ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা চাই

ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা চাই? এটা আবার কেমন ব্যাপার! দৌড় প্রতিযোগিতা, নাচ- গান, রচনা প্রতিযোগিতা খুব বড় জোর পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার প্রতিযোগিতার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা কেন? ইতিহাসে যে সব বড় বড় মানুষেরা আছেন তারা কি সবাই ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা করেছিলেন। “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভালো হইয়া ছলি” এটাওকি ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতার জন্য? আমাদের চারপাশ টা একটু খেয়াল করলেই এই উত্তর টা পাওয়া যাবে। এখন চারদিকে শুধু প্রতিযোগিতা চলছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সেরা মডেল, সেরা গায়ক হওয়ার প্রতিযোগিতা। কার চেয়ে কে কত টাকা বানাতে পারে সে প্রতিযোগিতা। শিশু কিশোরদের প্রতিযোগিতার ধরণ এখন বলতে গেলে আগের থেকে অনেক বদলে গেছে। বলা ভালো আয়োজন করে বদলে ফেলা হয়েছে।

এখন কিশোরদের আলোচনার বিষয় হলো কজ আপ ওয়ান ্এর সম্ভাব্য বিজয়ী কে হতে পারে বা হলিউড বলিউডের সাম্প্রতিক ছবির হিটলিস্ট কি? প্রতিযোগিতা চলতে থাকে কার থেকে কে বেশি হিন্দি সিনেমার গান গাইতে পারে। খোলা মাঠের খেলা ধুলা আর সুস্থ্য’ নির্মল আনন্দের পরিবর্তে শিশু কিশোরদের বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিডিও গেমস আর মোবাইল টিভি চ্যানেলের অসুস্থ্য সব বিজ্ঞাপন ও ছবি। একা একা খেতে চাও তবে দরজা বন্ধ করে খাও – এমন বিজ্ঞাপনগুলো বন্ধুসৎলব শিশুদের কোমল মনকে চুড়ান্ত রকমের স্বাথপরতার শিক্ষাই দিচ্ছে। শুধূ নিজের কথাই ভাবার এই শিক্ষা তাদেরকে ভয়ংকর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে তারই এক উদাহরন পাওয়া যায় গত বছর ওশি নামের এক ১০ম শ্রেনির স্কুল ছাত্রী মাদকের টাকা না ফেয়ে তার বাবা – মাকে হত্যার ঘটনা থেকে।

এক সময় ছেলে মেয়েরা অনুসরণ করতো বড় মানুষদের চরিত্র। যেমন, ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের চাদর কিংবা রবিন্দ্রনাথের দাড়ি গোঁফ রাখার প্রতিযোগীতা। কিন্তু আজকের দিনে তা কি হয়। এখন কার ছেলেরা অনুসরণ করে মেসি কিংবা নেইমারের চুল রাখার ধরন। গত বছরের বিজয় দিবসে সময় টেলিবিশনের একটা অভিযানে ছাত্র থেকে শুরু করে সকল প্রকার মানুষ কে প্রশ্ন করে উত্তর মেলে এক অদ্ভুদ ধরণের। যা আমার বলতে গৃনা হয়। আমরা কেমন দেশে বসবাস করি। আমরা কেমন জাতির সাথে বসবাস করি। আমরা আমাদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারছিনা সেটার প্রমান সে দিন্িট।
আগে স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে তিন গোয়েন্দার বই কিংবা শখের স্ট্যাম্প কেনার প্রতিযোগিতা হতো আর এখন টাকা জমানোর প্রতিযোগিতা চলে ভিডিও গেমস খেলা কিংবা অলিগলিতে সহজলভ্য পর্ণ প্রত্রিকা আর সিডি কেনার জন্য। টাকা কামানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত কোম্পানী গুলো টিভি প্রত্রিকার বিজ্ঞাপনের মাধ্যেমে এমন প্রভাব বিস্তার করছে এখন স্কুল ছাত্রদেরও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাড়িয়েছে মোবাইল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর তরুণদের মোবাইল ব্যাবহার করার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে অশ্লীল ম্যাসেজ আর পর্ণ কিপসের ব্যপক বিস্তারের কারণে। কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন আর পর্ণগ্রাফির কল্যানে এখন ছেলে মেয়ে পরস্পর পরস্পর সম্পর্কে লালন করে এক ধরনের বিকৃত অসুস্থ মানসিকতা। ‘তোমার জন্য মরতে পারি ও সুন্দরী তোমার গোলার মালা’ – এই ধরনের নি¤œরুচি সম্পুর্ন জনপ্রিয় গান গুলো কিশোরদের মনে বন্ধুত্ব পুর্ণ মানসিকতার পরিবর্তে যে ধরনের দৃষ্টি ভঙ্গি প্রকাশ করে তার প্রভাব দেখা যায়, রাস্তা বা মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্লীল মন্তব্য শোনার ঘটনায়। অন্যদিকে শিক্ষা-সংস্কৃতি-ব্যক্তিত্য সমস্ত কিছুকে চাফিয়ে গায়ের রং আর বাইরের সৌর্ন্দয্যই যে মেয়েদের একমাত্র যোগ্যতা, বিউটি ক্রিমের এই ধরনের বিজ্ঞাপনের কল্যাণে এখন ছোট বেলা থেকে কিশোরদের মনে আপ্রান চেষ্টা চলছে কি করে নিজেকে আরো সৌর্ন্দয্য করে উপস্থাপন করা যায়। অভিবাকরাও পাল্লা দিয়ে নিজের মেয়েকে সুন্দরী করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। গত কয়েক বছর আগে প্রথম আলো প্রত্রিকার একটি খবর বের হয়- এক জরিপে দেখা গেছে বৃটেনের শিশুরা ব্রিটেনি স্পিয়ার্স এর মতো গায়িকা কিংবা বেক হামের মতো তারকা ফুটবলার হতে চায়। কিন্তু কোন শিশু বলেনি বড় হয়ে শেক্সপিয়ারের মতো বড় সাহিত্যিক বা আইনস্টাইনের মতো বড় বিজ্ঞানী হবো। এটা শুধু ব্রিটেনের চিত্র নয়। এটা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ গুলোতে একই অবস্থা। যা আমাদের বাংলা দেশের ও একই অবস্থা। কিছুদিন আগে একজন ছাত্র কে একটা প্রশ্ন করে জিজ্ঞেস করলাম তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও? সে উত্তরে বলে আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। আমি বললাম কেন ডাক্তার হওয়া ছাড়া আর কি কোন কিছু হতে পারবেনা? সে আমাকে বলে আর অন্য কিছুতে কি টাকা আছে। তাহলে বুঝতে পারা যায় খুব সহজে আমাদের কমল মতি শিশুরা ও এখন টাকা কিভাবে আয় করা যায় তার চিন্তা করছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের বিশ্ব জোয়ারে শিশু কিশোরদেরও এখন অন্যতম আলোচ্ছ বিষয় রোনালদো, রোনালদিনহো, নেইমার আর সবার আগে মেসি। অথচ মজার ব্যপার হলো আর্জেন্টিনা সেরা না ব্রাজিল এই তীব্র যুদ্ধে অগ্রনী এই সব কিশোরদের ফুটবল কেমন খেলে জানতে চাওয়া হলে বলবে ভিডিও গেমস এ খেলেছে অথবা টিভিতে দেখেছে। ফ্যাট বাড়ি স্কুল পরিবেশে বড় হওয়া এইসব শিশু কিশোরদের মাঠ হচ্ছে কম্পিউটার মনিটর আর ফুটবলের অস্ত্র ভিডিও গেমসের বাটন। ম্যারাডোনা – প্যালেদের নিয়ে গর্ব করলেও এরা জানেইনা যে জীবনের সাথে কত কষ্টকর লড়াই করে ম্যারাডোনা প্যালেরা জুতা পালিশ করা ছেলে থেকে আজকের এই বিশ্ব তারকা হয়েছে। কারণ প্রচার মাধ্যেম গুলো তাদের জীবনের এই সব দিককে আড়াল করে শুধু মাত্র তারকা খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বানিজ্যের প্রতিযোগিতা চলছে। তাই সুন্দর দিকগুলোর পাশাপাশি তাদের জীবনের এই ভালো দিক গুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ এই্ প্রজন্ম কে দেয়া হচ্ছেনা।

এত কিছুর পরও অদ্ভুদ আমাদের অভিভাবকদের আচরণ। ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ অথবা ‘শুধু নিজের টা ভাবে’। এই সব বাক্য মাথায় বদ্ধমুল করেই তারা নিজেদের সন্তানদের মানুষ করার মরিয়া চেষ্টা করেন। কাসে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতাটি হলো এখন কার মা বাবাদের কছে একমাত্র অনুমোদন যোগ্য ব্যাপার। চারপাশে সমস্যা সংকট নিয়ে যাতে সন্তান রা ভাবতে না পারে মাথা না ঘামাতে পারে এই ব্যাপারে তারা সদা সতর্ক। ছোট থেকে ছেলে মেয়েদের একটা কথা শুনাতে থাকেন‘এট কষ্ট করে টাকা পয়সা খরচ করে তোমাদের মানুষ করছি কি অন্যদের কথা ভাবার জন্য?’ শুধু আমাদের কথা ভাবা ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবতে পারবেনা। আর যদি রাজনৈতি বা সমাজ নিয়ে ভাবার কথা আসলে ‘ঘরে খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর দরকার নেই’? অথচ আমাদের পড়াশুনা করার জন্য স্কুল কলেজ নির্মান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রতিটি প্রয়োজন মেটানোর জন্যই যে আশা নিয়ে আমরা সমাজের কাছে কোনো বা কোনো ভাবে রীনি সেটা শিশু কিশোরদের বুঝতেই দেয়া হয় না। দেশের অর্থনৈতির অপরিহায্য কারিগর হাজার হাজার শ্রমিক যখন নিজেদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের জন্য বিদ্রোহ করে, ইদের দিনে শ্রমিক দের যে বাড়ি এসে সবার সাথে আনন্দ উল্লাস করবে কিন্তু শ্রমিক রা সেই ইদের দিনেও ঢাকা শহরে তাদের মুজুরি আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছে অথবা দেশের মানুষের অন্নের সংস্থান করতে গিয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে কৃষক যখন নিজের অন্নের জন্য হাহাকার করে মরে, তখন ছাত্র দের বোঝানো হয় ‘এইসব বিষয় নিয়ে ভাববার বিষয় নেই তোমাদের তোমরা শুধু পড়ালিখা করবে’ – ছাত্রানং অধ্যয়ং তপঃ’- অর্থাৎ কিনা অধ্যায়ন ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা। অথচ শ্রমিক কৃষক থেকে শুরু করে সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের করের টাকা দিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা হাসপাতাল নির্মান করা না হলে কারো বাবা-মায়ের সাদ্য নেই এককভাবে এসব নির্মান করে সন্তানের পড়াশোনা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা = এই সহজ কথাটাই শিশুদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখা হয় নানা কথার মারপ্যাঁচে।

একসময় মানুষের জীবনের লক্ষ্যেথাকতো মানুষের মতো মানুষ হওয়া। ছোট শিশুদের মানুষ শুভ কামোনা জানাতো ‘মানুষ হও অনেক বড় হও’। বাবা মায়ের চিন্তার বিষয় থাকতো সন্তানকে মানুষ করতে পারবোতো। ‘সৎ পথে চলবে, সত্য কথা বলবে, আর্তের সেবা করবে, অসহায়ের পাশে দাড়াবে’ এগুলো ছিল জীবন চলার পথে মানুষের জন্য অনুসরণীয় পথ। কিন্তু এখন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ঠিক করে দেয়া হয় অনেক বড় হতে হবে – তবে সেটা মানুষ হিসেবে মানবিকতা নিয়ে নয় । তাহলে একটা সত্য ঘটনা বলি যা গত কয়েকদিন আগে ঘটেছিল, কয়েক দিন আগে নিজের সামনে এই অভিজ্ঞতা হলো। মীরসরাই বরতাকিয়া পূর্ব খৈয়াছড়া সরণিকা সংঘ‘র একটা স্কুল প্রতিযোগিতায় ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিরা প্রশ্ন করতে লাগলো ‘বাবা, মা তুমি বড় হলে কি হতে চাও?’ সবার একটা উত্তর কেউ বলে ডাক্তার কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। অবাক হলাম কেউ রাজনীতি বিদ হতে চায় না। একছাত্রকে বলে দিলাম তুমি গিয়ে বলবে আমি রাজনীতি বিদ হবো কিন্তু সে তা বলেনা, বললো আমি ডাক্তার হবো।আসলে এটা এই ছোট ছোট শিশুদের কোনো দোষ নয় দোষ এই সমাজের। কারণ এই সমাজ তাদের ্্এগুলো শেখায়। তারা যে বই পড়ে ক, খ, অ, আ শিখে সেই বই গুলোতে তাদের শেখানো হয়ে থাকে । শিখানো হয়ে থাকে যে যত বেশি গাড়ি বাড়ী টাকার মালিক সে তত বেশি বড় মানুষ। বাবা মায়েরাও তাই সন্তানদের এভাবে মানুষ করার জন্য উঠে পড়ে লাগগেন। স্কুল পড়ার টেবিল আর স্যারের বাসা, কাসে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা এর বাইরে কিছু যেন ভাবতে পারেন না। অথচ আপনারা দেখেন যেই রাজনৈতি করার জন্য বাবা মায়েরা নিষেধ করে থাকেন সেই রাজনীতি তাকে পরীচালনা করে থাকে। সেই রাজনীতি তার জীবন গড়ে থাকেন। সেই রাজনীদি সে কত টুকু পড়া লিখা করবে সে আজ খাবে না পড়বে । এবং সে যেই পড়ে বড় লোক হবে সেই বই নির্ধারণ করে থাকে এই রাজনৈতি। আজ কাল পাড়া বা মহাল্লায় কনর্সাট বা সংগীতা অনুষ্ঠান হলে সেখানে যেতে দেয়া হতো কিন্তু বন্যা-মঙ্গার জন্য বন্ধুরা মিলে ত্রাণ সংগ্রহ করার মতো অকাজে অনুমোতি দেয়া? – কক্ষনো নয়। সেই জন্য বলছি ভারো হওয়ার জন্য যদি একটা প্রতিযোগিতা দেয়া হতো তাহলে ভালো হতো। অন্ততঃ প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জনের জন্যে হলেও মানুষ ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা দিতো। নীতি-নৈতিকতা, সুস্থ রুচি, মুল্যবোধ নিয়ে বড় মানুষ, মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতো।

অন্ধকারে থেকেও মানুষ আলোর সপ্ন দেখে। আশা রাখে। আরো সপ্ন দেখি। এতকিছুর পর ও আমাদের শিশুরা আমাদের সপ্ন দেখাচ্ছে। ইরাক আফগানিস্তারের শিশুরা তাদের দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছে হাতে অস্ত্র ধরছে। আমাদের দেশেও বন্যার সময় টিফিনের টাকা তুলে শিশুরা বন্যাভাসী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

তাই বলছি শিশুদের যা করতে ইচ্ছে হয় তা করার সুযোগ দিন। তাদের বড় মানুষ হওূয়ার সুযোগ দিন। যারা পৃথিবীকে জয় করবে মানবিকতা দিয়ে, মনুষ্যত্ব দিয়ে, মানুষের জন্য তাদের ভালোবাসা দিয়ে।

২ thoughts on “ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা চাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *