বহিপীর

বইঃ বহিপীর ( নাটক) /১৯৬০, ঢাকায় প্রকাশিত।
লেখকঃ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ


বইঃ বহিপীর ( নাটক) /১৯৬০, ঢাকায় প্রকাশিত।
লেখকঃ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

বহিপীর নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে এক পীরকে কেন্দ্র করে। এই পীর সারা বছর বিভিন্ন জেলায় তার অনুসারীদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ান। এক এক এলাকায় একেক ধরনের ভাষা। তাই তিনি বিভিন্ন এলাকার ভাষা শিক্ষা না করে বইয়ের ভাষায়ই কথা বলে থাকেন। একারণে তার নাম হয়েছে বহিপীর । নাটকটির কেন্দ্রীয় এ চরিত্রটির নাম অনুসারেই নাটকের নাম রাখা হয়েছে বহিপীর’। নামটির একটি প্রতীকী তাৎপর্যও রয়েছে। বাঙালি মুসলমান সমাজে পীর সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয় কুসংস্কার ও ধর্মীয় বইয়ের পাতা থেকে। মূলত ইসলাম ধর্মের সুফিবাদী ব্যাখ্যার সূত্র ধরেই পীর সমাজের সৃষ্টি। এ হিসেবে তারা ধমীয় ব্যাখ্যা, মাসায়েল বইয়ের পাতা থেকেই মানুষের সংস্কারকে পুঁজি করে সমাজে ছড়িয়ে পড়েন। নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর পিতা ছিলেন ম্যাজিস্টেট। পিতার চাকরি বদলির সূত্রে ওয়ালীউল্লাহ সারা বাংলাদেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান। তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন জেকে বসা পীর প্রথা কাছে থেকে দেখে অভিজ্ঞতা তার নাটকে তুলে ধরেন।
>>নাটকের কাহিনি-সংক্ষেপ
বহিণীর নাটকটি গড়ে উঠেছে বহিণীরের সর্বগ্রাসী স্বর্থ ও নতুন দিনের প্রতীক এক বালিকার বিদ্রোহের কাহিনিকে কেন্দ্র করে। ডেমরার ঘাটে অবস্থানকারী একটি বজরা। বজরাটি রেশমপুরের জমিদার হাতেম আলির। দুটাে কামরা একটি সদর কামরা, অপরটি পুরনারীদের জন্য সংরক্ষিত কামরা। সদর কামরার সামনে পাটাতনে বেশ খানিকটা ফাকা জায়গা। গত রাতের ঝড়ে একটি আধাডোবা নৌকা থেকে বহিপীর ও তার খাদেম হকিকুয়াহ নৌকায় উঠে প্রাণ বঁচিয়েছেন। তিনি এখন সদর কামরায় বহিপীরের সাথে কথা বলছেন। একই সময় বজরার জেনানা কামরায় জমিদার গিন্নি খোদেজা বেগম এবং পুত্র হাশেম আলি তাহের নামী সদ্য কৈশোর পেরুনো, ঘর পালানো এক যুবতির সাথে আলাপ করছেন। গতকাল ডেমরার ঘাটে যুবতিটি একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিল। ছেলেটি ক্ষুধায় কাদছিল। তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। কোথায় যাচ্ছে তাও তারা জানত না। তাদেরকে ঘিরে জটলা জমে গিয়েছিল। দু-একজন বদলোক মেয়েটির দিকে অন্য সৃষ্টিতে তাকচ্ছিল। ঠাট্ৰামকরা করতেও শুরু করছিল তাদের কেউ কেউ। এমনি অবস্থায় জমিদার গিন্নি চাকর দিয়ে তাহেরা নামের যুবতীটিকে বজরায় ডেকে আনেন। জিঙ্গাসার জবাবে তাহেরা জানান – সে মাতৃহারা। তার কুসংসারছন্ন বাবা ও সত মা তাকে বৃদ্ধ পীরের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সে এ অন্যায় বিয়ে মেনে না নিয়ে; বাড়ি থেকে পালিয়েছে। তাহেরার এ কথায় খোদেজা বেগম অবাক হন।
**তিনি বলেন, “বিয়ে হলো তকদিরের কথা। কারও ভালো দুলা জোটে, কারও জোটে না। কেউ স্বাস্থ্য, সম্পদ সবই পায়, কেউ পায় না। তাই বলে পালতে হয় নাকি? ওটা কত বড় গুনাহ তা বোঝ না।”***
এদিকে জমিদার হাতেম আলির জিজ্ঞাসার জবাবে বহিপীর বলেন, দেশের নানা স্থানে তার মুরিদান। একেক স্থানে একেক ঢঙের জবান চালু। এক সন্থানের জবান অন্য স্থানে বোধগম্য হয় না, হলেও হাস্যকর ঠেকে। এ সমস্যার সমাধান করার জন্য পীর সাহেব বইয়ের ভাষা চর্চা করে ..ঐ ভাষাতেই আলাপ-আলোচনা, কথাবার্তা করে থাকেন। এ কারণেই তিনি বহিপীর’ নামে পরিচিত ও খ্যাত। বহিপীরের জিজ্ঞাসার জবাবে জমিদার হাতেম আলি বলেন, শরীরটা তার ভালো যাচ্ছিল না। চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি সদরের কাচরিতে এসেছেন। বিবি-বেটা সাথে আসতে চাওয়ায় তাদেরকেও সাথে করে নিয়ে এসেছেন। আসলে জমিদার হাতেম আলি বহিপীরের নিকট তার শহরে আসার উদ্দেশ যেমন গোপন করেন, জমিদার সাহেবের কাছে তার এদিকে আসার উদ্দেশ্য এড়িয়ে যান। – জমিদার হাতেম আলি ও বহিপীরের কথোপকথনে তাহেরার সন্দেহ জাগে। জমিদার বজরায় উঠে শহরে গেলে তাহেরা হাশেমের কাছ থেকে জানতে পারে , বাইরের কামরায় অবস্থানরত বৃদ্ধই সুনামগঞ্জের বহিপীর। মহুর্তে তাহেরা বজরা হতে নদীতে ঝাপ দিয়ে ডুবে মরতে চায়, কিন্তু জমিদার পুত্র হাশেম তাকে আশ্বস্ত করে – তাহেরার অমতে তাকে পীর সাহেবের হাতে তুলে দেওয়া হবে না।
শহর হতে ঘুরে আসা জমিদার কে খুব দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ ও চিন্তিত দেখে পীর সাহেব কারণ জিঙ্গেস করে? জমিদার তার কাছে জানায় তিনি আর্থিক সংকটে আছেন। আর সেই কারণে তার জমিদারী আজ সূর্যাস্থ আইনে নিলামে উঠেছে। জমিদারি রক্ষার জন্য তিনি শহরের বন্ধুদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এসেছেন। আর এ সংবাদটি তিনি পরিবারের সবার কাছে গোপন রেখেছেন। চিকিৎসার অজুহাতে তিনি শহরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন। জমিদারকে নানা সানা দিয়ে বহিপীর তার সফরের আসল কারণ খুলে বলেন এবং তার বিয়ে করা বিবি যে জমিদার সাহেবের বজরাতেই আশ্রয় নিয়েছেন, তাও তিনি জানান।

নাটক একখানে এসে জটিল এক ধারায় মোড় নেয়।
তাহেরাকে জমিদার পত্নীর নানা ধর্মীয় ভয় ভীতি দেখিয়ে চলে কিন্তু তাহেরা পীরের সাথে তার বিয়ের কথা স্বীকার করে না। এর মাঝে জমিদার পুত্র হাশেম মানবিক কারণে তাহেরার পক্ষ নেয়ার ফলে ঘটনা আরো জটিল রুপ ধারন করে।
এক্ষেত্রে মায়ের সাবধান বাণী, বহিপীরের ভীতি প্রদর্শন, পিতার করুণ মুখ কিছুই তাকে টলাতে পারে না। সে তাহেরাকে বাঁচাতে চায়। এমোন কি বিয়ে করে হলেও।
আর এখানে বহিপীর কূটচালের আশ্রয় নেয়। । তার বেয়াড় বিবিকে উদ্ধারে তিনি পুলিশের আশ্রয় গ্রহণ করার অভিনয় করেন। কিন্তু জানে, এতে অনেক ঝামেলা। “তাই ও পথে আর এগোয় না। তিনি প্রথমে ধর্মীয় বিয়ের দোহাই দেয়। কিন্তু তাহেরা তার পাল্টা যুক্তি দিলে তা থেকে তিনি সরে এসে ধর্মবিরতার বাহানা করেন। বলেন, এ মেয়ে কখনো স্নেহ-মমতা পায়নি। তার কাছ থেকে স্নেহ-মমতা পেলে বুঝতে পারবে …। এতেও কাজ না হওয়ায় তিনি জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি টাকা দিয়ে জমিদারের জমিদারি রক্ষা করার প্রস্তাব করেন। শর্ত হিসেবে তহেয়াকে ফেরত পেতে চান। এ পর্যায়ে জমিদার পত্নী খোদেজা বহিপীরের এ প্রস্তাবকে আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে গন্য করে গ্রহণ করতে রজি হন। তিনি তাহেরাকে বহিপীরের কাছে ফিরে যেতে বলেন। তখন পিতার অসহায় মুখ ও কষ্টদীর্ণ হূদয়ের কথা ভেবে হাশেম আলির হাহাকারে পরিবেশকে বেদনবিধুর করে তোলে মাত্র। তার বিনিময়ে একটি জমিদারি, জমিদার পরিবার রক্ষা পাচ্ছে, এই বোধ তাহেরাকে বহি পীরের কাছে আত্মসমর্পণে উৎসাহিত করে।
*কিন্তু এ পর্যয়ে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁকে বসেন জমিদার হাতেম আলি। কেননা তার নিজেকে নিজের কাছে হীন, স্বার্থপর, ছোট মনে হয়। তার মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। তিনি পীরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এক পর্যায়ে তাহেরা ও হাশেম আ’ল পালিয়ে যায়। জমিদার হাতেম আলি তাদের রুখতে গেলে বহিপীর তার হাত চেপে ধরেন। খোদেজা বেগমের আর্তচিৎকারে বহিপীর তাকে ধৈর্য ধরতে বলেন। এখন এক নতুন মানুষ বহিপীর। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে একজন বুদ্ধিমান, বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন, দার্শনিক সত্তর শুদ্ধতম উচ্চারণ –“এতক্ষণে ঝড় থামিল, তাহারা গিয়াছে, যাক। তাছাড়া তো আগুনে বাপাইয়া পড়িতে যাইতেছে না। তাহারা তাহদের নতুন জীবনের পথে বাইতেছে। আমরা কী করিয়া তাহদের ঠেকাই। আজ না হয় কাল, যাইবেই।”

ভবিষ্যৎ ভেবে উদ্বিগ্ন খোদেজা বেগমের জিজ্ঞাসার জবাবে বহিপীর লেন- “এত বিচলিত হইবার কী আছে? আমরা সকলে তো রহিলাম। আমরা থাকিব; আপনার জমিদারও থাকবে, আমরা আমাদের পুরাতন সুরদার মধ্যে সুখে-স্বচ্ছদে বাকি দিন কাটাইয়া দিব। চিন্তার কী কারণ?”

>> বহিপীর বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রচলিত পীর প্রথার একটি বিশ্বস্থ দলীল। নাটকটি শেষ পর্যন্ত আমাদের আলোর পথ দেখায়, ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থা বদলানর বাস্তব শিক্ষা দেয়। তাই আসুন সময় এখন ——লাথি মারি এই সব ভন্ড পীরদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *