একাত্তরে যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন ছিল পুর্ব পরিকল্পিত

Image and video hosting by TinyPic

কানাডীয় রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অ্যাডাম জোনস বলেছেন যে, একাত্তরে গণ-ধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ ছিল বাঙালি নারীদের “অসম্মান” করার মাধ্যমে বাঙালি সমাজের মনোস্তাত্বিক ভাবে পতন ঘটানো এবং সেজন্য কিছু নারীকে মৃত্যু না-হওয়া পর্যন্ত ধর্ষন করা হয়।

Image and video hosting by TinyPic


Image and video hosting by TinyPic

কানাডীয় রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অ্যাডাম জোনস বলেছেন যে, একাত্তরে গণ-ধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ ছিল বাঙালি নারীদের “অসম্মান” করার মাধ্যমে বাঙালি সমাজের মনোস্তাত্বিক ভাবে পতন ঘটানো এবং সেজন্য কিছু নারীকে মৃত্যু না-হওয়া পর্যন্ত ধর্ষন করা হয়।

Image and video hosting by TinyPic

১৯৭১ সালে যে গণহত্যা চালানো হবে তা ছিল পুর্ব পরিকল্পিত। ফেব্রুয়ারীতে কনফারেন্সে তৎকালীন প্রেসিডেণ্ট ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, “ওদের তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা কর, তাহলে বাকি সবাই নতি স্বীকার করবে। (রবার্ট পেণ, ম্যাসাকার [১৯৭২], পৃষ্ঠা ৫০ )।”ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে সরাসরি বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পাকিস্তান আর্মিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যশোরে কিছু সাংবাদিকের সাথে কথা বলার সময় ইয়াহিয়া খান একদল বাঙালির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন যে, ‘আগে এদেরকে মুসলমান বানাও’। অর্থাৎ ইয়াহিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী বাঙালিরা সাচ্চা মুসলমান না। পাকিস্তান আর্মি অফিসার এবং সাধারণ সৈনিকদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে বাঙালিরা খাঁটি মুসলমান নয় এবং তারা হিন্দু ভারতের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ট। ইয়াহিয়া খানের ঐ উক্তিতে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তান আর্মি বাঙালিদেরকে মুসলমান বানানোর ধান্দায় নেমে পরে। আর এর জন্য সহজ রাস্তা ছিল বাঙালি মেয়েদেরকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে তাদেরকে দিয়ে খাটি মুসলমান বাচ্চা পয়দা করানো। ভারতীয় মেজর লক্ষণ সিং তাঁর ‘Indian Sword Strikes in East Pakistan’ বইতে পাকিস্তানি তরুণ সৈন্যদের বিকৃত ধর্ষকাম মানসিকতার কথা বলেছেন। জেনারেল নিয়াজি নামের এই জঘন্যতম লোকটির বিকৃত মানসিকতার কথা বিস্তারিত আছে হাসান আব্বাসের লেখা, Pakistan’s Drift Into Extremism: Allah, then Army, and America’s War Terror বইতে।
.
Image and video hosting by TinyPic
.
সেই বইয়ে লেখা –

জেনারেল নিয়াজি বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ আখ্যায়িত করে দম্ভোক্তি কণ্ঠে তার সেনাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “One cannot fight a war here in East Pakistan and go all the way to the Western wing to have an ejaculation!” ( পূর্ব পাকিস্তানে বীর্যপাত না করে কেউ যুদ্ধ সফল করে পাকিস্তানে ফেরত যেতে পারবে না )

.
Image and video hosting by TinyPic
.
পাকিস্তানী জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা তার লেখা A Stranger in My Own Country বইয়ে উল্লেখ করেছেন, “নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার নিজে আত্মহত্যা করেন।” ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করানোর পেছনে নিয়াজির প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিল।
.
Image and video hosting by TinyPic
.
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদের ব্যারাকে পর্ণো ছবির চালান সাপ্লাই দিয়ে সৈন্যদের তাতিয়ে রাখানোর তথ্য আছে সুসান ব্রাউনমিলারের Against Our Will: Men, Women, and Rape বইতে। এর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন ‘শিলা জেফ্রি’ তার The Industrial Vagina বইতে।
পাকিস্থানি সৈন্যদের মধ্যে ধর্ষকাম জাগিয়ে তুলতে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে যাতে তারা বেশী বেশী ধর্ষণ করতে পারে সেই কারণে বিকৃত পর্ণো ছবি ব্যারাকে দেয়া হতো। নিচের ছবিগুলো দেখুন।
আফসোস, এগুলো কোন সাধারন ফ্যান্টাসি নয়। সিলেটের শালুটিকরে পাকিস্তানী হায়েনাদের টর্চার সেলের দেয়ালে আঁকা ছিল বাঙালি মা বোনদের উপর নির্যাতনের এই ছবিগুলো।
.
Image and video hosting by TinyPic
.

Image and video hosting by TinyPic
.
“ব্রাউন মিলার তার বইয়ে আরো লিখেছেন, বাংলাদেশে ধর্ষণের কোন বাছ বিচার ছিলনা। “আট বছরের মেয়ে থেকে ৭৫ বছরের বুড়ি ॥ এমনকি কোন কোন মহিলাকে একই রাতে আশি বার পর্যন্ত ধর্ষণ করা হয়েছিল।”
.
Image and video hosting by TinyPic
.
বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলীলপত্র, ৮ম খন্ড, হাসান হাফিজুর রহমান লিখেছেন,পাকসেনারা সেইসময় রাজাকারদের সাহায্যে ঢাকার বিভিন্ন স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত এলাকা থেকে বহু বাঙালি যুবতী মেয়েদের ধরে এনে ব্যারাকে জামায়েত করে। তারপরই আরম্ভ হয়ে গেল সেইসব বাঙালি নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ।
.
Image and video hosting by TinyPic
.
কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল। সেই বইয়ে রাবেয়া খাতুন তার জবান বন্দিতে আরো উল্লেখ করেছেন,”সেনারা এই নিরীহ বাঙালি মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয়নি, আমি দেখলাম পাক সেনারা সেইসব মেয়েদের ধারালো দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। মেয়েদের স্তন, গাল, পেট , ঘাড়, বক্ষ, পিঠে ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল। যে সকল মেয়েরা ওদের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করল পাকসেনারা তাদের স্তন টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ওদের যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। এমনকি অনেক মেয়েদের ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পরতো। কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেতো, কেউ হাসতে হাসতে তাদের যৌনপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ উপভোগ করতো। কেউ ধারালো চাকু দিয়ে কোনো যুবতীর পাছার মাংস আস্তে আস্তে কেটে কেটে আনন্দ করতো। ধর্ষণ করে হত্যার পর মেয়েদের লাশ অন্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত।”
.
Image and video hosting by TinyPic
.
“অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মেয়েরা যখন একটু পানি চাইতো তখন হানাদার এবং রাজাকাররা ডাবের খোসায় প্রসাব করে সেটা খেতে দিত। তাদের পরবার জন্য কোন শাড়ি দেয়া হতো না (যদি শাড়ি পেচিয়ে আত্মহত্যা করে তাই)। গোসলের প্রয়োজন হলে তিন জন করে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয়া হতো, রাজাকার ও পাকিরা দড়ির এক প্রান্ত ধরে রেখে তাদের নিয়ে যেতে গোসলে। নিচের ছবিটি দেখুন। ১৯৭১ সালের এক বীরাঙ্গনার ছবিটি ক্যামেরাবন্দি করেন বরেণ্য আলোক চিত্র শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা নাইব উদ্দিন আহমেদ।

Image and video hosting by TinyPic
.

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার একাত্তরের দিনগুলি বইয়ে লিখেছেন, ‘একমহিলা রোগীর কাছে শুনেছিলাম তিনি নামাজ পড়ছিলেন, সেই অবস্থায় তাঁকে টেনে ধর্ষণ করা হয়। আরেক মহিলা কোরআন শরিফ পড়ছিলেন, শয়তানরা কোরআন শরিফ টান দিয়ে ফেলে তাঁকে ধর্ষণ করে।’

.
Image and video hosting by TinyPic
.
ডা. এম এ হাসান লিখিত “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে এমনই একজনের কাহিনী। একাত্তরের মে মাসে হবিগঞ্জের লস্করপুরে চা বাগান থেকে পাকি আর্মিরা যখন সুপ্রিয়া নায়েককে ধরে নিয়ে যায় তখনও তাঁর বয়স ষোলর কম। প্রথম দিন চা বাগানের এক ক্যাম্পে নিয়ে কয়েকজন পাকি আর্মি তাঁর ওপর বীভৎস যৌন নির্যাতন চালায়। সেই ছিল শুরু। তারপর পাকিরা তাঁকে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে, এক বাগান থেকে অন্য বাগানে। দিনের পর দিন ঐসব ক্যাম্পের আর্মি অফিসাররা তাঁর ওপর নির্দয় নির্যাতন চালিয়েছে। দীর্ঘ আট মাসের প্রতি রাতে চারজন পাঁচজন করে পাকি তাঁকে ধর্ষণ করেছে।
.
Image and video hosting by TinyPic
.
নির্যাতিত নারীদের নিয়ে ডাব্লিউসিএফএফসি’র গবেষণায় ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখেরও বেশি বলা হয়েছে । নির্যাতিত নারীদের মধ্যে মুসলমান: ৫৬.৫০% এবং হিন্দু: ৪১.৪৪%। খ্রিস্টান ও অন্যান্য: ২.০৬%। বিবাহিত: ৬৬.৫০% এর চেয়ে বেশি। অবিবাহিত: ৩৩.৫০% এর চেয়ে কম। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণ করার পর লেখক সাংবাদিক অমিতা মালিক বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, একজন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক বলেছে যে:.”আমরা যাচ্ছি। কিন্তু আমরা পেছনে আমাদের উত্তরসুরি রেখে যাচ্ছি”। তাহলে বুঝুন কতটা নিচু মনের বিকৃত মানুষ ছিল পাকি আর তাদের মেয়ে সাপ্লাই দেওয়া রাজাকাররা।

৬ thoughts on “একাত্তরে যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন ছিল পুর্ব পরিকল্পিত

  1. এই ধর্ষিতাদের অনেকেই যুদ্ধ
    এই ধর্ষিতাদের অনেকেই যুদ্ধ করেছেন। আমরা তো তাদের নামও মনে রাখি নাই।
    আমি আইকন হিসেবে জানি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি তাঁর ধর্ষণের কাহিনী গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন।
    সবেমাত্র রাজাকারের বিচার শুরু হয়েছে।
    কাজ আসলে এখনও অনেক বাকি।

  2. সকল রাজাকারদের কঠোর বিচার
    সকল রাজাকারদের কঠোর বিচার করতে হবে না হলে আমরা চিরকালের জন্য তাদের কাছে অপরাধি হয়ে থাকব।

  3. পাকিস্থান জানত তারাই যুদ্ধে
    পাকিস্থান জানত তারাই যুদ্ধে জিতবে ।তাই তারা অবিরাম পাকিস্থান বিরোধীদের মেরেছে ।আর ধর্ষণের মধ্যে তারা পাকিস্থান পন্থি শিশুর জন্ম দিতে চেয়েছিল ।

  4. অনেক ধন্যবাদ। আপনার দেয়া অনেক
    অনেক ধন্যবাদ। আপনার দেয়া অনেক তথ্যই আমার আজানা ছিল।
    এই বিষয়টি নিয়ে আরও বিপুল কাজের দরকার আছে। সামনে আরও পেলে ধন্য হব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *