ফোকলোর সম্পর্কে কিছু কথা

বিশ্বপরিক্রমায় ক্রমাগত নিত্য নতুন সংস্কৃতির উদ্ভব ও ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দৈনন্দিন বিজ্ঞানে আবিষ্কারের আলোতে আমরা দেশীয় লোকশিল্পকলাভুলতে বসেছি। লোকশিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় জানতে হলে ফোকলোরের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক অপসংস্কৃতিরবেড়াজালে আজ লোকশিল্প অসহায় প্রায়। তাই দেশীয় বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হলে ফোকলোরে পরিভ্রমণ বৈতনিক বৈকি। সেজন্য নিজস্ব জ্ঞানান্ধতা ঘুচান ও এ বিষয়ে লেখার চেষ্টা করলাম।

ফোকলোরের সজ্ঞাঃ
ফোকলোর হচ্ছে কোনো ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তথা লোকশিল্পের প্রভাব বিস্তারকারীচেতনাই হলো ফোকলোর।

বিশ্বপরিক্রমায় ক্রমাগত নিত্য নতুন সংস্কৃতির উদ্ভব ও ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দৈনন্দিন বিজ্ঞানে আবিষ্কারের আলোতে আমরা দেশীয় লোকশিল্পকলাভুলতে বসেছি। লোকশিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় জানতে হলে ফোকলোরের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক অপসংস্কৃতিরবেড়াজালে আজ লোকশিল্প অসহায় প্রায়। তাই দেশীয় বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হলে ফোকলোরে পরিভ্রমণ বৈতনিক বৈকি। সেজন্য নিজস্ব জ্ঞানান্ধতা ঘুচান ও এ বিষয়ে লেখার চেষ্টা করলাম।

ফোকলোরের সজ্ঞাঃ
ফোকলোর হচ্ছে কোনো ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তথা লোকশিল্পের প্রভাব বিস্তারকারীচেতনাই হলো ফোকলোর।
ব্যাপকার্থেবলা যায়, একটা দেশে বিভিন্ন পরিমণ্ডলে সাধারণ মানুষের সামাজিক-বসবাস, ধ্যান-ধারণার প্রকাশ, চিন্তা-চেতনা, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, উচ্ছ্বাস-আত্মরক্ষা-জীবনযুদ্ধ, বিশ্বাস-আচার-ব্যবহার, ঘর-গৃহস্থালি, জয়-পরাজয় সর্বোপরি মানুষের সামগ্রিক জীবনযাপন ও জীবনসংগ্রামের ক্রমাগত ভাবধারার মানবিক ভাবধারানুসারী সামগ্রিক প্রকাশই হলো ফোকলোর। এসব কিছুর সঙ্গে গাছের ডালপালার মত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ফোকলোরের প্রধান বস্তুগত উপাদান লোকশিল্পকলা।
অন্যভাবে বলা যায়, কৃষিজীবী ও বিচিত্র শ্রমশীল, উৎপাদনশীল এবং বিশিষ্ট নাগরিক ও খেটে-খাওয়া মানুষের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকশই হচ্ছে ফোকলোর। প্রতিটা দেশের সমগ্র ভাষাভাষী এবং বিশেষ করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদেবাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ফোকলোরের উপাদানে সমৃদ্ধ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ফোকলোরকে বাতাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। লোকশিল্পকলামানুষের মনে যেমন বাতাসের ন্যায় প্রভাবিত করে তেমনি ফোকলোর প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিক ভাবধারা সামগ্রিকভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাবিত করে। তিনি বলেছেন, ‘বাতাস যেমন আমাদের ঘিরে আছে, তেমনিআমাদেরচারপাশে ছড়িয়ে আছে ফোকলোর তথা লোকসাহিত্য।কিন্তু তার কথা আমারা মূল্যায়ন করি না। তা যেবাতাসের মতোই উদার, বাতাসের মতোই সীমাহীন।

ফোকলোরের অদিকথা
সংস্কৃতি ধারক-বাহক হিসেবে ফোকলোর অনেক প্রাচীন শিল্প। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি এ বিষয়ে ‘ব্রিটানিয়া’ নামক একটি গ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন এর নাম ছিলপপুলার এন্টিকুইটিস। পরে উনিশ শতকের মাঝামাঝি এর নাম হয় ফোকলোর। তবে বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চা ইতিহাস পুরানো হলেও এ নিয়ে পণ্ডিতমহলে বেশ মতানৈক্য রয়েছে; এই বিভ্রম যে জ্ঞানহীনতার পরিচয় তাতে কোন সন্দেহ নেই।প্রথম বিভ্রম হলো, অনেকেই বলে থাকে যে এটি বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তএকটি ডিসিপ্লিন। প্রথম দিকে যারা বাংলাদেশে ফোকলোরচর্চাকরেছিল তারা যেভাবেই হোক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মানুষ ছিলেন। এ বিষয়ে তাদের ভূমিকাকে ছোটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, অনেকের ধারণা ফোকলোর নৃতত্ত্বের একটি প্রাচীন শাখা। এ ধারনার যারা করে থাকেন এর চেয়ে বড় অজ্ঞতা আর হতে পারে না। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানেরসাথে ফোকলোরের মিল অনেক থাকলেও দুটিই ডিফারেন্ট ঐতিহ্য বহন করে। আর এদের ডিসিপ্লিনেরএপ্রোচ আলাদা। এবং এমনকি নৃতত্ত্ব বিষয় হিসেবে পঠিত হবার কয়েকশ’ বছর আগে ফোকলোর বিষয় হিসেবে ইংল্যান্ডে চর্চা চালু ছিল। ই বি টাইলর যিনি নৃবিজ্ঞানেরপ্রধান পণ্ডিত তিনি ফোকলোর নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছিলেন এবং সফলভাবে তিনি ফোকলোর বিষয়কে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। আর বলাই বাহুল্য যে ওই সময় ডিসিপ্লিন হিসেবে নৃবিজ্ঞানেরজন্মই হয়নি।

দেশে ফোকলোর চর্চার অন্তরায় ও উত্তরণের পথঃ

তবে দুর্ভাগ্যজনকহলেও সত্য যে বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চা, দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং সম্ভবনা নিয়ে যারা (ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লা, আশুতোষ ভট্টাচার্য, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনপ্রমুখ) সুপারিশ করেছিল কিন্তু তৎকালীন দেশের মাথারা এতে গুরুত্ব দেননি। তাই আজ আমাদের দেশে অপসংস্কৃতি ছেয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা ফোকলোর চর্চার সম্ভাবনা জাগিয়েছে, সেটাই আজও আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছে। যদিও তা সব সময় সঠিক পথে চলেছিল এমন বলা যাবে না। মিশনারীরা এদেশে প্রথম ফোকলোরচর্চাশুরু করে, তারা ভারতে লৌকিক সাহিত্য সংগ্রহ ও সম্পাদনায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এছাড়া আমাদের লোকশিল্পের যারা অসাম্য অবদান রাখেন, তারা রবীন্দ্রনাথঠাকুর, আশুতোষ ভট্টাচার্য, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনপ্রমুখ ব্যক্তিরা বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহে মৌলিক অবদান রেখেছিলেন। ষাটের দশকে ড.আশরাফ সিদ্দিক ও ড. মযহারুল ইসলাম আমেরিকা ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর গবেষণা করেন। তাদের বিষয় ছিল উপমহাদেশের লোকগল্পের ইতিহাস। সত্যি কথা বলতে ইউরোপ ও আমেরিকা বা কানাডাতে ফোকলোর যেভাবে চর্চা হয়েছে বা হচ্ছে সেই ধরণের বা মাপের চর্চা আমাদের দেশে কখনোই হয়নি। যার ফলপ্রসূ আমাদের দেশের লোকশিল্প সেইভাবে বিশ্বেদরবারে প্রসার ঘটেনি। উদার-জ্ঞানতত্ত্ব ও মানবিকতার জয়গানের মাধ্যমে এ দেশের লোক-কবিগণ ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তির সাধনায় মানবতার পক্ষে গান গেয়েছেন: ‘যারযার ধর্ম সেই করে তোমার বলা অকারণ’ (লালন), ‘মানুষছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি_মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ (লালন)। ফোকলোর দর্শনে তা থেকে উত্তরণের উপায় রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনায়দেখা যায়, হাজার বছরের এ দেশে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমান রাজাদের রাজনৈতিক আদর্শ কেবল ফোকলোর চর্চার মধ্য দিয়ে একটি অভিন্ন মানবিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা সম্ভব। বাংলার হাজার বছরের শাসনকালের মধ্যে নানা অহিংসা-মানবপ্রেম ও মানবতাবাদেরউপাদান রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের সর্বত্র মূল্যবোধের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ ফোকলোরের প্রতি অবহেলা। বৃহত্তর পরিসরে ফোকলোর চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। অধিকন্তু বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদনের মূলশক্তি কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী ও আদিবাসীদের রয়েছে বৈচিত্র্যময়ফোকলোর বা লোকসংস্কৃতি। যে সংস্কৃতির ভেতরে এ জাতিরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যময়ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে। তাই বহির্বিশ্বে ও বাংলাদেশের পরিচিতির ক্ষেত্রে ফোকলোর চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

উপসংহারদেশের শিক্ষার সর্বস্তরে ফোকলোর চর্চা দেশে অরাজকতা, ধর্মান্ধতা ও বিদ্যমান মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র ও কৌশলরূপে গণ্য হবে। জাতীয় সংকট উত্তরণে ফোকলোরের ভূমিকা সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং কূপমণ্ডূকতাহচ্ছে জাতীয় উন্নতির অন্যতম অন্তরায়। একইভাবে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক সংকট বিদ্যমান। ব্যাপকভাবে ফোকলোর চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রএসব সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র
http://www.Wikipedia.com/লোকশিল্পউপমহাদেশের লোকগল্পের ইতিহাস- ড. আশরাফ সিদ্দিকhttp://www.banglapedia.comড. আবদুল ওয়াহাব : পরিচালক, পাঠ্যপুস্তকবিভাগ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *