সাহিত্যে নান্দনিকতা

দ্বাদশ এই সংখ্যাটি প্রকাশ করার মাধ্যমে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, তিন বছর পূর্ণ করল। এ-৪, ১৬ ফর্মা আকারে ছাপা এই পত্রিকাটিতে বিগত এই তিনটি বছরে কবিতাগুচ্ছ, যুগল/একক কবিতা, গল্প, অনুগল্প, সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ/নিবন্ধ, সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম সম্বলিত বই/ম্যাগ-আলোচনা, শিল্প ও সাহিত্য জগতের বিভিন্ন প্রয়াত/জীবিত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, স্মরণ শ্রদ্ধাঞ্জলী, অথবা দেশী/বিদেশী সাহিত্য ও শিল্প-কলা জগতের খবরাখবর, আলোচনা, অনুবাদ, কিস্তিতে উপন্যাস ইত্যাদী আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছি। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যজগত ও লেখকদের, বিশেষ করে তরুণ ও নবীন লেখকদের সাহিত্য কর্মের সাথে সাহিত্যের পাঠকদের মেলবন্ধন সৃষ্টি করার পাশাপাশি সুষ্ঠু, শুদ্ধ, সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ এবং মুক্তচিন্তাসম্পন্ন সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, সাহিত্যের অধিকতর তরুণ পাঠক সৃষ্টি এবং সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে শিল্প ও সাহিত্যরুচি ও রসবোধ জাগ্রত ও উন্নত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে বিগত তিন বছরে অনুপ্রাণন কতটুকু এগিয়েছে, এই বিচার অনুপ্রাণন’এর পাঠক ও সমালোচকেরাই করবেন।

যাত্রার শুরু থেকেই অনুপ্রাণন পত্রিকায় লেখা ছাপানোর জন্য আমরা অনেক তরুণ লেখকদের প্রচুর লেখা পেয়েছি। কোন কোন লেখা অনুপ্রাণন’এর সম্পাদনা পরিষদ অনুমোদন করলেও স্থানের অভাবে সেই লেখাটি হয়তো সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ছাপানো সম্ভব হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে, লেখাটির কোন কোন বাক্য অথবা সামগ্রিক গঠনপদ্ধতি অথবা ব্যাকরণ মেনে চলার ক্ষেত্রে দুর্বলতার কারনে অথবা, স্বাতন্ত্র্য, মননশীলতা, সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব ও নান্দনিকতার বিচারে লেখাটি হয়তো সম্পাদনা পরিষদের অনুমোদন পেতে অসক্ষম ছিল। লেখকের পরিচিতি অথবা সখ্যতার বিষয়টি কখনো সামনে না এনে শিল্প ও সাহিত্যমূল্যের এসব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, উপাদান ও বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টি রেখে লেখার শিল্প, শৈলী সাহিত্যমান, নান্দনিকতা অথবা বিষয়বস্তুতে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিচারে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ মনোযোগী এবং নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছে।

অনুপ্রাণন’এর তিন বছর পূর্তিতে এসে সাহিত্যকর্মের শিল্প ও সাহিত্যমান বিচারের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে প্রথমেই যে প্রশ্নটি করা যেতে পারে যে, ভাষা, বানান ও ব্যাকরণ মেনে শুদ্ধ বাক্য নির্মান না করতে পারলে সাহিত্য নির্মান দূরে থাক, সুপাঠ্য কোন লেখা সৃষ্টি কী করে সম্ভব? আমরা এমন অনেক লেখা পেয়েছি যেখানে ভাষা ও ব্যাকরণের দুর্বলতা আমাদের খুব পীড়িত করেছে। স্কুল পর্যায়েই ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বানান ও ব্যাকরণ মেনে শুদ্ধ লেখার প্রশিক্ষণটি দেয়া হয়ে থাকে তাই কেউ যদি তার ভাব, আবেগ, বোধ অথবা পর্যবেক্ষন সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চায় তবে বানান ও ব্যাকরণ শুদ্ধ বাক্য নির্মান একটি প্রাথমিক ও মৌলিক প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়েই মৌলিক এই চর্চা একজন লেখকের থাকা অবশ্যই দরকার।

দ্বিতীয়তঃ শুধুমাত্র বানান ও ব্যাকরণ মেনে লেখলেই যে লেখাটি সুপাঠ্য এবং সাহিত্য গুণ ও মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে এর কোন নিশ্চয়তা নেই। কবিতা,গল্প, প্রবন্ধ অথবা গদ্য লেখায় একটা স্বচ্ছ, গতিশীল ও সাবলীল কাঠামো নির্মান না করতে পারলে লেখাটি সুপাঠ্য ও সাহিত্যগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। এটা রপ্ত করার জন্য ভাল লেখকদের ভাল রচনাসমৃদ্ধ বইয়ের নিয়মিত পাঠ খুবই প্রয়োজনীয়। আমাদের তরুণদের মধ্যে সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম পাঠের প্রচলন এবং অভ্যাস খুব কম দেখতে পাওয়া যায়। শুধু, রচনার গঠন কাঠামো অথবা গঠনশৈলী উন্নত করার জন্য না, বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করার জন্য যেমন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শনের বিষয়ে ভাল বইয়ের নিয়মিত পাঠ অভ্যাস গড়ে তোলা নবীন অথবা প্রবীন প্রতিটি লেখকের জন্যই খুবই জরুরী। আমরা অনেক লেখা পাই যেখানে তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে বিভ্রাট, অসম্পূর্ণতা, অজ্ঞানতা ও অপরিপক্কতার ছাপ উৎকটভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তত্ত্বের ভিন্নমত অথবা সমালোচনা থাকতে পারে কিন্তু যে তথ্য ও তত্ত্বটি ঘিরে রচনাটি নির্মিত হল, রচনার সামগ্রিক অভিব্যক্তিতে নির্দিষ্ট অথবা যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বের স্বচ্ছ, সম্পূর্ণ, প্রাসঙ্গিক ও সামগ্রিক রূপের প্রকাশ ও ব্যাখ্যা ফুটে উঠা বাঞ্ছনীয়। একটি অসম্পূর্ণ অথবা অসঙ্গতিপূর্ণ ক্যানভাসে ভারসাম্যের অভাব পাঠকের চেতনার নিবিড়ে প্রত্যয়ী এবং ফলপ্রসু যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয় না।

তৃতীয়তঃ সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে একজন লেখককে প্রথমেই তার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য নির্মানের দ্বন্দ্ব বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধাপটি অতিক্রম করতে হয়। এই ধাপটি একজন সৃজনশীল লেখকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রকৃতপক্ষে একজন লেখকের শিল্প অথবা সাহিত্যকর্মের মাঝে স্বকীয় স্বাক্ষর স্থাপন না করতে পারলে সাহিত্যজগতে তার স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মিত হতে পারে না। বস্তুতঃ একজন লেখকের রচনায় তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট নির্মান না করতে পারলে সাহিত্যকর্মটি একটি প্রতিলিপি হিসাবেই গন্য হবে। তাই, বলা যেতে পারে, সাধনার এই প্রাথমিক স্তরটি অতিক্রম করতে না পারলে প্রকৃতপক্ষে একজন লেখক লেখকই হয়ে উঠতে সক্ষম হয় না। কিন্তু, সাধনার প্রথম ধাপেই কীভাবে এটা অর্জন করা সম্ভব? এটা কী আদৌ সম্ভব? মৌলিকত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য দুটি ভিন্ন বিষয়। মৌলিকত্ব হয়ত সাহিত্য সাধনার উচ্চতর স্তর বলে বিবেচিত হতে পারে কিন্তু স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা সাহিত্যসৃষ্টির প্রথম ধাপেই অর্জন করাটা জরুরী। তরুণ ও নবীন লেখকদের অবশ্যই তার লেখায় স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির এই প্রাথমিক ধাপটি অতিক্রম করতে হবে।

প্রত্যেকের জীবনে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, যাপিত জীবনের নিজ অভিজ্ঞতা প্রত্যেককেই একটি মনমুগ্ধকর ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরী করে। আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে সেই সত্তাটিকে, সেই ব্যক্তিটিকে চিনে নিয়ে সম্পূর্ণ আনন্দ ঢেলে সেই আমিকে আলিঙ্গন করে সেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের সকল উপাদান অক্ষুণ্ণ রেখেই সমাজ ও সমগ্রের অংশ হিসাবে নিজ স্থানটি যে কেউ করে নিতে পারে। কেননা বৈচিত্র্যের ভারসাম্যের উপাদান হিসাবেই সমাজ ও সমগ্রতে নিজ নিজ স্বতন্ত্র সত্তার স্থানটি সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত। শুধুমাত্র, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠাটাই এখানে বেশী জরুরী।

চতুর্থতঃ সাহিত্য রচনা কোন ঘটনা বা ইতিহাসের বর্ণনা, বয়ান, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষন অর্থাৎ সাংবাদিকতা না। শিল্প-সাহিত্য রচনা ও নির্মান গভীর চিন্তাশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ফসল। মেধার অধ্যাবসায়ী প্রয়োগের মধ্য দিয়েই একটি চিন্তাশীল অথবা মননশীল রচনা নির্মান করা সম্ভব হতে পারে। তাই ভাবতে হবে। এই ধ্যান, এই ভাবনাটা খুবই জরুরী। নিজ ভাবনার গভীরে ডুব দিয়ে চিন্তাকে জাগ্রত করতে হবে, সংগঠিত করতে হবে। আর এই ভাবনার, এই চিন্তার গভীর ক্রিয়াকর্মের প্রতিফলন থাকতে হবে রচিত পাঠ্যবস্তুর প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি বাক্যে এবং সামগ্রিক রচনায়। তবেই একটি শিল্প-সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতে পারে মননশীল এবং থাকতে পারে মেধার ছাপ। যে ছাপের প্রতিটি চিহ্ন একজন পাঠককেও নিয়ে যেতে পারে ভাবনার গভীরে। প্রশ্ন এটাই, যে লেখাটি একজন পাঠকের চিন্তা, চেতনায়, অনুভবে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে না, ভাবায় না- সেই লেখার মূল্য কতটুকু?

পঞ্চমতঃ সৃজনশীল সাহিত্য বলতে আমরা কোনটাকে বুঝি? কিছুটা স্পষ্ট করার জন্য বহুল ব্যবহৃত কুর্ট ভনেগুট’এর একটা উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। “প্রতিনিয়ত পাহাড়ের চূড়া থেকে আমাদের লাফ দিতে থাকতে হবে আর বাতাসে ভেসে নীচে নেমে আসার পথে বাতাসে ভেসে থাকার জন্য নিজেদের কল্পনার ডানাগুলোর জন্ম দিতে হবে, বিকশিত করতে হবে।” বাস্তবে আমাদের তো ডানা নেই কিন্তু বাস্তবতার গভীরে কল্পনার ডানা নিশ্চয়ই আমরা মেলে দিতে পারি। রুমী’র উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টা আরো স্পষ্ট করা যেতে পারে। রুমী বলছেন, “ অন্যদের সাথে কী ঘটেছে এই গল্প নিয়ে সন্তুষ্ট থেক না, নিজের মিথ উন্মোচিত করো’। অর্থাৎ, সৃজনশীল সাহিত্যে কল্পনার ডানা মেলে দেয়ার আভাস মেলে। কথার মধ্যে নিজের কল্পিত সত্য ও বাস্তব উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। প্রশ্ন এই যে; কী হয়েছে এটাই কী আমি বলতে চাই, অথবা কেন হয়েছে সেটাই কী আমার লেখার উদ্দেশ্য? আসলে আমরা সেটাই বলতে চেয়েছি যেটা হওয়ার ছিল আর বলতে চেয়েছি, কেন না? এই কারনে সাহিত্যকর্ম অনেকাংশেই এমন এক অভিব্যক্তি যে অভিব্যক্তিটি একান্ত ব্যক্তিগত সত্য উপলব্ধি থেকে উৎসারিত এক নতুন বাস্তবতা। অদ্বিতীয় সৃষ্টি যার সারকথা।

ষষ্ঠতঃ পদার্থবিদ্যার আলোকে বলা যেতে পারে, একটি মৌলিক পদার্থ বা বস্তু তাকেই বলা হয় যে বস্তুটির বৈশিষ্ট্য ও গুনাগুন অন্য পদার্থ ধারণ করে না। যে সাহিত্যকর্মটির গঠনশৈলীতে এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যে গঠনশৈলী সম্পূর্ণ একটি নতুন ধারার। অথবা, যে সাহিত্যকর্মটিতে এমন চিন্তা ও ভাবনার অভিব্যক্তি রয়েছে যে চিন্তা, যে ভাবনা অভূতপূর্ব। অথবা যে সাহিত্যকর্মটি এমন এক সৃষ্টি যাকে আলাদাভাবেই চেনা যায়, ছোঁয়া যায়। সেই ধারা ও ধরণের সাহিত্যকর্মকে বলা যেতে পারে মৌলিক। একটি মৌলিক সাহিত্যকর্মে গঠনশৈলী, স্বাতন্ত্র্য, মননশীলতা ও সৃজনশীলতার সব দিক দিয়ে উচ্চতর স্তরের বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। ভীড়ের মাঝে সেই বস্তুটিকে আলাদা করেই সদা চেনা যায়।

কিন্তু, সবসময়য় এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হতে হয় যে যেহেতু একজন লেখককে একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্প-সাহিত্য অথবা চিন্তধারা জগতেই বাস করতে হয় তাহলে কী করে তার পক্ষে সম্পূর্ণ একটি মৌলিক শিল্প অথবা সাহিত্য রচনা করা সম্ভব? মৌলিক রচনার জন্য অবশ্যই একজন লেখককে প্রথা ও প্রতিষ্ঠার খোলস ভেঙ্গে ফেলার দরকার পড়ে। সেটা করতে গিয়ে যেমন মুক্তচিন্তার পরিবেশ প্রয়োজন আবার সেটা করার জন্য হয়তো তার রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই তাকেই মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরির সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়। একারনে ভ্যন গগ’এর মত করে করা মৌলিক শিল্প-সাহিত্যকর্ম অনেক ক্ষেত্রে প্রথমেই জনপ্রিয় হয়না। বরঞ্চ কঠিন সমালোচনার মুখেই হয়ত সেই শিল্পী ও লেখককে পড়ে তার জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। কিন্তু, কালক্রমে সেই লেখক অথবা শিল্পী তার মৌলিক কর্মের জন্যই বিশ্বনন্দিত হয়ে ওঠে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, মুক্তচিন্তার এই চর্চাটি বজায় রেখে মৈলিকধারার শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের জন্য অনুপ্রাণন’এর ভূমিকা পালন করতে চায়।
সপ্তমতঃ একজন লেখকের জন্য তার সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে তার কর্মে নান্দনিকতার গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করার প্রয়াস গ্রহন করা। এটা কী করে সম্ভব? এটা কী কবিতার মাত্রা, ছন্দ, প্রতীক, রূপক অথবা অলঙ্কার রচনায় মননশীলতা, মৌলিকত্ব ও মুন্সিয়ানা? নান্দনিকতা কী গদ্যের গঠনরীতি অথবা গঠনকাঠামোর মার্জিত সাম্য, ভারসাম্য, সুস্থিতি অথবা জটিল অথচ সুক্ষ্ম ঐক্যতান? বলা হয়ে থাকে নান্দনিকতা যতটুকু না বস্তুতে তার থেকে অনেক বেশী উপলব্ধিতে। আর এই উপলব্ধি অথবা মূল্যায়নের দায়িত্ব যতটুকু না লেখকের উপর বর্তায় তার থেকে অনেক বেশী হয়তো বর্তায় পাঠকের উপলব্ধি ক্ষমতায় ও মূল্যায়ণে। তাই, হতে পারে সাহিত্যকর্মটি সুচারু সাজানো সমকেন্দ্রীয় কতগুলো বৃত্ত মাত্র এবং এর নান্দনিক বিমূর্ততা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সেই বৃত্তগুলোর পরিধির বাইরে। কেননা নান্দনিক উপলব্ধি একটি বিমূর্ত প্রতিক্রিয়া আর এর অবস্থান যতটুকু না বস্তুতে তার থেকে অনেক বেশী পাঠকের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি অথবা কল্পনায়।

তাই সাহিত্যের পাঠকেরা যতটা না মনোযোগী হবেন সাহিত্য রচনার গঠনরীতির সুস্থিতি অথবা সাম্যে, যতটা না খুঁজবেন লেখাটির সামগ্রিক ঐক্যতান, আন্তঃসংযোগ অথবা বিষয়বস্তুতে, এসবের থেকে অনেক বেশী হয়তো মূল্য দেবেন সার্বিক প্রতিক্রিয়ায়। কেননা শিল্প-সাহিত্যকর্ম এমনই একটি কাজ যেখানে দর্শক অথবা পাঠকের উপলব্ধিতে আসা নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ব্যপক প্রকাশই যার মুখ্য উদ্দেশ্য। শিল্প-সাহিত্যকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এই প্রত্যাশাই এটাকে ভাষা অথবা বস্তুগত অর্থে সঙ্কুচিত না করে একে নান্দনিক মূল্যায়ণের বস্তুতে পরিণত করেছে। যাহা সুন্দর তাহাই সত্য। যাহা সত্য তাহাই চিরায়ত। চিরায়ত না হয়েও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্য কালের পটে দীর্ঘতম স্থানটি করে নিতে পারে। শিল্প-সাহিত্য সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য এটাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *