দর্শক টিকিট আছে তো হাতে!

শুরু হয়ে গেল শেক্সপীয়ারের আরেকটি মঞ্চায়ন। না, গ্যালারীতে কোনো দর্শক নেই। দর্শকই হয়ে ওঠেন পাকা অভিনেতা । মঞ্চের কানায় কানায়, এমনকি উইংসে অভিনেতা অভিনেত্রী টইটুম্বুর! হট্টগোল বেঁধে যায় কখন সখনো। আসলে এটা ও অভিনয়ের অংশবিশেষ। গান বাজনা, নৃত্যশৈলী, টান টান উত্তেজনায় ভরপুর। দর্শক ইতোমধ্যে ভুলে বসে আছেন টিকিট কেটেছেন নির্দিষ্ট সময়সীমায় পরাবাস্তব নাটক দেখবার জন্য। কিন্তু হায়! অদ্ভুত এ মঞ্চে তিনি নিজেই নাটকের কুশীলব হয়ে ওঠেন নিজেরি অজান্তে। অভিনয়ে মন্দ নয় কেউ। তবে হেরফের হয়ে যায় যখন ভুলে মনে পড়ে যায় তিনি একজন দর্শক বৈ আর কিছু নন! শুরু হয়ে যায় কলহ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মান-অভিমান, প্রেম-বিরহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ । আলো আর কালো যজ্ঞ। হ্যাঁ, এই মাত্র আড়মোড়া ভেঙ্গে ঈশ্বর সমতুল্য সূর্যদেব এপাশে ঘার ঘুড়িয়ে তীব্র আলোর ঝলকানিতে ভাসিয়ে দিলেন মঞ্চ। নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা, অনাড়ম্বর আবেগহীন বুড়ো চৌকিদার যেন। শুরু হয়ে গেল ঝিম মেরে থাকা কুশীলবদের দৌড়-ঝাঁপ, নাচন-কুন্দন। পড়িমরি করে কে কাকে ছেড়ে যাবেন এগিয়ে তার ই মহড়া। ভুলে যান কে কোথায় ছিলেন, কোত্থেকে এসছেন, কোথায় যেন গন্তব্য! না, এসব বুজরুকী ভাববার সময় পরে ঢের পাওয়া যাবে। এখন যুদ্ধ; কেবলই যুদ্ধ। বস্তুগত বিদ্যার ঝোলা কাঁধে নিয়ে ফেরি করে বেড়ানো ;পাছে কিছু সোনার মোহরের দেখা মেলে। তার পরেইতো স্বর্গ! যেখানে শ্বপ্ন আর পরাবাস্তব এক হয়ে ধরা দেবে। রুপার, সোনার মোহর গুলি সেজন্যই। এখানে স্বপ্ন কেনা বেচা হয় ধাতব আধুলীতে। কে কাকে এমনিতে ধরা দেবে বলুন! প্রথা বিরোধী হবার দুস্বাহস কজন বোকার আছে। ব্যাটা অভিনয়ই জানেনা তার আবার প্রথাবিরোধী তত্ত্বকথার ঝুলি! ও হ্যাঁ, চলছে অভিনয়, নাটকের দুর্দান্ত গতিপ্রকৃতি। কোন কোনো দর্শকের ভুলে মনে পড়ে যদি যায় সে ও অভিনয় করছে পাকাদস্তুর। ব্যস হয়ে যায় গণ্ডগোল, নয়তো মঞ্চচ্যুত তক্ষুনি। বুড়ো চৌকিদারের আলো নিভে আসে কখনো মনভুলে। ও না, চৌকিদারের মন নেই। নিয়ম মেনেই আলোর ঝলকানি কমে আসে মাঝে সাঝে বিষণ্ণ বেহাগ রাগে। নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি তানপুরা হাতে। মঞ্চ স্থির হয়, কুশীলবরা ফিরে যায় যে যার স্থানে। হয়ে যায় সত্যিকারে দর্শক আপনভুলে। বৃষ্টি যেন সবার বাষ্পরুদ্ধ আবেগ হয়ে ঝড়ে পড়ে। দর্শক হারিয়ে যায় পার্থিব পৃথিবী ছেড়ে অন্য এক ভুবনে যেখানে নেই কোনো মঞ্চসজ্জা, কৃত্তিম আলোকসজ্জা, কুশীলব পাকাদস্তুর দর্শক। তানপুরার সুরে ঝমঝম বৃষ্টির সাথে মনে পড়ে যায় স্বপ্নের হাতছানি, না পাওয়ার বেদনা, আশাভঙ্গ, ভুল বোঝাবুঝির অমোঘ সত্য। মনে পড়ে যায় সব স্বপ্ন পূরণ হবার নয়, সব কি থাকে সাধ্যে! পরাবাস্তব পৃথিবীতে দর্শক হয়ে যান স্যুরিয়ালিস্ট জীবনানন্দ। মিথ্যার বেসাতিতে গড়া পৃথিবী আষ্টেপ্রিষ্টে বাঁধা থাকে বুঁদ হয়ে থাকা স্বপ্নগুলোয়। কেবল তানপুরা হাতে অমোঘ সত্য হয়ে ঝড়ে পড়ে মেঘবৃষ্টি যেন মিথ্যার বেসাতিতে ভরা রঙ্গমঞ্চ ধুয়ে মুছে দেয় ক্লান্ত –শ্রান্ত কলা কুশলীদের আবেগরুদ্ধ নিভৃত মন। মঞ্চযজ্ঞ শেষ হয় এবং বুড়ো চৌকিদার আড়মোড়া ভেঙ্গে প্রস্তুতি নেয় অন্যপাশের মঞ্চে ঘাড় ঘুরাবার। মঞ্চ প্রস্তুত! শুরু হোয়ে যাবে আরেকটি শেক্সপীয়ার মঞ্চায়ন একটু পরেই। দর্শক টিকিট আছে তো হাতে! ! “টু বি অর নট টুবি দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন “

২ thoughts on “দর্শক টিকিট আছে তো হাতে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *