আত্মহত্যানামা

মধ্যরাতের ফোন দুই প্রকার। এক- অতি জরুরি ফোন। দুই- অতি বিরক্তিকর ফোন!
আমি মোবাইল ব্যবহার করছি প্রায় দশ বছর ধরে। এই দীর্ঘ এক দশকে অদ্যবধি একটাও “মধ্য রাতের অতি জরুরি ফোন” পাইনি। যে কয়টাই পেয়েছি সবগুলোই ছিল দ্বিতীয় প্রকারের। কলেজে থাকতে এক সহপাঠী রাত আড়াইটায় ফোন দিয়ে বলেছিল- সফিক! তুমি জাফর ইকবাল-এর “ক্যাম্প” বইটা পড়ছো? আমি মাত্রই পড়ে শেষ করলাম। অসাধারণ না? কারো সাথে ডিসকাস না করা পর্যন্ত ঘুম আসতেছিল না! ঈশ! শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলল ছেলেটাকে… আমার এত্তো খারাপ লাগতেছে জানো! রাজাকারটার কথা শুনছো? আমার তো রাগে গা জ্বলতেছে… হারামজাদাটাকে জ্যান্ত পুতে ফেলতে ইচ্ছে করতেছে…!


মধ্যরাতের ফোন দুই প্রকার। এক- অতি জরুরি ফোন। দুই- অতি বিরক্তিকর ফোন!
আমি মোবাইল ব্যবহার করছি প্রায় দশ বছর ধরে। এই দীর্ঘ এক দশকে অদ্যবধি একটাও “মধ্য রাতের অতি জরুরি ফোন” পাইনি। যে কয়টাই পেয়েছি সবগুলোই ছিল দ্বিতীয় প্রকারের। কলেজে থাকতে এক সহপাঠী রাত আড়াইটায় ফোন দিয়ে বলেছিল- সফিক! তুমি জাফর ইকবাল-এর “ক্যাম্প” বইটা পড়ছো? আমি মাত্রই পড়ে শেষ করলাম। অসাধারণ না? কারো সাথে ডিসকাস না করা পর্যন্ত ঘুম আসতেছিল না! ঈশ! শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলল ছেলেটাকে… আমার এত্তো খারাপ লাগতেছে জানো! রাজাকারটার কথা শুনছো? আমার তো রাগে গা জ্বলতেছে… হারামজাদাটাকে জ্যান্ত পুতে ফেলতে ইচ্ছে করতেছে…!

এই হচ্ছে আমার মাঝ রাতের ফোন ধরার অভিজ্ঞতা! তা সত্যেও আমি কখনও আমার পার্সোনাল নাম্বার সায়লেন্ট করে ঘুমাই না। যদিও আমি এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি না যে রাত দুপুরে আমাকে কারও জরুরি দরকার হবে। তবুও এটা আমার স্বভাব… আসতেও তো পারে কোনদিন অতি জরুরি কোন ফোন!

আর ঠিক সেজন্যই আজকেও যখন রাত প্রায় সোয়া দুইটায় মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা ফোনটাকে অবজ্ঞা করতে পারলাম না। কাঁচা ঘুম ভাঙ্গা চোখ দু’টো অনেক কষ্টে মেলে স্ক্রিনের নাম্বারটা একবার দেখে নিয়ে কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে যথা সম্ভব স্পষ্ট স্বরে বলার চেষ্টা করলাম- হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম?
ওপাশ থেকে খুব আস্তে করে কে যেন বলল- হ্যালো…!
আমি আরেকটু জোরে বললাম- হ্যালো! কে বলছেন?
একটা দীর্ঘশ্বাস এর আওয়াজ। তারপর নারী কণ্ঠ- আমি কান্তা। আপনার প্রতিবেশী…
– কোন কান্তা!?
– আমাকে আপনি চিনবেন না। তবে আমি আপনার একজন প্রতিবেশী!
– প্রতিবেশী! মানে?
– মানে আমার নাম্বারটা দেখুন…
আমি স্ক্রিনে নাম্বারটা আরেকবার দেখলাম। কিন্তু কিছু বুঝলাম না। পরক্ষণেই নাম্বারটা পরিচিত মনে হল! আমার নাম্বার শেষে ৩১, এরটা ৩০।
– হুম… দেখলাম! তো জনাবা প্রতিবেশী… আমি আপনার জন্য এই রাত দুপুরে কী উপকার করতে পারি?
– খুব বেশি কিছু না; জাস্ট পাঁচ মিনিটের মত সময় নেব। আপনাকে একটা জিনিস পড়ে শোনাবো। আপনি শুধু চুপচাপ শুনবেন। মন চাইলে কোন মন্তব্য করতে পারেন। মন না চাইলে শুনেই ফোন রেখে দিতে পারেন। আই প্রমিস, আর ফোন করবো না।
আমার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো। রাত দুপুরে এই আজাইড়া ফোন ধরলাম এতো সাধের কাঁচা ঘুমটা নষ্ট করে!
– পাঁচ মিনিট দূরে থাক, আমার তো এক্ষুণি রেখে দিতে ইচ্ছা করছে! রাত বিরাতে আপনি এগুলা বলার জন্য ফোন দিয়েছেন?
– সেটা আপনার ইচ্ছা! মন চাইলে লাইন কেটে দেন…

আমি সত্যি সত্যি কেটে দেবার জন্য কান থেকে মোবাইলটা সরালাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাটলাম না। সেটা কি অপর পাশের ব্যক্তিটি একজন নারী বলে নাকি নেহায়েত সৌজন্যবোধ নিজেই জানি না! একটা লম্বা হামি তুলে বললাম- কী শোনাবেন? কবিতা-টবিতা নাকি! মাত্রই লিখেছেন?
একটা মৃদু হাসির শব্দ পেলাম। তারপর দিরিয়াস স্বরে বলল- না, কবিতা না। আপনাকে আমার আত্মহত্যানামা পড়ে শোনাবো।
– কি! কী পড়ে শোনাবেন?
– আত্মহত্যানামা। ইংরেজিতে বলে ‘সুইসাইড নোট’। অবশ্য বাংলাটা শুদ্ধ হয়েছে কিনা জানি না। এটা আমার নিজের দেয়া নাম… ভাল হয়নি?
– দ্যাখেন! আপনি মহিলা মানুষ বলে উল্টা-পাল্টা কিছু বললাম না। রাত আড়াইটায় আমাকে ফোন দিয়েছেন আপনার সুইসাইড নোট পড়ে শোনাতে! ফাইজলামী করেন আপনি?
– জ্বি না। আমি সিরিয়াস। আমি সত্যি সত্যী আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি। সেজন্যই সুইসাইড নোট লিখেছি। এতোক্ষণে করেই ফেলতাম হয়তো। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো ‘সুইসাইড নোটটা কাউকে পড়ে শোনাই!’ কিন্তু পরিচিত কাউকে করা যাবে না। তাই…
– বাহ! হোয়াট এ্যান আইডিয়া! তা আমাকেই কেন পছন্দ হলো? আপনি তো ২৯ কেও ফোন দিতে পারতেন! সত্যি করে বলুন তো আপনার মতলবটা কী?
– উম… অতো ভেবে আসলে ফোন করিনি। আমার নাম্বার তো শেষে ৩০। আনমনে নিজের নাম্বারটাই লিখছিলাম মোবাইলে… হটাৎ ৩ পর্যন্ত লিখে মনে হলো- ‘আমি তো ০, দেখি তো ১ কে!’ আর তখনই হঠাৎ মাথায় আসলো- ‘১ যদি ফোন ধরে তাহলে সুইসাইড নোটটা তাকে পড়ে শোনালে কেমন হয়!’
– বাপরে! কী লজিক! আর কী সুন্দর কাব্যিক বর্ণনা! উনি ‘শূন্য’ আর আমি ‘পূর্ণ’! ‘শূন্য’ ফোন দিয়েছে ‘এক’কে, মাঝরাতে সুইসাইড নোট পড়ে শোনানোর জন্য…
– হিহিহি… এভাবে তো ভাবি নাই। আপনি তো অনেক মজার কথা বলেন দেখছি!
– জ্বি না! আমি মোটেও মজা করছি না। আমি প্রচন্ড বিরক্ত… ফাইজলামীর একটা সীমা থাকা উচিৎ! মানুষের মাথায় কোত্থেকে আসে এগুলা? দয়া করে ফোনটা রাখেন; নিজেও ঘুমান, লোকজনকেও ঘুমাতে দেন…

ওপাশের নারী কণ্ঠটা হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে গেল।
– আপনি সত্যি বিশ্বাস করছেন না যে আমি আত্মহত্যা করবো, তাই না?
– না। করছি না। করার কোন কারণও নেই। যে মানুষ আত্মহত্যা করবে সে থাকবে মানসিক ভাবে প্রচণ্ড আহত। সে এমন গভীর রাতে অপরিচিত মানুষকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে তুলে রং-তামাশা করবে না! হি হি করে হাসবে না…
নারী কণ্ঠ আহত স্বরে বলল- ও!
আমি আরও যোগ করলাল- সুইসাইড নোট পড়ে শোনাবার আইডিয়াও তার মাথায় আসবে না…
ওপাশ থেকে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস। অস্পষ্ট স্বরে বলল- ও!
তারপর কয়েক সেকেন্ড নিরবতা।
– আমি আজ কতদিন পর হাসলাম জানেন? ইন ফ্যাক্ট কারো সাথে এতোগুলো কথাই বললাম অনেকদিন পর…

কণ্ঠটা খুব বিষণ্ণ শোনালো। আমি মোবাইলটা অন্য কানে নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বললাম- তাহলে তো এখন আপনার মন ভাল হয়ে গেছে! এখন এসব বাদ দিয়ে একটা ঘুম দেন… আসলেই সুইসাইড করতে চেয়েছিলেন?
– চেয়েছিলাম না, এখনও চাইছি।
– তাহলে আগেই করে ফেললে পারতেন! খামোখা আমাকে ফোন দিয়ে বিপদে ফেললেন। কাল যখন পুলিশ কেস হবে তখন সবার আগে আমাকে ধরবে! কারণ, মৃত্যু পূর্ব মুহূর্তের লাস্ট ডায়াল নাম্বারটা আমার… নির্ঘাত ‘ব্যর্থ প্রেমের কেস’-এ ফাঁসাবে আমাকে!
নারী কণ্ঠ অনেক্ষণ খিল খিল করে হাসলো। হাসতে হাসতেই বলল- আপনার তো অনেক বুদ্ধি! এতো কিছু তো মাথায়ই আসেনি আমার…
– তা আসবে কেন? আসছে তো এই উদ্ভট আইডিয়া! নিজে মরবেন ভাল কথা! আরেকজনকে বিপদে ফেলবেন কেন খামোখা?
– তাইতো! কিন্তু আমার এখন সত্যি ইচ্ছা করছে আপনাকে বিপদে ফেলি! অন্তত বিপদে পড়ে হলেও কেউ তো আমায় সারা জীবন মনে রাখবে…
– এ্যাঁহ! বলে কী? ফাঁসিতেই যদি ঝুলি তাহলে আর সারাজীবন মনে রাখার সুযোগ কই!
– আরে নাহ! আপনি ফাঁসিতে ঝুলবেন কেন? মৃত্যুর পর সবাই বুঝবে যে আমি আত্মহত্যা করেছি। আপনার হয়তো জেরার মুখে পড়তে হবে, দুই চারদিন থানা হাজত কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে… এর বেশি কিছু না।
– কোন দরকার নাই ভাই। আপনি মরলেও প্লিজ দুই চারটা দিন পরে মরেন… আমাকে ফাঁসাবেন না।
– উঁহু! আমাকে যা করার আজই করতে হবে। তাছাড়া আত্মহত্যানামায় দিন তারিখ দিয়ে ফেলেছি।
– দিন তারিখ এডিট করা যায় না?
– না। যায় না।
– আজকেই মরতে হবে?
– হুঁম… আজকেই!
– কখন মরবেন?
– ফজরের আযানের পর পরই…
– কেন? আযানের পর কেন? নামায পড়ে আল্লাহ্‌র কাছে মাফ টাফ চেয়ে তারপর?
– ধুর! মাফ টাফ চাওয়ার কিছু নেই। ওসব গড-ভগবান-পরকাল-টরকাল থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে অনেক আগেই। সৃষ্টিকর্তা বলে আদৌ কিছু নেই। থাকলে আজ আমাকে সুইসাইড করতে হতো না!
– ও আচ্ছা। তা কিভাবে মরবেন ঠিক করছেন? বিষ? নাকি ফ্যানের সাথে ওড়না পেচিয়ে ঝুলে পড়বেন?
– আরে নাহ! ওসব বিদঘুটে স্টাইল আমার পছন্দ না। অনেক কষ্ট পেয়েছি জীবনে, আর না। মরার সময় অন্তত শান্তিতে মরতে চাই…
– ও! বুঝেছি… তাহলে ঘুমের ঔষধ?
– ধুর! আপনি দেখি আত্মহত্যার ব্যাপারে কিচ্ছু জানেন না! সুইসাইড করার জন্য ঘুমের ঔষধ হচ্ছে সবচেয়ে অকর্মা পন্থা! বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরদিন হাসপাতালে নিয়ে নাক দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে ঔষধ বের করে ফেলে। মরা তো যায়ই না উল্টা প্রেস্টিজ পাংচার! মাথায় বিন্দু মাত্র বুদ্ধি থাকলে কেউ ঘুমের ঔষধ খেয়ে মরার চেষ্টা করে?
– কী জানি! আমি কিভাবে বলব? আমি তো আর আত্মহত্যা করার কথা ভাবিনি কখনও! তা কিভাবে মরবেন তাহলে?
– হাতের রগ কাটবো। ধারালো ব্লেড দিয়ে একটা পোচ… পোচটা দিতেই যত ভয়। একবার দিয়ে ফেলতে পারলে আর চিন্তা নেই!
– ইয়াক! জঘন্য… রক্তারক্তি করে বিশ্রী অবস্থা!
– আরে না! রক্তারক্তি হবে না… ২০ লিটারের একটা বালতি অর্ধেক ভরে বিছানার পাশে রাখবো। পোচটা দিয়েই বিছানায় শুয়ে হাত ডুবিয়ে দেব পানিতে…
– কেন! আবার পানিতে হাত ডুবাবেন কেন?
– এতে ব্যথা লাগে না আর। তাছাড়া বাতাসে জমাট বেধে অনেক সময় আপনা আপনি রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পানিতে ডুবিয়ে রাখলে ভেনের মুখে রক্ত জমাট বাঁধতে পারবে না। পুরোটাই বের হয়ে যেতে পারবে। প্রায় শতভাগ অব্যর্থ পদ্ধতি। এবং এটাই মোটামুটি সবচেয়ে কম খরচে, কম যন্ত্রণা ভোগ করে সহজে ও সল্প সময়ে আত্মহত্যা করার সর্বোত্তম উপায়!
– বাপরে! আপনি কি মেডিক্যালের স্টুডেন্ট নাকি? এত্ত কিছু জানলেন কিভাবে?
নারী কণ্ঠ হাসলো- আপনাকে যত বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম আপনি ততটা না। এসব জানতে আজকাল ডাক্তার হওয়া লাগে নাকি! ইন্টারনেটে কত ভিডিও টিউটোরিয়াল আছে জানেন?
– কী সাংঘাতিক!!!
– কেন? সাংঘাতিক কেন?
– সাংঘাতিক না? নেটে ‘সহজ পন্থায় আত্মহত্যার কলাকৌশল’ এর ওপর ভিডিও টিউটোরিয়ালও আছে!
– আরেহ্‌… এটা তো মামুলি জিনিস। কাপড় কাঁচা সাবান দিয়ে কিভাবে বোমা বানাবেন সেটা পর্যন্ত জানা যায়… অতি সহজে কিভাবে মানুষ খুন করা যায় তার ওপরও বিস্তর তথ্য আছে। কোন কোনটা দারুণ ইন্টারেস্টিং! আমার যদি আত্মহত্যা না করে কাউকে খুন করার অপশন থাকতো তাহলে আমি সেগুলিই এপ্লাই করতাম…
– খাইছে! বলে কী? কী ডেঞ্জারাস মেয়েরে বাবা!

নারী কণ্ঠ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখী দুঃখী স্বরে বলল- আমি মোটেও ডেঞ্জারাস মেয়ে না। আমি অতি সাধারণ ভিতু টাইপ একটা মেয়ে। কোরবানীর গরু জবাই করা দেখতে পারতাম না কোনদিন। সেই আমি কিনা আজ নিজের হাতের রগ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছি!
আমি একটু সান্ত্বনার সুরে বললাম- কেন মরতে চাইছেন? বয়ফ্রেন্ড ছ্যাঁকা দিয়ে চলে গেছে?
– কেন! এমন মনে হলো কেন? বয় ফ্রেন্ডের ছ্যাঁকা খাওয়াই কি মেয়েদের সুইসাইড করার একমাত্র কারণ?
– না, ঠিক তা না… তাহলে কেন?
– সেটা তো আপনাকে বলব না! কারণ কিছু নিশ্চয়ই আছে… কিন্তু সেটা আমি আমার ‘আত্মহত্যানামা’তেই লিখি নাই; আপনাকে কেন বলব?
– আপনার আত্মহত্যানামার বাইরেও তো অনেক কিছুই বললেন। এটাও নাহয় বলেন…
– উঁহু! ব্যক্তিগত ব্যাপারে তেমন কিছু বলিনি তো।
– এই যে, কখন কিভাবে মরবেন সেটা তো বললেন! এটা কি ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল না?
– মোটেও না! কখন কিভাবে মরলাম তা মৃত্যুর পর সবাই এমনিতেই জানবে। এমন কোন ব্যক্তিগত কিছু না!
– ও!
– আমি বরং আপনাকে আমার আত্মহত্যানামা পড়ে শোনাই। তারপর বিদায় হই। সময় তো বেশি নেই। ফজরের আযান কয়টায় দেয়? চারটার দিকে না?
– ঠিক জানা নেই। রোজার মাস হলে বলতে পারতাম। তখন সেহেরী খেতে উঠতে হয় তো!
– ও। আচ্ছা বাদ দেন। এখন কী লিখেছি শোনাই?
– না শুনলে হয় না? শুনতে ইচ্ছা করছে না…
– আপনি যে কোন সময় ফোন রেখে দিতে পারেন। আগেই তো বলেছি…
– না না, ফোন রাখা লাগবে না। মানে এমনি কথা বলি…
– কী কথা?
– কী কথা জানি না… আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে- আপনি কেন আমাকে ওটা পড়ে শোনাতে চান আমি সেটা বুঝতে পেরেছি!
– কী বুঝতে পেরেছেন? কেন শোনাতে চাই? কই কোন কারণ নেই তো!
– আছে। অবশ্যই আছে। আপনি আসলে চাচ্ছেন কেউ একজন আপনার সুইসাইড নোটটির কথা শুনে ব্যথিত হোক। আপনার প্রতি সিমপ্যাথি অনুভব করুক। আপনাকে সান্ত্বনা দিক, দুই একটা আশা-ভরসার কথা বলুক…
– মোটেই না! আপনার ধারণা ভুল। আমার আত্মহত্যানামায় তেমন কিছু লেখা নেই। আমি মোটেও কোন আশা-ভরসার কথা শুনতে চাচ্ছি না।
– লেখা নেই হয়তো। কিন্তু এই যে অপরিচিত কাউকে ফোন দিয়ে এটার কথা বলছেন, এটাই কি যথেষ্ট না? যে কোন মানুষই কাউকে আত্মহত্যা করতে দেখলে বাঁধা দেবে!
– কেউ বাঁধা দিলেই শুনতে হবে? আপনি শুরু থেকেই সোজা সাপ্টা কথা বলছেন বলে শুনতে ভাল লাগছে। এতোক্ষণ ধরে কথা বলতে পারছি সেজন্যই, নইলে অনেক আগেই হয়তো আমি নিজেই ফোন রেখে দিতাম… কারও মন ভোলানো কথা শোনার ইচ্ছে নেই আমার। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি এবং অনেক ভেবে চিন্তেই নিয়েছি সেটা।
– হুম… হতে পারে। আমি একটা গল্প শুনেছিলাম। ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজ’-এর। এই ব্রিজটি ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি সম্পূর্ণ অন্যরকম কারণে। গত প্রায় আট দশকে এর ওপর থেকে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। এরকমই একজন লোক নাকি তার এপার্টমেন্টে বসে সুইসাইড নোটে লিখে রেখে গিয়েছিল- “আজ যদি গোল্ডেন ব্রিজ যাবার পথে একজন মানুষও আমার দিকে তাকিয়ে হাসে তাহলেও আমি আত্মহত্যা করবো না…”
এবং সেই লোকটি আর ফিরে আসেনি! কত হতভাগা মানুষই না আছে দুনিয়ায়…
নারী কণ্ঠ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললঃ 15 September 2005. Milton Van Sant… I’m going to walk to the bridge. If one person smiles at me on the way, I won’t jump…! নাহ্‌, ঐ আশি বছরের বুড়ার মত আমার কোন উইশ নেই। কোন শর্ত বা কিন্তু-যদি নেই।
– বাহ! আপনি জানেন দেখছি! সেজন্যই বলছি… হয়তো সচেতন ভাবে উইশ করেননি। কিন্তু অবচেতন মন এটাই চাচ্ছিলো। নইলে মনের অজান্তেই কেন সম্পূর্ণ অপরিচিত কাউকে ফোন দেবেন? ফোন দিয়ে আপনার সুইসাইড নোট পড়ে শোনাতে চাইবেন?

কয়েক মুহূর্ত নিরবতা। তারপর বিষণ্ণ স্বরে নারী কণ্ঠ বললঃ অবচেতনের কথা কে বলতে পারে? ওটা অচেতনই থাক নাহয়। আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাবো না…
– দ্যাখেন, আমি আপনাকে কোন সান্ত্বনা দিচ্ছি না। আপনার জীবনে কী ঘটেছে আমি জানি না। আত্মহত্যাকামী কাউকে আমি কখনও সান্ত্বনা দিতে যাই না। আজকাল অনেকে ফেসবুকেও সুইসাইড নোট টাইপ স্ট্যাটাস দেয়। তাদের প্রতিও আমার বিন্দু মাত্র করুণা হয় না; বরং বিরক্তি হয়। এদের প্রতি আমার দর্শন হলোঃ “যদি সত্যি মনে হয় তোর জীবন এতো সস্তা, মরা ছাড়া আর কোন গতি নাই, তাহলে তোর মত অপদার্থের মরাই উচিৎ! জলদি মর, পারলে এক্ষুণি মইরা যা। তুই মরলে দুনিয়া থেকে অত্নত একটা গর্ধব কমে… নিজে না পারলে আমার কাছে আয়, তোরে থাবড়াইয়া মাইরা ফেলি!
নারী কণ্ঠ খিল খিল করে হেসে উঠলো আমার কথা শুনে। হাসি থামতে সময় লাগলো। আমি আরও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললামঃ এবারের মত হাতের রগটা না কাটলে হয় না?
নারী কণ্ঠ দৃঢ় ভাবে বলল- না, হয় না। আই এম কমিটেড টু সুইসাইড। কিছুই বদলাবে না। কাল সকালে সব কিছু যেমন ছিল তেমনই থাকবে। আমার জীবনের ভার আমাকেই বইতে হবে। কেউ এসে বদলে দিয়ে যাবে না। তারচেয়ে শেষ হয়ে গেলেই ঝামেলা চুকে যায়…
– ঠিক বলেছেন! কেউ এসে বদলে দিয়ে যাবে না। বদলাতে হবে নিজেকেই। প্রতিটি সকালই নতুন একটা দিন নিয়ে আসে। নতুন ভাবে নিজেকে বদলাবেন না শেষ করে দেবেন সেটা আপনার ইচ্ছা। রাত জেগে নিজের ঘুম নষ্ট করে এতো ক্ষণ কথা বলেছি বলেই আপনাকে উপদেশ দেবার অধিকার তৈরি হয়ে যায়নি আমার। শুধু একটা কথা বলিঃ কালকের দিনটা অনেক সুন্দর… না দেখে গেলে মিস করবেন!
– আপনি ভালোই কথা জানেন। রাতের ঘুম হারাম করে অনেক ধৈর্য্যের সাথে সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু দুঃখিত, আপনার কথাটা রাখতে পারছি না… বড্ড দেরী হয়ে গেছে! আমার আর কোন পথ খোলা নেই…!
আমি আরও কিছু বলার আগেই লাইনটা কেটে গেল। কয়েক সেকেন্ড ভেবে ডায়াল করলাম নাম্বারটায়। বন্ধ! আরও কয়েকবার চেষ্টা করেও পেলাম না… কী করব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।

রাত জাগার কারণেই কিনা জানি না ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল অনেক। অফিসে যাবার তাড়াহুড়োয় কিছুই খেয়াল ছিল না আর। অফিসেও যেন আজ দুনিয়ের কাজের ঝামেলা! পার্সোনাল নাম্বারটায় কখন থেকে রিং হচ্ছিল খেয়াল করিনি। পিয়নটা মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলল- ছার! আপনার ফোন বাজতাছে…!
আমি দেখলাম একটা অপরিচিত নাম্বার।
– হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম?
– হ্যালো!
– কে?
– আমি! আমি কান্তা…
ভ্রু কুচকে বলতে যাচ্ছিলাম “কোন কান্তা!?” তার আগেই হটাৎ খেয়াল হলো… চট করে একবার স্ক্রিণে চোখ বুলিয়ে বললামঃ কান্তা… ও হ্যাঁ, কান্তা! বলেন? তাও ভাল এটা আপনার ফোন, পুলিশের না!
ওপাশের মেয়েটা খিল খিল করে হেসে উঠলো। এই হাসি কাল রাতেও বেশ কয়েকবার শুনেছি। তখন খেয়াল হয়নি, এই প্রথমবার মনে হলোঃ মেয়েটার হাসিটা তো খুব সুন্দর!

———-০———-

-সফিক এহসান
২৯-০৯-২০১৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *