পালিয়ে যাওয়া এক প্রবাসী

সময়টা খুব ভোর, রাস্তা ঘাটে লোকজন খুব একটা নেই বড় রাস্তার মোড় পেড়িয়ে কোন একটা ঔষধের দোকান খুঁজে বেড়াচ্ছি, যদিবা খোলা পাওয়া যায় | সবে মাত্র মসজিদ থেকে আজান শেষ হলো, মুসুল্লিরা তাড়াহুড়া করে দৌড়াচ্ছেন আর আমি একা একা অনেক দূর হেটে যাচ্ছি | বেশ চিন্তায় পরে গেলাম, বৌ’কে কথা দিয়ে এসেছি -“চিন্তা করোনা, বাসায় সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই যে কোনো একটা ঔষধের দোকান পেয়েই যাবো” | পেন্টের পেছনের পকেট থেকে ম্যানি ব্যাগটা বের করে পেন্টের ভেতরে সামনের দিকে আন্ডার ওয়ারের ভেতরে গুজে রাখলাম কারণ ওই একটাই, ছিনতাইকারীরা তো আর আমার শশুর বাড়ির লোক না যে আমাকে দেখলেই সালাম দিয়ে চা বিস্কুট খেতে দেবে | শুনেছি প্রবাসীরা খুব সহজে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারেনা, কোন না কোন ভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে যে লোকটি প্রবাসী আর যদি এই রাত ভোরে ধরা পরে যাই তবে ছিনতাইকারীদের জন্যে আমার অবস্থাটা হবে অনেকটা পহেলা বৈশাখের ইলিশ মাছের মত, একেবারে চেটেপুটে খাবে | এতদিন পর নিজের দেশে এসেও সব কিছুই কেমন যেন অচেনা লাগছে, সবাই মনে হয় খুব জোরে জোরে কথা বলছে, কেউ কারুর কথা মন দিয়ে শুনছে না, সবাই শুধু আমি আমি করতে ব্যাস্ত | বাসে উঠছি, ট্রেনে উঠছি, খারাপ যে লেগেছে তা বলছি না, সবাই খুবই আন্তরিক শত হলেও আমি একজন বাঙালি, আন্তরিকতা ও আথিতীয়তা আমাদের রক্তে মিশে আছে, তারপরও সবাই যেন একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে কথা বলেই চলেছে -“আরে ভাই , আমারটা আগে শোনেন” | আসলে প্রবাসে থাকতে থাকতে ভুলেই গিয়েছিলাম যে একজন অপরজনকে ধাক্কা দিয়ে কথা বলা চলে- “আরে ভাই আমারটা আগে শোনেন”, শত হলেও আমাদের মাঝে আন্তরিকতা আছে, খুব সহজে আমরা একে অপরকে বুকে টেনে নিতে অভ্যস্থ, কাজেই ধাক্কা দিয়ে কথা বলাটা আমাদের মাঝে ঠিক সেই হিসাবে অভদ্রতা বলা যায় না | কিছুদিন আগে বাসে চড়ে সাতাইশ নাম্বার থেকে মীরপুর যাচ্ছি, কিছুদুর পার হতেই ভিড়ের মাঝে বাসে একজন মেয়ে যাত্রী উঠে পরতেই সবার মাঝেই বেশ আন্তরিকতা, বাসের ছোকরাগুলো যেন ইচ্ছে করেই ওই মহিলা যাত্রীটির সাথে খুবই আন্তরিক হতে চাইছে, হঠাৎ মেয়েটি উচ্চস্বরে বলে উঠলো – “আপনাদের বাসায় কি মা বোন নেই” | আসলে ভুলটি ছিল আমার নিজের, ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমার খুবই আন্তরিক তবে বাসের ভেতরে মহিলা যাত্রীদের সাথে একটু বেশী আন্তরিক | আমি মহিলাটিকে আমারই মত একজন সাধারণ যাত্রী ভাবলেও অন্যরা হয়তো তা ভাবছে না | নিজের প্রতি খুব রাগ জন্ম নিচ্ছে, মনে হচ্ছে প্রবাসে দীর্ঘিদিন থাকতে থাকতে আমার ভেতর থেকে কি বাঙালিত্ব লোপ পাচ্ছে ? এমনতো হবার কথা ছিল না, হয়তবা হতেও পারে, অনেকটা কাকের মযূর পুচ্ছ লাগানোর মত অবস্থা | সেদিন উচ্চপদস্থ সচিব পর্যায়ের বন্ধুর সাথে শীততাপনিয়ন্ত্রিত রাতের বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, আমাদের সামনের সিটে হঠাৎ করেই এক পুরনো বন্ধুর মায়ের সাথে দেখা তিনি তার মেয়েকে নিয়ে একই বাসের যাত্রী, আমিও খালাম্মার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম, খালাম্মা’র সিট ঠিক আমার সামনে তার পাশে তার মেয়ে বসে আছে আর আমার পাশেই আমার বন্ধুটি | বাসের ভেতরে বেশ অন্ধকার তবে মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে আসা আবছা আলোতে লক্ষ্য করলাম আমার পাশে যাত্রী বন্ধুটি একটু পর পর জানালার পাশে দিয়ে সামনের সিটের দিকে হাত বাড়িয়ে কি যেন খুজচ্ছে, রাতের অন্ধকারে স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছিল না | মাঝ রাতে ফেনীতে একটা রেস্তোরার সামনে এসে বাস থামলো, আমি খালাম্মা ও তার মেয়েকে কিছু খাবারের আমন্ত্রণ জানালাম, বাসের ভেতরে আলো জ্বলে উঠতেই লক্ষ্য করলাম মেয়েটি ওরনা দিয়ে চোখ মূছছে, আমার বুঝতে আর বাকি রইলো না যে আমার পাশের বন্ধুটি রাতের অন্ধকারে সামনের সিটে হাত বাড়িয়ে বার বার কি খুজে বেড়াচ্ছিল, এই দীর্ঘ যাত্রা পথে বন্ধুটির আন্তরিকতা একজন মহিলা যাত্রীকে স্বস্থি দেয়নি |
রাস্তার মোড় পেরিয়ে বেশ কিছুটা দূর এগিয়ে আসতেই একটা ঔষধের দোকান খোলা পেতেই আমি দোকানে হুড়মুড় করে ঢুকে পরেই তাড়াহুড়া করে জিজ্ঞাস করলাম- “ভাই, আপনাদের কাছে ভলো মানের সেনিটারী টাওয়েল হবে”, বুঝতে পারিনি আমার পেছনে আরো দুজন ক্রেতা ঘাড়টা কাত করে আমার মুখের দিকে একটু ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে, নিজের উপর আবারও রাগ হলো | আসলেই কি আমার ভেতর থেকে কৃষ্টি, সংস্কৃতি সব হারিয়ে যেতে বসেছে, আমি যেন আবার কি ভুল করে বসলাম | দোকানদার খুব নিচু স্বরে কানের কাছে মাথা এনে ফিসফিস করে বললো – “আছে, তা কয় পেকেট দেবো ?” , দোকানী কানে কানে কথাটা এত আস্তে বললো যেন আমি তার দোকানে গাজা কিনতে এসেছি | দোকানী দোকানের পেছনে গিয়ে খবরের কাগজে মুড়ে একটা পলিথিনে ব্যাগে আমার হাতে একটা পেকেট গুজে দিলো, পেছনের লোক দুজন তখনো হা করে এবার আমার পেকেটের দিকে তাকিয়ে আছে | আসলে আমিই বোকা, আমার বোঝা উচিত ছিল এখানে সেনিটারী টাওয়েল কেনাটা একটা গোপনীয় কাজ, মেয়েদের ঋতুস্রাব হওয়া একটা অপরাধ | পেছনের একজন হঠাৎ এবার মুখ খুলে বলেই ফেললো -“ভাই এই সাত সকালে এইসব নাপাক জিনিস কি না কিনলেই নয়” | এবার সত্যি আমার চোখের কোণা দিয়ে দুফোটা পানি আমার হাতের উপর এসে পড়লো | লজ্জায় মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম -“ভাই ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দেবেন” | দৌড়াতে দৌড়াতে বাসায় আসতেই আমার বৌ এক গাল হেসে উত্তর দিলো, – ” ধুত্তারিকা তোমাকে এই সাত সকালে কষ্ট দিলাম, ঘুম থেকে উঠেই তোমার বোনের কাছে থেকে এক্সট্রা একটা পেকেট ছিল, নিয়ে নিয়েছি” | আমি এবার হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম,-“তুমি আমাকে মোটেও কষ্ট দাওনি, দিয়েছো আমার ভেতরের কৃষ্টিকে | আমার বৌ কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো |
==কিন্তু==

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *