কিশোর-তরুণদের মনোজগতের সংকট: সমস্যা, শঙ্কা ও সমাধান

আমাদের বোধ থেকে-নৈতিকতা বোধ, মূল্যবোধ থেকে-আমরা যেন দিনে দিনে দূরে সরে যাচ্ছি। হয়ে যাচ্ছি নির্বোধ, জড়িয়ে পড়ছি অপরাধবোধে। হারিয়ে ফেলছি স্বাতন্ত্র্যবোধ।


আমাদের বোধ থেকে-নৈতিকতা বোধ, মূল্যবোধ থেকে-আমরা যেন দিনে দিনে দূরে সরে যাচ্ছি। হয়ে যাচ্ছি নির্বোধ, জড়িয়ে পড়ছি অপরাধবোধে। হারিয়ে ফেলছি স্বাতন্ত্র্যবোধ।

আমাদের তরুণ সামাজের দিকে তাকালে এই বিষয়টি আরো পরিস্ফুট হয়ে উঠবে। মাদকের নীল ছোঁয়া ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে তাদের একটা বিরাট অংশই ডুবে আছে। হতাশ তরুণদের কাছে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-ই যেন আদর্শ। তাইতো, দু:খে বা অপ্রাপ্তির অনুযোগে ভারাক্রান্ত হয়ে মাদকের মাদকতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে তিলে তিলে শেষ করাই যেন মোক্ষ, যেখানে অক্ষম হয়ে যায় বিচারবুদ্ধি। সেই সমাজে তরুণ-তরুনীরা সহজেই হয়ে পড়েছে চরম হতাশাগ্রস্থ। হতাশাগ্রস্থ মরিয়া তরুণরা ষষ্ঠ নরক থেকে সপ্তম নরকে, মানাক থেকে চলে যাচ্ছে ‘হাবিয়া’ দোজখে। দিশেহারা তরুণ সমাজের ‘টেনে-হিঁচড়ে এগিয়ে চলা’ বা তথাকথিত ‘মুক্তির আম্বেষণের’ বলি হচ্ছে সমাজের অন্য মানুষজন, যেখানে ল্যাপটপ চুরি করার জন্য বন্ধুকে খুন করা বা ঐশীর মতো নিজের বাবা-মাকে খুন করে ‘পতিত অন্ধকার’-এ মুক্তির তালাশ করার মতো ঘটনা যেন বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।

আসলে মারাত্বক এক শূন্যতা বিরাজ করছে আমাদের এই সমাজ সংসারে, যে শূন্যস্থানে সহজেই ঢুকে পড়ছে নৈতিক অবক্ষয়। তা হচ্ছে ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক দুই জীবনেই। পিতা-মাতা ব্যস্ত থাকে অর্থ উপার্জনের নেশায়, অথবা সামাজিক অবস্থান বাড়ানোর আশায়। ব্যস্ত থাকে তার দিনরাত। সন্তানকে ঠিকমত দেখ ভাল করার, সময় দেয়ার সুযোগ তাদের হয়না। তারা মনে করে সন্তানকে অঢেল হাত খরচ দিলেই হলো। আবার তারাই সন্তানদের অঢেল স্বাধীনতা দিয়ে মাঝে মাঝে স্বৈরশাসকের ভূমিবায় অবতীর্ণ হয়ে একেবারে নজর বন্দী করে রাখেন। এ যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফাস্কা গেরো’। পুঁজিবাদী এই সমাজে পিতা-মাতা সন্তানদের কে ‘মানুষের মত মানুষ’ হিসাবে গড়ে তুলতে চান, আর এই ‘মানুষ, তারা মনে করেন সন্তানের প্রচুর টাকা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোটাকে। তারা সন্তানদের কর্ণগোচরে এই কথা কদাচিৎ বলে যে, তোমাকে হতে হবে একজন আদর্শবাদী মানুষ, ভালবাসতে হবে মানুষকে, হতে হবে ত্যাগী, লোভের কাছে কখনো বিকোনো যাবেনা আত্বসত্ত্বাকে। পুঁজিবাদী সমাজের ‘অর্থ-কেন্দ্রিক স্বার্থপর’ নীতি এখানে সমূলে উৎসারিত, যেখানে সমাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টাকা কামানোর মেশিন হিসাবে দেখতে চায়, একজন নি:স্বার্থ জনগণের সেবক হিসাবে নয়। নিজেকে মেশিনের মত ক্রমবর্ধমান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবেই পরিনত করাই যেন মোক্ষ, যেখানে শিল্প, সাহিত্য মানবসেবা, সহ সকল সুকুমার বৃত্তিগুলো এই সব মানুষের কাছে মিশতেই যেন সাহস পায়না এভাবে জাতির ভবিষ্যত হয়ে বাড়ছে দেহসর্বস্ব, অন্তসারশূন্য। অপরদিকে, তরুণদের কাছেও পয়সার ঝনঝনানিটাই যেন বেশি চটকদার মনে হয় সবসময়। তাইতো, দেখা যায়, সিজিপিএ বৃদ্ধির পড়াশুনা, ক্যারিয়ার ও ভোগের আশা ছাড়া তাদের আর কোন লক্ষ থাকেনা।

অথচ দেখা গেছে যে সকল তরুণ-তরুণীরা পাড়াশোনার পাশা-পাশি লিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বা সামাজিক কাজ কর্মের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখতে পেরেছে, তারা কখনোই বিপথে যায়না। ভাল কাজে স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব মানুষের মধ্যে ত্যাগের আদর্শ তৈরী করে মনটাকে অনেক বড় করে, বাড়িয়ে দেয় অন্তর্নিহিত শক্তি। সততা ও নৈতিকতা তাদের ভিতর অবস্থান করে, তাইতো তরুণদেরকে নষ্ট জবিনের মজা কখনোই আকর্ষণ করতে পারেনা। একজন রোভার স্কাউট বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য সাধারণত কখনোই নষ্ট পথে পা বাড়ায়না। আর একটা বিষয় আলোকপাত না করলেই নয় যে, বর্তমান সমাজে বাবI-মাসন্তানদের সাথে যেন শাসকের ভূমিকাই পালন করেন, তারা যেন অনেকটাই কঠোর ও মনমানসিকতার দিক থেকে সেকেলে। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন, যার কারণে সন্তান কোন সমস্যায় পড়লে বাবা-মায়েরা সাথে শোয়ার করতে পারেনা। উল্টো সমস্যার কথা বললেই কিছু বাবা-মা সন্তানদের এত ছোট করেই দেখেন যে, পোষ্যরা বিতস্ত্রত থেে বিধবস্ত হয়ে পড়ে। তাদের মনের মধ্যে জন্ম নেয় ক্ষোভ, যার অনেকটা হয় বাবা-মার প্রতিও। এই রকম ক্ষোভ ও সংক্ষুব্ধতা থেকেই জন্ম নেয় ঐশীর মতো পিতা-মাতা হন্তারক। অথচ বাবা-মা যদি সন্তানের পাশে ভালবাসা ও বন্ধুত্বা নিয়ে দাঁড়াতেন, তাহলে এধরণের-ঘটনা, হয়তো কখনোই ঘটতোনা। এতো গেল একটা দিক। কোন পরিবারের মেয়ে সন্তানটি যদি ইভ-টিটিংয়ের শিকার হয়, অনেক সময় দেখা যায় বাবা-মা সেই মেয়েটিকেই এর জন্য দোষারোপ করে থাকেন। ফলশ্র“তি তে কণ্যা সন্তানটি আরো ভেঙ্গে পড়ে এবং কখনো আতœহননের পথও বেছে নেয়। এই দায় কে নেবে?

পরিশেষে বলা যায়, তরুণসমাজোর নৈতিক অবক্ষয় ও হতাশাগ্রস্থতার পেছনেই আমাদের সমাজা ও পরিবারের কিছু ‘ভয়াবহ শূন্যতা’ দায়ী। যে পরিবারে শিশুদের ‘জি-বাংলা’ ও ‘স্টার জলসা’ দেখিয়ে বড় করা হয়, সেইসব পরিবারের সন্তানদের কাছে দেশ ও সমাজ ভবিষ্যতে তেমন কিছুই আল করতে পারেনা। যে পরিবারের সন্তানের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় যে দুনিয়ার বস্তুগত সাফল্যই সব, তখন সন্তানদের অনেকেই মাদক, নারী ও অর্থকেই একমাত্র আরাধ্য ভাবতেই পারে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জীবন-ঘনিষ্ট মানবতাবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। সন্তানদের দু:সময়ে তাদের তিরস্কার না করে বুকে টেনে নিতে হবে, তাদেরকে অন্ধকার জগৎ থেকে বের হতে সাহায্য করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মকেও ভালবাসা, শান্তি, বন্ধুত্বের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে হবে। শিল্প সাহিত্য, সংগীত, সাংগঠনিক কাজের মতো সৃষ্টিশীল কাজে জড়িত থেকে নিজেদের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। হারমান হেসের ‘সিদ্ধার্থ উপন্যাস বা ‘জন লেনলের ‘ইমাজিন’ গানের মমার্থ যারা বুঝতে পেরেছে, তারা কি কখনো বিপথে যেতে পারে? যে তরুণের মাঝে দেশপ্রেমের প্রজ্জ্বল শিখা দেদীপ্যমান, সে কি শিশা লাউঞ্জের ধূম্রজ্বালে ইন্দ্রজ্বালিত হতে পারে?

** লেখাটি ২০১৩ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর চতুর্মাত্রিক ব্লগে প্রথম প্রকাশিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *