উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা: মুসলিম শাসকগনের মধ্যযুগীয় বর্বরতা……………(পর্ব-৪)

আমির তিমুরের আক্রমণে: মধ্য এশিয়া থেকে আগত আমির তিমুর একজন ‘গাজী’ কিংবা ‘শহীদ’ হওয়ার ইসলামি গৌরব অর্জনের খায়েশে ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত হন (১৩৯৮-৯৯)। দিল্লি পৌঁছাবার প্রাক্কালে তিনি ইতিমধ্যে ১০০,০০০ বন্দিকে কব্জা করেছিলেন। দিল্লি আক্রমণের পূর্বে তিনি সেসব বন্দিকে নির্বিচারে হত্যা করেন। দিল্লি আক্রমণ থেকে শুরু করে তার রাজধানীতে ফেরা পর্যন্ত পথিমধ্যে তিনি রেখে যান বর্বরতার লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ইতিহাস: হত্যা, ধ্বংসলীলা, লুটতরাজ ও ক্রীতদাসকরণ, যা তিনি তার নিজস্ব স্মৃতিকথা ‘মালফুজাত-ই তিমুরী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।


আমির তিমুরের আক্রমণে: মধ্য এশিয়া থেকে আগত আমির তিমুর একজন ‘গাজী’ কিংবা ‘শহীদ’ হওয়ার ইসলামি গৌরব অর্জনের খায়েশে ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত হন (১৩৯৮-৯৯)। দিল্লি পৌঁছাবার প্রাক্কালে তিনি ইতিমধ্যে ১০০,০০০ বন্দিকে কব্জা করেছিলেন। দিল্লি আক্রমণের পূর্বে তিনি সেসব বন্দিকে নির্বিচারে হত্যা করেন। দিল্লি আক্রমণ থেকে শুরু করে তার রাজধানীতে ফেরা পর্যন্ত পথিমধ্যে তিনি রেখে যান বর্বরতার লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ইতিহাস: হত্যা, ধ্বংসলীলা, লুটতরাজ ও ক্রীতদাসকরণ, যা তিনি তার নিজস্ব স্মৃতিকথা ‘মালফুজাত-ই তিমুরী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

১৩৯৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তার দিল্লি আক্রমণে, লিখেছেন তিমুর: ‘১৫০০০ তুর্ক সেনা হত্যা, লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়। লুণ্ঠনের মালামাল এতই বিপুল ছিল যে, প্রত্যেকে পঞ্চাশ থেকে একশ জন করে পুরুষ, নারী ও শিশুকে ভাগে পেয়েছিল। কারো ভাগেই কুড়ি জনের কম ক্রীতদাস পড়েনি।’ যদি প্রতিটি যোদ্ধা গড়ে ৬০ জন বন্দিকেও পেয়ে থাকে, সেদিন কমপক্ষে ১০০০০০০ ক্রীতদাস কব্জা করা হয়েছিল তিমুর বর্ণনা করেছেন, মধ্য এশিয়ায় তার রাজধানীতে ফেরার পথে তিনি সেনানায়কদেরকে নির্দেশ দেন যে, পথিমধ্যে প্রত্যেক দুর্গ, শহর ও গ্রামে হানা দিয়ে সমস্ত বিধর্মীকে তরবারির খাদ্যে পরিণত করতে। তার বর্ণনা মতে: ‘আমার সাহসী সঙ্গীরা তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে অনেককে হত্যা করে এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে বন্দি করে।’

কুতিলায় পৌঁছানোর পর তিনি সেখানকার বিধর্মীদেরকে আক্রমণ করেন। তিমুর লিখেছেন: ‘সামান্য প্রতিরোধের পর শত্রুরা পলায়ন করে, কিন্তু তাদের অনেকেই আমার সৈনিকদের তলোয়ারের নিচে পড়ে। বিধর্মীদের সকল স্ত্রী ও সন্তানকে বন্দি করা হয়।’

সামনে অগ্রসর হয়ে গঙ্গা-স্নান উৎসবের সময় গঙ্গাতীরে পৌঁছানোর পর তার যোদ্ধারা ‘বহু অবিশ্বাসীকে হত্যা করে এবং যারা পাহাড়ে পালিয়ে যায় তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে।’ ‘লুণ্ঠনের মালামালের পরিমাণ ও সংখ্যা, যা আমার যোদ্ধাদের হস্তগত হয়, তা সকল গণনা ছাড়িয়ে যায়,’ লিখেছেন তিমুর। লুণ্ঠন দ্রব্যের মধ্যে অবশ্যই ছিল ক্রীতদাস।

তিনি সিউওয়ালিক পৌঁছালে, লিখেছেন তিমুর, ‘তাদেরকে দেখেই বিধর্মী ‘গাবর’রা পলায়ন করে। ধর্মযোদ্ধারা তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে নিহতদের স্তূপ বানায়।’ অগণিত লুন্ঠন-দ্রব্য তার বাহিনীর হাতে আসে এবং ‘উপত্যকার সমস্ত হিন্দু নারী ও শিশুদেরকে বন্দি করা হয়।’

নদীর অপর তীরে রাজা রতন সেন তিমুরের অগ্রসর হওয়ার খবর শুনে তার যোদ্ধাদের নিয়ে ত্রিসর্তর (কাংড়ার) দুর্গের ভিতরে আশ্রয় নেন। তিমুর লিখেছেন: দুর্গটি আক্রমণ করা হলে ‘হিন্দুরা ছত্র ভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে এবং আমার বিজয়ী যোদ্ধারা তাদেরকে ধাওয়া করলে মাত্র কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তারা বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠন দ্রব্য কব্জা করে, যা ছিল গণনার অতীত। প্রত্যেকে ১০ থেকে ২০ জন করে ক্রীতদাস পায়।’ এর অর্থ দাঁড়ায়: এ আক্রমণে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার লোককে ক্রীতদাস বানানো হয় সিউওয়ালিক উপত্যকার অপর অংশে ছিল নগরকোট নামক হিন্দুস্তানের একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর। তিমুর উপসংহার টেনেছেন: এ আক্রমণে ‘পবিত্র ধর্মযোদ্ধারা মৃতদেহের বিশাল স্তূপ সৃষ্টি করে এবং বিপুল সংখ্যক বন্দিসহ ব্যাপক পরিমাণ লুণ্ঠিত মালামাল ও ক্রীতদাস নিয়ে বিজয়ী বীরেরা অতি উল্লসিত চিত্তে ফিরে যায়।’

দিল্লি থেকে ফেরার পথে তিমুর হিন্দু দুর্গ, নগরী ও গ্রামে প্রধান পাঁচটি আক্রমণ করেন। এছাড়াও অন্যান্য ছোট ছোট আক্রমণ করা হয়েছিল এবং প্রতিটিতে ক্রীতদাস শিকার করা হয়েছিল। কব্জাকৃত ক্রীতদাসদের আনুমানিক সংখ্যা একমাত্র কাংড়া আক্রমণের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়, যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজারের মতো। অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুরূপ সংখ্যায় ক্রীতদাস ধরা হলে তিনি তার ফেরার পথে ১০ থেকে ১৫ লাখ ক্রীতদাস সংগ্রহ করেছিলেন। এর সঙ্গে যদি দিল্লিতে কব্জাকৃত ক্রীতদাসদের যুক্ত করা হয়, তাহলে তিনি অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ ভারতীয় নাগরিককে ক্রীতদাস বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার রাজধানীতে। তিনি দিল্লিতে কয়েক হাজার শিল্পী ও কারিগরও বাছাই করেছিলেন তার রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সিকান্দার;কালাপাহাড়(১৩৮৯-১৪১৩): সিকান্দার ছিল কাশ্মিরের শাহ মিরি রাজবংশের ষষ্ঠ সুলতান। তার আরেক নাম কালাপাহাড়। তিনি এতো বেশি হিন্দু, বৌদ্ধ মন্দির, প্রতিমা, আশ্রম, মঠ ধ্বংস করেছেন যে, তার নামই দিয়েছে কালাপাহাড়। তিনি রাজ্যে নাচ, গান, পূজা, প্রতিমা গড়া ইত্যাদি অনৈসলামিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেন। এমনকি তিনি হিন্দুদের তিলক করা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেন, হিন্দুরা শবদাহ করতে পারতো না।

মুসলিম লেখক হাসান লিখেছেন- তিনি হিন্দুদের। জোরপূর্বক মুসলিম ধর্ম দিক্ষিত করতেন। তিনি আরো লিখেছেন- সিকান্দারপুরাতে রাজবাড়ীর পাশের মহা শ্রী মন্দির ধ্বংস করে এর ধ্বংসাবশেষ দিয়ে জামে মসজিদ নির্মান করেন। বাহারিস্তান-ই-শাহী মতে- সুলতান তার রাজ্য থেকে অবিশ্বসী কাফেরদে সমূল উৎপাটন করার জন্য দৃঢ় সংকল্প ছিল। তিনি অনেক মন্দির, মঠ ধ্বংস করেছিলেন। ‘রাজতরঙ্গিনী’ তে উল্লেখ আছে- যেখানে কোন মন্দির অক্ষত ছিল, সেখানে কোন শহর, গ্রাম বা মানুষ ছিল না। যখন বরাহ, সুরেশ্বরী ইত্যাদি মন্দির ভাঙ্গা হচ্ছিল, তখন ধরনী কেঁপে উঠেছিল কিন্তু সিকান্দারের বুক কাঁপেনি। ফিরিস্তা লিখেছেন- অনেক ব্রাক্ষ্মন দেশত্যাগ করতেন, অনেক বিষপান এবং কিছু বেঁচে যতো মুসলিম হয়।

সৈয়দ ও লোদী শাসনামলে (১৪০০-১৫২৫): দিল্লির ক্ষমতা বিধ্বস্ত করে তিমুরের প্রত্যাবর্তনের পর স্বল্প সময়ের জন্য তুঘলকরা ও পরে সৈয়দরা তাদের ক্ষমতা সংহত করতে অনেক অভিযান পরিচালনা করেন। ফেরিশতা লিখেছেন: সুলতান সৈয়দ মুবারকের শাসনামলে (১৪১৩-৩৫) মুসলিম বাহিনী কাটিহার লুন্ঠন করে ও বহু রাথোর রাজপুতকে ক্রীতদাস বানায় (১৪২২)। ১৪২৩ সালে আলয়ারে বহু মুয়াত্তি বিদ্রোহীকে ও ১৪৩০ সালে হুলকান্তের (গোয়ালিয়রে) রাজার প্রজাদেরকে বন্দি ও ক্রীতদাসরূপে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৪৩০ সালে কাবুলের আমির শেখ আলী পাঞ্জাবের শিরহিন্দ ও লাহোর আক্রমণ করেন। ফেরিশতা লিখেছেন: লাহোরে ‘গুণে গুণে ৪০০০০ হিন্দুকে হত্যা করা হয় ও বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়’; টুলুম্বায় (মুলতানে) তার বাহিনী ‘স্থানটি লুটপাট করে, অস্ত্রবহনে সক্ষম সব পুরুষকে হত্যা করে এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে বন্দি করে নিয়ে যায়।

এর উল্টোটাও ঘটেছে, ১৪৩১ সালে জালন্দার দুর্গ হিন্দুরা পুনর্দখল করলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এরকমভাবে হিন্দু মুসলিমের মধ্য হত্যাচক্র দেশে বিভন্ন অংশে চলতে থাকে।
লোদী বংশ (১৪৫১-১৫২৬): সুলতানাতের কর্তৃত্ব পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং ক্রীতদাসকরণ প্রক্রিয়া যথারীতি অব্যাহত রাখে। লোদী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান বাহলুল ‘ছিলেন এক স্বেচ্ছাচারী লুণ্ঠনকারী এবং বন্দিদেরকে দিয়ে তিনি এক শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন।’ নিমসারের (হারদয় জেলায়) বিরুদ্ধে আক্রমণে তিনি ‘সেখানকার বাসিন্দাদের হত্যা ও ক্রীতদাসকরণের মাধ্যমে স্থানটিকে একেবারে জনশূন্য করে ফেলেন।’ তার উত্তরসূরী সিকান্দার লোদী রেওয়া ও গোয়ালিয়র অঞ্চলে একই দৃশ্যের অবতারণা করেন।

মুঘল শাসনামলে: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে ইব্রাহিম লোদীকে পরাভূত করার মাধ্যমে আমির তিমুরের গর্বিত উত্তরসূরী জহিরুদ্দিন শাহ বাবর ভারতে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা ‘বাবরনামা’য় কোরান থেকে তুলে ধরা আয়াত ও সূত্রের অনুপ্রেরণায় তিনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদ অভিযান চালান বলে বর্ণনা করেছেন। বাবরের শাসনামলে তার ক্রীতদাসকরণের কথা পদ্ধতিগতভাবে লিখিত হয়নি।

বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অবস্থিত তৎকালীন ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য বাজাউর আক্রমণ সম্বন্ধে বাবর লিখেছেন: ‘তাদের উপর সাধারণ হত্যাকাণ্ড চালানো হয় এবং তাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে বন্দি করা হয়। আনুমানিক ৩০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। (আমি) আদেশ দিলাম যে, উচ্চস্থানে ছিন্ন-মস্তক দ্বারা একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।’ একইভাবে তিনি আগ্রায় হিন্দুদের ছিন্ন-মস্তক দিয়ে স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। ১৫২৮ সালে তিনি কনৌজের শত্রুদেরকে আক্রমণ ও পরাজিত করেন এবং ‘তাদের পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদেরকে বন্দি করা হয়। এসব দৃষ্টান্ত ইঙ্গিত করে যে, বাবরের ‘জিহাদ’ অভিযানগুলোতে নারী-শিশুদেরকে বন্দি ও ক্রীতদাসকরণ ছিল একটা সাধারণ নীতি বা অংশ। ‘বাবরনামা’য় উল্লেখ রয়েছে যে, হিন্দুস্তান ও খোরাসানের মধ্যে দু’টো প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল কাবুল ও কান্দাহারে, যেখানে উচ্চ মুনাফায় বিক্রির জন্য ভারত থেকে ক্রীতদাস (বার্দা) ও অন্যান্য পণ্যবোঝাই গাড়ির-বহর আসতো। শের শাহ’র মুঘল বাহিনী কালিন্জার দুর্গ আক্রমনকালে প্রতিটি পুরুষ, নারী এমনকি শিশুদেরও হত্যা করেন।

বাবরের মৃত্যুর পর ১৫৬২ সালে বাবরের নাতি ইসলাম-ত্যাগী ‘আকবর দ্য গ্রেট’ যুদ্ধে পাইকারিহারে নারী-শিশুদের ক্রীতদাসকরণ নিষিদ্ধ করেন। তবুও, লিখেছেন মোরল্যাণ্ড, ‘আকবরের শাসনকালে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই একটা গ্রাম বা গ্রামগুচ্ছে হানা দিয়ে বাসিন্দাদেরকে ক্রীতদাসরূপে তুলে নিয়ে আসা একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’ এ কারণে সম্রাট আকবর শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাসকরণ নিষিদ্ধ করেন। তবে গভীরভাবে প্রোথিত এ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। নিষেধ সত্ত্বেও আকবরের সেনাধ্যক্ষ ও প্রাদেশিক শাসকরা নিজেদের ইচ্ছামতো অমুসলিমদের বাড়িঘর ও ধনসম্পদ লুণ্ঠন এবং তাদেরকে ক্রীতদাসকরণ অব্যাহত রাখে। ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আকবরের স্বল্পকালীন এক প্রাদেশিক সেনাপতি আব্দুল্লাহ খান উজ্বেক ৫০০০০০ নারী ও পুরুষকে ক্রীতদাস বানিয়ে বিক্রয় করার কৃতিত্বে গর্ব প্রকাশ করেন। এমনকি আকবরও নিজস্ব আইনের অমর্যাদা করে ১৫৬৮ সালে চিতোরের যুদ্ধে নিহত রাজপুত সেনাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে ক্রীতদাসকরণের নির্দেশ দেন, যারা বিষপানে বা অগ্নিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়ে তাদের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিল। নিষিদ্ধ ঘোষণা সত্ত্বেও প্রদেশগুলোতে ক্রীতদাসকরণ অব্যাহত থাকে আকবরের আমলে। মোরল্যাণ্ড লিখেছেন: আকবরের শাসনকালে স্বাভাবিক সময়ে শিশুদেরকে চুরি বা অপহরণ ও বেচা-কেনা করা হতো; বাংলা ছিল এসব অপকর্মে কুখ্যাত, যেখানে তা সবচেয়ে বীভৎসরূপে (ক্রীতদাসদের খোজাকরণ ইত্যাদি) চর্চা করা হতো। এ কারণে আকবর ১৫৭৬ সালে ক্রীতদাসকরণ নিষিদ্ধ আইন পুনরায় জারি করতে বাধ্য হন। তার শাসনকালে ডেলা ভ্যাল তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যে জানান: চাকর ও ক্রীতদাসের সংখ্যা এত অগণন ও সস্তা যে, ‘প্রত্যেকেই, এমনকি দুর্ভাগা গরিবরাও, বড় বড় পরিবার রাখতো এবং চমৎকার সেবা-সহায়তা পেতো। এসব দৃষ্টান্ত মহান আকবরের শাসনামলেও কী মাত্রায় ক্রীতদাসকরণ চলছিল তার একটা স্বচ্ছ ধারণা দেয়।

ক্রীতদাসকরণ পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটে আকবরের উত্তরসূরী জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭) ও শাহজাহানের (১৬২৮-৫৮) শাসনামলে। এ দুই সম্রাটের শাসনকালে গোঁড়ামি ও ইসলামিকরণ ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হয়। জাহাঙ্গীর তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন: বাংলায় রাজস্ব পরিশোধে অপারগ পিতা-মাতারা আপন সন্তানদেরকে খোজা করে গভর্নরকে দিতো রাজস্বের পরিবর্তে। ‘এ চর্চা একেবারে সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে’, লিখেছেন জাহাঙ্গীর। বেশ কয়েকটি তথ্য-দলিল জানায় যে, জাহাঙ্গীরের পরিষদের উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তা সৈয়দ খান চাগতাই একাই ১২০০ খোজাকৃত ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন। জাহাঙ্গীর শুধুমাত্র ১৬১৯-২০ সালেই ২০০,০০০ বন্দিকৃত ভারতীয় ক্রীতদাসকে বিক্রির জন্য ইরানে পাঠিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরের নির্দেশনায় শিখ গুরু অর্জুনকে হত্যা করা হয়।

পরবর্তী সম্রাট শাহজাহানের অধীনে হিন্দু কৃষকদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছে। মুঘল আমলে ভারত সফরকারী পর্যটক মানরিকে দেখেন: কর আদায়কারী কর্মকর্তারা বিপন্ন ও দরিদ্র কৃষক ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে ধরে নিয়ে যেতো, কর আদায়ের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন বাজার ও মেলায় বিক্রি করতে। ফরাসি চিকিৎসক ও পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার, যিনি ভারতে ১২ বছর বসবাস করেন ও সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন, তিনিও এরূপ ঘটনার সত্যতা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি কর প্রদানে অপারগ দুর্ভাগা কৃষকদের সম্পর্কে লিখেছেন: তাদের শিশুদেরকে ক্রীতদাসরূপে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। মানরিকেও একই ঘটনার সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন।

আওরঙ্গজেবের শাসনকাল (১৬৫৮-১৭০৭) হিন্দুদের জন্য ভয়ঙ্কর বিবেচিত। তার শাসনামলে কেবলমাত্র ১৬৫৯ সালেই গোলকুণ্ডা (হায়দরাবাদ) শহরে ২২,০০০ তরুণ বালককে খোজা করা হয়, শাসক ও গভর্নরদেরকে প্রদান কিংবা ক্রীতদাস-বাজারে বিক্রির জন্য। তিনি অনেক মন্দির ধ্বংস করেন, এবং নবম শিখ গুরু ত্যাগ বাহাদুরকে গ্রপ্তারও হত্যা করেন। ১৬৬৯ সালে তিনি একটি নির্দেশ দেন যে- বিধর্মী কাফেরদের সকল উপসনালয় ও বিদ্যালয ধ্বংস করো এবং কেউ যেন মূর্তি পূজা বা এ সম্পর্কে শিক্ষাদান দিতে না পারে। তার এই নির্দেশের পর প্রায় ৮০ টি অভিযানে প্রায় ৬০০০০ মন্দির ধ্বংস করা হয়। এর মধ্যে বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির ধ্বংস ও তৎস্থানে মসজিদ নির্মান করা হয়। মথুরার বিখ্যাত কেশব মন্দির ধ্বংস এবং সেখান মসজিদ নির্মানের নির্দেশ দেন।

ইরানের নাদির শাহ ১৭৩৮-৩৯ সালে ভারত আক্রমণ করেন। ব্যাপক নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের পর তিনি বিপুল সংখ্যক ক্রীতদাস সংগ্রহ করেন এবং বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠিত মালামালসহ তাদেরকে নিয়ে চলে যান। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে আফগানিস্তান থেকে আহমাদ শাহ আবদালী তিন-তিন বার ভারত আক্রমণ করেন। ‘পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ’ বিজয়ী হয়ে তিনি নিহত মারাঠা সেনাদের ২২০০০ স্ত্রী-সন্তানকে ক্রীতদাসরূপে বন্দি করে নিয়ে যান।

এছাড়া আকবরের সময়কালে বাংলা বিহার, উড়িষ্যার শাসনকর্তা সুলয়মান খান কররানীর দুধর্ষ সেনাপতি কালাপাহাড়ের কীর্তি সবাই জানেন। তিনি অসংখ্য মন্দির ধ্বংস ও লুটপাট করেন। ১৫৬৭ সালে তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভাংচুর ও লুঠপাট করেন। জানা যায় তিনি প্রতিমাগুলো হুগলীর তীরে আগুনে ভষ্মিভূত করেন। কালাপাহাড় উড়িষ্যার বালেশ্বরের গোপীনাথ মন্দির, ভুবনেশ্বরের কাছে কোনার্ক মন্দির, মেদিনীপুর, ময়ুরভঞ্জ, কটক ও পুরীর আরো কিছু মন্দিরে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালান।

২ thoughts on “উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা: মুসলিম শাসকগনের মধ্যযুগীয় বর্বরতা……………(পর্ব-৪)

  1. এই উপমহাদেশে মুসলিম শাসকরা
    এই উপমহাদেশে মুসলিম শাসকরা রক্তের বন্যায় বইয়ে দিয়ে শাসন করেছে। ধর্মের নামে হত্যা, লুণ্ঠন ছিল নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। এই ধর্মের শিক্ষাই এমন।

    ভাল একটা সিরিজ লিখছেন আপনি। সিরিজ চলুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *