হাফপ্যান্ট


নির্জন নিস্তব্ধ নদীতীর। নিঃশ্বব্দে বয়ে চলছে ব্রহ্মপূত্র। মেঘের ঘোমটা সরিয়ে আকাশে উঁকি দিচ্ছে জোৎস্নারানী। কংক্রিটের বেঞ্চে বসে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ এক তরুণ সুমধুর কন্ঠে গেয়ে চলছে “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে”। পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় সেই সুরের মায়াজালে আবিষ্ট হয়ে আছেন স্যার। চোখ বন্ধ করে গাইছে তরুণটি। স্যার তাকিয়ে আছেন নিস্তরঙ্গ ব্রহ্মপূত্রের দিকে। ছেলেমানুষের মত তিনি এখন ভাবছেন এত সুন্দর গান কিভাবে মানুষ লিখে ? সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন তিনি এই শহরটিতে। উঠেছেন একটি সরকারী রেস্ট হাউজে। কারন বেশিদিন থাকা হবে না এখানে। মানুষের সাথে কথা বলতে, মিশতে কোন কার্পন্য নেই তার। তাই অল্পদিনে এই শহরে স্যারের অনুরাগীও কম নয়। এখানে আসার পরপরই তিনি আবিস্কার করেছেন রেস্টহাউজের পাশেই রয়েছে “আলেকজান্দ্রিয়া ক্যাসেল।” লোকে বলে “লোহার কুঠি।” রবীন্দ্রনাথ যেবার ময়মনসিংহে আসেন তিনি




নির্জন নিস্তব্ধ নদীতীর। নিঃশ্বব্দে বয়ে চলছে ব্রহ্মপূত্র। মেঘের ঘোমটা সরিয়ে আকাশে উঁকি দিচ্ছে জোৎস্নারানী। কংক্রিটের বেঞ্চে বসে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ এক তরুণ সুমধুর কন্ঠে গেয়ে চলছে “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে”। পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় সেই সুরের মায়াজালে আবিষ্ট হয়ে আছেন স্যার। চোখ বন্ধ করে গাইছে তরুণটি। স্যার তাকিয়ে আছেন নিস্তরঙ্গ ব্রহ্মপূত্রের দিকে। ছেলেমানুষের মত তিনি এখন ভাবছেন এত সুন্দর গান কিভাবে মানুষ লিখে ? সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন তিনি এই শহরটিতে। উঠেছেন একটি সরকারী রেস্ট হাউজে। কারন বেশিদিন থাকা হবে না এখানে। মানুষের সাথে কথা বলতে, মিশতে কোন কার্পন্য নেই তার। তাই অল্পদিনে এই শহরে স্যারের অনুরাগীও কম নয়। এখানে আসার পরপরই তিনি আবিস্কার করেছেন রেস্টহাউজের পাশেই রয়েছে “আলেকজান্দ্রিয়া ক্যাসেল।” লোকে বলে “লোহার কুঠি।” রবীন্দ্রনাথ যেবার ময়মনসিংহে আসেন তিনি এই ভবনেই ছিলেন। সেই সাথে আবিস্কার করেন পাশের বয়োঃবৃদ্ধ বটবৃক্ষটি। ইতিহাস বলে, এই বটবৃক্ষের তলায় রবীন্দ্রনাথ বসতেন। এই বটবৃক্ষের নিচে বসেই ভাবনার রংতুলি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ হয়তো মনস্পটে এঁকেছিলেন অসাধারণ কোন সৃষ্টিকর্ম । কেউ সেটা জানে না। অনুসন্ধানী মন তবু খুঁজে ফেরে বাঙ্গালীর শেকড়কে। রবীন্দ্রনাথ যখন এই বটমূলে বসে আবৃত্তি করতেন তখন নিশ্চয় পরম সৌভাগ্যবানেরা হৃদয়ভরে পান করত সেই অমৃতসুধা। স্যার খেয়াল করে দেখলেন কি অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে বাঁধানো বটবৃক্ষটি। বাংলা সাহিত্যকে যিনি বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন সেই বিশ্বকবির স্মৃতিচিহ্ন বলতে কিছুই নেই জায়গাটিতে। কি দূর্ভাগা জাতি। নিজের অস্তিত্বকে, নিজের শেকড়কে এরা কি অবলীলায় ধ্বংস করতে পারে !

গান থেমে গেল। ধীরে ধীরে আরও প্রবল হচ্ছে জোৎ¯œা। কোথায় যেন একটা পাখি ডাকছে করুণ স্বরে। নিত্য অভিসারে বেড়িয়ে পড়েছে নিশীথিনী। চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠছে তার চকমকি ওড়না। কান পাতলে শোনা যাচ্ছে চুড়ির মৃদু নিক্কনধ্বনি। স্যারের চোখে জল। কেন জানি এই গানটি শুনলে তার চোখে জল চলে আসে। তিনি তরুণটির হাত ধরে বললেন “তুই কার কাছে গান শিখেছিস সুমন্ত ?”
-স্যার আমি কোথাও গান শিখিনি।
-তবে এত সুন্দর করে কিভাবে গাইলি রে ?
-জানিনা স্যার, রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার কাছে খুব ভাল লাগে। আমি সবসময় রবীন্দ্রনাথে মগ্ন থাকি।
-তুই কতটুকু জানিস রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ?
-স্যার তেমন কিছুই জানি না। আসলে আমার কঠিন কঠিন বই পড়তে ভাল লাগেনা। যেসব বইয়ে রবীন্দ্রনাথকে কাঁটাছেড়া করে যুক্তিতর্কের ঝড় বয়ে যায় সেগুলো আমার বোধগম্য হয়না। রবীন্দ্রনাথকে আমি খুঁজে পাই তার গানের মাঝে। যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি তখন আমি যেন রবীন্দ্রনাথকে অনুভব করি। আমার কাছে স্যার রবীন্দ্রনাথ বলতে এটুকুই।
-রবীন্দ্র্রনাথ এতটুকু নয় রে। রবীন্দ্রনাথ বিশাল, রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের দিগন্তরেখা; যাকে কখনো ছোঁয়া যায়না, অথচ মনে হয় কত না কাছে। যখন প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথের গান শুনি তখন মানুষকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে। যারা আমার সাথে অন্যায় করেছে ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে তাদের। মানুষকে জাদু করার ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের মত আর কারো আছে বলে আমার মনে হয়না। যে প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ শুনবে সে মানুষকে ভালবাসতে বাধ্য। সে ভালবাসায় কোন প্রতারণা নেই, কোন লোলুপতা নেই, শুধু আছে নীরব ধরণীকে আলোকিত করে রাখা নির্মল জোৎ¯œা, কিংবা শ্রাবণের কোন দুপুরে টিনের চালে বৃষ্টির রিমিঝিম নুপুরের ধ্বনি। লালপেড়ে সাদা শাড়ি পড়া আমার প্রিয়তমার ছবি। যাকে হৃদয়ের সবটুকু উজার করে ভালবাসা যায়। যার কোমল হাতটি ধরে হারিয়ে যেতে পারি জীবনের তরে।
-স্যার আপনার কথাগুলো শুনলে মনে হয় এ যেন কবিতা। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত কর্কশতার মাঝে নীরব মধুবর্ষণ।
-আর তোর কন্ঠে যে আমি খুঁজে পাই আমার সোনার বাংলাকে। খুঁজে পাই বাংলা সাহিত্যের অধীশ্বর রবীন্দ্রনাথের অপূর্ব সৃষ্টিকর্ম। রবীন্দ্রনাথের মত এত জীবনমুখী স্রষ্টা আর কেউ আছে বলে মনে হয়না । তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই ।
-স্যার আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি অধ্যায়। আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে শান্ত সমূদ্রের বুকে শীতল বাতাস, কিংবা হেমন্তের কোন এক মৃদু কুয়াশাভেজা লাজরাঙ্গা ভোর। স্যার আমি বাঙ্গালী হয়ে জন্ম নিয়ে খুব ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে; নইলে হয়তো রবীন্দ্রনাথকে এত কাছে পেতাম না।
-আর আমি ভাগ্যবান তোকে পেয়ে। বল তো সুমন্ত, আমাকে তোর কি মনে হয় ? বাবা ? বন্ধু ? নাকি সহযোদ্ধা ?
-স্যার আপনাকে আমার বাবার মত মনে হয় ।
-তোর বাবাকে এভাবে গান শোনাস ?
-সুযোগ হয়নি স্যার। আমি ছোট থাকতেই বাবা গত হয়েছেন।
-ওফ ! স্যরি সুমন্ত, ভেরি স্যরি।
-চলুন স্যার এবার যাই।
-হ্যাঁ চল যাই। তুই আমাকে প্রতিদিন গান শোনাবি বল?
-আমি তো বেশি গান জানি না স্যার। আমি শুধু আমার জন্যই গান করি। বাথরুম সিঙ্গার বলতে পারেন। অন্যকে শোনানোর সামর্থ্য নেই।
-শিল্পের জগতে এমন অনেক লোক আছে যারা অনেক বিজ্ঞ, শাস্ত্রীয় পন্ডিত। কিন্তু তারা মানুষের কাছে পৌছতে পারেনা। কেন জানিস ?
-না স্যার।
-কারন তাদের শিল্পকর্মকে মানুষ নিজের মনে করে না। গ্রহণ করতে পারেনা। তাই তারা গণমানুষ থেকে অনেক দূরে। শোন সুমন্ত, সংস্কৃতি হতে হবে মানুষের জন্য। নইলে সেই সংস্কৃতি মূল্যহীন।
-ঠিক স্যার। এজন্যই আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
-সাংস্কৃতিক আন্দোলন…। বল তো সুমন্ত কেন করিস এই আন্দোলন?
-স্যার সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের জন্য। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য।
– মানুষ ? মানুষ কারা ?
-নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ। শোষিত বঞ্চিত মানুষ।
স্যার হেসে ফেলেন। বলেন “সুমন্ত আমার নিবাস এসে গেছে। তুই সোজা বাসায় চলে যা। কোথাও আড্ডা দিবি না। অনেক রাত হয়েছে।”
-শুভরাত্রি স্যার।
-শুভরাত্রি।
স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুমন্ত হাঁটতে থাকে রাস্তায়। আজ সত্যিই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করছে না। স্যার কেন ওভাবে হাসলেন ? তার উত্তরটি কি সঠিক হয়নি ? স্যারকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন আমরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করি। এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে সুমন্ত হাঁটছে নিয়ন আলোয় আলোকিত পথে। যেখানে জোৎ¯œার আলো নেই। প্রযুক্তির কাছে ম্লান হয়ে গেছে প্রকৃতি। মাঝে মধ্যে দু-একটা রিকশার আনাগোনা। রাস্তার মোড়ে একটানা চিৎকার করে চলছে এক মাতাল। কয়েকজন রিকশাওয়ালা এবং গার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। আছে ছিনতাইকারীর ভয়। একটি পুলিশের গাড়ি বিকট শব্দে বেড়িয়ে গেল। সব মিলিয়ে একটি ভুতুরে বিভীষিকাময় পরিবেশ। কেউ ঘর থেকে বের হয় না। ছিনতাইকারীর চাইতেও বড় ভয় পুলিশের। অযথা হয়রানির জন্য পুলিশের তুলনা নেই। সুমন্ত মানিব্যাগ বের করে। মানিব্যাগের ভাজে চ্যাপ্টা হয়ে থাকা একটি সিগারেট বের করে সেটাকে গোল করতে থাকে। গোল করা শেষ হলে লাইটার বের করে সিগারেটটি ধরায়। সিগারেট খাওয়াটা ওর কাছে ফ্যাশন। তেমনি একটি ফ্যাশন হল তার পরনে থাকা থ্রি কোয়ার্টার প্যন্টটি। স্যার প্রায়দিনই ওকে বলেন “সুমন্ত তোর হাফপ্যান্ট কি আর ফুলপ্যান্ট হবে না?” সুমন্ত হেসে বলে “স্যার আমি বড় হলেই আামার হাফপ্যান্ট বড় হবে।” স্যার উদাস চোখে বলতেন “ সুমন্ত, তুই কবে বড় হবি ?”
আবছা অন্ধকার ফুঁড়ে একটি মানুষ পথ আগলে দাঁড়ায় অন্যমনস্ক সুমন্তর।
-ভাইজান আগুনটা একটু দিবেন ?
সুমন্ত আগন্তুকের আসল উদ্দেশ্য অনুমান করে। ছেলেটা তাদের বয়সীই, নেশাগ্রস্ত। তার দেহ এমনভাবে টলছে যে সামান্য একটা আঘাত করলেই পড়ে যাবে। এই ছেলে ছিনতাই করতে এসেছে দেখে সুমন্তর হাসি পেল। সে কঠিন গলায় বলল
-ঐ, সামনে থিক্যা সর। নইলে তোর কপালে দুঃখ আছে!
সুমন্তর ধমক আর আঞ্চলিক ভাষা শুনে ছিনতাইকারীটা বোধহয় উপলব্ধি করল যে কেটে পড়াই উত্তম। সে দূর্বোধ্য কিছু শব্দ করে সামনে থেকে সরে যায়। সুমন্ত এগিয়ে যেতে লাগল। তার বাসার সামনের রাস্তাটিতে সেই পাগলীটা এখনও একা একা গালি দিয়ে চলছে। প্রতিটি পাগলের সাধারণত নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। এই পাগলীটার বৈশিষ্ট্য হল সে সারাক্ষণ একা একা ঝগড়া করে। সেই ঝগড়া কখনই থামে না। এই গভীর রাতেও চলছে সেই ঝগড়া। তবে একা একা ঝগড়া করা পাগলীটার বর্তমান সংস্কৃতি। কিংবা নেশা করে ছিনতাই করা সেই ছিনতাইকারী ছেলেটার সংস্কৃতি। তাদের পূর্বজীবন নিশ্চয় এমন ছিল না। পরিবার ছিল, বাবা-মা ছিল, প্রিয় মানুষ ছিল। এখন কিছুই নেই। ওদের নিকট সুস্থ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্যই তো সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এতে তো কোন সন্দেহ নেই। তবে স্যার হাসলেন কেন ? কোথাও কি ঘাটতি রয়ে গেছে ? আচ্ছা, পাগলের কি কোন সংস্কৃতি থাকতে পারে ? এমন অসংখ্য ভাবনা ভাবতে ভাবতে সুমন্ত বাসায় ঢুকে যায়। ওর মা ঘুমিয়ে গেছে। সুমন্ত জন্য টেবিলে খাবার ঢেকে রাখা আছে। খেতে খেতে সুমন্তর মনে হয় আগামীকাল সকালে তো মিছিল আছে। এমনিতেই সে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে দুপুর পর্যন্ত ঘুমায়। কিন্তু মিছিল মিস করেনা। রাত না জেগে তাই লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। তার মাথার পাশে মৃদুস্বরে বাজতে থাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত।


স্যার খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেন। মেপে মেপে দুই গ্লাস পানি পান করেন। তারপর ট্রাউজার ও টি-শার্ট পরিধান করে বের হন হাঁটতে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা একেবারে কাবু করে দিয়েছে তাকে। তবু তার অসম্ভব প্রাণশক্তিতে অবাক হয় সবাই। সকালের এই হন্টনকর্ম চলে অনেক জায়গাজুড়ে থাকা নদীতীরের সেই পার্কটিতে। স্যার সেই বেঞ্চটির কাছে এসে থামেন। তখন সবে সূর্যদেব উঠি উঠি করছে। শারদ প্রভাতের মৃদু হাওয়া বইছে। স্যারের কানে বাজতে থাকে সুমন্তর অসাধারণ গলার গান। স্যারের মনে হতে থাকে ছেলেটি যা করছে পুরোপুরি বুঝে করছে না। ওকে বোঝাতে হবে। নয়তো কোন এক সময়ে পথ হারিয়ে থেমে যাবে ওর পথচলা। একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে স্যার আবার হাঁটতে থাকেন। হঠাৎ “স্যার” বলে কেউ ডেকে উঠে দুর থেকে। স্যার সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পান তারই এক সহকর্মীকে। এই কয়েকদিনে বেশ কিছু মজার বিষয় খুঁজে পেয়েছেন তিনি। পার্কে তার মত আরো অনেকেই আসে সকালের হন্টনকর্মে। এর মাঝে ছোট ছোট কিছু সংগঠনও আছে। যারা একত্রে নির্দিষ্ট নিয়মে সকালের ব্যায়ামকার্য সম্পাদন করে। গতকাল তিনি এক উদ্ভট সংগঠনের খোঁজ পেয়েছেন। এই সংগঠনের সদস্যদের প্রায় প্রত্যেকেই বৃদ্ধ। এমনকি দশ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিও আছে। প্রত্যেকেই ডায়াবেটিস আক্রান্ত। সংগঠনটির নাম হল “বউভীতি সমিতি” ! বাসায় বউয়ের কড়াকড়িতে অস্থির হয়ে তারা পার্কে এসে হাঁটার নামে আড্ডা দিতে থাকে। অসুস্থতার কারনে ডাক্তার কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া কিছু খাদ্যদ্রব্য তারা নিয়মিত গ্রহণ করে। স্যারের সহকর্মীটিও সেই সংগঠনের একজন “গর্বিত” সদস্য ! তিনি স্যারকে “বউভীতি সমিতির” উপদেষ্টা হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্যার হাসতে হাসতে তা প্রত্যাখান করে বলেছিলেন “আমার খুব সুন্দর এবং সুখী একটা পরিবার রয়েছে যেখানে “বউভীতি” কিংবা “বরভীতি” -র কোন স্থান নেই।” স্যার হাত তুলে সালাম দিয়ে আবার হাঁটতে থাকেন। গতকাল সুমন্তকে যখন এই গল্প বলছিলেন তখন হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়েছিল সুমন্ত। বলেছিল “স্যার, আমি কোন একদিন সকালে উঠবই উঠব। তারপর পার্কে গিয়ে সেই বৃদ্ধদের সাথে কথা বলব।” স্যার বলেন “সুমন্ত তুই আর কথা বলিস না। তোর মত অপদার্থ সকালে ঘুম থেকে উঠবে এটা আমায় বিশ্বাস করতে বলিস?” সুমন্ত বলল “ স্যার আপনি শুধু একদিন ভোরের ট্রেনে বাড়ি যান, তখন দেখবেন আমি উঠতে পারি কিনা ?” প্রতি সপ্তাহে স্যার বাড়ি যান ট্রেনে চড়ে। বিদায়বেলায় তার নিয়মিত সঙ্গী হয় সুমন্ত। রিকশায় বসে একদিন সুমন্ত বলছিল – স্যার, আপনি যেদিন ময়মনসিংহ ছেড়ে যান, সেদিন আকাশ কাঁদে। দেখুন না স্যার আজও বৃষ্টি হচ্ছে। স্যার বলেছিলেন – এমন করে বলিস না সুমন্ত, এমনিতেই শহরটার প্রতি মায়া পড়ে গেছে। আমি যতবার বদলি হয়ে কোথাও গিয়েছি সেখানেই কিছু মানুষের সাথে জড়িয়ে গেছি মায়ায়। তারপর বাড়ি ফিরলে আমার মেয়ে বলত “বাবা, তোমার যা ঢং !! প্রতিবার বদলি হয়ে আসলেই মন খারাপ করে গালে হাত দিয়ে বসে থাক।” সুমন্ত হাসতে থাকে। হাসতে থাকেন স্যারও। প্রাণোচ্ছল হাসি। হাঁটা থামিয়ে স্যার ফোন করেন মেয়েকে। কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়না। মনে সামান্য অভিমান নিয়ে ফেরার পথ ধরেন স্যার। মোবাইল স্ক্রীণে দেখতে থাকেন একমাত্র মেয়ের ছবি। পহেলা বৈশাখে তোলা সেই ছবিটিতে বৈশাখী সাজে দুষ্টু দুষ্টু হাসিভরা মুখে বাবা-মার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে। স্যার আপন মনেই বলে উঠেন “পাগলী মেয়ে আমার।” তার ঠোঁটের কোনে হাসির ভাঁজ পড়ে। কোয়ার্টারের গেটেই একটি ভাঙ্গাচোরা হোটেল। হোটেলটির সাজসজ্জা দেখলে মনে হয় প্রতিদিন এর উপর দিয়ে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত স্যার এই হোটেলটিকেই নাস্তার উপযুক্ত হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এই বিখ্যাত হোটেলটির যেকোন টেবিলে হাতের স্পর্শ লাগলে চুলকানি শুরু হয় এবং ফুলে যায়। তিনি তাই ভীষণ সন্তর্পনে প্রাতঃরাশ গ্রহণ করতে লাগলেন। রুমে ফিরে অর্ধেক লেখা উপন্যাসটি নিয়ে বসেন স্যার। অনেক্ষণ বসে থেকেও কিছুই লিখতে পারলেন না তিনি। মাথায় কিছুই আসছে না। লিখতে ইচ্ছে করছে না। কেন যেন মনটা দুর্বল হয়ে গেছে। মেয়ের জন্যে ? হয়তো। আত্মীয়স্বজনরা তাকে ক্ষেপায় এই বলে যে “এমন মেয়েপাগল বাবা তো আর দেখিনি !” স্যার দোতালার বারান্দায় এসে নিচের বাগানটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বিপর্যস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কাঁধের উপর অন্ধকারের হায়নাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস। ওরা দেশকে নিয়ে যেতে চায় মধ্যযুগে। চারিদিকে হত্যা, রগকাটা, সন্ত্রাস! ইতিহাসের এই নতুন যুগসন্ধিক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আলো ও অন্ধকার। অন্ধকারকে পরাস্ত করতে গিয়ে আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত আলোর পথের যাত্রীরা। স্যারের দৃঢ় বিশ্বাস বাঙ্গালী হারতে পারেনা। ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিক্ষণে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাঙ্গালী। নিজেদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য দিয়ে প্রতিরোধ করেছে মধ্যযুগীয় দানবদের। বাঙ্গালী সংস্কৃতি প্রবল পরাক্রমশালী। তাই স্যার বিশ্বাস করেন যে সোনার বাংলা কখনো হায়নায় হবেনা। তার মনে পড়ে মিছিলের কথা। গতকাল সুমন্তকে কথা দিয়েছেন যে মিছিলের সময় তিনি দূরে দাঁড়িয়ে দেখবেন। তিনি বেড়িয়ে পড়েন। মিছিল আসছে। গুটিকয়েক প্রতিবাদীর বজ্রকন্ঠের স্লোগানে কাঁপছে রাজপথ। স্যার ভীষণভাবে অনুভব করছেন সেই আলোড়ন। তার দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা নীরবে সরব হচ্ছে স্লোগানের প্রত্যুত্তরে। এই ভয়াল সময়ে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে রাজপথে নেমেছে দেশপাগল তরুণের দল। মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে দেশমাতার প্রতি কি অসীম ভালবাসায় ঘর ছেড়েছে একবিংশ শতাব্দীর সৈনিকেরা। দরদর করে ঘাম ঝরছে ওদের শরীর বেয়ে। স্যার সুমন্তর দিকে তাকান। সুমন্ত তার সেই বিখ্যাত হাফপ্যান্ট পড়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। অন্য কোনদিকে খেয়াল নেই। স্যার তাকিয়ে থাকেন পিতৃহীন ছেলেটির দিকে। বড় ইচ্ছে হয় “বাবা” বলে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। সুমন্ত স্যারকে দেখতে পায়না। সে মিছিলে মগ্ন। মিছিল চলতে থাকে। স্যার হাঁটতে থাকেন মিছিলের পিছু পিছু।


এক একটি দিন কেটে যাচ্ছে আর দেশজুড়ে অশান্তি, অবিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে শান্তিবিক্রেতারা। যেই প্রতিবাদ করছে মৃত্যুপরোয়ানা জারি হচ্ছে তার নামে। মানবতার কাঠগড়ায় এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছে জীবন্ত প্রেতাত্মা! চারিদিকে উঠেছে ক্রুদ্ধ চিৎকার “ওদের মৃত্যু চাই, ওদের মৃত্যু চাই।” রাজপথের ধুলিকণায়, লেখকের খাতায়, কিংবা শিল্পীর কন্ঠে আবারো রচিত হতে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস। প্রতিহিংসা নয়, বাঙ্গালী প্রতিশোধ চায়। অমীমাংসিত ইতিহাসের প্রতিশোধ। দুপুরের রোদে একটি রিকশার খোঁজে ব্যাস্তভাবে সুমন্ত পায়চারি করছে রাস্তায়। অন্ধকারের শক্তির লাগাতার হরতাল চলছে। ওরা মুক্তি চায় জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মানুষরুপী প্রেতাত্মার। চারিদিকে থমথমে ভাব। কিছুক্ষণ আগে বোমাবাজি হয়েছে এই রাস্তায়। পুলিশ ঘিরে রেখেছে চারিদিক। কোন যানবাহন চলছে না। সুমন্তকে যে একটা রিকশা পেতেই হবে। ওর মা ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখুনি হাসপাতালে না নিলে হয়তো বাঁচবে না। সুমন্ত পাগলের মত ছুটছে। মাকে বাঁচাতেই হবে। মা ছাড়া যে ওর আর কেউ নেই। হঠাৎ একটি রিকশা আসতে দেখা যায়। সুমন্ত দৌড়ে গিয়ে রিকশাওয়ালাকে রাজি করিয়ে বাসার দিকে ছোটে। মাকে রিকশায় তুলে জড়িয়ে ধরে থাকে। সুমন্তর যখন খুব একা লাগে তখন মাকে ডেকে বলে “ও মা, আমার কাছে একটু বসো না, তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকি।” মা বলেন “এখন কাজের সময় ঢং করিস না তো।” বলে প্রায় সাথে সাথেই সুমন্তর বিছানায় গিয়ে বসেন। মায়ের কোলে মাথা রাখে ছেলে। মা হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন পাগল ছেলের মাথায়। বলেন “সারদিন কোথায় টো টো করে ঘুরিস, শুকিয়ে শুকিয়ে শরীরের কি অবস্থা হয়েছে দেখেছিস ?” সুমন্ত বলে -মাগো, তোমার কাছে আমি কোনদিনই মোটা হব না। হা…হা…হা…” খুব দ্রুত রিকশা চলছে। রিকশাওয়ালার ভয়ার্ত অনুসন্ধানী দৃষ্টি ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিক। সুমন্তর চোখে জল। মা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। সংগঠনের কয়েকজন অপেক্ষা করছে হাসপাতালে। কোনরকম দেরী করা যাবে না। প্রতিটি মূহুর্ত মূল্যবান। হঠাৎ হল্লা করতে করতে কয়েকটি ছেলে এসে রিকশার গতিরোধ করে দাঁড়ায়। পড়নে শার্ট। পয়ের গোড়ালির উপরে পড়া প্যান্ট। মুখাবয়বে হিং¯্রতা। রিকশাওয়ালাকে কয়েকটি চড় দিয়ে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয় ওরা। তারপর সুমন্তকে আদেশ করে রিকশা থেকে নামতে। সুমন্ত ওদের চিনতে পারেনা। সে হাতজোড় করে বলে “ভাই, আমাদের যেতে দিন। এখুনি হাসপাতালে না নিলে আমার মা বাঁচবে না।” একজন হুঙ্কার দিয়ে বলে -এইসব ভন্ডামি আমরা বুঝি। অসুখের নাম করে মজা মেরে ঘুরতাছস ! হরতাল চলছে জানিস না হারামজাদা ? নাম রিকশা থেকে নাম ।” ওরা টানাটানি শুরু করে। মা কঁকিয়ে উঠেন। সুমন্ত অসহায়ভাবে অনুরোধ করেই যায়। কিন্তু রাক্ষসের মন গলে না। একজন চাপাতি বের করে বলে “নামবি কিনা বল ? নইলে কিন্তু হাসপাতালের খরচ বাঁচাইয়া দিমু”! ভারী একটা মজার কথা বলেছে এমন ভাব নিয়ে আগন্তুকরা হেসে গড়িয়ে পড়ে। একজন একটি বোতল বের করে পেট্রোল ছড়িয়ে দিতে থাক রিকশায়। সুমন্ত চিৎকার করতে থাকে। রাগে তার শরীর জ্বলছে। সাথে মা না থাকলে বুঝি মারামারি বাঁধিয়ে দিত। কিন্তু এখন সে যদি নামতে যায় তবে মা হয়তো পড়ে যাবে। একজন সুমন্তকে আঘাত করতে করতে বলতে থাকে “চিল্লাস ক্যান হারামজাদা ? আগে ভালভাবে কইছিলাম না নাইম্যা পড়!” সুমন্ত আরও জোড়ে চিৎকার করে। হঠাৎ পেছন থেকে শোনা যায় অনেক মানুষের কোলাহল, সাথে “ধর” “ধর” আওয়াজ। সুমন্ত তাকিয়ে দেখে লাঠি হাতে ছুটে আসছে কিছু মানুষ। আগন্তুকদের আচরণ হঠাৎ করে অদ্ভুত পরিবর্তন হয়। পেছনের লোকগুলিকে দেখে তারা ঝেড়ে দৌড় লাগায়। দৌড় দেবার আগে একজন একটি জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ছুঁড়ে মারে রিকশা লক্ষ্য করে। তবে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দু-তিন জন লোক দাঁড়ায় রিকশার কাছে। বাকীরা তাড়া করতে থাকে যুবকদের। একজন রিকশাওয়ালাকে মাটি থেকে তুলে বলে “কই যাইতাছিলেন?” সুমন্ত দ্রুত সংক্ষেপে সব খুলে বলে। লোকটি বলে- “তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যান। কেউ কিচ্ছু করতে পারব না। পাবলিকই ওগো পিডাইয়া মারব।” লোকটিকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে সুমন্তু মাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে যেতে থাকে। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ চলে এসেছে। সুমন্তুর সেদিকে তাকানোর সুযোগ নেই। বাকী পথ নির্বিঘেœ পেরিয়ে সুমন্ত পৌছে যায় হাসপাতালে। উপস্থিত বন্ধুদের সাহোয্যে মাকে নামানো হয়। জরুরী বিভাগে চিকিৎসার পর সুমন্তর মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুমন্তুর বুক থেকে একটা ভারী বোঝা নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত মাকে হাসপাতালে আনতে পেরেছে সে। এখন মা চিকিৎসা পাবে। খুব দ্রুত ভাল হয়ে উঠবে। সুমন্তর অনেক তাড়া। তার মা কিছুতেই বেশিদিন অসুস্থ থাকতে পারেনা। অল্প সময়ের মাঝে সংগঠনের অনেকে চলে আসে। চলে আসেন স্যার। সুমন্ত অভিভূত হয়ে যায়। এত ভালবাসায় আপ্লুত হয়ে সে ভুলে যায় পথের অনাকাঙ্খিত ঘটনাটি। সন্ধ্যা নামে। সুমন্তর কাছে একটি অন্যরকম সন্ধ্যা। ওর মার অবস্থারও উন্নতি ঘটে। সুমন্তকে কাছে ডেকে জল খেতে চায়। সুমন্ত মাকে জল খাইয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। মা বলে “তোর অনেক কষ্ট হয়েছে না বাবা ?” সুমন্ত কিছু বলতে পারে না। ওর কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। চোখের কোনে দেখা দেয় অশ্রু। পরম আদরে মা হাত বুলিয়ে দেন ওর চুলে।

স্যার আজ একাকী বসে আছেন নদীতীরের সেই বেঞ্চটিতে। তিনি এই সময়টি একান্ত নিজের করে চান। তার একমাত্র সঙ্গী সুমন্ত আজ হাসপাতালে। চারদিকে হায়নার দল ওঁত পেতে আছে। তবু স্যারের ছেলেমানুষি জেদ তিনি গোধুুলি উপভোগ করবেন। তিনি জোৎ¯œা দেখবেন। আজ জোৎ¯œা নেই । আকাশজুড়ে কালো মেঘ। মেয়ের সাথে কথা হয়েছে। তবু কোন এক অজানা কারনে স্যারের মনের আঁধার কাটছে না। তিনি অনেক্ষণ ধরে গুনগুন করছেন। বিক্ষিপ্ত মনকে স্থির করে রবীন্দ্রনাথের গান। তবু মন স্থির হচ্ছে না। হঠাৎ মনে হল তার মেয়ে তাকে বলছে, “বাবা তুমি এখনো বাইরে বসে আছ ? আমি কিন্তু ফোন বন্ধ করলাম!!” স্যার উঠে পড়েন। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকেন রেস্টহাউসের দিকে। মোবাইল বের করে সুমন্তকে ফোন করেন। সুমন্ত তখন বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাসায় যেতে হবে। ময়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে অত্মীয়স্বজন এসেছেন। তারাই রান্নার ব্যাবস্থা করেছেন বাসায়। হাসপাতালের খাবার নাকি তেমন ভাল না। সুমন্ত তাই বাসায় যাচ্ছে মায়ের জন্য খাবার আনতে। এরই মাঝে স্যারের ফোন এল। সুমন্ত স্যারকে মায়ের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আশ্বস্ত করল। তারপর এক আত্মীয়াকে মায়ের কাছে রেখে সে বের হল বাসার উদ্দেশ্যে। হরতাল চলছে। রাত যদিও খুব বেশি নয় তবু রাস্তা কেমন যেন সুনসান। মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক। কেউ ঘর ছেড়ে বের হতে চায়না। যদিও রাজনৈতিক দলগুলি দাবী করে জনগন স্বতস্ফুর্তভাবে হরতাল পালন করে, আসলে কিন্তু তা নয়। মানুষ প্রাণের ভয়ে নীরবে সব মেনে নেয়। একটি সমাজব্যাবস্থা, একটি রাষ্ট্রব্যাবস্থা পরিবর্তনের জন্য কমসংখ্যাক মানুষই রাজপথে নামবে এটাই স্বাভাবিক। বেশিরভাগ মানুষ নির্লিপ্ত থেকে সেই পরিবর্তনের ফলভোগ করবে। তবু যুগে যুগে বাংলা মায়ের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় বীরসন্তানেরা। সুমন্ত রাজপথে নামে। তাকে বাসায় যেতেই হবে। কোন গাড়িঘোড়া নেই। কোথাও হতে শোনা যাচ্ছে নৈশপ্রহরীর হুইসেল। এই কংক্রিটের খাঁচার মাঝেও থেমে থেমে ডাকছে নিশাচর পাখি। তাদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সুমন্ত ভাবে, রাত কত ভয়ানক, রাত কত মায়াবী। রাতের এই সৌন্দর্য্যকে কি বলা যায়? স্যারকে জিজ্ঞেস করতে হবে। স্যার অসম্ভব সুন্দর করে কথা বলতে পারেন। সুমন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মত তার সকল কথা শুনে। একটি রিক্সা দেখে সুমন্ত চঞ্চল হয়ে উঠে। কিন্ত কাছে আসতেই দেখে সেটি যাত্রীসহ কোথাও যাচ্ছে। সুমন্ত হতাশ হয়। মূল রাস্তা থেকে বামদিক দিয়ে একটা গলি বেড়িয়ে গেছে। জায়গাটা ভীষণ অন্ধকার। বেশ খানিকটা রাস্তায় কোন রোডলাইট নেই। সুমন্তর কেমন যেন গা ছমছম করে উঠে। সামনে দিয়ে সুরুত করে চলে যায় কোন নিশাচর প্রাণী। সুমন্ত চমকে উঠে। সড়কদ্বীপে বসে এক ভিক্ষুক অনবরত কেঁশে চলছে। অনেকদুর থেকেই শোনা যাচ্ছিল তার কাঁশির বিকট শব্দ। হঠাৎ গাড়ির তীব্র আলোয় চোখ ঝলসে উঠে অন্যমনষ্ক সুমন্তর। সরু রাস্তাটি দিয়ে একটি মাইক্রোবাস এসে তার পথ আটকে দিল। সুমন্ত কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল মৃত্যুদূত!! চোখের পলকে দুজন এসে ওকে চেপে ধরলো। কারও মুখে কোন কথা নেই। সুমন্ত চিৎকার করে। নিজেকে মুক্ত করার চেষ্ঠা করে। তার আগেই নেমে আসে অন্ধকারের হায়নাদের মারণাস্ত্র । ওর পিঠে, ঘাড়ে এবং গলায় তখন একের পর এক চাপাতির আঘাত এসে লাগছে। সুমন্ত বুঝতে পারছে যে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে গেছে ! এভাবে মরতে পারেনা সে। কিছু একটা করতে হবে। বেঁচে থাকার প্রবল আকুতিতে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে গা ঝাড়া দিল সুমন্ত। পিঠে বসে থাকা লোকটি প্রায় ছিটকে পরে গেল। সুমন্ত উঠে দাঁড়ায়। মরণ চিৎকার করে ছুটতে থাকে শুন্য রাস্তায়। পেছনে ছুটতে থাকে একদল পশু। সুমন্তর ঘাড় বেয়ে রক্ত ঝড়ছে। শরীর টলছে। চাপাতি হাতে ওর কাছাকাছি চলে এসেছে একজন। কেউ কোন কথা বলছে না। সুমন্ত হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটাকে লাথি মারে। আচমকা প্রতিরোধে লোকটা উল্টে পড়ে পেছনে থাকা দূজনের উপর। এই সুযোগে সুমন্ত ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়ে পাশের এক ক্লিনিকে। ক্লিনিকে ঢুকে সুমন্ত চিৎকার করে বলতে থাকে- “আমাকে বাঁচান… কেউ ডাক্তার ডাকেন… রক্ত থামান। তাড়াতাড়ি রক্ত না থামালে মরে যাবো।” কিন্তু পুলিশ আসার আগে ওকে কেউ ¯পর্শও করবে না। সুমন্ত আর কিছু বলতে পারল না। তার সঙাহীন দেহটি ঢলে পড়ল হাসপাতালের বেঞ্চে !


শরীরজুড়ে ভীষণ ব্যাথা। মাথা নাড়ানো যাচ্ছে না। ¯পাইনাল কর্ডের অবস্থা খুব খারাপ। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। ৩০ টার উপরে সেলাই, মোট পাঁচটি আঘাত। তখনো রক্ত দেয়া হচ্ছে। এই নিয়ে দুই ব্যাগ। সারা শরীরে অসংখ্য নল লাগানো। কড়া ঔষধের প্রভাবে শরীরে এক ভয়ঙ্কর অনুভূতি। কত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সুমন্ত বুঝতে পারছে না। একসময় অনুভব করলো কেউ যেন পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সুমন্ত ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে সব। তাকে ঘিরে অনেকগুলি পরিচিত মুখ। মা কোথায় ? মাকে খুঁজতে লাগল সুমন্ত। ঘাড় ঘোরানোর চেষ্ঠা করতেই প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হল। সে অস্ফুট শব্দ করে ককিয়ে উঠল। ওর মাথায় বিলি কাটতে কাটতে স্যার বললেন “এখন কেমন আছিস সুমন্ত ?” স্যারের গলা ধরে এল। তিনি হয়তো সবার সামনে কাঁদতে চাইলেন না। মুখ চেপে দ্রুতপায়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। সহযোদ্ধাদের মুখে তখন আনন্দ আর স্বস্তি। সুমন্ত বেঁচে উঠেছে। এই ভয়ঙ্কর আঘাতের পর দৃঢ় মানসিক বল এবং অফুরন্ত প্রাণশক্তি না থাকলে বেঁচে ফেরা অসম্ভব। সুমন্ত পেরেছে। ওর ভীষণ সাহস। বন্ধুদের কাছ থেকেই সুমন্ত জানতে পারল খুব বেশি সময় কাটেনি। রাত পার হয়ে এখন বিকাল মাত্র। মা এখন সুস্থ। তিনি কেবলি সুমন্তকে খুঁজছেন। তাকে সুমন্তর ঘটনা এখনো জানানো হয়নি। মিথ্যে করে বলা হয়েছে যে মায়ের জন্য জরুরী একটা অষুধ আনতে সুমন্ত ঢাকা গেছে। বন্ধুদের সব দায়িত্ব দিয়ে গেছে। মা সেটাই বিশ্বাস করে সুমন্তর ফেরার অপেক্ষায় বসে আছেন। তাকে কিছুক্ষণের মাঝেই বাসায় নেয়া হবে। তারপর ধীরেসুস্থে জানানো হবে সুমন্তর কথা। তারপর কি হবে কেউ জানে না। সবাই সেই মূহুর্তটি ভাবতে ভয় পাচ্ছে। কিছু সময় পর সুমন্ত দেখল স্যার প্রবেশ করছেন। স্যারের চোখ-মুখ ফোলা। মুখমন্ডলে অশ্রুর ছাপ স্পষ্ট। স্যার ধীরে ধীরে নিঃশব্দে এসে ওর বিছানার পাশে দাঁড়ায়। ভীষণ কষ্টে সুমন্ত বলে “এখন ভাল আছি স্যার। বাকীটুকু দুদিনেই ঠিক হয়ে যাবে।” সুমন্তর ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা। স্যারও বহু কষ্টে হেসে বললেন “তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ শয়তান কোথাকার! সবাইকে এত জ্বালিয়ে মারিস কেন বলতো ?” সুমন্ত শুধুই হাসতে থাকে। শরীরের যন্ত্রণা যেন সব উধাাও হয়ে যায়। মনে হয় যেন কতকাল পর শুনছে সেই অসাধারণ কন্ঠস্বর। স্যার বলতে থাকেন “মনে হচ্ছে যেন কতদিন তোর গান শুনি না। আমাকে গান শোনবি না সুমন্ত ?”
-শোনাব স্যার। আবার যেদিন সোনার বাংলা আলোকিত করে জোৎ¯œা উঠবে, সেদিন আমরা সবাই মিলে গাইব “আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে, বিরাজ, সত্য-সুন্দর”। দেখবেন স্যার, তার আগেই আমি ঠিক ভাল হয়ে যাব।
-জোৎ¯œারাত্রি কি আসবে সুমন্ত ? কবে কাটবে আঁধার রাত্রি ? আমি খুব আশাবাদী মানুষ। কিন্তু আজকাল হতাশাগুলি খুব বেশীই শক্তি অর্জন করেছে।
-আসবে স্যার। আমি যখন বেঁচে আছি তখন অবশ্যই জোৎ¯œারাত্রি আসবে।
-থাক এখন আর কথা বলিস না। পরে সব শুনব। একটু পরে হয়তো পুলিশ এসে এমনিতেই জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আমি এখন যাই রে। রাতে আবার আসব।
স্যার উঠে পড়লেন। তার গন্তব্য এখন রাজপথ। সুমন্তর উপরে হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক এসেছে। আজ তিনি কিছুই মানবেন না। সকল বাধাকে উড়িয়ে করে আজ তিনি মিছিলে নামবেন। এতে যা হবার হবে। স্যার দ্রুত হাঁটছেন। কোনদিকে তাকানোর সময় তার নেই। তার পেশা, অসুস্থতা সকল কিছু আজ তুচ্ছ। শরতের আকাশজুড়ে অসময়ের মেঘ। রাস্তায় কিছুদূর এগোতেই বৃষ্টি শুরু হল। স্যারের কোন ভাবান্তর হলো না। কোন প্রকার যানবাহনে ওঠার চেষ্ঠা না করে তিনি বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এগিয়ে যেতে লাগলেন। যেখানে তার অনেক সহযোদ্ধা অপেক্ষা করে রয়েছে।


দুমাস কেটে গেছে।
প্রতিদিনের মত সন্ধ্যা নেমেছে ব্রহ্মপূত্রের তীরে। কৃষ্ণপক্ষ পেরিয়ে আবার সেই মাতাল করা জোৎ¯œা। ভীষণ শীত পড়েছে। সেই সাথে ঘন কুয়াশার সাথে জোৎ¯œার মাখামাখি। একগাদা কাপড় সারা শরীরে জড়িয়ে সেই বিখ্যাত বেঞ্চটিতে বসে অগ্রজ এবং অনুজ। কোন কথা নেই, গান নেই। সবকিছু যেন থমকে আছে। সুমন্ত মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। দু-একজন মানুষ হেঁটে চলে যাচ্ছে ওদের দেখে দেখে । নীরবতা ভঙ্গ করে স্যার বললেন
-সুমন্ত, তুই মন খারাপ করছিস কেন রে ? আমি কি একেবারে চলে যাচ্ছি ? অন্য কোথাও চাকরি করলেও বারবার ফিরে আসব তোদের মাঝে। তোর যখন ইচ্ছে হবে ভোঁ করে চলে যাবি। তারপর আমার বাসার ছাদে বসবে গানের আসর। আমার শহরে কি জোৎ¯œা নেই ? কথা বলছিস না কেন ? এই ফাজিল, মুখ তোল!
সুমন্ত মুখ তুলল। বলল,
-বটতলাটি ওভাবেই পড়ে রইল স্যার !
-কেন পড়ে থাকবে ? তোরা ঐ বটতলাটিকে “রবীন্দ্রতলা’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবি। ওখানে কবিতা পাঠ হবে, সাহিত্যচর্চা হবে, ময়মনসিংহের সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনস্থল হবে। আবার যখন আসব তখন সেই “রবীন্দ্রতলায়” বসেই তোর গান শুনব। পারবি না সুমন্ত ?
-জানি না স্যার। তবে এটুকু জানি যে এখন আর পথ হারাব না।
-পথের খোঁজ কি পেয়েছিস সুমন্ত ? পথ যে বড়ই গোলমেলে !
-পেয়েছি স্যার। আমি এখন বুঝতে পারছি আমি আন্দোলন করছি আসলে আমার জন্য। যে শোষণ-নিপীড়নের কথা আমরা বলি আমিও তো তাদেরই একজন।
-মানে ?
-মানে স্যার প্রত্যেকে যখন নিজের অধিকার আদায়ে সচেতন হবে তখনই প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য আন্দোলন করবে। এতদিন বলতাম মানুষের অধিকারের আদায়ে কাজ করছি, কিন্তু কখনই ভাবতে পারিনি আমি সেই মানুষদের একজন। ভাবতে পারিনি যে আমার নিজের অধিকারের উপর কেউ আক্রমণ করতে পারে ! হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবনার অনেক অবকাশ পেয়েছি। নিজেকে প্রশ্ন করেছি। নিজেকে জেনেছি।
স্যার হেসে বলেন
-সুমন্ত তুই এবার সত্যিই বড় হয়েছিস।
-জ্বি স্যার, আমি এখন থেকে ফুলপ্যান্ট পড়বো…।
স্যার হাসতে থাকেন। হাসতে থাকে সুমন্ত। নিশাচর পাখিরা যেন গাইতে থাকে “চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে…”

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল সুমন
০৭/১১/২০১৩

২ thoughts on “হাফপ্যান্ট

  1. যদিও এখন ময়মনসিংহ বা বাংলাদেশ
    যদিও এখন ময়মনসিংহ বা বাংলাদেশ থেকে বহুদূর প্রবাসে আছি,তবুও আপনার লেখা পড়ে আবার সেই স্মৃতির শহরের কথা মনে পড়ে গেল। আমরাও একদিন আপনার কল্পনার সুমন্তর মত মিছিল নিয়ে রাজপথে বের হতাম।
    কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন এমন কয়জন স্যার বা সুমন্ত খুঁজে পাওয়া যাবে? আপনার সুমন্ত হয়ত বেঁচে গেছে,কিন্তু বাস্তবের সুমন্তরা বাচঁবে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *