একই কারাগারে বাপ-বেটার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ


এমন ভাগ্য কয়জনের হয়, একই স্থানে বাপ-বেটার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা। স্থানটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, এ যেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য নির্ধারিত। জানা যায়, ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই সাকার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় রহস্যজনকভাবে মারা যান। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা ও পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করায় দালাল আইনে আটক ছিলেন। এর ৪২ বছর পর গেল ২২ ডিসেম্বর একই অপরাধের দায়ে ফাঁসির কাষ্ঠে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

ফজলুল কাদের চৌধুরীর জীবন ও কর্ম
১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার গহীরা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ল’ কলেজ থেকে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪১ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হবার পর ১৯৪২ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন। মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে তিনি মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন। এ পদে থাকা অবস্থায়ই তিনি ১৯৫৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। পরে তিনি মুসলিম লীগের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৬২ সালে আইউব খানের সামরিক শাসনের শেষ পর্যায়ে মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় কৃষি ও পূর্তমন্ত্রী, শিক্ষা ও তথ্যমন্ত্রী এবং শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হন।

১৯৬২ সালে কনভেনশন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েও মন্ত্রিসভায় থাকায় সুপ্রীম কোর্ট তার সদস্যপদ বাতিল করায় ১৯৬৩ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ওই বছর অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে পুনরায় তিনি পুনরায় জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং ২৯ নভেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে পুনরায় তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তবে তবে আইউব খানের সাথে বিরোধের কারণে দলীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ১৯৬৬ সালে তাঁকে মুসলিম লীগ (কনভেনশন) থেকে বহিষ্কার করা হয়।

১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারের পতনের পর কনভেনশন মুসলিম লীগ তিনভাগে বিভক্ত হলে ফজলুল কাদের দলের একটি অংশের সভাপতি নির্বাচিত হন। ফজলুল কাদের চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধিতা করে দখলদার পাকবাহিনীর সঙ্গে সর্বাত্বক সহযোগিতা করেন। চট্টগ্রামে রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।

১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর পর হয় ১৯ জুলাই বিমানে করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমান বন্দরে তার লাশ নেয়া হলে সেখানে ব্যাপক জনসমাগম হয়। চট্টগ্রামের প্যারেড স্কয়ারে তার নামাজে জানাযায়ও ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। ২০ জুলাই তাকে রাউজানের গহিরায় পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। ফজলুল কাদের চৌধুরীর মৃত্যুর ৪দিন পর খ্যাতিমান সাহিত্যিক আবুল ফজল দৈনিক ইত্তেফাকে ‘যার যা প্রাপ্য’ শীর্ষক এক লেখায় তার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করেন। জাতীয় পরিষদের স্পীকার হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তিনি পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট থাকার এক পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা জেলায় তার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জীবন ও কর্ম
সাকা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ, চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহীরা গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। পড়াশোনা শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের সাদিক পাবলিক স্কুলে। পরবর্তীতে সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড স্কুলে ভর্তি করায় তার পরিবার। ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ফের পাকিস্তানে যান এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ (অনার্স) করেন।

পিতার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে সাকা চৌধুরী রাজনীতি করতেন মুসলিম লীগে। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে মুসলিম লীগ সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে সাকার বাবা ফকা চৌধুরী ও তার পরিবার চট্টগ্রামের বহু মানুষের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয় পৈশাচিক গণহত্যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে হত্যা-নির্যাতনসহ অসংখ্য অপরাধে মামলা দায়ের হয়। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সাকা। আর বাবা ফকা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় লুটে নেওয়া প্রায় দেড় মণ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে নৌযানে করে পালানোর সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহীরা উপকূলে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে কারাগারে বন্দী অবস্থায় ১৯৭৩ সালে মৃত্যু হয় ফকার।

এর বেশ পরে দেশে ফিরে আসেন সাকা। ক্ষমতার নেশায় ফের সক্রিয় হন রাজনীতিতে। ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে প্রথমবারের মতো রাউজানের এমপি নির্বাচিত হন। এরপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হন। কেবল তা-ই না, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আবারও এমপি নির্বাচিত হয়ে ক্রমান্বয়ে একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব পান সাকা। কিন্তু পরে এরশাদ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। সেখান থেকে বের হয়ে ১৯৮৮ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে নিজেই একটি দল গঠন করেন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে নিজের এই দল থেকেই ফের রাউজানের এমপি নির্বাচিত হন। আধিপত্যশীল এই নেতা পরে নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন সালাউদ্দিন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও এমপি নির্বাচিত হন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন সাকা চৌধুরী।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি থেকে অংশ নেন সাকা। রাঙ্গুনিয়াতে হেরে গেলেও ফটিকছড়ি অর্থাৎ চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে ফের বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে বরাবরই জনগণের মধ্যে ভয়-ভীতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেছেন সাকা। সে কারণেই বিভিন্ন দল থেকে মোট ছয়বার এমপি নির্বাচিত হন তিনি। জীবনভর তার কথা-বার্তার ধরন ছিল লাগামছাড়া।

শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, সারা দেশের মানুষও তার শিষ্টাচার বিবর্জিত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সঙ্গে পরিচিত। এমনকি তার নিজ দলের প্রধান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য দেওয়ায় ২০০১ সালে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরই নির্বাচনের আগে আবার দলে ডেকে নেয় বিএনপি। এ নিয়ে দলের বড় একটি অংশই তাকে চোখের কাঁটা হিসেবে দেখতেন। আত্মীয়তা ও পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সূত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে নানা নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন সাকা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ‘অশালীন’ মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা কুড়ান তিনি।

বিচারের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে কটাক্ষ করা ছাড়াও বিভিন্ন পর্বে নিজের অতীত ও বর্তমান নিয়ে দম্ভোক্তি করেছেন সালাউদ্দিন। নানা ঢঙে বিদ্রুপ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রতিও। এসব নিয়ে তার কখনোই কোনো মাথাব্যথা ছিল না। অকপটেই মুখে যা খুশি তাই বলে যেতেন এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধী অপরাধী।

ফকা চৌধুরীর চার ছেলের মধ্যে সাকা চৌধুরীই সবার বড়। তার সেজ ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির আরেক বড় নেতা। অপর দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রয়াত সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। তাদের দুই ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরী। আর মেয়ের নাম ফারজিন কাদের চৌধুরী।

হরতালে গাড়ি পোড়ানোর একটি মামলায় ২০১০ সালে বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে আটক হয়েছিলেন সাকা। যদিও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় ১৯ ডিসেম্বর। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিলে ১৮ নভেম্বর তা আমলে নেন বিচারক। এরপর ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়।

প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওই বছর ৩ মে শুরু হয় এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ। ২৩টি মামলার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, গণহত্যাসহ নয়টি মামলায় দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর চলতি বছর ২৯ জুলাই সাকার করা আপিল আবেদনেও ফাঁসির রায় বহাল রাখেন আদালত। সর্বশেষ গত ১৮ নভেম্বর পুনর্বিবেচনার আবেদনটিও খারিজ করে দেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। যদিও ওইদিন পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনা একটি ভুয়া সনদ দিয়ে শেষ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন সাকার আইনজীবীরা। যুদ্ধকালীন সময়ে সাকা পাকিস্তানে ছিলেন-এমন হাস্যকর নাটক সাজাতে চেয়েছিলেন তারা।

মূলকথা, মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে এমন নানা অপচেষ্টাই চালিয়েছেন সাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতের কাছে হার মানতেই হলো এই অপরাধীকে। এমনকি বাঁচার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়েও ক‚ল পেলেন না ইতিহাসের জঘন্য এই অপরাধী। আইন ও গণমানুষের আবদারের জোরে দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সাকা-জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়। অবসান হলো কুখ্যাত রাজনীতিকের কলঙ্কময় জীবন।

আর এভাবেই পিতা-পুত্র সুযোগ পেলেন একই কয়েদখানায় মৃতুর স্বাদ গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ!

২ thoughts on “একই কারাগারে বাপ-বেটার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *