে অনেক ইচ্ছাই তার হারিয়ে যেত- এগুলো নিয়ে এখন যদিও অত বেশি ভুগতে হয় না তাকে। তবে মিথির সন্তানকে যে করেই হউক ভাল শিক্ষা দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে, সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ দিয়ে বড় করবে- এটাই আপাতত তার সান্ত্বনা। এগুলো অনেক পুরনো চিন্তা, কেউই জানে না, শুধু সে নিজে জানে। কিন্তু মিথি কি করে ভুলে! সে কি ভুলতে পারে, তার পক্ষে কি ভুলা সম্ভব? মিথির তো ভুলার কথা না, সে ভুলেনি, চাপিয়ে গেছে- এমন স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে থাকা এখন তার। নিজেকে মিথির অনেক বয়স্ক একজন মানুষ মনে হচ্ছে আজ। দুই বাচ্চার চিন্তায় সে চাকুরী করছে এতদিন পর। প্রথম ছেলেটা হওয়ার পর চাকরি ছেড়েছিল, আর এখন করতে হচ্ছে। আহ, বাচ্চাগুলোকে আর সময় দেয়া হবে না আগের মত!
রবি ছিল সংসার-সন্তান নিয়ে সবসময় উদাসীন, এগুলো নিয়ে আলোচনাই করতে চাইত না- সে এমন ব্যাপারে কোন গুরুত্বই দিত না, তাতে তার খুব একটা আগ্রহ নাই, সে নাকি গতানুগতিক সংসার করবে না, তার সংসারের দায় তার বউকেও সমান ভাগ নিতে হবে। সে বলে- সংসারে সমতা যদি চাও তাইলে তুমি তার দায়ভার নিবে না কেন? কিন্তু সে বুঝতে চায়না নারীর আসল সমস্যাগুলো কোথায়, কোথায় নারীর দুর্বলতা- তত্ত্ব দিয়ে সে যা বুঝতে পারে, বিচার করতে চায় তা একজন নারীর চাওয়ার সাথে মিলবে কেন? সে তো একজন পুরুষ, সে তো নারীত্ব ধারণ করেনা, নারীর মনস্তত্ত্ব ধারণ করেনা মিথির মত, এই সমাজে নারীর অবস্থান কোথায়, রাস্তার পাশে হ্যাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষের কাছে নারী যা, রবির কাছে নারী তা হবে কেন? সেও তো নারীকে ভোগের দৃষ্টিতে দেখে, তাইলে এখানে তার আদর্শ কোথায় গেল, এগুলো নিয়ে তো মিথি কখনো কোন প্রশ্ন করেনি। আর এখন তো প্রশ্ন করার সুযোগও নাই, সময় শেষ। মানুষের প্রায়শ্চিত্তের সময় কি শেষ হয়ে যায় কখনো? এমন প্রশ্নের উত্তর সে কার কাছে পাবে; পাওয়ার উপায় নাই! আচ্ছা, রবি কি বিয়ে করেছে? তাইলে বুঝত ব্যাপারটা। দেখে তো মনেহয় না, কিজানি! তাকে কি জিজ্ঞেস করা যায় বিয়ের ব্যাপারে। নাহ, থাক- এই প্রশ্ন করা যাবে না। তবে আস্তে আস্তে কথায় কথায় বের করা যায়। কিন্তু এতো কথা রবির সাথে সে বলে কি করে। তার সাথে এখন কথা বলতেই ক্যামন যেন লাগছে, ভাল লাগছে না, বিরক্ত লাগছে তার সামনে বসে থাকতেই, কথা বলবে কি করে? দেখা যাক।
মিথিকে না পাওয়ার জন্য দায়ী রবি নিজেই। এইজন্য তাকে অপরাধীর কাতারে দাড় করানো যায়- বলা যায় তার জন্যই আজ মিথির এই পরিণতি, তার উদাসীনতার জন্যই ফারদিনকে বিয়ে করতে হয়েছিল তখন। সে আর কি করে? সংসারের বড় মেয়ে, তারপর ছোট বোন দুই বছরের ছোট, তাকেও বিয়ে দেয়া দরকার, সংসারের চাপ, সবার চাপ, এতো বড় মেয়ে বিয়ে করছে না এখনো- সে তখন ইউনিভার্সিটিতে শেষ বছরে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ভার্সিটী ছাড়ার আগেই তার বিয়ে করতে হয়েছিল। সে কি করবে, কিছুই তো করার ছিল না- বাবামার বয়স হয়েছে, বাবার রিটায়ারম্যান্টের সময় হয়ে যাচ্ছিল। আর বাবা তো অসুস্থ হয়ে কয়েকবার হসপিটালেও ছিল, তাও তো ওদিকটা মেনেজ সে করে নিয়েছে মিথি। তার পরও রবি কিছুই করতে পারেনি, তার তিন টাকার পত্রিকার চাকরি ছাড়লে নাকি তার আর নিজের সৃষ্টিকর্ম করার সুযোগ থাকবে না, রাষ্ট্র উদ্ধার করার সুযোগ পাবে না, ক্যারিয়ার উচ্ছন্নে যাবে। আর তখনো নাকি তার পারিবারিকভাবে বিয়ে করার সময় হয়নি। সে অনেকবার বলেছিল সে যেভাবে থাকে তার সাথে, ভ্যাগাবন্ডের মত থেকে যেতে, ওভাবেই বিয়ে করতে, সংসার করতে। কিন্তু মিথির কি পরিবার নাই, সমাজ নাই, বন্ধু-বান্ধব নাই! সে কি অলি আহমেদ মুন্সির নাতনি নয়! যার নামে বাঘে-মোষে এক ঘাটে জল খেত- সেই পরিবারের মানুষ হয়ে মিথি কি এমন কিছু করতে পারবে? সমাজ জানতে চাইবে না তার স্বামীকে, সংসারকে! তারা কি তার সুখ দুঃখের অংশিদার না, হতে চাইতে পারে না, তারা কি মানবে? মানবে না কখনোই। না মানলে কি করতে হবে? বাবামাকে ছেড়ে চলে আসতে হবে, একেবারে। ওর সাথে নাকি ভব সাগরে ঝাঁপ দিতে হবে, জীবন যেভাবে চলে সেভাবে চলতে দিতে হবে; মগের মুলুক নাকি! যে বাবামা এতো কষ্ট করে, এতো আদর যত্ন ভালবাসা দিয়ে বড় করেছে তাদের কি কোন চাওয়া নাই! সন্তানের কাছে তারা কিছু চাইতেও পারবে না! এই প্রশ্নের একটা উত্তর রবি সবসময় খাড়া করে রাখত এভাবে- বাবামা কয়দিন, জীবনটা তো তোমাকেই বয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর বাবামাও নাকি আমাদের পেছনের দিকে টেনে ধরে রাখে, এগুতে দেয় না, তাদের নাকি স্বপ্ন ছোট, মন ছোট। তাই বলে-কি বাবামাকে ফেলে চলে আসতে হবে? না বাবা আমি তোমার মত অতটা স্বার্থপর হতে পারব না, তুমি যাও তোমার পথে। কিন্তু যেতে বললেই তাকে চলে যেতে হবে? সে কি আর চেষ্টা করবে না, তার কি কোন দায়িত্ব নাই? সে কি মিথিকে ভালবাসত না, চাইত না? চাইত তো অবশ্যই। কিন্তু এ চাওয়ার কি দাম আছে? ধরে রাখতে পারল না তাকে। হ্যাঁ, ঠিকই তো, মিথি যে নিজেকে সম্পর্ক ধরে রাখার ব্যাপারে অপরাধী করে, রবিরও তো ধরে রাখার দরকার ছিল, দায়িত্ব ছিল- সে কি করেছে? তার তো দায়িত্ব মিথির চেয়ে অনেক বেশি। আচ্ছা, এতদিন পর এসব ব্যাপারে কাউকে কি অভিযুক্ত করা যায়, সম্পর্ক কি তামাদি হয়! বাদ দেই, এ পার্ট তো চুকিয়েছে- এ নিয়ে আজ এতো চিন্তা করার দরকার কি, লাভ কি? সে তো রবির কাছে এখন কিছুই চায় না। তবুও, দরকার তো অবশ্যই আছেই- যে প্রশ্নগুলো মিথি বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, একলা বাসার বারান্দা বা খোলা জানালা থেকে যে প্রশ্নগুলোর উদ্ভব হয়েছে, স্মৃতির জমা হয়েছে দিনের পর দিন- সেগুলো করার সুযোগ হাতছাড়া করবে মিথি! আচ্ছা, আজকের পর আর কি কখনো রবির সাথে দেখা হবে? হতে পারে, মিথি বা রবি দুজনে চাইলে হবে। কিন্তু পদক্ষেপটা আসতে হবে একদিক থেকে। মিথি কি সে পদক্ষেপ নিবে? অসম্ভব, কখনোই নিবে না, রবিকে দেখেও মনেহয়ে না সে নিবে। তাইলে থাকুক- দুটো পাড় যদি এক হতে না চায়; সেতুর কি প্রয়োজন- কার যেন এ গানের লাইনটা রবির মুখেই শুনা। মিথি অনেকক্ষণ থেকে কিছু বলতে চাইছে পারছে না। তারদিকে না তাকিয়ে বলেই ফেলল,
– আপনারা মহাপুরুষ, অমরত্ব চান, বেঁচে থাকতে চান হাজার বছর। আমাদের সাথে কি আপনাদের মিলে? আমরা…
মিথি বলে যাচ্ছে, রবির ওর দিকে কোন মনোযোগ নাই। সে ভাবছে, মিথির কথাগুলো এখনো আগের মতই; একটু অভিমানি অভিমানী ভাব, ক্যামন যেন এক অভিযোগ দাড় করাতে চায় তার বিরুদ্ধে, পরাস্ত করে তার জীবনের সব দায় রবির ঘাড়ে ফেলতে চায়- এটা পুরনো। ও এখনো আগের মতই। মনের দিক থেকে খুব বেশি না হলেও দৃশ্যমান মিথির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আজ আর আগের মত ঘোমটা টেনে রাখতে চায় না, খুব সহজে আন-ইজি ফিল করে না, মাথার কাপড়ের দিকে লক্ষ্যই নাই, চুল আগের চেয়ে ছোট হয়েছে, পোশাকে ব্যাক্তিত্বের ছাপ আসছে, শরীর কিছুটা মোটাও হয়েছে- তবে খুব বেশি নয়। চোখের নীচটা কাল, মনেহয় আগের মত যেখানে-সেখানে, যখন-তখন ঘুমিয়ে পড়ে না; ঘুম কমে গেছে অবশ্যই। চেহারায় গাম্ভির্যতা বেড়েছে, এখন মনেহচ্ছে মাঝে মাঝেও হাসে না। ওর কি বাচ্চা-কাচ্ছা আছে, হয়েছে? হবে না কেন? জিজ্ঞেস করা যায়, কিন্তু কোন দিক থেকে শুরু করবে? আর ফারদিন ভাইয়ের খবর কি? তাদের সংসার ক্যামন চলছে, এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর চাই। কিন্তু তা কি ঠিক হবে! মিথি যদি ওর প্রতি আবার আকৃষ্ট হয়ে যায়, দুর্বল হয়ে যায়! তাইলে তো ফারদিন ভাই খুব কষ্ট পাবে, লোকটা অনেক ভাল ভদ্র, রবির জীবনেও ফারদিন ভাইয়ের অবদান আছে, তার সবচেয়ে দুঃসময়ে পাশে ছিল ফারদিন ভাই, তার প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞতা বোধ রবি সব সময়ই করে। ঠিক যে জন্য সে পালিয়ে চলে গেছে একসময়, তার বিয়েতেও পর্যন্ত যায়নি, সবাই গেছে, খুব মজা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু সে যায়নি। যায়নি কেন সে নিজেই জানে না। চোখের সামনে প্রেমিকা-ভালবাসার মানুষের অন্যের হাত ধ’রে চলা দেখতে ভাল লাগবে না, তাই কি? তাই নয় কি? না, তা হবে কেন? তার তো এমন হওয়ার কথা নয়। তবে ফলাফল যাই হউক, সে আসলে চেয়েছিল মিথি যাতে মানিয়ে নিতে পারে ফারদিন ভাইয়ের সাথে। আর মিথি তার জন্য নয় তা ইতোমধ্যে সে ভালোই বুঝেছে- তাই দূরে দূরে ছিল। রবি সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেলল- তোমাদের কি বাচ্ছা হয়েছে?
– ছেলের বয়স চার, মেয়ের আগামী মাসে দুই হবে।
– কংরেজুলেশন, ফারদিন ভাইয়ের খবর কি? ক্যামন আছেন উনি?
এই প্রশ্নের জবাবে মিথি থেমে যায়, চুপ হয়ে যায়, মাথা নিচু করে নেয়, তারপর মুখ তুলে দূরে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে, কোন কথা বলেনা, কি যেন চিন্তা করে। রবি উদগ্রীব হয়ে আবার জানতে চাইলে বলে,
– মনেহয় ভালোই আছে। উনি এখন আমাদের সাথে থাকেন না।
– কেন, কি হয়েছে! এখন উনি কোথায়?
– দেশের বাইরে মনেহয়, জানিনা, ওর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।
এই কথা শুনার পর রবিও মাথা নিচু করে নেয়। একি হল! ফারদিন ভাই তো ভাল মানুষই; মিথিও তো অসাধারণ মেয়ে- কোন সন্দেহ নাই। তাইলে সম্পর্ক শেষ হল কেন, ভাঙল কেন? এটা মিথিকে জিজ্ঞেস করা কি ঠিক হবে? রবি এক অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়; সে মাথা নিচু করে আছে। নাহ, তাকে এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। কিন্তু তাইলে মিথির বাচ্চাগুলোর কি হবে, কি অবস্থা ওদের, ওরা খেতে পায় তো! রবি মানসিকভাবে কিছুটা উত্তেজিত। বাচ্চাদের প্রতি খুব বেশি আগ্রহ বা আবেগ তার ছিল না; নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নও খুব বেশি দেখত না, দেখে না। সে বলে- এই পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু- এগুলোর প্রত্যেকটি আমার নয় কেন? সম্পর্ক কি শুধু রক্ত দিয়েই হয়! এগুলো যদি মানুষের সন্তান হয় তাইলে আমারও সন্তান। সেই রবি এখন শুন্যতা বোধ করে মিথির সন্তানের জন্য, না শুধু মিথির সন্তানের জন্য নয়, অনেক শিশুর কথা শুনলেই তার মানবিকতা জাগে- সে হিসেবে মিথির সন্তানের জন্যও জেগেছে, কিন্তু তা ওজনে একটু বেশি। সে উপলব্ধি করতে লাগল মিথির সন্তান্যের জন্য তার যে বোধের সৃষ্টি হয়েছে তা কোটি মানব শিশুর মত মানবিক নয়- এখানে তার আপন পিতৃত্ব জেগেছে; যাকে সে আরও কাছের বোধ করে কোটি কোটি মানব শিশু থেকে, মিথিকে এখনো তার আগের মতই আপন মনেহয়, মিথির মাঝে সে তার ছায়া দেখতে পায় এখনো আগের মতই; অনেক দিনের একটা স্থায়ী-নির্ভরশীলতা দেখতে পায়; মিথি কি এখনো আমার হতে পারে না! বাচ্চাগুলোও থাকবে তাদের সাথে, তার তো আর আলাদা করে বাচ্চা নেয়ার দরকার নাই- অনেক কাজ এগিয়ে গেল! রবির চোখে স্বপ্ন আর ধরে না; বয়ে যেতে চায় মিথির দিকে; ঠিক একজনকে পাওয়া গেছে যে সবকিছু হারিয়ে হলেও তাকে চিনবে, তার চাওয়া-পাওয়ার সবকিছুই মিথি ভাল করে জানে, তাকে আর নতুন করে জানাতে হবে না, তাদের এই সম্পর্ক কি দুই দিনের? দুই দিনের না- অনেক দিনের পুরনো। মিথির চোখে তাকালে বুঝা যায়- আজও মিথি ওকে ভালোবাসে, ফারদিন ভাইকে কি কারণে বিয়ে করেছে তা-তো রবি ভাল করেই জানে, তার জন্য তো সেও কিছুটা দায়ী। কিন্তু মিথি তার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি, নির্ভর করতে পারেনি, ভরসা করতে পারেনি- সেজন্য একটু খারাপই লাগে, রাগ হয় ওর উপর। তারপরও, সব কিছু হারানোর পর যদি সে ফিরে আসে তাইলে তাকে কি আর ফেলে দেয়া যায়, দিতে পারবে সে? তবে মিথি তো এভাবে, এতো সহজে ধরা দিবে না; ও ঝানু মাল, যদিও হাবাটে ভেসে থাকে কিন্তু ওকে বুঝানো পৃথিবীর সবেচেয়ে কঠিন কাজ- সেই কঠিন কাজ যে রবির জন্য খুবই সহজ তা উপলব্ধি করে রবি ভেতর থেকে এক ধরণের উষ্ণতা বোধ করল। তাইলে শেষ পর্যন্ত তার একটা হিল্লে হল। কিন্তু মিথির মুখের দিকে তাকালে মনে হয়না এবার ব্যাপারটা এতো সহজে মিটবে, অনিশ্চিয়তাও তৈরি হতে থাকে তার মনে। রবি প্রশ্ন করে- তাইলে বাচ্চাদের এখন কি অবস্থা, কি করবে, ভাবছ কিছু? তোমার বাবা কি বলেন?
– বাবা নাই দুই বছর থেকে, মা আমার সাথেই আছে।
মিথির বাবাও মারা গেছে, এতকিছু হয়ে গেছে, আমি কিছুই জানি না! এমন ভাবতেই ক্যামন যেন এক ধরণের অপরাধ বোধ গ্রাস করছে রবিকে। শালা আমাকে দিয়ে কিছুই হল না! ওকে ধরে রাখতে পারিনি আমি! মিথির বাবামার সাথেও তো রবির সম্পর্ক খারাপ ছিল না, অন্যভাবে যাতায়াত ছিল তাদের বাড়িতে। দূর বাল, আমি কি করবে, আমার কি করা উচিত বুঝিনা! নিজের উপর রাগ না ঝেড়ে রবি মিথির সাথে সরাসরি কথায় আসতে চায়। কিন্তু কীভাবে? মিথি যে কঠিন মানুষ, এখন চেহারায় আরও বেশি কঠিনত্ব- এটা সে ভাঙবে কি করে! আসলে কি মিথি খুব কঠিন- নাকি আমি তাকে কঠিন হতে বাধ্য করেছি, নাকি আমাদের সিস্টেম, নাকি আমাদের সমাজ! কি-জানি! এখন এগুলো ভাবার সময়, এতকিছু ভাবলে হবে না, মিথিকে আটকানোর চেষ্টা করতে হবে- দেখুক-ই-না চেষ্টা করে, তাতে এমন আর ক্ষতি কি! মিথির কাছে তার ছোট হলেই কি, আর বড় হলেই কি! আগে তার বর্তমান মানসিক অবস্থা জানতে হবে, তার কাছে আমার জায়গা কতটুকু আছে তা জানতে হবে, বুঝতে হবে। রবি ইতোমধ্যে মিথির অনেকটা কাছে চলে এসেছে তা দুজনের কেউই টের পায়নি। রবি খুব দরদ ভরে প্রশ্ন করল,
– এখন কি করবে, কি সিদ্ধান্ত নিলা?
রবির মনে কি আমার জন্য দয়া বাড়ছে, সে কি বুঝাতে চায়, আমাকে কি দয়া করতে চায়? এর দয়া আমার লাগবে না- একে সুযোগ দেয়াই ভুল হবে, মনের কাছেই আসতে দেয়া যাবে না, ওর কাছে গেলেই যেন মিথি আগুনে জ্বলে-পুড়ে-ছাই হয়ে যাবে! না, ওকে আমার হাড়ে হাড়ে চেনা আছে- আর ওদের দয়া চাইনা বলেই তো মিথি আজ স্বয়ং-সম্পুর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে, একা থাকতে চাইছে, আবার চাকরিতে জয়েন্ট করেছে- সেই তাকে কি আর ক্ষমা করা যায়; যার জন্য জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে তার; অনিশ্চিত এক জীবনে ঢেউয়ের মত ভাসতে শুরু করেছে সে। নাহ, আমার নিজেকেই নিজের বোঝা বয়ে নিয়ে যেতে হবে, আমার আর কারো সাহায্য-সহযোগিতা এমনকি সঙ্গও চাই না। সব পুরুষ এক না হলেও প্রায় একই। গোঁড়ায় ফারদিনের সাথে রবির তফাৎ অনেক হলেও পুরুষ হিসেবে তারা একই গোত্র ভুক্ত; দুজনেই সমান; দুজনেই তার প্রতিপক্ষ। আর যদি এর পরও কোন পুরুষ আসে তার জীবনে সে তো রবি বা ফারদিনের চেয়ে বেশি ভাল হওয়ারও কথা না, হতে পারে না- নাহ, সিদ্ধান্ত পাকা, মিথি আর কারো সাথে জড়াবে না, আর কোন পুরুষ-সঙ্গ আমার চাই না, আমি আমাকে নিয়ে আমার সন্তানদের নিয়ে থাকতে চাই, তাদের ভাল রাখতে চাই, সে নিজেও যে ভণ্ড পুরুষদের চেয়ে সন্তানের দেখ-ভাল ভাল করতে পারে তা দেখিয়ে দেবে, প্রমান করে দিবে সে তাদের বাবার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়- বরঞ্চ বেশিই! তাইলে রবিকে বেশি পশ্রয় দেয়ার কোন দরকার নাই- এটাই সিদ্ধান্ত। রবির প্রশ্নের তাই উত্তর,
– তা জেনে আর আপনার লাভ কি? আমার জন্য আর দয়া বা দরদ দেখাতে হবে না। আমি এখন নিজে নিজে বাঁচতে শিখেছে, চলতে শিখেছি, সংসার চালাতে শিখেছি।
– কিন্তু তোমার বাচ্চাদের কি হবে, আমি তাদের কথাই ভাবছি।
– আপনার ভাবতে হবে না, আমিই তাদের জন্য যথেষ্ট, দয়াকরে আমাকে কাছে টানার চেষ্টা করবেন না। আর সেটা করলেও ফল হবে না। আপনাদের মত পুরুষদের চেনা হয়ে গেছে।
আরে ও তো দেখি আমার বা ফারদিন ভাইয়ের জন্য পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে উঠছে, এটা তো খুবই ভয়ঙ্কর ব্যাপার। আমি কি করলাম- আমি তাকে আমার মত করে চেয়েছি, কিন্তু হয়নি, ওর পোষায়নি তাই চলে গেছে। কেউ যদি আমার সাথে থাকতে না পারে, থাকতে না চায়, যদি আমার সাথে থাকতে এতোই সমস্যা হয় কারো তাইলে আমি তাকে আটকাব কেন, আটকিয়ে লাভ কি? এখানে তো আর সমস্যাটা ভাত-কাপড়ের নয়; একজন মানুষের জিবনাচার নিয়ে, সামাজিক অবস্থা নিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ নিয়ে। আমি সেটা পারি না, করি না- তো আমার জিবনাচার তার সাথে না গেলে সে থাকবে কেন? তাই সে ফারদিন ভাইকে বিয়ে করেছে আমি কিছুই বলিনি। কিন্তু এখন যে আবার আমাকেই সব দোষ চাপাতে চায়! আমি তো কখনো তাকে বলিনি যে- ভালবাসার মানুষের সাথে থাকতে তুমি পারনি, তোমার চাহিদার সাথে তার চাহিদা না মিললে, চাওয়া পাওয়া এক না হলে, অথবা অনিশ্চিত জীবনের আসংকায় তুমি একজন বড় চাকুরী ওয়ালাকে বিয়ে করেছ, সে তোমাকে ঠকিয়েছে কি জিতিয়েছে তার দায়ভার আমার কাঁধে কেন; সম্পুর্ন পুরুষ জাতীর কাঁধে কেন? এমন প্রশ্ন তো রবি তাকে করেনি! আরও কত প্রশ্ন করা যায় তাকে, কত প্রশ্ন করা যেত, কত প্রশ্ন আছে মনে- শুধু মানুষকে আসামির কাতারে দাড় করাতে ভাল লাগত না বলে বলা হয়নি। কিন্তু এটাকে দুর্বলতা হিসেবে নিলে তো সমস্যা, একপেশে চিন্তা হলে তো আর কিছুই বলার নাই। রবি কি আর বলবে? ওর মানসিকতা ইতিবাচক না, এই মুহুর্তে এমন কোন কথা বলাটা হবে আত্মঘ্যাতি। আর রাজি হলেই বা কি, কেউ যদি কাউকে অপরাধীর কাতারে দাড় করেই কথা বলে, তাইলে তো আর তাকে বুঝানো যায় না, তার সাথে জীবন কাটানো যাবে না! রবি কিছু না ভেবেই হঠাত করে, পুরনো অভ্যাসবসত বলে উঠল,
– চা খাবে, রং চা, ওরা চা ভাল করে।
এই কথা বলার সাথে সাথে মিথির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখছে তার চোখ কি বলে? আসলে মিথির মানসিক অবস্থার কতটা পরিবর্তন হয়, বা আদও হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা দেখতে তাকে চা অফার করা। চা যে সে খাবে না তা-তো রবির জানাই। চা খাওয়া হল না। তার মনেহয় কোন কাজের কথা মনে পড়েছে- সে সব কিছু গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছে, রবি কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় মিথি দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে চোখে-চোখ রেখে বলল,
– যাই, ভাল থাকবেন। আর নিশ্চিত থাকবেন আমরাও ভাল থাকব…।
মিথি হাঁটতে শুরু করেছে সোজা রাস্তা ধরে, রবি তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটু সামনে গেলেই বলে,
– আমি ঠিক আগের মতই আছি, পাশের সিট এখনো খালি, আমার চাহিদা আগের মতই, ফুলফিল করতে পারলে মোস্ট ওয়েলকাম।
মিথি রবিকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন বোধ না করেই হেঁটে চলে গেল একই পথ ধরে। সে নাকি আজ বাঁচতে শিখেছে, একাই চলতে জানে, সংসার-সন্তান সবই চালাতে পারে। এমন ভাবতেই রবির ভালো লাগছে, মিথি এমন দৃঢ়-সংকল্পবদ্ধ, ও খোদা! পুরো জীবনের সংসারের দায়ভার সে নিজের ঘাড়ে নিয়েছে, মানুষ সবই পারে। কিন্তু সময় গেলে। সারাজীবন আমি বলেছি সংসারের দায়ভার সমান ভাগ করে নিতে তা নিতে পারল না, নিবে না। শুধু অন্যের ঘাড়ের উপর থাকবে বোঝা হয়ে, তা ঠিকই পারবে, মানুষের চিন্তা দেখো, ব্যাক্তিত্ব দেখো, হীনমানসিকতা দেখো- কি অদ্ভুত, অন্যের উপর দিয়ে চলে যেতে পারলেই খুশি। আর সেই মানুষই এখন দেখো, ঠিকই একা সব কিছুর দায়ভার নিচ্ছে, আশাকরি পারবেও। কিন্তু শুধু রবি থাকবে না সেখানে। মিথির চিন্তা- রবির কাছে তো তার জিতা হল! এই গো ধরে থাকলে তো আর কাউকে পথ দেখানো সম্ভব না। তবে সবকিছু হারিয়ে, এতো সুন্দর ভালবাসাময় পৃথিবী হারিয়ে হলেও মিথি আসল জীবনটাকে বুঝতে শিখেছে, চালাতে শিখেছে, এটাই গর্ভের কথা। তার বিদ্যা ফলতে শুরু করেছে- এই মুহুর্তে রবি পাশে থাকলে ভাল হত, ভাল লাগত রবির, মিথির জন্যও ভাল হত। কিন্তু সে কি আর সেই মিথি আছে? তার আর মিথির পাহাড় সমান বাঁধা, দূরত্ব অনেক হয়ে গেছে, সে আর আমার মিথি নাই- হার জিতের প্রশ্ন যেখানে মুখ্য সেখানে কেউ কাউকে এক বিন্দুও ছাড় দেবে কেন? আর এটা যদি প্রতিযোগিতাই হয়ে থাকে তাইলে তো ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই রবির মিথিকে আবার ভুলে যেতে হবে, আবার অপেক্ষা করতে হবে আরও কোন মিথির তৈরি হওয়ার জন্য। জীবন এ ক্যামন প্রতিযোগিতাময়, এ ক্যামন জটিলতা জীবনের, আর কত বইতে হবে এর বোঝা, আর কত অপেক্ষা মিথিদের জন্য? এমন বোঝা বইতে বইতে ঘরে ফিরে যেতে হবে খালি হাতে। আবার রাত-দিন-সকাল আসবে, আলো-আঁধারের পরিবর্তন ঘটবে, আলোর সুষম বণ্টন হবে এই পৃথিবীতে- এটাই আপাত তার চাওয়া। এমন চাওয়া নিয়ে আবার সে বাড়ির পথ ধরে ফিরে যায়- এ এক কঠিন চক্র জীবনের।
০৩/১২/১৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *