খালেদা জিয়া বিএনপির কাঁধে ‘৭১-এর ৩০ লক্ষ গণহত্যার দায় চাপিয়ে দিয়েছেন

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দন্ডিত দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ওরফে ‘দেইল্লা রাজাকার’-এর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকার নাকি ইসলামী চিন্তাবিদদের ধরে ধরে ফাঁসি দিচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন সাঈদী বা জামায়াতের কোন নেতা ‘৭১-এর গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না। যে উচ্চ আদালত সাঈদীকে গণহত্যাকারী বলেছেন, খালেদা জিয়া এই আদালতের সমালোচনা করেছেন। সাঈদীর মৃত্যুদন্ডের অজুহাতে বিএনপির সহোদর ভ্রাতা (তারেক জিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী) জামায়াতে ইসলামীর সন্ত্রাসীরা পূর্বঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী সারা দেশে পুলিশ ও বিজিবি সহ বিভিন্ন জনপদে এবং সংখ্যালঘু হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে নৃশংস হামলা চালিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে তারা ‘৭১-এর অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ এবং পাকিস্তানি প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য জামায়াতের সকল সহিংসতা ও হত্যার দায় স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।

২৮ ফেব্রুয়ারী ও ১, ২ মার্চ (২০১৩) জামায়াতের সহিংসতায় সারা দেশে ৫ জন পুলিশসহ অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন কয়েক শ’, যাদের অধিকাংশ জামায়াতের কর্মী হলেও নিহত ও আহতের তালিকায় আওয়ামীলীগের কর্মী-সমর্থক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ খেটে খাওয়া নিরীহ মানুষও কম নয়। পূর্বঘোষিত গৃহযুদ্ধের হুমকি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জামায়াত সরাসরি রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করেছে যা রাষ্ট্রদ্রোহতুল্য অপরাধ। জামায়াতের রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকান্ডের সমর্থনে খালেদা জিয়া ৫ মার্চ হরতাল আহবান করে প্রমাণ করেছেন প্রকৃত অর্থেই বিএনপি এখন জামায়াতের ‘বি টিম’-এ পরিণত হয়েছে এবং জামায়াতের আমীর ও ভারপ্রাপ্তের অনুপস্থিতিতে তিনি যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীদের এই দলটির নতুন আমীর হয়েছেন।

দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণার দুদিন আগে হঠাৎ সিঙ্গাপুরে গিয়ে রায় ঘোষণার একদিন পর ফিরে এসে খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী জামায়াতের তান্ডবের কারণে ৪৮ জন নিহতের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর আগের দিন জামায়াত-শিবিরের এই হত্যা ও ধ্বংসকান্ডকে বিএনপি বলেছে, ‘ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা’। (দৈনিক সংগ্রাম, ১ মার্চ ২০১৩)
‘৭১-এর গণহত্যায় কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন সে সম্পর্কে খালেদা জিয়া তার ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একবারও একটি বাক্য উচ্চারণ করেননি। কারা এই গণহত্যা করেছে, গণহত্যাকারীদের বিচার হওয়া উচিত কিনা এ বিষয়েও তিনি টুঁ শব্দ করেননি। বরং শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন এই গণহত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছিলেন তাকে খালেদা জিয়ার বাহিনী রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে অজ্ঞান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বিচার প্রার্থী শহীদ জননীকে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ মাথায় নিয়েই জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরণ করেছেন।

খালেদা জিয়ার স্বামী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা (বীরউত্তম) ছিলেন। বিএনপিতে বহু ‘বীরউত্তম’, ‘বীরবিক্রম’, ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির বহু নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। গণহত্যাকারী জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচারের রায় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে, পাকিস্তানি কায়দায় ‘৭১-এর গণহত্যার ঘটনা অস্বীকার করে খালেদা জিয়া এই গণহত্যার দায় বিএনপির তাবত মুক্তিযুদ্ধাদের কাঁধে তুলে দিয়েছেন। অভিশপ্ত জামায়াতের মতো এখন থেকে বিএনপিকেও রোজ কেয়ামত পর্যন্ত ‘৭১-এর ৩০ লক্ষ গণহত্যার দায় বহন করতে হবে।

১৯৯৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিম্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের এক নারকীয় হামলায় শতাধিক নিরীহ ছাত্র আহত এবং ছাত্রনেতা রীমু নিহত হয়েছিলেন। নিহত রীমু ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রির নেতা হলেও তার মা হেলেনা চৌধুরী ছিলেন সাতক্ষীরা বিএনপির সভাপতি। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। রীমু হত্যার প্রতিবাদে ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক উত্তপ্ত ও আবেগপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সহ সকল বিরোধী দলের সাংসদরা জামায়াতে-শিবিরের এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দাসহ জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। আওয়ামি লীগের নেতারা জামায়াত সম্পর্কে এখন যা বলেন তখনও তাই বলেছিলেন। সেদিন জাতীয় সংসদে বিএনপির সদস্যরা দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন।

জামাত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে তারা রাষ্ট্রদোহিতাতূল্য অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিএনপির বর্তমান আত্মবিস্মৃত মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের জ্ঞাতার্থে তাদের সহযোদ্ধা কয়েকজন সাংসদের বক্তব্যের কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি –

“আজকে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এটাই আমার কলঙ্ক। আজকে আমার সন্তানের সামনে মাথা নীচু করে আমাকে স্বীকার করতে হয়, ক্ষমতায় থাকার জন্য আমাকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে হাত মিলাতে হয়। এই ক্ষমতা দারুন মোহ, দারুন নেশা। এখানে বিবেক বলে কোন কিছু কাজ করে না। আজকে আসুন শুধু সরকারীভাবে সরকার নয়, সবাই মিলে সামাজিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের বয়কট করি। আসুন, আজকে তাদের সঙ্গে আমরা এক কক্ষে বসব না সেই প্রতিজ্ঞা করি। আসুন, আমরা জাতীয় কোন ইস্যুতে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করব না সেই সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু আমরা সেটা নিব না। ক্ষমতায় ভাগাভাগি করার জন্য- আমরা একজন আর একজনকে দোষারোপ করব এ হয় না।
আজকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে জামায়াত-শিবির ঔদ্ধত্য দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে এটা আমাদের দূর্বলতার জন্য। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আমাদের যারা বিরোধিতা করেছে,আমাদের অস্তিত্বের যারা বিরোধিতা করেছে, যারা আমাদের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি তাদের সাথে আমাদের কোন সামাজিক বন্ধন হতে পারে না। যদি আমরা সকল ব্যাপারে তাদেরকে বয়কট করতে পারতাম তাহলে, আজকে আমাদের রগ কাটা যেত না। আজকে আমাদের ছাত্র ভাইদেরকে জীবন দিতে হতো না। জামায়াত-শিবির শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়- আজকে প্রশাসনের বিভিন্ন দিকে তাকিয়ে দেখুন, এদেশের অনেক জুনিয়র কর্মকর্তা কর্মচারী আছেন যারা প্রকাশ্যেই জামায়াত করেন এবং জামায়াতের বই লিখেন। তারপরও তাদেরকে সরকারের বড় বড় আসনে চাকুরী দেয়া হয়, পদোন্নতি করা হয়। আমরা তাদের কাছে সবাই ধর্ণা দেই।….
“আমি বিরোধী দলের বন্ধুদের বলব,স্বাধীনতাবিরোধী চক্র,মৌলবাদী চক্রকে এই দেশের রাজনীতিতে এবং সর্ব জায়গায় তাদেরকে নিষিদ্ধ করেন, তার প্রস্তাব আনেন। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি যদি আপনাদেরকে ভোট দিতে হয় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমি এই ব্যাপারে দেব।”
১৯৯৩-এর ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এসব কথা বলেছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ মেজর আখতারুজ্জামান।

সেদিন পাবনা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ সিরাজুল ইসলাম বলেছিলেন- “আজ রিমুর পিতার অনুভূতি নেয়া হোক এবং সেই অনুভূতিকে সামনে রেখেই আমি ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে চাই। আমার যে বোন, মা যেভাবে ধর্ষণ হয়েছিল, যাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল তারা আজ ২২ বছর বিভিন্নভাবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা শূণ্যতা সৃষ্টি করতে চায়। যেভাবে তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে চেয়েছিল- আজকে আমার ধর্ষিত বোনকে জবাব দিতে চাই। ২২ বছর পর জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ১২ কোটি মানুষের সংসদ আজকে কথা বলছে। কিছু কিছু সদস্য মনে করেন এবং তালি দিতে অসুবিধা বোধ করেন যে আবার Home Minister সাহেব অসন্তুষ্ট হন কিনা। পরিষ্কার কথা আমার- স্বাধীনতার সাথে আমি আপোষ করব না, আমার রক্তের সাথে আমি আপোষ করব না। যারা আমার মা-বোনদের সতীত্ব নিয়েছে তাদের সাথে আমি আপোষ করব না। গোলাম আযমকে যখন তারা এই জামায়াতের আমীর করেছিল তখন তার নাগরিকত্ব ছিল না। আমার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তারা সেদিন চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেছিল, তাদের সাথে আমার কখনো আপোষ হতে পারে না। আমি পরিষ্কার করে দিতে চাই- আমাদের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে যারা আছেন সবার জন্যে, আজকে তারা সমস্ত মসজিদগুলি কার্যালয়ে পরিণত করছে। আজকে ধর্মান্ধদের দৌরাত্ম্যে আমার বাবা চাচা ভাইয়েরা মসজিদে ইবাদত করতে পারে না। তাদের রাজনীতিতে নামতে বাধ্য করা হয়। এই হচ্ছে আজকের গ্রামগঞ্জের মসজিদগুলির অবস্থা। তারা এখন মসজিদে অবস্থান নিয়েছে, এদেরকে বিতাড়িত করতে হবে। তারা আফগানিস্তান থেকে বিপ্লবী আমদানী করতে চায়। তারা ইরান থেকে বিপ্লবী আমদানী করতে চায়। আমি আজকে প্রস্তাব করতে চাই-
সামরিক বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, এন.এস.আই, ডিজিএফআই, সকল বাহিনীতে নাগরিক সার্টিফিকেটের পাশাপাশি আর একটি সার্টিফিকেট যোগ করতে হবে। জামায়াত শিবিরের কোন সদস্য, এই বাহিনীতে যোগদান করতে পারবে না। তা না হলে ২০ বছর পর এই বাহিনী দখল করে তারা আবার এ দেশের ক্ষমতা দখল করবে। আমি বলতে চাই,আজকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ওরা নেতাশূণ্য করতে চায়, এটাই মূল কথা। যেটা ওরা করতে চেয়েছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে। ওরা সেই একই পরিকল্পনায় সেদিন ২৫ মার্চ আমাদের ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করেছিল। ওরা সেই একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুমন্ত ছাত্রদের উপর আক্রমন করেছে।”

লক্ষীপুর-৩ থেকে নির্বাচিত বিএনপির এমপি এডভোকেট খায়রুল এনাম বলেছিলেন-
”আজকে এই স্বাধীন দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে যে সমস্ত বক্তব্য রাখতে হচ্ছে এবং যে সংগঠন সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে হচ্ছে, তাদের কর্মকান্ডের নিন্দা জানাবার ভাষা আমার নাই। এটা এমন একটি সংগঠন যার কলঙ্কের ইতিহাস ছাড়া আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে আরম্ভ করে আজকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা পর্যন্ত তারা যেসব নারকীয় ঘটনা এই বাংলাদেশে ঘটিয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের এই স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর যে তান্ডবলীলা এ পর্যন্ত তারা ঘটিয়েছেন তার হিসাব করলে আমার মনে হয় তা মিলানো কষ্টকর হবে।
আজকে আমাদেরকে জানতে হবে তাদের উদ্দেশ্যটা কি। কি কারণে তারা বাংলাদেশের এই নিরীহ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ছাত্র সমাজের উপর যে তান্ডবলীলা চালাচ্ছে তার উদ্দেশ্যটা কি? আজকে জানতে হবে তাদের এই অস্ত্রের উৎস কোথায়? কোথা থেকে তারা এসব অস্ত্র পাচ্ছে? আমাদের জানা মতে পত্রপত্রিকায় যে সব খবর বের হয়েছে, তাতে ৩০৩ রাইফেল, এলএমজি, এসএমজি এবং ৩ ইঞ্চি মর্টার নাকি তাদের কাছে আছে। তারা এগুলি কোথায় রেখেছে, কোথা থেকে তারা এগুলি পেয়েছে তার উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
আজকে এখানে আমরা সকল মাননীয় সদস্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে এই জামাত-শিবিরের তান্ডবলীলা নিয়ে বক্তব্য রাখছি। কিন্তু আজকে আমাদেরকে নজর দিতে হবে এই জামাত-শিবির চক্র সারা বাংলাদেশে যে একের পর এক ছাত্রদের উপর, মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমন চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১ সেপ্টেম্বর যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কাউন্সিল অধিবেশন হচ্ছিল যখন বিএনপির সকল নেতা কর্মীরা এই ঢাকা শহরে উপস্থিত হয়েছিল, সে সময়ে এই জামাত শিবির চক্র অতর্কিতে আক্রমণ করে লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজের ১৪/১৫ জন ছাত্রদল কর্মীকে আহত করেছে। আজকে সেই আহতদের মধ্যে জুয়েল নামের একজন ছাত্রদলকর্মী ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।…
একটা সরকার দেশে আসীন থাকা অবস্থায় একটা রাজনৈতিক সংগঠন কিভাবে সারাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যায়? আমার মনে হয় সরকার চেষ্টা করলে এই সব সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা একেবারেই সহজ।… আজকে এই সংসদ থেকে, এই জাতির প্রতিনিধিত্বকারী মাননীয় সংসদ সদস্যদের মুখ থেকে, তাদের বক্তব্য থেকে আওয়াজ এসেছে যে, জামাত-শিবির চক্রের রাজনীতিও এই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। আমিও মাননীয় সকল সংসদ সদস্যদের সাথে একমত পোষণ করে বলতে চাই,পৃথিবীর সকল দেশে যখন এই মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশেও সেই মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আবেদন আমি এই সরকারের কাছে জানাচ্ছি।
আমি পরিশেষে বলতে চাই, এইসব সন্ত্রাসী চক্রের নিজস্ব অস্ত্র কারখানা আছে। সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে যে কোথায় তাদের সেই নিজস্ব অস্ত্র কারখানা। খুঁজে বের করে তাদের এই মৌলবাদী রাজনীতি,ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ করে দিয়ে আজকে সাধারন মানুষকে,বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে শান্তিতে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে।”

২০ বছর আগে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত বিএনপির তিনজন সদস্যের বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করেছি। সেদিন জাতীয় সংসদে বিএনপির ১৬ জন, আওয়ামী লীগের ১১ জন,জাতীয় পার্টির ২ জন,ওয়ার্কাস পার্টি, জাসদ ও ইসলামী ঐক্যজোটের একজন ও একজন স্বতন্ত্র সদস্যসহ ৩৩ জন সাংসদ প্রায় একই ভাষায় জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতার বিবরণ দিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে এ দুটি সংগঠন নিষিদ্ধকরণের দাবী জানিয়েছিলেন।

সেই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াত-শিবিরের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবীতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন ছিল তুঙ্গস্পর্শী। শহীদ জননীর আহবানে সেদিন জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ২০ বছর পর তার আন্দোলনের তরুণ প্রজন্মের ডাকে সমগ্র জাতি আবার জেগে উঠেছে। পার্থক্য হচ্ছে সেদিন বিএনপির ভেতর যে দেশপ্রেম ছিল, স্বাধীনতার শত্রুদের প্রতি যে ঘৃণা ছিলো, গত ২০ বছরে খালেদা জিয়ার হিমালয়প্রমাণ জামায়াত প্রেমের নিচে তা চাপা পড়েছে। পাকিস্তানের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিএনপির মুক্তিযোদ্ধারা আজ সাফাই গাইছেন জামায়াত-শিবিরের সকল সন্ত্রাসের পক্ষে। বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা সাংসদ মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামানের ভাষায়- “ক্ষমতার দারুণ মোহ,দারুণ নেশা। এখানে বিবেক বলে কোন কিছু কাজ করে না।”

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশপ্রেমিক নেতাকর্মীদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আর কতকাল ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের যাবতীয় হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের দায় বয়ে বেড়াবেন।

৪ মার্চ ২০১৩। ঢাকা।

১১ thoughts on “খালেদা জিয়া বিএনপির কাঁধে ‘৭১-এর ৩০ লক্ষ গণহত্যার দায় চাপিয়ে দিয়েছেন

  1. ৯৩ সালের বিএনপি, আর আজকের
    ৯৩ সালের বিএনপি, আর আজকের বিএনপির অবস্থায় আকাশ-পাতাল তফাত। যদিও এই দলটির সূচনাই হয়েছে অবৈধ প্রক্রিয়ায়। তবুও দলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা থাকায় অনেকেই এই দলটিকে সমর্থন দিত। কিংবা সমর্থন দিত বিভিন্ন কারনে নিরুপায় হয়েই (আওয়ামী লীগের কুকর্মে বীতশ্রদ্ধ হয়ে)। কিন্তু আজকের বিএনপি জামাতের বি-টীম ছাড়া আর কিছুই না। উপরে শাহরিয়ার কবির স্যার যে কজন সংসদ সদস্যের বক্তব্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে পাবনা-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য জনাব সিরাজুল ইসলাম সিরাজকে পারিবারিকভাবেই চিনি। ঐ টার্মের পর উনি আর বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাননি। এভাবেই বিএনপি থেকে দেশপ্রেমিক নেতাদের একে একে তাড়ানো হয়েছে। ফলস্বরূপ বিএনপির আজকের এই অবস্থা।

    তথ্য সমৃদ্ধ এই লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। ইতিহাস কখনও চাপা দিয়ে রাখা যায় না। ৭৫ পরবর্তি প্রতিটি সরকার এদেশের ইতিহাস অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করে একটা প্রজন্মকে অন্ধকারে রেখেছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে সঠিক ইতিহাসের আলোয় কিন্তু প্রজন্ম ঠিকই আলোকিত হয়েছে। তাই এসব ইতিহাসও একদিন এদেশের প্রতিটি মানুষের সামনে পরিষ্কার হবে। এই ধরনের লেখাগুলো দলীল হয়ে থাকবে।

  2. পূর্বঘোষিত গৃহযুদ্ধের হুমকি

    পূর্বঘোষিত গৃহযুদ্ধের হুমকি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জামায়াত সরাসরি রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করেছে যা রাষ্ট্রদ্রোহতুল্য অপরাধ।

    এই জানোয়ারদের এখনই রুখতে হবে। দেরি হয়ে গেলে রক্ষা নাই।

    বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশপ্রেমিক নেতাকর্মীদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আর কতকাল ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের যাবতীয় হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের দায় বয়ে বেড়াবেন।

    বিএনপি সে পথে যাবে না বলেই ধারণা কারণ তাদের নেত্রী স্বয়ং রাজাকারদের পক্ষে সাফাই গাইছেন। আর মুক্তিযুদ্ধকে আস্বীকার করে চলছেন বিভিন্নভাবে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে।
    এই বিএনপি প্রকৃতই জামাতের “বি-টিম” হয়ে গেছে। দুঃখজনক! এবং এ দলের নৈতিক পরাজয় হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।

  3. আমার জানা মতে বিএনপিতে বহু
    আমার জানা মতে বিএনপিতে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিনা? আমার যথেষ্ট সন্হেদ আছে। কারণ ৭১ এর সেই দিনের কথা মনে হলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের এখনও গা শিউরে উঠার কথা। আমি মুক্তিযোদ্ধা না, কারণ ৭১ এ আমার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার মত বয়স ছিল না। তারপরও ৭১ এর স্মৃতি চারণ হলে বা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন শুনলে আমার গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়। আর বিএনপি’র মুক্তিযোদ্ধারা এখনও প্রতিবাদ করছেন না কেন? পরিশেষে শাহরিয়ার কবির স্যারের তথ্য বহুল লেখার জন্য অসংখ্যা ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

  4. অসাধারণ একটা লেখা।
    গত কিছুদিন

    অসাধারণ একটা লেখা।
    গত কিছুদিন ধরে খালেদা ও বিএনপির প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেছিলাম।
    কায়মনোবাক্যে চাইছিলাম, জামাতের সাথে সাথে এরাও ধ্বংস হোক।
    এই লেখাটি পড়ে বিএনপির জন্য আমার করুণা হচ্ছে।
    ইশশশশ… কিভাবে একটা দলকে গিলে ফেললো ওরা…
    বিএনপি নেতাদের জামাত বিরোধিতার এই ইতিবৃত্ত পড়ে রোমাঞ্চিত হলাম।
    যদি তারা আজ আমাদের সঙ্গে থাকতো কত সহজ হতো জানোয়ারদের বিতাড়িত করা।
    যদিও আজ ওসব শুধুই ইতিহাস। খালেদার স্বৈরসিদ্ধান্ত ডুবিয়েছে দলটাকে।
    ক্ষমতালোভী কিছু পঙ্গপালের দল আজ বিএনপি। ধ্বংস তারা হবেই।

    স্যালুট শাহরিয়ার কবিরকে। অসাধারণ এই লেখাটির জন্য।

  5. “আজকে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা

    “আজকে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এটাই আমার কলঙ্ক। আজকে আমার সন্তানের সামনে মাথা নীচু করে আমাকে স্বীকার করতে হয়, ক্ষমতায় থাকার জন্য আমাকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে হাত মিলাতে হয়। এই ক্ষমতা দারুন মোহ, দারুন নেশা। এখানে বিবেক বলে কোন কিছু কাজ করে না

  6. অসাধারণ একটি লেখা। সবাইকে
    অসাধারণ একটি লেখা। সবাইকে শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি। বিএনপির জন্য সত্যিই করুণা অনুভব করছি। ইতিহাস যখন জামাতকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে তখন বিএনপিও সেই একই পথের পথিক হবে।

  7. ৭১ সালে পাকিস্তানিরা ছিলো
    ৭১ সালে পাকিস্তানিরা ছিলো সরাসরি প্রতিপক্ষ এবং রাজাকাররা ছিলো তাদের দোষর । ৪২ বছর পর রাজাকাররা আমাদের সরাসরি প্রতিপক্ষ এবং বিএনপি তাদের দোষর !

    1. ঠিক বলেছেন, ২০১৩-তে হানাদার
      ঠিক বলেছেন, ২০১৩-তে হানাদার হচ্ছে জামায়াত-শিবির আর রাজাকার হচ্ছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *