‘ত’ তে তুমি

– তুমি কি আসতেছ ?
– হুম
– কতক্ষন লাগবে আর ?
– এখনও দুই ঘণ্টা
– আমি রোদে পুড়ে যাচ্ছি
– ছায়ায় বসলেই পারো
– তুমি যেখানে থাকতে বলছ সেখানে কোন ছায়া নেই
– আমি রাখলাম
– একটু তাড়াতাড়ি আসো না প্লিজ
– হুম
– আর শাড়ি পরো কিন্তু
– তাহলে চার ঘণ্টা লাগবে
– এমন করতেছ ক্যান ?
– তোমার গলার ভলিউম হঠাৎ বেড়ে গেল ক্যান ? আসব না আমি
– আচ্ছা, সরি সরি। তুমি আসো আস্তে আস্তে


– তুমি কি আসতেছ ?
– হুম
– কতক্ষন লাগবে আর ?
– এখনও দুই ঘণ্টা
– আমি রোদে পুড়ে যাচ্ছি
– ছায়ায় বসলেই পারো
– তুমি যেখানে থাকতে বলছ সেখানে কোন ছায়া নেই
– আমি রাখলাম
– একটু তাড়াতাড়ি আসো না প্লিজ
– হুম
– আর শাড়ি পরো কিন্তু
– তাহলে চার ঘণ্টা লাগবে
– এমন করতেছ ক্যান ?
– তোমার গলার ভলিউম হঠাৎ বেড়ে গেল ক্যান ? আসব না আমি
– আচ্ছা, সরি সরি। তুমি আসো আস্তে আস্তে

মিহান পার্কের এক কোণায় বসে আছে। প্রচণ্ড রোদ। তবুও সে সরে অন্য কোথাও বসছে না। কারণ নিমা বলেছে তাকে এখানে না পেলে সে সাথেই সাথেই হাঁটা ধরবে। নিমার সাথে আজ তার ব্রেক আপ। ডিসিশন টা নিমারই। কি থেকে কি হয়ে গেল মিহান ভাবতেই পারছে না। কদিন আগেও মিহানের দিনগুলো এমন ছিল না। সেদিনও এমন এক মিষ্টি সকালে নিমা ফোন করেছিল,
– কই তুমি ?
– হ্যা
– হ্যা মানে ! তুমি ঘুমাইতেছ ?
– ও তুমি, হুম বল
– আমি এখন রিকশায়
– এতো সকালে কই যাও ?
– কই যাই মানে ? কালকে রাতে তো মহান মহান বাণী ছাড়লা ! আমার সাথে দেখা না হলে তোমার নাকি হৃদয়বিট বাড়ে, প্রেসার বেড়ে যায়। আর এখন বলতেছ আমি কই যাই ?
– ওহহো হ্যা দাঁড়াও পাঁচ মিনিট। আমি তো মজা করতেছিলাম। আমি তো আসলে ঘুম থেকে উঠছি বুঝছ তারপর হইল কি…
টুট… টুট… টুট…

সকাল সকাল মিথ্যায় কাজ হল না সেদিন। ওয়াশরুমে যেতে যেতে মিহান ভাবছিল আজ না জানি কপালে কি আছে। পেস্ট নিতে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় লেগে যায়। আঙ্গুল দিয়ে সেখান থেকে উঠিয়ে ব্রাশে লাগিয়ে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে বের হয় সে। যেদিনই নিমার সাথে তার ডেট থাকে বেছে বেছে ওইদিনই তার দেরি হয়। না চাইলেও হয়ে যায়। ওইদিনই তার প্রচুর ঘুম পায়। অ্যালার্ম তো দূরে থাক সকালবেলা মোবাইল খুঁজে পাওয়া যায় তার পায়ের কাছে। তড়িঘড়ি করে রিকশা নেয় মিহান।

আবারও ফোন,
– কই ?
– এইতো রিকশায়
– রিকশায় তো, আশেপাশের আওয়াজ পাই না কেন ?
– আরে আমি জ্যামে
– ও আচ্ছা আচ্ছা। আমার তো বোঝা উচিত ছিল যে তুমি জ্যামে তাই না ? সরি
– আর একটু দাঁড়াও, আর দুই মিনিট

আসতে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টার মত লেইট হয় মিহানের। দূর থেকে নিমাকে দেখা যাচ্ছে। তাকে বরাবরের মতো ক্লান্ত দেখাচ্ছে। জোরে জোরে হাঁটছে মিহান। কি অজুহাত দেয়া যায় ভাবছে সে। নতুন কোন অজুহাত আর মাথায় আসছিল না বরাবরের মতো। সামনে এক পিচ্চির কাছ থেকে আমড়া কিনল সে।

– সরি সরি এই শেষ আর জীবনে দেরি হবে না। এই আমড়ার কসম। আর যদি কখনো দেরি হয় তাহলে জীবনে আমি আমড়া খাওয়া ছেড়ে দিবো। প্রমিজ
চুপ করে বসে পরে নিমা। রোবটের মতো এক দিকে তাকিয়ে আছে সে।

– লাস্ট চাঞ্ছ এভার লাস্ট
– আমি একটা ডিসিশন নিয়ে ফেলছি
– কি ডিসিশন ?
– ব্রেক আপ
– আচ্ছা বাদ দাও, সরি
– আমি উঠলাম
– কই যাচ্ছ ? আরে আরে
নিমা হাঁটা শুরু করল। পিছে পিছে মিহান। মিহান হাত ধরতে চাইলে এক ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল নিমা। একটা রিকশা ডাকল…

– ভাইজান কি ভাবেন ?

হঠাৎ সম্বিত ফিরল মিহানের। ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখের কোণটা ভিজে গিয়েছে খেয়ালই করেনি সে।
– কিরে তুই কখন ?
– এইতো একটু আগে আইছি। আপনি দেখি কি ভাবতাছেন। তারপর আপনার পাশে বইলাম কিন্তু আপনার কোন খেয়ালই নাই। আজকে আফনে একা ! আফা কই ?
– আপা আসছে
– সবসময় আগে আফা আইসা বইসা থাকে আইজকা আফনে আগে ?

কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না মিহান। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

– তুই এখন যা ফুল বিক্রি কর। তোর আপা আসলে আসিস
– আইচ্ছা, ফুল লইবেন না ?
– নারে আজকে থাক
– লন আজকে একটা ফ্রি লন
– লাগবে নারে

তবুও যাওয়ার সময় পাশে ফুলের মালাটা রেখে গেল নেয়ামত। নেয়ামত ফুল বিক্রি করে। প্রায়ই সে মিহান-নিমার পাশে বসে থাকে। তাদের ভালোবাসার গল্প শোনে।
মালাটা ছুঁয়েও দেখল না মিহান। ওসব এখন তার মন ছুয়ে যাচ্ছে না। তার চোখ গেল সে যেখানে বসে আছে তার পাশে লাল ইট দিয়ে লেখা S+R এ। হয়ত কোন প্রেমিকযুগল এসে তাদের ছোট্ট স্মৃতি রেখে গেছে। হয়ত অক্ষরগুলো তাদের দুজনের নামের প্রথম অক্ষর। মিহান এক টুকরা ইট নিয়ে একটা নাম কেটে দিচ্ছে বারবার। এক প্রকার ক্ষোভ নিয়েই ইট ঘষছে সে। পাশে আবার নতুন করে লিখল ম+ত।

সেইদিন মিহান অনেকবার ফোন দিয়েছিল নিমাকে। কিন্তু ফোন অফ। পরের চারদিন পর্যন্ত ফোন অফ। বাসার নিচে উঁকি ঝুঁকি মেরেও তার বারান্দার কাপড় ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না মিহান। ক্যাম্পাসে আসাও বন্ধ করে দেয় নিমা। এস এম এস, ভয়েস এস এম এস কোন কিছু বাদ রাখেনি মিহান। যখন মিহানের প্রায় পাগল পাগল অবস্থা তখন একটি ছোট্ট ম্যাসেজ আসে তার ফোনে,
‘শেষ দেখা কর’
সাথেই সাথেই ফোন দেয় মিহান। এক মিনিটের মতো কথা হয়। ঠিক হয় আজকের দিন।
চার ঘণ্টা হল মিহান বসে আছে। নিমা যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি সে। মিহানের মাথা নিচু। চোখ বন্ধ।

– কি ব্যাপার নেশা করেছ ?
মিহান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। মিহানের চোখ মুখ লাল। চুল উস্ক শুষ্ক।
ওকে দেখে নিমারই খুব খারাপ লাগতে লাগল। বেচারার এ অবস্থা হবে তা সে কখনো ভাবেনি।
– বসো। কিছু খাইছ টাইছ নাকি ?

মিহান কিছু বলল না। কেন জানি তার কান্না পাচ্ছে খুব। নিমা বুঝতে পারল এ কয়টা দিন মিহানের কেমন কেটেছে। তা তার চেহারায় স্পষ্ট। এখন খুব মায়া হতে লাগল নিমার। তার রাগ গুলো যেন গলতে শুরু করল। তারও উপায় ছিল না। একটা মেয়ে সবসময় আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাপারটা কেমন ওটাই একটু বোঝাতে চেয়েছিল মিহানকে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে সে বোধয় বেশিই করে ফেলেছে।
– আজকে আগে এলে কীভাবে ?
– এমনিতেই। এখন আর রাতে ঘুম হয়না
– কেন ঘুম হয়না ?
– এমনি
– কেমন লাগল ওয়েট করতে ?
মিহানের চোখ এবার ছল ছল করছে। কেঁদে দিবে মনে হয়। অনেক কষ্টে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
– ক্যান করলা এমন তুমি ? আমি কি ইচ্ছা করে করি বল ?
– কি করলাম ?
– তুমি জাননা ?
– তোমার একটা শিক্ষার দরকার ছিল
– আমাকে শিক্ষা দিয়ে তুমি খুশি ? তুমি ভালো ছিলা এতদিন ?
– কিছু করার ছিল না। তোমার এটা দরকার ছিল
– তুমি জানো আমি তোমাকে কতবার ফোন দিছি ? কতো খুঁজছি ?
– জানি
– না তুমি জানো না

মিহান আস্তে করে নিমার ওড়নাটা টেনে চোখ মুছতে লাগল। নিমা কিছু বলল না। বেচারার এ অবস্থা দেখে তার নিজেরই এখন অনুশোচনা হচ্ছে। নিমা তার ব্যাগ থেকে নেইল কাঁটার বের করে বলল,
– দেখি হাত দাও
– নখ বড় হয়নি তো
– হাত দাও বলছি
– না, সেদিন তুমি নখ কাটতে গিয়ে চামড়া ছিলে ফেলছ। পরে ভাত খাইতে পারতেছিলাম না। শেষমেষ বাম হাত দিয়ে…
– কি ! তুমি বাম হাত দিয়ে ভাত খাইছ ! ছিঃ
– না মানে, আসলে কি করবো বল ? মেসে আমাকে কে খাইয়ে দিবে ?
– তাই বলে বাম হাত ?
– তো কি করবো ? আমি আর নখ কাটব না তোমার কাছে
– কাটবা না মানে একশোবার বার কাটতে হবে তোমাকে। হাত দাও বলতেছি
– আজকে আঙ্গুল কাটলে আমাকে কিন্তু খাইয়ে দিতে হবে বলে রাখলাম
– এহ মুল্লুকের মগ?
হঠাৎ নিমার চোখ গেল তার পাশের বসার জায়গায়।
– এটা কি লিখছ ?
– তোমার আর আমার নাম
– বাংলায় লিখছ ক্যান ? কেমন খ্যাত খ্যাত লাগতেছে !
– আচ্ছা বিয়ের পর যদি আমি লুঙ্গি পরি তাহলেও কি আমাকে খ্যাত বলবা ?
– অবশ্যই
– তোমার আব্বু বাসায় কি হাফ প্যান্ট পরে থাকে ?
– ফালতু কথা রাখ আগে বল, ম তে মিহান বুঝলাম কিন্তু ‘ত’ তে কি ?
– ‘ত’ তে তুমি

এবার কেমন করে জানি নিমা তাকাল মিহানের দিকে। মিহান অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল। অদ্ভুত সে দৃষ্টি। মিহান পাশে থাকা মালা টা নিয়ে নিমার হাতে গুজে দিল। নিমা হাত খুলে দেখছে না। যেন দেখলেই সব ফুরিয়ে যাবে। গন্ধ উবে যাবে। সে চায় না এই গন্ধ উড়ে যাক। এই সুবাস চলে যাক। এই সময় হারিয়ে যাক …
দূর থেকে নেয়ামত গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে।

(গল্পের আদলে লেখা জীবনের প্রথম কোন গল্প ছিল এটা আমার। কোনো উপায়তেই এটা গল্পের কাতারে ফেলা যায় নাহ। তবুও প্রথম লেখা বলে কথা।অন্যরকম ভালো লাগা আছে এ গল্পে। অনেক ভুল আছে গল্পে। কখনো তা ইচ্ছে করেই সম্পাদন করিনি। প্রথম গল্পে কিছু ভুল থাকা উত্তম। এবং এ ভুল অপরিবর্তিত রাখা যেন আরও উত্তম ব্যাপার।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *